Breaking News

ভারতে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কঃ ফিরে দেখা

প্রথম কিস্তি (গণদাবী ৭৯ বর্ষ ৫ সংখ্যা ২৮ আগস্ট ২০২৬)

অজাতশত্রু রাজা হল যবে, “পিতার আসনে আসি/পিতার ধর্ম শোণিতের স্রোতে/মুছিয়া ফেলিল রাজপুরী হতে–/সঁপিল যজ্ঞ-অনল-আলোতে/বৌদ্ধশাস্ত্ররাশি।

পূজারিণী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

অতীত যুগের ইতিহাস মূলত তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী রাজা-সুলতান-নবাবদের শৌর্য, বিজয়ের কাহিনি। সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম, যা আসলে উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত, এই ইতিহাসে তা স্থান পায়নি। ভারতের ইতিহাসও এর ব্যতিক্রম নয়। ভারতে ব্রিটিশ শাসনের সময়ে এসেই শুরু হয় ধারাবাহিক ইতিহাস রচনার কাজ। কিন্তু ব্রিটিশ শাসকরা সত্য ইতিহাস রচনার পরিবর্তে তাদের শাসন পাকাপোক্ত এবং দীর্ঘস্থায়ী করা, ব্রিটিশ বিরোধী বিক্ষোভকে দুর্বল করার লক্ষ্যকে সামনে রেখেই তা শুরু করে। স্বাভাবিক ভাবেই সেই ইতিহাস হয়ে ওঠে বিকৃত ইতিহাস।

