
কোথাও শিক্ষক নেই, কোথাও ছাত্র কম, কোথাও স্কুলবাড়ি ক্লাস করার উপযুক্ত নয়। এ রকমই অবস্থা পশ্চিমবঙ্গ সরকার পরিচালিত ও পোষিত স্কুলগুলির। এ রাজ্যে হাজার হাজার শিক্ষক রোজ স্কুলে যাচ্ছেন-আসছেন, অথচ কোনও ছাত্রকে পড়াচ্ছেন না। আবার হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী স্কুলে যাচ্ছে, সেখানে শিক্ষকের সংখ্যা এত কম যে (কোথাও মাত্র ১ জন) ক্লাস ঠিকমতো হচ্ছে না। ইউ-ডিআইএসই-প্লাস ২০২৪-২৫ রিপোর্টের তথ্য বলছে, রাজ্যের ছাত্র নেই এমন স্কুলের সংখ্যা ৩,৮১২টি। সেখানে রয়েছেন ১৭ হাজার ৯৬৫ জন শিক্ষক। দেশে ৪৭.৭ শতাংশ সরকারি স্কুলে ছাত্র নগণ্য।
স্কুলশিক্ষার এই চিত্র উদ্বিগ করেছে অভিভাবকদের– সন্তানরা কি শিক্ষার সুযোগ হারাবে? শিক্ষার ভিতই যদি নড়বড়ে হয়, তা হলে উচ্চশিক্ষা সম্ভব হবে কী করে? ৩৮১২টি স্কুলে এক জনও ছাত্র নেই কেন? কোথাও স্কুল-বাড়ি নেই, শিক্ষার প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো নেই, পাশ-ফেল নেই, শিক্ষার পরিবেশ নেই– এ রকম হাজারো কারণ রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষক নিয়োগে রাজ্য সরকারের দুন¹তি-নিয়োগ বাতিল-একের পর এক মামলা এবং নিয়োগপর্ব ঝুলে থাকা। ফলে ৩০ জন ছাত্রপিছু এক জন শিক্ষক বাস্তবে কোথাও নেই। ছাত্র না থাকার জন্য বা ছাত্রদের স্কুলছুটের জন্য দায়ী সরকারের নীতি, জাতীয় শিক্ষানীতির ছত্রে ছত্রে তার প্রমাণ রয়েছে। তেমনই দায়ী সরকারের অদক্ষ পরিচালনা। ছাত্র কম এই অজুহাতে ৮২০৭টি স্কুলকে তুলে দিচ্ছে রাজ্যের তৃণমূল সরকার। স্কুলের মার্জার (একত্রীকরণ) ঘটানো হচ্ছে। দুটি স্কুল মার্জার করা মানে যে একটিকে উঠিয়ে দেওয়া, এই সহজ কথাটা তারা গুলিয়ে দিতে চাইছেন। কোথাও ক্লাস্টার এডুকেশনের কথা বলে একটি স্কুলের ছাত্রদের অন্য স্কুলে ক্লাস করতে বা আর একটি স্কুলের ল্যাবরেটরিতে প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস করতে পাঠানো হচ্ছে, একটি স্কুলের শিক্ষককে অন্য আর একটি স্কুল গিয়ে ক্লাস করাতে বাধ্য করা হচ্ছে। এটা কি শিক্ষার যথাযথ ব্যবস্থাপনা? পর্যাপ্ত পরিকাঠামোর ব্যবস্থা না করে শিক্ষক বা ছাত্রদের এ ভাবে ছোটানো– বাস্তবে নৈরাজ্য ছাড়া কিছু নয়।
এক দিকে সরকারি স্কুল বা সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলে বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া, শিক্ষক-অশিক্ষক কর্মচারী নিয়োগ দিনের পর দিন না হওয়ায় এই স্কুলগুলির ছাত্র সংখ্যা কমছে। আবার দেখা যাচ্ছে শহরের স্কুলগুলিতে পড়তে আসছে শহরতলির আপাত নিম্নবিত্ত পরিবারের ছাত্ররা। দূর থেকে ট্রেনে বা বাসে করে তারা সরকারি স্কুলে আসতে বাধ্য হচ্ছে। স্থানীয়, তুলনায় সচ্ছল পরিবারের ছাত্ররা এই সব স্কুলে পড়ছে না। তারা কাছের মন্টেসরি বা বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তি হচ্ছে। ফলে মেধাবী ছাত্রদের মধ্যে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে শিক্ষার মান উন্নত হওয়ার কোনও সুযোগ থাকে না। আগে সরকারি স্কুলগুলির ছাত্রছাত্রীরা মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিকের মেধাতালিকার প্রথম দিকে থাকত। এখন হাতে গোনা কয়েকটি স্কুলের ছাত্র বা ছাত্রী নিজস্ব অধ্যাবসায়ে বা গৃহশিক্ষকের সহায়তায় কোনও স্থানে আসতে পারছে। জেলা স্কুলগুলিতে যদিও বা মধ্যবিত্ত বাড়ির কিছু সন্তান ভর্তি হয়, শহরের স্কুলগুলিতে তা আরও কম। ফলে রেজাল্টেতার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, সরকারি স্কুলে ৫০ শতাংশ ছাত্র ভর্তি হচ্ছে (আনন্দবাজার পত্রিকা-২৮। ৮। ২৫)। ৫০ শতাংশ পড়ছে বেসরকারি স্কুলে। অথচ কয়েক বছর আগেও চিত্রটা এতটা খারাপ ছিল না।
