মার্কিন অর্থনীতি ও সে-দেশের শ্রমিক শ্রেণির দুরবস্থা

পুঁজিবাদী প্রচারমাধ্যম সাধারণভাবে মার্কিন দেশ সম্পর্কে বিশ্বজুড়ে একটা ধারণা প্রচার করে চলে– নব্য-উদারনীতিবাদী অর্থনীতির সফল রূপায়নের ফলে সে-দেশ এক স্বপ্নভূমি। অমিত সম্পদের অধিকারী সে দেশে প্রতিটি নাগরিকের জীবন সাচ্ছল্য ও স্বাচ্ছন্দে্য ভরপুর। বিলাসবহুল জীবনযাপনের আধুনিক নানা উপকরণ ও নিরাপত্তা সেখানে সুলভ; জীবনজীবিকা নিয়ে প্রতিদিনের দুশ্চিন্তামুক্ত ও স্বাধীন তাদের জীবন। কিন্তু ভিতরের খবরে একটু চোখ রাখলেই টের পাওয়া যায়– দুনিয়াজুড়ে সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী প্রচারমাধ্যমের এই প্রচার কতটা অন্তঃসারশূন্য। সে দেশের সাধারণ মানুষের জীবন আদৌ এতটা উজ্জ্বল ও রঙিন নয়। বরং বহু প্রেক্ষিতেই যথেষ্ট বিবর্ণ ও মলিন। আর বিশেষত আজকের করোনা অতিমারির সময়ে প্রচারের এই ফাঁপা বেলুন এমন চুপসে গেছে যে, ভিতরের ভয়াবহ অবস্থা রীতিমতো প্রকট। অতিমারির অভিঘাতে মাত্র কয়েক সপ্তাহেই এই তথাকথিত শক্তিশালী অর্থনীতি প্রায় ভেঙে পড়ার উপক্রম। পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সহজাত ও অন্তর্নিহিত দুর্বলতা এবং অস্থিরতাই কেবল এর মধ্য দিয়ে প্রকাশ্যে এসে পড়েনি, সেই সঙ্গে তার ফলে সাধারণ মানুষ তথা শ্রমিক শ্রেণির ক্রমবর্দমান দুর্দশা, দারিদ্র, বঞ্চনাও আজ সমস্ত আড়াল খসিয়ে এসে পড়েছে সামনে।

করোনাপূর্ব পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক অসাম্য

কোনও দেশের সমাজ-অর্থনীতি কতটা সবল ও সম্পদশালী– তা বোঝার মাপকাঠিটা ঠিক কী? সম্পদ সৃষ্টি, বা উৎপাদনের পরিমাণ নয়, এর জন্য আমাদের তাকাতে হয় কীভাবে সেই উৎপাদিত সম্পদ বন্টন করা হচ্ছে তার দিকে। তার সঙ্গে দেখতে হয় মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলি, যেমন– খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, জীবিকা নির্ধারণের উপায়, আয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যক্রয়ের সামর্থ্য ও তার পরিমাণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার সুলভতা, প্রভৃতির কতটা সুব্যবস্থা রয়েছে। আর সেই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ– জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ নির্বিশেষে সমস্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের সাধারণ মানের উন্নতি হচ্ছে কিনা, তাকেও হিসেবের মধ্যে রাখা।

এখন বিচার্য – এই মৌলিক মাপকাঠিগুলির ভিত্তিতে দুনিয়ার পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী শিবিরের প্রধান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির অবস্থা ঠিক কী? প্রথমেই চোখ রাখা যাক উৎপাদিত সম্পদ বন্টনের ক্ষেত্রটিতে। আমেরিকার মূলধারার প্রচারমাধ্যমই বলছে– সে দেশের উচ্চতম আয়ের ২০ শতাংশ মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত ৮৬ শতাংশ সম্পদ। অর্থাৎ বাকি ৮০ শতাংশ মানুষের অধিকারে রয়েছে মাত্র ১৪ শতাংশ সম্পদ। বিগত ৫০ বছরের মধ্যে মার্কিন দেশের উচ্চ ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে আয়ের ফারাকও বর্তমানে সর্বোচ্চ (ওয়াশিংটন টাইমস, ২৭-০৯-২০১৯)। পুঁজিবাদী অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়মেই এই পার্থক্য অবশ্যম্ভাবী। কারণ সমাজের এক অংশের হাতে ধনসম্পদ কেন্দ্রীভূত হওয়ার অর্থই হল সমাজের বাকি অংশের হাত থেকে তা বেরিয়ে যাওয়া এবং দারিদ্র ও অর্থনৈতিক দুর্দশার বৃদ্ধি ঘটা। একই মুদ্রার দুই পিঠের মতো এই দুটিকে পরস্পর থেকে পৃথক করা অসম্ভব। মার্কিন সরকারের নিজের সরবরাহকৃত তথ্য থেকেই এক্ষেত্রে তাদের অর্থনীতির তথাকথিত সাফল্যের নেপথ্যের অন্ধকার চিত্রটিও বেরিয়ে আসে। পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতির উন্নয়নের চিত্রটি আসলে এমনই। এর ফলে জাতীয় সম্পদের বৃহদংশই ক্রমশ একচেটিয়া পুঁজিপতিদের হাতে এসে জমা হতে থাকে। অন্যদিকে সাধারণ মানুষ ও শ্রমিক শ্রেণির দুর্দশা ও দারিদ্র বেড়েই চলে। বিশেষত ১৯৮০-র পর থেকে এই তথাকথিত উন্নয়নের গতি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়, যা এখনও চলছে। নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ মিলটন ফ্রিডমান (১৯১২-২০০৬) পুঁজিবাদী উন্নয়নের এই চরিত্র সম্পর্কে বেশ খোলসা করেই বলেছেন– ব্যবসার এক ও একমাত্র সামাজিক দায়বদ্ধতা হল তার হাতে থাকা উপাদানকে এমনভাবে কার্যে নিয়োজিত করা যাতে মুনাফা ঘরে তোলা সম্ভব হয়। এছাড়া বাকি যা কিছু তা সমাজতন্ত্রের আওতায় পড়ে (http//prospect.org/economy/shareholder-capitalism-came-town/) অর্থাৎ পুঁজিবাদী অর্থনীতি এখন এতটাই জনবিরোধী যে, যেসব পুঁজিবাদী তাত্ত্বিক ও অর্থনীতিবিদ এতদিন পুঁজিবাদের এই সর্বোচ্চ মুনাফামুখী চলনকে আড়াল করতে মালিক শ্রেণির সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়ে নানাবিধ মিষ্টি মোড়ক দেওয়া তত্ত্বের আমদানি করতেন, আজ তাঁরাও বাস্তব পরিস্থিতিটা খোলাখুলি স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছেন।