ভারতে ইতিহাস বিকৃতির সূচনা ব্রিটিশ শাসকদের হাতে

১৮১৭-তে ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ জেমস মিল পরিকল্পনা মতো এই বিকৃত ইতিহাসের সূচনা করেন। ভারতীয় ইতিহাসকে তিনি হিন্দু, মুসলিম ও ব্রিটিশ– এই তিনটি পর্বে ভাগ করেন। প্রথম দুটি ভাগ ধর্মের নামে হলেও তৃতীয় ভাগটি ধর্মের নামের পরিবর্তে শাসকদের নামে ‘ব্রিটিশ’ বলে উল্লেখ করা হয়। অথচ প্রথম দুটি হিন্দু এবং মুসলিম হলে তৃতীয় ভাগটিও ‘খ্রিস্টান’ হওয়া উচিত ছিল। এই ভাবে ভাগের মধ্যেই শাসকের হীন উদ্দেশ্যমূলক মনোভাব স্পষ্ট। এই ইতিহাস বিচারে সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণ বাদ দিয়ে ধর্মীয় পরিচয়কেই রাজনৈতিক ক্ষমতার একমাত্র উৎস হিসাবে দেখানো হয়। শাসকদের রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক লড়াইকে উপনিবেশিক ইতিহাসবিদরা ধর্মীয় সংঘাত হিসাবে উপস্থিত করেন। যা ব্রিটিশের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতিকে তত্ত্বগত ভাবে বৈধতা দেয়। অথচ হিন্দু ও মুসলিম রাজা-সুলতানরা কেউই মূলত ধর্মীয় বিদ্বেষ থেকে রাজ্য শাসন করেছেন বিষয়টা এমন নয়। যে কোনও রাষ্ট্রই যেমন শ্রেণি-শোষণের ও দমন-পীড়নের হাতিয়ার– রাজতন্ত্রও তেমনই ছিল। হিন্দু রাজারা যেমন সকল প্রজাদের উপর শোষণের যাঁতাকল চালিয়েছে, তেমনই মুসলিম শাসকরাও তাই করেছে এবং এর ভিত্তি ধর্ম ছিল না। এই অনৈতিহাসিক ইতিহাস বিচারপদ্ধতি মেনেই উপনিবেশিক আমলের দেশীয় বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশ, দেশীয় সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলি এবং ভারতীয় পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থরক্ষাকারী রাজনীতিবিদরা ভারতবাসীর সামগ্রিক ঐক্যবদ্ধ জাতীয় পরিচয়কে অস্বীকার করে পৃথক হিন্দু বা মুসলিম জাতীয়তাবাদের তত্ত্ব হাজির করে।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে শাসক কংগ্রেস ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ধর্মকে ভোটের স্বার্থেই কাজে লাগাতে থাকে। জরুরি অবস্থার পরের নির্বাচনে কংগ্রেস নেত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেন, এত দিন আমরা সংখ্যালঘুদের স্বার্থ দেখে এসেছি, এ বার সংখ্যাগুরুদের স্বার্থ দেখব। বুর্জোয়া দলগুলির রাজনীতিতে ‘ভোটব্যাঙ্ক’ রাজনীতি স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। এই ভোটব্যাঙ্ক রাজনীতির কারণেই সাধারণ মানুষের মধ্যে ধারণা তৈরি হয় যে, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে আসলে তোষণের রাজনীতি। বাস্তবে যথার্থ ধর্মনিরপেক্ষতা রাষ্ট্রকে যে কোনও ধর্মীয় কাজকর্ম থেকে দূরে রাখে। পরবর্তী সময়ে বিজেপি এবং আরএসএস এই বিকৃত ইতিহাসকে রাজনৈতিক মেরুকরণের কাজে পুরোপুরি ব্যবহার করতে থাকে। নির্দিষ্ট একটি ধর্মের শাসকদের এবং সম্প্রদায়কে সম্পূর্ণ খলনায়ক বানিয়ে সাধারণ মানুষের মনে স্থায়ী বিদ্বেষ তৈরি করতে থাকে। যার ফলে অনেক শিক্ষিত মানুষও, যাঁরা হয়তো ব্যক্তিগত ভাবে সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন নন, কিন্তু ইতিহাসের ততখানি খোঁজ রাখেন না, তাঁরাও ইতিহাসের বিকৃত প্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। ভাবতে থাকেন, আজ ভারতে হিন্দু-মুসলমান বিরোধ-বিভেদ যে বিকৃত রূপ নিয়েছে তা বোধহয় বরাবরই ছিল। সুস্থ স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন মানুষের মনে বার বার প্রশ্ন ধাক্কা দেয়– এই দীর্ঘ সময় ধরে উভয় ধর্মের মানুষ কি তা হলে পারস্পরিক বিদ্বেষ-বিভেদের মধ্যেই বাস করেছে? সাম্প্রদায়িকতার শেকড় কি সমাজের এমন গভীরে প্রোথিত যে দীর্ঘ পরিচর্যায় তা এখন সমাজের স্বাভাবিক বৈশিষ্টে্য পরিণত হয়েছে? এই বিরোধ কি স্বাভাবিক? এই বিরোধ থেকে বের হওয়ার কি কোনও উপায় নেই? এই প্রশ্নগুলির যথাযথ উত্তর পেতে হলে আমাদের আশ্রয় নিতে হবে ইতিহাসের বিজ্ঞানভিত্তিকবিচারে।

ধর্মান্তরণ সম্পর্কে বিবেকানন্দের বক্তব্য

দীর্ঘ সামন্তী ব্যবস্থা জুড়ে রাজার পরিবর্তনের সঙ্গে রাজধর্ম বদলেছে। পুরনো ধর্মকে মুছে ফেলা হয়েছে। তার প্রভাবে প্রজাদের ধর্মেরও পরিবর্তন ঘটেছে। এক কথায়, রাজার ধর্মই হয়েছে প্রজার ধর্ম। তা কখনও তরবারি বা রাজশাসনের জোরে, কখনও ভালবাসায়। মৌর্য সম্রাট অশোকের পৃষ্ঠপোষকতায় বর্তমান ভারতের অধিকাংশ অংশে, এমনকি ভারতের বাইরেও একটি বিরাট অংশে বৌদ্ধ ধর্ম ছড়িয়ে পড়েছিল। মনে রাখতে হবে, তখন এখনকার মতো ভারতের নির্দিষ্ট কোনও ভৌগলিক সীমারেখা ছিল না। পরবর্তী কালে গুপ্ত যুগে এসে হিন্দু ধর্ম তথা ব্রাহ্মণ্যধর্ম রাষ্ট্রীয় প্রধান ধর্মে পরিণত হয়। খ্রিস্টপূর্বের অজাতশত্রু শাসনে কিংবা বহু পরে বাংলায় শশাঙ্কের শাসনে দেখা যায় বৌদ্ধ ধর্মের বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাব এবং শৈব তথা হিন্দুধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা। এই ভাবেই চলেছে।