একটি বেসরকারি স্কুলের সাথে একটি সরকারি স্কুলের জুটি বেঁধে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে নয়া জাতীয় শিক্ষানীতিতে। কেন বলা হল? এটা কি দেশের জনগণ দাবি করেছিল? তা হলে এই সংযুক্তি কারা চায়? কী উদ্দেশ্যে চায়? মানুষকে বিভ্রান্ত করতে বলা হচ্ছে, এতে দুটি স্কুলের সম্পর্ক তৈরি হওয়ার সাথে সাথে সম্পদ বিনিময়ও হবে। আসলে এ ভাবে সরকারি সম্পদ যাবে শিক্ষা ব্যবসায়ীদের হাতে।
এই শিক্ষানীতিতে বলা হয়েছে, বেসরকারি স্কুলগুলিকে যথাযথ শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব পালনে বাধ্য করতে হবে সরকারকেই। প্রশ্ন উঠছে, বেসরকারি মালিকদের শিক্ষার দায়িত্ব পালনে সরকারকে যদি বাধ্য করতে হয়, তা হলে সরকার নিজেই সেই দায়িত্ব পালন করছে না কেন? এর ফলে বেসরকারি স্কুলে এক দিকে অভিভাবকদের ঘাড়ে বিপুল ফি-র বোঝা চাপবে। কারণ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিক শিক্ষাকে লাভজনক পণ্য হিসাবে দেখে, ফলে তা ছাত্রদের কাছে বহুমূল্যে বিক্রি করবে। এটা সর্বজনীন শিক্ষার ক্ষেত্রে বড় বাধা। এই শিক্ষানীতিতে উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে বেসরকারি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় মালিকদেরই জনকল্যাণের কথা মাথায় রেখে ফি-নির্ধারণের কথা বলেছে সরকার। এ কি সোনার পাথরবাটি নয়?
আসলে জনসাধারণের মধ্যে শিক্ষার প্রসার হোক, তারা যুক্তি দিয়ে কোনও বিষয়কে বিচার করতে শিখুক, প্রশ্ন করতে শিখুক, তা চায় না কোনও শাসকই। কারণ শিক্ষিত বেকার ছাত্র-যুবরা শিক্ষার আলোকে বুঝতে শেখে তাদের দুরবস্থার আসল কারণ কী। তা উপলব্ধি করতে পারলে শাসকের তাদের পক্ষে রাখা কঠিন। সে কারণে দেশের তাবড় শিক্ষাবিদদের শিক্ষা বাঁচানোর প্রয়াসকে উপেক্ষা করে জনশিক্ষাকে সম্পূর্ণ জলাঞ্জলি দিচ্ছে। ‘হীরক রাজার’ আধুনিক অবতাররা ভাল করেই জানে, প্রজারা ‘যত কম জানে, তত বেশি মানে’।
ফলে মুখ বন্ধ করে দাও– নানা কৌশলে। কেন্দেরের বিজেপি সরকার এই উদ্দেশ্যে নয়া জাতীয় শিক্ষানীতির প্রয়োগ ঘটাচ্ছে রাজ্যে রাজ্যে। আর তৃণমূল সরকার মুখে বিজেপির বিরুদ্ধে তীব্র হুঙ্কার দিয়ে হুবহু সেটাকেই রাজ্য শিক্ষানীতি- ‘২৫ নামে রাজ্যে চালু করছে। শিক্ষা নিয়ে চলছে ছেলেখেলা। স্কুলে দেওয়া হচ্ছে অকারণ ছুটি, শিক্ষকদের শিক্ষা বর্হিভূত নানা সরকারি কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে যখন-তখন, তারা পড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় সময় পাচ্ছেন না। এর পরিণামে ছাত্রদের একটা বড় অংশ শিক্ষার জগৎ ছেড়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে। ‘পিএশ্রী’ প্রকল্পের মাধ্যমে রাজ্যে রাজ্যে স্কুলের মানোন্নয়ন ঘটানোর প্রচারই করুক বিজেপি আর শিক্ষাক্ষেত্রে নানা নামের ‘শ্রী’ প্রকল্প চালু করুক রাজ্যের তৃণমূল সরকার, শিক্ষাক্ষেত্র ক্রমশ হচ্ছে হতশ্রী। কেন্দ্র ও রাজ্য– দুটি সরকারের কার্যকলাপেই স্পষ্ট, জনশিক্ষার প্রসার তারা আদৌ চায় না।