১৯৮০-র দশকের শেষ দিক থেকে একটি নতুন শব্দবন্ধ উঠে এসেছে অর্থনৈতিক আলোচনায় – ‘শেয়ারহোল্ডার ক্যাপিটালিজম’। ব্যাপারটা ঠিক কী? না, বিভিন্ন কোম্পানিগুলির এক্ষেত্রে মূল লক্ষ্য হল ‘শেয়ারহোল্ডার’দের শেয়ারের দাম যতদূর সম্ভব বৃদ্ধি করা। বর্তমানে একবিংশ শতব্দীতে পুঁজিবাদী দুনিয়ার যাবতীয় তত্ত্ব, আলোচনা ও বিবিধ কর্মকাণ্ড এখন এই ধারণাটিকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে। এই তত্ত্বকে ভিত্তি করেই ওয়াল স্ট্রিট অর্থাৎ মার্কিন ধনকুবের গোষ্ঠীগুলির মুষ্টিমেয় ক্ষমতাধারী অংশ বর্তমানে বিভিন্ন কোম্পানিগুলির উপর তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেছে। কিন্তু এভাবে কোম্পানিগুলিকে নতুন বিনিয়োগের জন্য যথেষ্ট পুঁজির জোগান আর দিতে পারছে না, বরং কোম্পানিগুলোর মুনাফাও এদের গহ্বরে চলে যেতে থাকায় পুনর্বিনিয়োগের পরিমাণও হ্রাস পাচ্ছে। সেই অর্থে স্টক মার্কেট কোম্পানিগুলির প্রকৃত মূল্য বাড়ানোর বদলে কমিয়ে দিচ্ছে। একধরনের অসাম্য তৈরি হচ্ছে। কারণ কারও ক্ষতি না হলে কেউ লাভ করবে কীভাবে? আর দেখা যাচ্ছে এক্ষেত্রে লাভের কড়ি ক্রমশ বেশি পরিমাণে যাচ্ছে কেবল এই শেয়ারবাজারের নিয়ন্ত্রণকারী মধ্যসত্ত্বভোগীদেরই হাতে (http//neweconomics.org/uploads/files/NEF/SHAREHOLDER-CAPITALISM/E/latest.pdf) অর্থাৎ, ওয়াল স্ট্রিটের এইসব ফিনান্সিয়াররা আসলে স্টক মার্কেটকে ব্যবহার করছে দ্রুত লাভ করার একটি পদ্ধতি হিসেবে। ‘শেয়ারহোল্ডার ক্যাপিটালিজমের’ আসল স্বরূপ তাই এ রকমই। এ হল আধুনিক মরণোন্মুখ পুঁজিবাদের একধরনের পরগাছা চরিত্র, যেখানে একচেটিয়া পুঁজির অধিপতি একটি ক্ষুদ্র ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী উৎপাদন ব্যবস্থা বা বন্টনের ক্ষেত্রে কোনও রকম অংশ না নিয়েই সমস্ত কোম্পানির শেয়ার নিয়ন্ত্রণ করে এবং তাদের রোজগার শোষণ করে ফুলে ফেঁপে ওঠে।

অন্যদিকে বেকারত্বের হারের দিকে তাকালেও কোনও দেশের অর্থনৈতিক চালচিত্রের একটা ধারণা পাওয়া যায়। কিন্তু আমেরিকার ক্ষেত্রে বিষয়টা অতটা সোজা নয়। কারণ সেখানে বেকারত্বের কোনও সোজাসাপটা হিসেব প্রকাশ করাই হয় না। তাই সরকারিভাবে বেকারির যে পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়, তার আড়ালে সবসময়েই থেকে যায় বিপুল পরিমাণ লুক্কায়িত কর্মহীনতা। ‘বুরো অব লেবার স্ট্যাটিস্টিকস অব ইউএস’ কর্মহীনতার একাধিক সংজ্ঞা ধরে নিয়ে এই সংক্রান্ত বিবিধ হিসেব প্রকাশ করে থাকে। ফলে বিষয়টি সাধারণ মানুষের বোঝার পক্ষে বেশ জটিল হয়ে যায়। সরকারিভাবে ‘ইউ-৩’ হল সেইসব কর্মহীনদের পরিসংখ্যান, যারা সক্রিয়ভাবে চাকরি খুঁজছে। আবার ‘ইউ-৬’ হল তাদের পরিসংখ্যান, যারা অন্তত ১ বছর কাজ খুঁজেছে, কিন্তু শেষে না পেয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছে। আবার যারা কাজ হারিয়ে পড়তে ফিরে গেছে বা কোনও কারণে অক্ষম হয়ে পড়েছে, যারা নিজেদের যোগ্যতামান অনুযায়ী কাজ পায়নি বা যোগ্যতার থেকে কম আয়ে কাজ কতে বাধ্য হয়, অথবা আংশিক সময়ের জন্য কাজ করে– এদের প্রত্যেকের হিসেব আলাদা আলাদা। ফলে এই হিসেবগুলিকে পাশাপাশি রেখে দেখলে করলে বরং বিষয়টি অনেক ভালো বোঝা যাবে। ২০১৮ সালের আগস্ট মাসে ইউ-৩ হিসেবে আমরা পাই ৬২ লক্ষ মানুষের নাম। ঐ একই সময়ে ইউ-৬ হিসেবে সংখ্যাটি ৭৪ লক্ষ (ফোর্বস ২৫-০৯-২০১৮)। অর্থাৎ কর্মপ্রার্থীদের এক বিরাট অংশ কম আয়ের কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। এর উপর আবার আছে সমাজের বিভিন্ন অংশের মধ্যে চোখে পড়ার মতো ফারাক। ২০১৯ এর জুনের হিসেব অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে কর্মহীনের সংখ্যা যেখানে ৩.৩ শতাংশ, লাতিনোদের মধ্যে তা ৪.৪ শতাংশ আর কৃষiরাঙ্গদের মধ্যে ৬.৬ শতাংশ (ব্রুকিংস ০১-০৮-১৯)।