ভারতে মুসলমান অভিযানের পরও সেই একই জিনিস ঘটে। রাজধর্ম হিসাবে ইসলাম ধর্মের প্রসার শুরু হয়। যদিও পাঠান ও মুঘল শাসকরা ভারতে গোটা মধ্যযুগ ধরে কয়েক শতকের স্থায়ী সাম্রাজ্যের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও ইসলাম ধর্মের বিরাট প্রসার ঘটেনি। সাধারণ মানুষের ধর্ম পরিবর্তন যদি এই শাসকদের উদ্দেশ্য হত, তবে এই দীর্ঘ সময়ে মুসলমানরা হয়ে দাঁড়াত সংখ্যাগুরু। তা হয়নি। ধর্মপরিবর্তন যতটা ঘটেছে তা-ও তরবারির জোরে সম্ভব হয়েছে বলে এমনকি বিবেকানন্দও মনে করতেন না। তিনি মনে করতেন, বর্ণাশ্রম প্রথার জের হিসাবে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের দ্বারা নিম্নবর্ণের মানুষের ওপর চলা সামাজিক অত্যাচার ও অস্পৃশ্যতা একটা অংশের হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষের এবং আগ্রাসী হিন্দুত্বের উৎপীড়ন বৌদ্ধদের একাংশের ইসলাম ধর্ম গ্রহণের কারণ। বাস্তবে এটাই ইতিহাস।

রামের জন্মস্থানে মন্দির ভেঙে মসজিদ তৈরির যে অভিযোগ বাবর সম্পর্কে হিন্দুত্ববাদীরা তোলেন তার কোনও ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যে সময় রামমন্দির ভাঙা হয়েছে বলা হচ্ছে, অর্থাৎ আল হিজরি ৯৩৫, সেই সময় বাবর তার ছেলে হুমায়ুনকে একটি চিঠিতে লিখেছেন– ‘হিন্দুস্তানের জনগণের মন জয় করার জন্য গোহত্যা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করো। অন্যান্য ধর্মের মন্দির বা ভজনালয়গুলো অপবিত্র কোরো না। শিয়া-সুন্নি ভেদাভেদ কোরো না, ওটি ইসলামের দুর্বলতা। তরবারির জোরে নয় দয়ার দ্বারা ইসলামের প্রচার করো।’ (দ্য সেকুলার এম্পারার বাবর, সুরিন্দার কাউর ও তপন সান্যাল, পৃ. ৬৫-৬৬)। বাবরনামা থেকে স্পষ্ট হয়, পরবর্তী মুঘল সম্রাট আকবরের বিখ্যাত উদারনীতির মূল নৈতিক বনিয়াদটা বাবরেরই অবদান।

