
আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, অতিথিরা সকলেই হাজির বিয়ের অনুষ্ঠানে, কিন্তু হাজির হতে পারলেন না স্বয়ং বর-কনে। ইন্ডিগো বিমান বিভ্রাটের জেরে এমন ঘটনারই সাক্ষী হয়ে থাকল ডিজিটাল ভারত। শুধুমাত্র এই একটি ঘটনাই নয়, দেশ জুড়ে লক্ষ লক্ষ যাত্রীকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে, বিশেষত রোগী ও জরুরি প্রয়োজন থাকা যাত্রীরা মহা বিপাকে পড়েছেন। এঁদের মধ্যে ছিলেন ক্যান্সার সহ নানা জটিলরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা যাঁদের সময়মতো চিকিৎসাস্থলে বা গন্তব্যে পৌঁছনো জরুরি ছিল। বহু জন পরীক্ষা পর্যন্ত দিতে যেতে পারেননি। ইন্ডিগো কর্তৃপক্ষের দুঃখপ্রকাশ ও টিকিটের টাকা ফেরত দেওয়ার মধ্যে দিয়ে কি এত ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব?
বেসরকারি পুঁজির দাপট দেখানোর এই নজিরবিহীন ঘটনা কোনও যান্ত্রিক বা প্রযুক্তিগত কারণে ঘটেনি। তা হলে ঘটল কী জন্য? সরকারের অসামরিক বিমান চলাচল সংক্রান্ত সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ডাইরেক্টরেট জেনারেল অফ সিভিল অ্যাভিয়েশন (DGCA) ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে বিশ্বমানের সুরক্ষা নীতির সঙ্গে ভারতীয় বিমান পরিষেবায় সামঞ্জস্য আনতে নতুন ফ্লাইট ডিউটি টাইম লিমিটেশন (FDTL) চালু করে। যা ১ নভেম্বর ২০২৫ থেকে কার্যকর হয়। ইন্ডিগোর মালিক, তার ম্যানেজমেন্ট প্রায় দু’বছর ধরে এই বিষয়টি জানত। ডিজিসিএ এই সময়সীমা সম্পর্কে অবগত ছিল এবং এর জন্য কী কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত তাও কারও অজানা ছিল না। তবুও উভয়েই যেন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল, যার ফলে দেশ জুড়ে এমন চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিল, কয়েক লক্ষ বিমানযাত্রী ভোগান্তির শিকার হলেন।
কী আছে নতুন নিয়মে?
পাইলটদের সাপ্তাহিক বাধ্যতামূলক বিশ্রাম ছত্রিশ ঘন্টা থেকে বাড়িয়ে আটচল্লিশ ঘণ্টা করা হয়েছে। রাতে ল্যান্ডিং সংখ্যা সপ্তাহে ছয় থেকে কমিয়ে দুইয়ে আনা হয়েছে। বলা হয়েছে পরপর দুটি নাইট ডিউটি দেওয়া যাবে না। রাতের ফ্লাইটে কাজের সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে এবং ব্যক্তিগত ছুটিকে আর বিশ্রামের অংশ হিসেবে গণ্য করা যাবে না– এমনই গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে নতুন নিয়মে।
কংগ্রেসের শাসনে নব্বইয়ের দশকে দেশে উদারিকরণের আর্থিক নীতি চালুর সময় মানুষকে বোঝানো হয়েছিল এর ফলে তারাই উপকৃত হবে। বলা হয়েছিল সরকারি কোম্পানির বেসরকারিকরণ করলে পুঁজি আসবে, তাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। প্রচুর কোম্পানি আসবে, প্রতিযোগিতা বাড়বে আর তার ফলে পরিষেবার মান উন্নত হবে ও উপভোক্তার আর্থিক সাশ্রয় হবে। উদারিকরণের ৩ দশকের বেশি সময় পরে আমরা তার ঠিক বিপরীত বিষয় দেখছি। ভারতের বিমান ক্ষেত্রের সামরিক বিপর্যয় চোখে আঙুল দিয়ে তা আবারও দেখিয়ে দিয়ে গেল।