লুকোনো কর্মহীনতা বোঝার আরেকটি উপায় হল সমাজের কর্মক্ষম বয়সের কত শতাংশ মানুষ সক্রিয়ভাবে কাজে অংশগ্রহণ করছে সেই হিসেবে একটু চোখ রাখা। আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠন (ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন বা আইএলও) এবং বিভিন্ন দেশের সরকার এই হিসেব নিয়মিত প্রকাশ করে থাকে। সেই হিসেবে দেখা যাচ্ছে আমেরিকায় ২০০০ সালে যেখানে এই হার ছিল ৬৭.৩ শতাংশ। ২০০৯-র অর্থনৈতিক মন্দার সময়ে তা নেমে এসে দাঁড়ায় ৬৪.৬ শতাংশে; আর এখন ২০২০-র মার্চ মাসে তা আরও নেমে এসে দাঁড়িয়েছে ৬২.৭ শতাংশে। এই হিসেবের ক্রমাগত অবনমনই পরিষ্কার করে দেয় মার্কিন সমাজে কর্মহীনতা আসলে কী হারে বাড়ছে, যা সরকারি হিসেবে নানা জটিলতার মাধ্যমে লুকিয়ে রাখা হচ্ছে। অর্থনীতির হাল যদি ভালোই হয়, তাহলে তো কর্মক্ষম মানুষের কাজে অংশগ্রহণ আরও বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। অথচ ঘটছে ঠিক উল্টো। এর কারণটা ঠিক কী? এর আসল উত্তর হল– আসলে সাধারণ দক্ষতার বেশিরভাগ মানুষই এখন আর পূর্ণসময়ের কাজ পাচ্ছেন না; তাঁদের চুক্তির ভিত্তিতে সল্প সময়ের জন্য নিতান্ত কম বেতনে নিয়োগ করা হচ্ছে; সেখানে না থাকছে কাজের কোনও নিরাপত্তা, না স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কোনওরকম সুযোগসুবিধা। কিন্তু এইসব সাময়িক ঠিকা কাজের দৌলতেই বেকারত্বের সরকারি হিসেব থেকে তাদের নাম বাদ চলে যাচ্ছে। অন্যদিকে এই ধরনের অত্যল্প বেতনের ঠিকা কাজের জন্যই কর্মক্ষম মানুষের এক বড় অংশ কাজে যোগ দিতে নিরুৎসাহিত বোধ করছে।

অন্যদিকে মার্কিন ক্ষমতাসীন শ্রেণি আজকাল বলতে শুরু করেছে – ৩.৫ থেকে ৩.৭ শতাংশ বেকারি মানে বাস্তবে দেশে বেকারি বলে কিছু নেই। সবারই হাতে কাজ আছে। কিন্তু তাহলে তো সাধারণ মানুষের রোজগার বাড়ার কথা, তাদের অবস্থাও আরও ভালো হওয়ার কথা। বাস্তব অবস্থা কি তাই বলছে? সে দেশের সরকারের নিজের প্রকাশিত ‘লেবার শেয়ার’ হিসেব থেকেই সত্যিটা বেরিয়ে আসছে। ‘লেবার শেয়ার’ হল জাতীয় আয়ের (জিডিপি) যে অংশ শ্রমিক কর্মচারীদের বেতন এবং অন্যান্য সুবিধা বাবদ খরচ করা হয়। জাতীয় আয়ের বাকি অংশটিকে ‘প্রফিট শেয়ার’ বলা হয়ে থাকে। জাতীয় আয়ের মধ্যে এই শ্রমিকদের ভাগ আমেরিকার ক্ষেত্রে ১৯৫৩ সালে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছিল– ৫১.৬ শতাংশ। ১৯৬৫’তে তা দাঁড়ায় ৪৯ শতাংশ; তারপর থেকে ক্রমাগত নামতে নামতে ২০১৪’তে তা পৌঁছয় মাত্র ৪১.৯ শতাংশে। ২০১৮ সালে তা সামান্য উঠে দাঁড়িয়েছে ৪৩.২ শতাংশে (ইউএস বুরো অব ইকনমিক অ্যানালাইসিস ২০১৯)। এই ‘লেবার শেয়ার’ হ্রাস পাওয়ার অর্থই হচ্ছে– শ্রমিকরা অর্থনীতির বিকাশের ভাগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আমেরিকার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরণের সমীক্ষা থেকে যা উঠে এসেছে, তা হল মুদ্রাস্ফীতি ও বেতনবৃদ্ধিকে হিসেবের নিলে দেখা যাবে বেশিরভাগ মার্কিন শ্রমজীবী মানুষের বেতন বাস্তবে একই জায়গায় রয়ে গেছে। ঘন্টাপিছু সর্বোচ্চ আয়ের ৫০ শতাংশ কাজ ও সর্বনিম্ন আয়ের ৫০ শতাংশ কাজের মধ্যবর্তী মিডিয়ান রেখা আমেরিকায় ১৯৭৯ থেকে ২০১৯-এর মধ্যে, অর্থাৎ ৪০ বছরে, মাত্র ৬.১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২০.৭৬ ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ ডলার। এর মধ্যে সর্বনিম্ন ১০ শতাংশের ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধির হার আরও কম– মাত্র ১.৬ শতাংশ। আবার কৃষiরাঙ্গ ও লাতিনোদের (আমেরিকার মোট জনসংখ্যার ৩১.৭ শতাংশ মানুষ) হিসেব আলাদা করে নিলে দেখা যাচ্ছে এদের আয় এই ৪০ বছরে বাড়ার বদলে উল্টে কমে গেছে (কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিস ২০১৯)।