হিন্দুত্ববাদীরা মুঘল সম্রাট আকবরের বিরুদ্ধে মেবারের রানা প্রতাপের লড়াইকে স্বাধীনতার লড়াই বলে দেখান। অথচ স্বাধীনতা বলতে আজ আমরা যা বুঝি, স্বাধীনতার সেই ধারণা সে সময়ে ছিল না। ওই স্বাধীনতা ছিল রাজার, প্রজাদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল না। তাই তাঁরা এটা বলেন না যে, প্রতাপের সেনাদলে ও সেনাপতিদের মধ্যে কতজন মুসলিম ছিলেন। তাঁর প্রধান সেনাপতিদের অন্যতম ছিলেন শের শাহ সুরির বংশধর আফগান সর্দার হাকিম খান সুরি। তাঁর অধীনে ৮০০ জনের এক আফগান বাহিনী মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। আবার আকবরের প্রধান সেনাপতিই ছিলেন হিন্দু মান সিংহ। যশোবন্ত সিংহ ছিলেন আওরঙ্গজেবের অন্যতম প্রধান সেনাপতি। আর মোগল সম্রাটদের শক্তি কারা ছিলেন? রাজপুতরা নয় কি? অম্বর, যোধপুর, এমনকি করণ সিংহ-জগৎ সিংহদের সময়ে মেবার কি মোগল মনসবদারি ছিল না? বাবর দিল্লি জয় করেছিলেন কোনও হিন্দুকে হারিয়ে নয়, ইব্রাহিম লোদিকে হারিয়ে। তাঁকে এ দেশে আহ্বান করে এনেছিলেন আর এক হিন্দু– রানা সঙ্গ। একে কি মুসলমান রাজার বিরুদ্ধে হিন্দু রাজার লড়াই বলা যায়? বাস্তবে এর চরিত্র ছিল সামন্ততান্ত্রিক বা রাজতান্ত্রিক। ধর্ম নয়, রাজ্যবিস্তার এবং রাজ্য রক্ষার লড়াই-ই ছিল মূল কথা। ইতিহাসের এ সব তথ্য হিন্দুত্ববাদীরা দেশের মানুষের সামনে সচেতন ভাবে উত্থাপন করেন না।

উৎপীড়নের চরিত্র ছিল রাজতান্ত্রিক

মধ্যযুগে, মুঘল আমলে অত্যাচার কি হয়নি? হয়েছে। তবে সে উৎপীড়নের চরিত্র রাজতান্ত্রিক– ধর্মীয় নয়। রাজা, নবাব, সুলতান– কে অত্যাচার করেনি? অত্যাচার কি কেবল মুসলমান নবাবরাই করেছে? হিন্দু রাজারা করেনি? বৌদ্ধদের ওপর হিন্দু রাজারা কি ব্যাপক অত্যাচার চালায়নি? গৌড়ের রাজা শশাঙ্ক প্রচণ্ড অত্যাচারী বলেই পরিচিত ছিলেন। যে শিবাজিকে হিন্দুত্ববাদীরা আদর্শ হিন্দু রাজা বলে প্রচার করেন সেই শিবাজির সুরাট অভিযানের বীভৎস অত্যাচার ইতিহাসের পাতাতেই রয়েছে। মারাঠা বর্গীদের বঙ্গ বিজয়ের পথে কয়েক লক্ষ মানুষের হত্যা, নির্বিচার লুঠতরাজের কাহিনি তো আজও প্রবাদ হয়ে আছে (‘ছেলে ঘুমোল পাড়া জুড়োল, বর্গি এল দেশে’)। তারাও ছিল হিন্দু, তার নেতা ভাস্কর পণ্ডিত।

ইতিহাসবিদদের অনেকের ইতিহাস-দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে হিন্দুত্ববাদী ঝোঁক মিশে থাকায় ইতিহাসের উপস্থাপনাটাও হয়ে পড়েছে একপেশে। পলাশির যুদ্ধে সিরাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন মিরজাফর, উমিচাঁদ, রাজবল্লভ, জগৎশেঠ প্রভৃতি অভিজাতরা। অথচ কেবল মিরজাফরই বেইমানির প্রতীক হিসেবে পরিচিত হয়ে গেলেন। তুর্ক, আফগান বা মুঘলদের ভারত বিজয়কে যারা মুসলমানদের জয় বলছেন তাঁরা কি ব্রিটিশের ভারত বিজয়, কিংবা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পরদেশ দখলকে খ্রিস্টানদের বিজয় বলবেন? নাকি তা সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিকতা?

