অবাধে মহিলা–শিশু পাচার রাজস্থানে সরকার নীরব দর্শক

ফাইল চিত্র পুরুলিয়া ৮ মার্চ ২০১৬

১৫ বছরের কম বয়সের একটি মেয়েকে এক মহিলা সহ তিনজন জোর করে দেহব্যবসায় নামানোর চেষ্টা করছে খবর পেয়ে পুলিশ মেয়েটিকে উদ্ধার করে হোমে পাঠায় এবং অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে৷ ঘটনাটি রাজস্থানের কোটার৷ মেয়েটিকে কাজ দেওয়ার নাম করে বোম্বে থেকে আনা হয়েছিল৷ কয়েক বার হাত বদল হয়ে মেয়েটি এসে পৌঁছায় কোটায়৷ দেশের অন্যান্য প্রান্তের থেকে ঘটনাটি আলাদা কিছু নয়৷ এভাবে ভুল বুঝিয়ে, টাকার লোভ দেখিয়ে অসংখ্য গরিব কিশোরী, মহিলাদের দেহব্যবসায় নামিয়ে বিপুল টাকার লেনদেন চালায় পাচার চক্র৷ এই চক্রের হাত বহুদূর প্রসারিত৷ এসব কথা পুলিশ-প্রশাসন জানে না, কোনও নাবালকও তা বিশ্বাস করবে না৷ রাজ্যে ক্ষমতায় আসীন কংগ্রেস সরকার রয়েছে নীরব দর্শকের ভূমিকায়৷ কিছুদিন আগে পর্যন্ত রাজ্যে ক্ষমতায় আসীন ছিল বিজেপি৷ ক্ষমতায় যেই থাক, তাতে নারীদের পরিস্থিতির কোনও পরিবর্তন হয়নি৷

রাজস্থানের কথা মনে হলেই ধূ ধূ মরুভূমি আর রুক্ষ-শুষ্ক্ প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকা মানুষের ছবিই ভেসে ওঠে৷ কিন্তু এ ছাড়াও মানুষকে বাঁচতে হয় অনাহার-দারিদ্রের সাথে লড়াই করে৷ শিল্প প্রায় নেই৷ রুখা-শুখা জমিতে কৃষিকাজও হয় খুব সামান্য৷ ফলে কাপড় কলে বা জরির কাজ করে রোজগার৷ তাতে আর ক’টা পরিবারের চলে! কাজের খোঁজে অন্য রাজ্যে পাড়ি দিতে হয় অনেককে৷ শিক্ষাতে পিছিয়ে থাকা রাজ্যের মানুষের মধ্যে রয়েছে রক্ষণশীলতা ও ব্যাপক কুসংস্কার৷ ফলে ঘরে-বাইরে মহিলাদের উপর অত্যাচারের ঘটনা বেড়েই চলেছে৷ ২০২১-এর রিপোর্ট বলছে, দেশের মধ্যে ধর্ষণে সবচেয়ে এগিয়ে রাজস্থান৷ এটি কিশোরী ও মহিলাদের পাচার এবং দেহব্যবসার উর্বর ক্ষেত্র৷ দারিদ্রের ছোবলে যন্ত্রণাকাতর পরিবার কিংবা সন্তানের মুখে দু’মুঠো খাবার তুলে দেওয়ার আশায় বহু পরিবার পাচারকারীদের টোপ গিলে মেয়েদের তাদের শিকারে পরিণত করতে বাধ্য হয়৷ দিনের পর দিন ধরে এক শ্রেণির মানুষ এই ঘৃণ্য ব্যবসা এবং প্রতিপত্তি বৃদ্ধি করে চলেছে৷ জাতীয় মহিলা কমিশনের দুই সদস্যের কমিটি সম্প্রতি এই সংক্রান্ত রিপোর্ট পেশ করেছে, তাতেই বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে৷ রাজ্যের ভিলওয়ারা, ভরতপুর সহ বেশ কয়েকটি জেলায় কিশোরীদের দেহব্যবসায় নামতে বাধ্য করা হচ্ছে বলে তাঁরা অভিযোগ জানিয়েছেন৷ এ বিষয়ে তারা কেন্দ্রীয় সরকারকে সিট গঠন করে তদন্ত করার আবেদন করেছে৷

মহিলাদের নানা কৌশলে দেহব্যবসায় ঢোকানো হয়৷ সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়, ভিলওয়ারায় ঋণশোধ করতে আসা কিশোরীদের কোনও অজানা কারণে স্ট্যাম্প পেপারে সই করিয়ে নেওয়ার খবর৷ তখনই জানা যায়, মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার নাম করে বা দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের কাছে পাঠানোর নাম করে দেহব্যবসায়ীদের হাতে বিক্রি করে দেওয়ার সক্রিয় চক্রের কথা৷ কোনও পারিবারিক বা বৈষয়িক বা অন্য কোনও বিষয়ে বিরোধ থাকলে কিংবা কারও মায়ের উপর শারীরিক নির্যাতন হয়ে থাকলে খাপ পঞ্চায়েতের মাধ্যমে সেগুলির মীমাংসা করার নামে ওই সব বাড়ির মেয়েদের জোর করে এই অমানবিক বৃত্তিতে নামতে বাধ্য করা হয়৷ এর সপক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ কমিশনের তদন্তে উঠে এসেছে৷ সোয়াই মাধোপুর, ভিলওয়ারা, ভরতপুরে হাইওয়ের পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলি এই ধরনের অসামাজিক কাজকর্মের ঘাঁটি৷