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের তাতে অবশ্য কিছুই যায় আসে না। মালিকরা সেদেশে কারণে অকারণে শ্রমিকদের বসিয়ে দেয়, তাদের বেতন এবং অন্যান্য সুযোগসুবিধা ছাঁটাই করে, কারখানা বন্ধ করে দেয়, ধারের বোঝা তাদের ঘাড়ে চাপায়, কম খরচে উৎপাদনের লোভে বিদেশে কাজ আউটসোর্স করে সেই দেশের সস্তা শ্রম ও কাঁচামাল শোষণ করে। কিন্তু শ্রমিকরা যদি তাদের প্রাপ্য বেতন ও সুযোগসুবিধা দাবি করে, তাদের প্রতি বঞ্চনা, অসাম্য বা অন্যায়ের প্রতিবাদ করে, সঙ্গে সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলার প্রশ্ন তুলে, উৎপাদনে বাধা দেওয়া হচ্ছে বলে সেই প্রতিবাদকে নিষ্ঠুরভাবে দমন করা হয়। বিশ্বজুড়েই সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদের রীতিই হল এই। মার্কিন দেশও তার কোনও ব্যতিক্রম নয়।

দারিদ্র পরিস্থিতি

বেকারি আর কম বেতনের নিতান্ত স্বাভাবিক ফল দারিদ্র। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের রিপোর্ট অনুযায়ী আমেরিকার ৪ কোটি মানুষ আজ দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করে। গত ৫০ বছরে সংখ্যাটা দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে (নিউ ইয়র্ক টাইমস, ১৬-০৪-২০২০)। আজকের অতিমারি পরিস্থিতির বহু আগেই, ২০১৯ সালের ফেডারেল রিসার্চ স্টাডিতেই উঠে আসছে– শতকরা ৪০ ভাগ আমেরিকানের হাতে বিপর্যয়ের সময় খরচ করার জন্য ৪০০ ডলারও মজুত থাকে না। এতে একটা চারজনের পরিবারের দু’সপ্তাহের খাবারও হয় না। (http//time.com/5800930/how-coronavirus-will-hurt-the-poor/) সাড়ে ৭ লক্ষ আমেরিকানের মাথার উপর কোনও ছাদ নেই। তাদের রাস্তায় ঘুমোতে হয় (ইকনমিক ডেইলি, ১২-০৬-১৯)।

পুঁজিবাদী প্রচারমাধ্যম এবং তাত্ত্বিকরা বারেবারেই একটা তত্ত্ব প্রচার করার চেষ্টা করে থাকেন– শ্রমিকদের দারিদ্রের জন্য আসলে দায়ী শ্রমিকরাই। কিন্তু সত্যিই কি তাই? এমনকি বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদদের নিজস্ব মাপকাঠিগুলো ধরে বিচার করলে এক্ষেত্রে কী দেখতে পাওয়া যায়? আমেরিকার ক্ষেত্রে আসুন আমরা একটা নির্দিষ্ট সময় বেছে নিয়ে সেই সময়ে উৎপাদন ও বেতনবৃদ্ধির দিকে একবার চোখ রাখি। ১৯৪৮ থেকে ‘৭৯ আমেরিকায় উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছিল ১০৮.১ শতাংশ। ঐসময়ে ঘন্টাপিছু বেতনবৃদ্ধি কিন্তু দেখা যাচ্ছে শতাংশের হারে বেশ খানিকটা কম, ৯৩.২ শতাংশ। আর ১৯৭৯ থেকে ২০১৮ সময়সীমায় দেখা যাচ্ছে উৎপাদন বৃদ্ধি হচ্ছে ৬৯.৬ শতাংশ, বেতনবৃদ্ধি কিন্তু ঐ একই সময় মাত্র ১১.৬ শতাংশ, অর্থাৎ উৎপাদন বৃদ্ধির মাত্র ছয়ভাগের একভাগ। এরমধ্যে উচ্চ আয়ের কর্মচারী, যাদের বেতন বৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে বেশি তাদের আমরা হিসেব থেকে বাদ দিই, তবে দেখবো বেশিরভাগ শ্রমিক কর্মচারীর বাস্তব বেতন এই দীর্ঘ সময় জুড়ে একটুও বাড়েনি, যদিও উৎপাদন বৃদ্ধি হয়েছে ঐ একই সময় পায় ৭০ শতাংশ (http/www.epi.org/productivity-pay-gap/) তাহলে কী করে বলা চলে তাদের দারিদ্রের জন্য শ্রমিকরা নিজেরাই দায়ী? নাকি বাস্তবটা ঠিক বিপরীত? উৎপাদনবৃদ্ধির প্রায় পুরো সুফলটাই অতি ধনী মালিক শ্রেণির পকেটস্থ হওয়াতেই শ্রমিক কর্মচারীদের এই হতদরিদ্র দশা?