শিকেয় পরিষেবা ও যাত্রী নিরাপত্তা
২০০৭ সালে ডিজিসিএ যাত্রী নিরাপত্তার স্বার্থে এবং পাইলট ও ত্রু-দের ক্লান্তি ও বিশ্রামের সময়ের সমস্যার সমাধানের জন্য একটা সিভিল অ্যাভিয়েশন রিত্রুটমেন্ট (CAR) চালু করেছিল। কিন্তু বিমান সংস্থার মালিকদের চাপে ডিজিসিএ-কে তা স্থগিত রাখার নির্দেশ দেয় সরকার। এই আদেশের বিরুদ্ধে পাইলট অ্যাসোসিয়েশন মুম্বাই হাইকোর্টে মামলা করে। হাইকোর্ট অন্তবর্তীকালীন নির্দেশে পাইলট ও যাত্রীদের জীবন নিয়ে ছেলেখেলা করার জন্য ডিজিসিএ ও বিমান পরিবহণ মন্ত্রকের তীব্র ভৎর্সনা করে তার পর্যবেক্ষণে বলে– এটা স্পষ্ট যে কয়েকটি বিমান সংস্থার আর্থিক স্বার্থরক্ষার জন্য বিমানের নিরাপত্তাকে উপেক্ষা করা হয়েছে। অদ্ভুতভাবে পরে ওই একই হাইকোর্ট আদেশটি বাতিল করে এবং অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রকের পদক্ষেপ বহাল রাখে। এ বারেও আমরা দেখলাম সরকার যাত্রী নিরাপত্তা শিকেয় তুলে ইন্ডিগোকে নতুন নিয়ম চালু করার ক্ষেত্রে আগামী বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছাড় দিল। উদারিকরণের আর্থিক নীতির এই যুগে আইন কানুন নিয়ম এগুলি আসলে সাধারণ মানুষের স্বার্থে পরিচালিত হয় না, তা পরিচালিত হয় কর্পোরেটের স্বার্থরক্ষায়।
কোথায় প্রতিযোগিতা? কোথায় কর্মসংস্থান?
২০০৫ সালে ভারতে এয়ার ইন্ডিয়া, জেট এয়ারওয়েজ, কিংফিশার, এয়ার ডেকান, সাহারা সহ আরও অনেক কোম্পানি এমনকি রিজিওনাল এয়ারলাইন্স কোম্পানিও ছিল। ২০১০ সালে ইন্ডিগো ভারতে বিমান সংস্থাগুলির মধ্যে তৃতীয় ছিল। ২০১৪ সালের পর থেকে বাকি প্রতিযোগীদের হটিয়ে দিয়ে বর্তমানে এই ক্ষেত্রে বাজারের ৬৫.৬ শতাংশ ইন্ডিগোর দখলে। এরপর আছে টাটার এয়ার ইন্ডিয়া, যার দখলে ২৫.৭ শতাংশ। অন্য দু’একটা ছোটখাটো সংস্থা থাকলেও এই দুই বৃহৎ ব্যবসায়ী মিলে এয়ারলাইন্স ক্ষেত্রে একচেটিয়া আধিপত্য কায়েম করেছে। প্রতিযোগিতা বলতে আর কোনও কিছুই অবশিষ্ট নেই। একের পর এক ইন্ডিগো বিমান বাতিলের সুযোগে অস্বাভাবিক ভাড়া বৃদ্ধি করে মানুষের পকেট কেটে দেদার মুনাফা লুটল এয়ার ইন্ডিয়া সহ সব কোম্পানি। দিল্লি থেকে রাঁচি গৌহাটি বাঙ্গালোর অমৃতসর যাওয়ার খরচ লন্ডন যাওয়ার খরচের থেকে বেশি হয়ে গিয়েছিল। সরকার ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে বসে থেকে বেশ কয়েক দিন এয়ারলাইন্স কোম্পানিগুলিকে দেদার মুনাফা লোটার সুযোগ করে দেওয়ার পর দামের ঊর্ধ্বসীমা বেঁধে দেয়।