রাজ্যে শিশুকন্যাদের বিয়ের নামে পাচার এখনও নিয়মিত ঘটনা৷ এই সব বিষয়ে সিট কিংবা কোনও সংস্থা তদন্ত করলেও রেহাই নেই শিশু ও মহিলাদের৷ কারণ এদের পরিজনেরা পঞ্চায়েত এবং স্থানীয় প্রশাসনের প্রবল চাপের মুখে পড়ে বহু সময়েই দেহব্যবসা ও পাচারের ঘটনা গোপন করে যান৷ ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে অত্যাচারিতা কিশোরীদের ডিএনএ পরীক্ষার দাবি ওঠে৷ কিছু বাড়িতে গেলে দেখা যায়, সেখানে ৬-৮টি কিশোরী রয়েছে একই ছাদের তলায়, অথচ একে অপরের কে হয় তা বলতে পারছে না৷ পুলিশি তৎপরতা না থাকায় অসংখ্য কিশোরী নিজেদের অজান্তেই পাচার চক্রের কবলে পড়ে যায়৷ আড়কাঠি আর দালালদের খপ্পরে পড়ে দরিদ্র পরিবারের বহু কিশোরী এই ঘৃণ্য ব্যবসায় যুক্ত হয়ে যন্ত্রণার দিন যাপন করে বছরের পর বছর৷

একটা পেটের জোগান কমে গেলে স্বস্তি পায় বহু অভাবী পরিবার৷ ফলে এদের খুঁজে বার করার চেষ্টাও করে না অনেকে৷ যারা খোঁজার চেষ্টা করেন তারাও সরকারি সহায়তা সেভাবে না পাওয়ায় সন্ধান পান না৷ বহুদিন পর কারও হদিশ পাওয়া গেলে সমাজে তার স্থান হয় না৷ পরিবার, প্রতিবেশীরা অন্য চোখে দেখে৷ ফলে চোখের জল ফেলতে ফেলতে অনেকেই এই কারবারে ফিরে যেতেও বাধ্য হন৷ সরকার কিংবা কোনও অ–সরকারি সংস্থা কিছু মহিলাকে কখনও উদ্ধার করলেও এই সমস্ত ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে শাস্তি দেওয়ার কোনও ব্যবস্থা করে না৷ তারা প্রভাব খাটিয়ে কিংবা অর্থ জুগিয়ে প্রশাসনের মুখে কুলুপ এঁটে রাখে৷ ফলে অসহায় মহিলাদের কাটাতে হয় অন্ধকার জগতেই৷

স্বাধীনতার অমৃতকাল নিয়ে বহু ঢাকঢোল পিটিয়ে শাসক বিজেপি জৌলুসপূর্ণ নানা কর্মসূচি পালন করেছে৷ কিন্তু মর্যাদাহীন অবস্থায় লক্ষ লক্ষ মহিলা যে যন্ত্রণাময় জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন দিনের পর দিন, তার কোনও খোঁজ রাখেন কি তাঁরা!

‘বেটি বাঁচাও’–এর জোর প্রচার চলছে, তাহলে বেটিদের দুর্দশা দেখে নেতারা চোখ বুজে আছেন কেন! বিজেপি, কংগ্রেস এবং নানা আঞ্চলিক দল মহিলাদের ক্ষমতায়ন, তাদের অধিকারের প্রশ্ন তুলে ভোটের আসর গরম করে থাকে৷ কিন্তু মহিলাদের প্রকৃত মর্যাদা, তাদের অধিকারবোধ নিয়ে কোনও লড়াই তারা করে না৷ মহিলাদের প্রকৃত মর্যাদা না দিলে সমাজ যে সর্বাঙ্গীন সুন্দর হয় না, তা তারা মানেন কি! আসলে ক্ষমতায় বসেই নেতাদের মহিলাদের দুঃখে ফেলা চোখের জল বাষ্প হয়ে যায়৷

সমাজের উচ্চবিত্তদের লালসার শিকার, মর্যাদাহীন জীবনযাপনে বাধ্য অত্যাচারিতা পতিতাদের দুঃখে, সর্বোপরি নারীদের মর্যাদা দিতে চোখের জলে সমাজের এই সীমাহীন অন্যায়ের প্রতিকারে এগিয়ে এসেছিলেন মহান মানবতাবাদী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়৷ কিন্তু তাঁরা এদের মুক্তি দেখে যেতে পারেননি৷ কারণ বর্তমান বিদ্যমান পুঁজিবাদী সমাজ এদের মুক্তি দিতে পারে না৷ পচা-গলা এই পুঁজিবাদী সমাজ এই নিষ্ঠুর প্রথার গায়ে মলম লাগিয়ে বড়জোর তা সহনশীল করে রাখার চেষ্টা করতে পারে, কিন্তু তাকে নির্মূল করতে পারে না৷ কারণ এই সমাজে নারী একদিকে পুঁজিবাদী শোষণের শিকার, একই সাথে শিকার শক্তিশালী পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোর৷ এই সমাজ মহিলাদের মর্যাদা আরও হানিই করে৷ তাই নির্যাতিত মহিলাদের যন্ত্রণার অবসান হতে পারে একমাত্র এই ব্যবস্থার অবসানের মধ্য দিয়ে৷ শোষণহীন নতুন সমাজব্যবস্থা স্থাপনের মধ্য দিয়েই এই মুক্তি অর্জন করা সম্ভব৷

সূত্রঃ দ্য হিন্দু  ১৮.১১. ২০২২