ঋণভিত্তিক অর্থনীতির বাড়বাড়ন্ত

সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের ক্রমহ্রাসমান আয়ের আরেক প্রমাণ তাদের ক্রমাগত ঋণ নির্ভরতা বৃদ্ধি। আমরা জানি, পুঁজিবাদী অর্থনীতির মন্দার কারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ক্রমাগত কমে যাওয়া। কারণ তার আয় হ্রাস পাওয়া। এখন পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদরা মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়িয়ে অর্থনীতিকে বাঁচানোর উপায় হিসেবে যেসব টোটকা দাওয়াই’এর ব্যবস্থা করেছেন, ধার দেওয়া তার অন্যতম। ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক সংগঠনের পক্ষ থেকে মানুষকে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া হয়, যাতে মানুষ বাজার থেকে কিছু কিনতে পারে। আর সেই সুযোগে বাজার কিছুটা চাঙ্গা হয়ে ওঠে। কিন্তু এই ঋণভিত্তিক অর্থনীতি যে কী ভয়াবহ পরিস্থিতি ডেকে আনতে পারে ২০০৮ সালের মন্দা তার অন্যতম দৃষ্টান্ত। তারপরেও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শাসকরা এখনও সেই পথই অনুসরণ করে চলেছেন।

মার্কিন নাগরিকরা এখন ঋণের দায়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। তাদের ঋণের রকমফের বহু – গৃহঋণ, ক্রেডিট কার্ড বাবদ ঋণ, শিক্ষা বাবদ ঋণ, গাড়ির জন্য নেওয়া ঋণ। দেশের মানুষের নেওয়া মোট ঋণ ২০১৪ সালে যেখানে ছিল ১১.৫ লক্ষ কোটি ডলার, ২০১৯-এ তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪ লক্ষ কোটি ডলারে। উচ্চশিক্ষা আমেরিকায় অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তার উপর গত ১৯৮০ থেকে প্রতিবছর এই বাবদ ব্যয়বৃদ্ধি গড়ে ৭ শতাংশের মতো। এর ফলে ছাত্রদের পক্ষে শিক্ষাবাবদ ঋণ নেওয়া ছাড়া পড়াশুনো চালানো প্রায়শই মুশকিল। দেখা যাচ্ছে আমেরিকায় ছাত্রদের নেওয়া এই শিক্ষাঋণের মোট পরিমাণ ২০০৪ সালে যেখানে ছিল ২৬ হাজার কোটি ডলারের কাছাকাছি, ২০১৯’এ গিয়ে তা দাঁড়ায় ১.৫ লক্ষ কোটি ডলারে– মানে ১৫ বছরে এক্ষেত্রে বৃদ্ধির পরিমাণ ৭ গুণ। বর্তমানে ৪ কোটি ৪০ লক্ষ মার্কিন নাগরিক এই শিক্ষাঋণের আওতায়। পরিসংখ্যান আরও দেখাচ্ছে– সাধারণ কোনও ব্যাচেলর ডিগ্রি অর্জন করতে, অর্থাৎ শুধুমাত্র কলেজস্তরের শিক্ষা শেষ করতেই একজন গড়পড়তা মার্কিন নাগরিকের যা ঋণ হয়ে যায়, তা শোধ করতে তার সময় লাগে অন্তত ২১ বছর (কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিস ২০১৯)। এর মানে হল– একজন সাধারণ মার্কিন নাগরিক যদি ২১ বছর বয়সে তার কলেজ শিক্ষা সম্পন্ন করতে পারে তাহলেও তার নেওয়া ঋণ শোধ করতে করতে সে মধ্য চল্লিশে এসে পড়ে। আর এর মধ্যে সে যদি কখনও চাকরি হারায়, বা কয়েক মাসও উপার্জনহীন হয়ে বসে থাকতে বাধ্য হয়, ঋণদাতারা কি তাকে তখন ছেড়ে দেবে? তাছাড়াও ঐ কয়েক মাস ঋণ শোধ না করতে পারার ফলে সুদের পরিমাণও তো আকাশ ছুঁয়ে ফেলবে। এখন নিচয়ই বোঝা যাচ্ছে, কেন বহু মার্কিন যুবকযুবতী তার যোগ্যতামানের থেকে অনেক কম বেতনেও কাজ করতে বাধ্য হয়।

১৮ কোটি ৯০ লক্ষ মার্কিন নাগরিকের হাতে আজ ক্রেডিট কার্ড। আর ২০১৯ সালে ক্রেডিট কার্ড বাবদ পরিশোধ্য মোট ঋণের পরিমাণ ১ লক্ষ ৮ হাজার কোটি ডলার। ক্রেডিট কার্ড আছে এমন প্রতিটি পরিবারের ঋণের পরিমাণ ৮৩৯৮ ডলার। যেখানে আমেরিকায় ব্যাঙ্কে টাকা রাখলে গ্রাহক ঋণ পান খুব জোর বার্ষিক ১ শতাংশ হারে, ক্রেডিট কার্ডের ঋণ বাবদ সেখানে সুদ গুনতে হয় গড়ে বার্ষিক ১৭ শতাংশ হারে। ‘ম্যাগনিফাই মানি’ সংস্থার সমীক্ষা অনুযায়ী ২০১৮-‘১৯ আর্থিক বছরে শুধুমাত্র ক্রেডিট কার্ড বাবদ বিভিন্ন চার্জ শোধ করতে হয়েছে আমেরিকার মানুষকে ১০ হজার ৪০০ কোটি ডলার (http/www.cnbc.com/2018/07/19/consumers-paying-104-billion-in-credit-card-interest-and-fees.html)। এই কারণেই বিভিন্ন ব্যাঙ্ক আজকাল নানা আকর্ষণীয় অফারের মাধ্যমে দিনরাত তাদের গ্রাহকদের ক্রেডিট কার্ড গছাতে চেষ্টা চালায়, যাতে ছাত্রাবস্থা থেকেই সে ক্রেডিট কার্ডে কেনাকাটা করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে এবং সেই বাবদ সারা জীবন ধরেই তার কঠিন পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জিত উপার্জনের এক বড় অংশ ঋণ পরিশোধে ব্যয় করতে বাধ্য হয়, আর সেই সুদের টাকায় ঋণদাতা সংস্থাগুলি ফুলে ফেঁপে উঠতে পারে।