একই বিষয় দেখা যাচ্ছে টেলিকম, বন্দর, সিমেন্ট, ইলেকট্রিসিটি সহ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই। জিও আসার আগে টেলিকম সেক্টরে এয়ারসেল, ইউনিনর, এয়ারটেল, ডোকোমো, টাটা, আইডিয়া, ভোডার মতো অনেকগুলি কোম্পানি ছিল। মানুষ এর থেকে বাছাই করতে পারত। এরপর জিও কয়েক বছর ফ্রি সার্ভিস দেওয়ার মধ্য দিয়ে ছোটখাটো টেলিকম কোম্পানিগুলিকে শেষ করে দু-তিনটে কোম্পানির একটা কার্টেল তৈরি করল যারা বাজারের সব কিছু এমনকি সরকারি নীতিকেও নিয়ন্ত্রণ করে। টেলিকম বাজারের ৭৪ শতাংশ জিও আর এয়ারটেলের দখলে। এখন না চাইলেও আপনাকে ফোন নম্বরটা সক্রিয় রাখার জন্য প্রতি মাসে ৩০০ টাকা রিচার্জ করতেই হবে। প্রতিযোগিতায় দাম কমা দূরে থাকুক, একটা কোম্পানি দাম বাড়ালে বাজারের অন্য কোম্পানিও দাম বাড়িয়ে দেয়। কোনও বিকল্প গ্রাহকের কাছে খোলা থাকে না। একই বিষয় সিমেন্ট ক্ষেত্রে। সেখানে আদানি গ্রুপ ধীরে ধীরে একটা দুটো করে ছোট বড় কোম্পানি গিলে খেয়ে ফেলছে। এখন ভারতের সিমেন্ট ব্যবসার বেশিরভাগটাই চার-পাঁচটা বড় কোম্পানির দখলে। একই অবস্থা বন্দর বিদ্যুৎ সহ আরও নানা ক্ষেত্রে। কয়েকটি কোম্পানি বাজারকে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে। বাজার তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। উদারিকরণের ফলে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাওয়া দূরে থাক। বাজার ক্রমাগত প্রতিযোগিতাহীন হয়ে পড়ছে। একচেটিয়া পুঁজির দখলে চলে যাচ্ছে।
কোথায় কর্মসংস্থান
আর পুঁজির চরিত্র অনুযায়ী তা ভোক্তার কথা না ভেবে, পরিষেবার কথা না ভেবেও শুধুমাত্র আরও মুনাফা আরও লাভের দিকে ছুটছে। ফলে কর্মসংস্থানও কিছু হচ্ছে না। ইন্ডিগো খুব ভাল করেই জানত যে এই বছরের ১ নভেম্বরের মধ্যে আরও পাইলট নিয়োগ না করলে তারা কখনওই নতুন নিয়ম অনুযায়ী সঠিক পরিষেবা দিতে পারবে না, বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে। এই পরিস্থিতি জেনেই তারা এই বছর শীতকালীন সময়সূচির অনুমোদনের জন্য আবেদন করেছিল। তারা ফ্লাইটের সংখ্যা গরমকালে ১৪,১৫৮ থেকে বাড়িয়ে ১৫,০১৪ করে, যা ডিজিসিএ অনুমোদন করেছে। একচেটিয়া পুঁজির নিয়মেই ইন্ডিগোর নীতি মিনিমাম স্টাফ ম্যাক্সিমাম প্রফিট। অথচ বিমান চালনার মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে এটা মানুষের জীবন নিয়ে বিপদজনক অবহেলা। সরকার বা ডিজিসিএ এগুলি জানা সত্তে্বও চুপ করে থাকতে পারল কী করে? কোথায় উদারিকরণের শুরুর সময়ের সেই ঘোষণা! কোথায় পরিষেবা, আর্থিক সাশ্রয়, যাত্রী নিরাপত্তা কর্মসংস্থান?
সাম্প্রতিককালে ভারতে তিনটি বড় বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছে (ম্যাঙ্গালুরু, কোঝিকোড় এবং আহমেদাবাদ)। তা সত্তে্বও যাত্রী নিরাপত্তার মান ক্রমশ নিম্নমুখী হচ্ছে। যা তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশের থেকেও খারাপ। ভারতীয় আকাশে কার্যত শুভ কামনার ওপর ভর করেই উড়ান চলছে। মন্ত্রী, ডিজিসিএ এবং বিমান সংস্থার মালিকরা বারবার প্রকাশ্যে বলেন, যাত্রী নিরাপত্তাই নাকি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ৫ ডিসেম্বর, ২০২৫-এর পদক্ষেপ প্রমাণ করে, মালিকদের মুনাফার থেকে বিমান চলাচলের নিরাপত্তার গুরুত্ব কম।