২০০৮ সালে আমেরিকার অর্থনৈতিক মহামন্দার অন্যতম কারণ ছিল লাগামছাড়া গৃহঋণ। তারপরেও, ২০১৮ সালেও দেখা যাচ্ছে সে দেশে এই বাবদ মোট ঋণের পরিমাণ ১০ লক্ষ ৩০ হাজার কোটি ডলার (http/www.thebalance.com/average-monthly-mortgage-payment4154282)। আমেরিকার মোট জনসংখ্যার ৩৬ শতাংশই এখনও ভাড়া বাড়িতে বাস করে। কিছু কিছু শহরের ক্ষেত্রে এই হার এমনকি ৭০ শতাংশ। ১৯৮১ সালের হিসেব অনুযায়ী আমেরিকার বাড়ি ক্রেতাদের গড় বয়স ছিল ৩১ বছর। ২০১৯ সালে তা হয়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭ বছর (http /www.marketwatch.com/story/this-chart-shows-just-how-much-is-staked-against-young-peopke-who-want-to-buy-a-home-2019-12-05)। বাসস্থান হল মানুষের খাদ্য বা বস্তে্রর মতোই একটা মৌলিক চাহিদা। দেখা যাচ্ছে এই মৌলিক চাহিদা মেটাতেই আজ আমেরিকার মানুষকে তাদের রোজগারের মোটা একটা অংশ ক্রমাগত ব্যয় করে যেতে হচ্ছে।

বর্তমান করোনা অতিমারি পর্বের আগেই মার্কিন দেশের অধিকাংশ মানুষই পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদদের মতে পবিত্র ‘সম্পদের অধিকার’ থেকে এতটাই বঞ্চিত হয়ে পড়ে যে মালিক শ্রেণির কাছে নিজেদের শ্রম বিক্রি ব্যতীত তাদের জীবনধারণ করাই অসম্ভব। ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’র পাতায় কার্ল মার্কস লিখেছিলেন– ‘‘আমরা যখন ব্যক্তিগত সম্পত্তি লোপের কথা বলি, আপনারা অনেকে আতংকিত হয়ে পড়েন। কিন্তু আপনাদের বর্তমান সমাজে প্রতি দশ জনের নয় জন মানুষের কাছেই তো ব্যক্তিগত সম্পত্তি ইতিমধ্যেই লোপ পেয়ে গেছে; বাকিদের হাতে এর অস্তিত্বর একমাত্র কারণই হল সমাজের এই নয় দশমাংশ মানুষের হাতে এর অস্তিত্বহীনতা। অর্থাৎ আপনারা আমাদের সমালোচনা করছেন সম্পত্তির এমন একটি রূপের বিরোধিতা করার জন্য, সমাজের একাংশের হাতে যার অস্তিত্বের প্রয়োজনীয় শর্তই হল সমাজের বেশির ভাগ মানুষের হাতে তা না থাকা।” (একাদশ পরিচ্ছদ)

করোনা অতিমারিকালীন পরিস্থিতি

এতক্ষণ ধরে আমরা করোনা পূর্ব পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করছিলাম। করোনা পরিস্থিতি এবং তদজনিত লকডাউন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে মাত্র। সাধারণ মার্কিন নাগরিক এবং শ্রমিক শ্রেণির দুর্দশা এর ফলে এক অভূতপূর্ব পর্যায়ে পৌঁছেছে। আমেরিকা ইতিমধ্যেই এক প্রবল অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে দিয়ে চলেছে। কিন্তু একমাত্র সরকার তা স্বীকার করছে না। করোনা পর্বের বহু আগে ২০১৯ সালের আগস্ট মাসেই প্রতি চারজনের মধ্যে তিনজন অর্থনীতিবিদই এই বিষয়ে তাঁদের সহমত পোষণ করতেন (ওয়াশিংটন পোস্ট, ০৯-০৮-২০১৯)। বর্তমানে ন্যাশনাল বুরো অব ইকনমিক রিসার্চও তাদের জুন মাসের রিপোর্টে তা সরকারিভাবেভাবে স্বীকার করেছে (সিএনবিসি, ০৯-০৬-২০২০)। অথচ আচর্যজনকভাবে মার্কিন সরকার ও তাদের পেটোয়া প্রচারমাধ্যম এই অতিমারি পরিস্থিতির ঠিক আগে দাবি জানিয়েছিল– ২০১৯ সাল নাকি মার্কিন শ্রমিকদের পক্ষে খুব ভালো একটা বছর ছিল। কারণ এই বছরে বেকারির হার মাত্র ৩.৫ শতাংশে নেমে এসেছিল। তারা দাবি জানিয়েছিল – এত কম কর্মহীনতা নাকি বাস্তবে কর্মহীনতা আদৌ না থাকার সমান। অথচ নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিৎস সেই সময়েই বলেছিলেন, এবারের মন্দার বৈশিষ্ট্যই হল তার ভয়ংকর গতি। বিশেষভাবে তা কর্মহীনতার ক্ষেত্রে সত্য। বর্তমান মন্দায় মাত্র কয়েক সপ্তাহে কর্মহীনতার মাত্রা ১০ শতাংশ পেরিয়ে গেছে। ১৯৩০’এর মহামন্দার সময়েও কর্মহীনতা কখনও এই মাত্রা ছোঁয়নি (সিএনবিসি, ০৯-০৬-২০২০)। আজকের করোনা পরিস্থিতি যে আমেরিকার শ্রমিক-কর্মচারী-সাধারণ মানুষের জন্য কী ভয়াবহ পরিস্থিতি নামিয়ে এনেছে, বুর্জোয়া প্রচারমাধ্যমের পক্ষেও তা আর এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বিনামূল্যে একটু খাবার পাওয়ার আশায় দেখা গেছে এমনকি এক মাইলের থেকেও লম্বা লাইন। ১১ জুলাই, ২০২০ শেষ হওয়া সপ্তাহে দেখা গেছে ১৩ লক্ষ মানুষ নতুন করে আনএমপ্লয়মেন্ট ইনসিওরেন্স পাওয়ার জন্য নিজেদের নাম নথিভুক্ত করেছে। এই পরিমাণ ২০০৭-‘০৯ মন্দার সময়ের তুলনাতেও দ্বিগুণ। এছাড়াও আরও ৯ লক্ষ আবেদন জমা পড়েছে অতিমারিকালীন কর্মহীনতা সংক্রান্ত সাহায্যের জন্য (ব্লুমবার্গ, ২০-০৭-২০২০)। সরকারিভাবেই বলা হচ্ছে – অন্তত ৩ কোটি মানুষ এই সময়ে কাজ হারিয়েছেন। পরিযায়ী শ্রমিক, ঠিকা শ্রমিকদের ধরলে বাস্তবে সংখ্যাটা দাঁড়ায় ৫ কোটির কাছাকাছি। এর মানে দাঁড়ায় মার্কিন কর্মক্ষম জনসাধারণের এক-তৃতীয়াংশই এখন কর্মহীন (ওয়ার্কারস’ ওয়ার্লড, ০৮-০৫-২০২০)। শুধু তাই নয়, অর্ধেক কর্মক্ষম মানুষই যে কোনও মুহূর্তে কাজ হারাবে বলে আশংকা করা হচ্ছে। ফলে করোনা পরিস্থিতির ধাক্কায় এক বিরাট সংখ্যক কাজ হারানো মানুষকে ভিখারির মতোই আজ ফুড কুপনের লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। এমনকি এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও বেশ কিছু সংস্থার শ্রমিক, যাদের এমনকি নিজেদের ইউনিয়ন করারও অধিকার নেই – যেমন আমাজন, ইনস্টাকার্ট, টার্গেট, প্রভৃতি সংস্থা– তারা মে দিবসে নিজেদের জন্য নিরাপদ কাজের পরিবেশ এবং অসুস্থতাজনিত ছুটির অধিকারের দাবিতে ধর্মঘটে যেতে বাধ্য হয়েছে। বর্তমানে স্বাস্থ্যকর্মীরা, পরিযায়ী কৃষিশ্রমিকরা, মুদিখানার দোকানে কর্মীরা এবং অন্যান্য এধরনের কম আয়ের কর্মীরা নিজেদের বেঁচে থাকার অধিকারটুকুর জন্য লড়াই করছে। বোঝাই যাচ্ছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও যেসব কাজ এই সময় চলে গেছে, তার অনেকগুলোই আর ফিরে আসবে না। আর বিশেষত আফ্রিকান-আমেরিকান, হিসপ্যানিক এবং সমাজের এইধরনের দুর্বল অংশ, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেই যাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রবল সংগ্রাম করতে হয়। স্বাভাবিকভাবেই করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যাও এদের মধ্যেই অধিক, শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় দ্বিগুণ (আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৪-০৮-২০২০) – এরাই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত। বর্তমানে সরকার পরিস্থিতির চাপে একরকমের বাধ্য হয়েই গত কয়েক দশকের ব্যয়সংকোচনের নীতি থেকে সরে এসে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার উদ্দেশ্যে আপাতত কয়েক লক্ষ কোটি ডলার ব্যয় করতে এগিয়ে এসেছে। এমার্জেন্সি রিলিফ ফান্ডের নামে এই টাকা দেওয়া হলেও দেখা যাচ্ছে এর বেশিরভাগটাই যাচ্ছে বড় বড় কোম্পানিগুলোরই গর্ভে। বেশিরভাগ কাজ হারানো শ্রমিক কর্মচারী, যাদের এই রিলিফের সবচেয়ে বেশি দরকার, তারা হয় এখনও পর্যন্ত তা পায়নি, অথবা দেখা যাচ্ছে নানা নিয়মের প্যাঁচে পড়ে তা পাওয়ার যোগ্যই না (ওয়ার্কারস’ ওয়ার্লড, ০৮-০৫-২০২০)। তার উপর বিশ্বায়ন আমেরিকার মতো উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শ্রমিক-কর্মচারীদের জীবন আরও কঠিন করে তুলেছে। তাদের এখন প্রতিযোগিতায় নামতে হচ্ছে পিছিয়ে থাকা নানা দেশের গরিব শ্রমিকদের সঙ্গে, কারণ মালিকশ্রেণি সস্তায় কাজ করিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাদের উৎপাদন এখন প্রায়শই সেইসব দেশে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। মানুষের সচেতন বিপ্লবী সংগ্রামই একমাত্র পারে এই শোষণমূলক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অবসান ঘটাতে

উপরের আলোচনা থেকে পরিষ্কার, পুঁজিবাদী অর্থনীতির নিজস্ব অস্থিরতা এবং শ্রমজীবী সাধারণ মানুষের শোষণের মাধ্যমে ক্রমাগত সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের ধাক্কাতেই আজ আমেরিকার সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ আজ এই দুর্দশার মুখোমুখি। এমনকি তাদের তথাকথিত ভালো দিনেও, যখন সমাজে নাকি কর্মহীনতা বলেই কিছু নেই, তখনও তাদের কম বেতনে সাময়িক ঠিকা কাজ করে দিন কাটাতে হচ্ছে। জীবন তাদের অনিচয়তায় ভরা। বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদ, এখনও পর্যন্ত যাদের নেতা আমেরিকা, এক অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সংকটে আজ হাবুডুবু খাচ্ছে। ১৯৩০’এর মহামন্দার তুলনাতেও তা ভয়াবহ। এই সংকটের হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়া তো দূরস্থান, দিনে দিনে তা আরও উচ্চ মাত্রা অর্জন করবে। কারণ, এর থেকে পরিত্রাণের আশায় যত কাজ ছাঁটাই করা হবে, মানুষ উত্তরোত্তর কম বেতনে অনিয়মিত কাজ করতে বাধ্য হবে। পুঁজিবাদী অতি উৎপাদনের ফলে জমে যাওয়া পণ্য কেনবার মতো ক্রেতাও কমে যাবে। ফলে আরও কারখানা বন্ধ হবে, ছাঁটাইয়ের পরিমাণও আরও বাড়বে। করোনা অতিমারি নিজে যেমন ভয়াবহ, এমনিতেই তীব্র সংকটে ডুবে থাকা বিশ্ব পুঁজিবাদী অর্থনীতিকেও অনুঘটক হিসেবে তা আরও গভীরতর সংকটের আবর্তে নিক্ষেপ করেছে। ১৯৩০-এর মহামন্দার পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে মার্কিন অর্থনীতি সাময়িক অি’জেনের জোগান পেয়ে কিছুটা সামলে ওঠে এবং বাকি শক্তিশালী পুঁজিবাদী দেশগুলির যুদ্ধে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সুযোগ নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী দুনিয়ার নেতৃত্বে উঠে আসে। কিন্তু এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবেই তার অর্থনীতি ধীরে ধীরে পড়ে আসছে। বিশ্বায়ন, একের পর এক নবতর প্রজন্মের প্রাযুক্তিক উন্নতি, শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষের উপর ক্রমবর্দমান শোষণ ও তাদের জীবনযাত্রার মানের উপর ধারাবাহিক আঘাত– কোনও কিছুই তাকে অর্থনীতির এই পঙ্কিল আবর্ত থেকে উদ্ধারের পথ বাতলাতে পারেনি।

এখন এই ভয়াবহ করোনা আবহে তাদের ‘শকুনি প্রবৃত্তি’ আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। লক্ষ লক্ষ মানুষের অসহায়তা ও মৃত্যুকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে উদ্দেশ্য যতটা সম্ভব লাভ করে নেওয়া। সেই উদ্দেশ্যে চলেছে বিবিধ উপায় অবলম্বন– জীবনদায়ী ওষুধের দাম ক্রমাগত বাড়িয়ে চলা, করোনা টেস্টের নামে যতটা সম্ভব অতিরিক্ত লাভ করে নেওয়া, বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের কৃত্রিম অভাব তৈরি করে তার দাম আকাশছোঁয়া করে তোলা, বিভিন্ন অবশ্য প্রয়োজনীয় পরিষেবার রাতারাতি মূল্যবৃদ্ধি, প্রভৃতি; এমনকি সরকার থেকে এই পরিস্থিতিতে যে রিলিফ ফান্ড তৈরি করা হয়েছে, নানা ঘুরপথে তার টাকারও এক বিরাট অংশ শেষপর্যন্ত ঐ কতিপয় অতি ধনীরই হস্তগত হচ্ছে। একদিকে সামান্য কয়েক শত হাতে এসে জমা হওয়া অপরিমেয় সম্পদ, আর অন্যদিকে ক্রমবর্দমান দারিদ্র ও অনিচয়তায় দিশাহারা কোটি কোতি বুভুক্ষু জনতা– আজকের একবিংশ শতব্দীর বিশ্বায়িত মহাসংকটগ্রস্ত শোষণমূলক সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদের এই হল স্বরূপ। আজকের এই কোভিড ১৯ অতিমারিতে আরও তীব্র মহাসংকটে ডুবতে থাকা অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে তাই আজ শ্রমিক শ্রেণির আবার দরকার মহান দার্শনিক কার্ল মার্কসের সেই অমোঘ শিক্ষাকে স্মরণ করা– ‘‘সর্বহারার শৃঙ্খল ছাড়া হারাবার কিছু নেই। জয় করবার জন্য আছে সারা দুনিয়া।” (কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো) ইতিমধ্যেই এই শোষণমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভের চেহারায় নানাভাবে ফেটে পড়তে শুরু করেছে। আমেরিকাতেও ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ আন্দোলনের সময় এই বিক্ষোভ এখনও পর্যন্ত তার শীর্ষ ছুঁয়েছিল; আজকের ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলনও এখনও চলছে। দীর্ঘস্থায়ী এই আন্দোলনের ধাক্কায় পেন্টাগনের কর্তারা এই মুহূর্তে যথেষ্টই বিচলিত। আশা করা যায়, সেই দিন আর খুব দূরে নয়, যেদিন পৃথিবীর অন্যান্য দেশের শ্রমিক শ্রেণির সাথে হাতে হাত মিলিয়ে আমেরিকার শ্রমিক শ্রেণিও এগিয়ে আসবে লড়াইয়ের পথে, এই শোষণমূলক পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে উচ্ছেদ করে বিপ্লব সংগঠিত করে মুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে।

(ডিজিটাল গণদাবী-৭৩ বর্ষ ৭ সংখ্যা_২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০)