সাম্প্রদায়িকতা পুঁজিবাদের প্রতিক্রিয়াশীল স্তরের বৈশিষ্ট্য

বাস্তব হল, দীর্ঘ মুসলমান শাসনের ইতিহাসকে যদি আমরা সেই সময়ের সাপেক্ষে এবং তার রাজতান্ত্রিক চরিত্রের পরিপ্রেক্ষিতে বিচার না করি তবে বিচারে ভুল হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। মনে রাখতে হবে ধর্মীয় বিদ্বেষ তথা সাম্প্রদায়িকতা চরিত্রে পুঁজিবাদী তথা ধনতান্ত্রিক। পুঁজিবাদ বিকাশের সর্বোচ্চ স্তর অতিক্রম করে তার প্রগতিশীল চরিত্র হারিয়ে মুমূর্ষু তথা প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে পড়ার পরই সাম্প্রদায়িকতা নামক সামাজিক ব্যাধির জন্ম। তাই গজনির সুলতান মাহমুদকে লুঠেরা বলাটাই সঙ্গত। হিন্দু মন্দির লুঠ করেছিলেন বলে তাঁকে হিন্দু বিদ্বেষী বা সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন বলে দেগে দেওয়া হবে অনৈতিহাসিক। সুলতান মাহমুদের ভারত অভিযানের পেছনে ধর্মীয় মনোভাবের আলাদা কোনও উদ্দেশ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি। বিজিত অঞ্চলগুলিতে ধর্মপ্রচারেরও কোনও প্রমাণ ইতিহাসে পাওয়া যায় না। বর্তমান ভারতের বড় বড় মন্দিরগুলির সম্পদের বিশালতা দেখলেই বোঝা যায় সে দিনও সোমনাথ সহ বড় বড় মন্দিরগুলি কী বিপুল সম্পদের অধিকারী ছিল! সেই সম্পদের লোভেই বিদেশি শাসকরা বারবার মন্দির আক্রমণ করেছে, কোনও রকম ধর্মীয় বিদ্বেষ থেকে নয়। সুলতান মাহমুদ শুধু হিন্দু রাজাদের বিরুদ্ধেই অভিযান চালাননি, মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধেও অভিযান চালিয়েছেন। মুক্তির বিনিময়ে তাঁদের কাছ থেকে অর্থ লাভ করেছেন। যেমন পরাজিত হিন্দু রাজাদের কারও কারও কাছ থেকেও অর্থ লাভ করেছেন। নেহেরু তাঁর ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়াতে লিখেছেন, সুলতান মাহমুদ যা করেছেন, তিনি মুসলমান না হয়ে অন্য কোনও ধর্মাবলম্বী হলেও তাই করতেন। সুলতান মাহমুদ তাঁর রাজত্ব এবং সেনাবাহিনীর খরচের উৎস হিসাবেই বার বার ভারত অভিযান চালিয়েছেন– যে সেনাবাহিনীকে তিনি এমনকি মধ্য এশিয়ায় তার সহধর্মী মুসলমানদের বিরুদ্ধেও মোতায়েন করেছিলেন। এগুলি যুক্ত সেই সময়ের শাসনতন্ত্রের সঙ্গে, ধর্মের সঙ্গে নয়।

মথুরা, বৃন্দাবন প্রভৃতি ধর্মীয় স্থান এবং সোমনাথ মন্দিরে অভিযান, মন্দির ভাঙচুর, বিগ্রহের ক্ষতিসাধনের যে অভিযোগ কিছু ভারতীয় ও ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ এবং রাজনীতিক করেছেন, তাতে মুসলিম বিদ্বেষ যতটা দেখানো হয়, বাস্তব অবস্থা ও সত্যতা ততটা নয়। মন্দির যখন যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়, অর্থভাণ্ডার হিসেবে আকর্ষণীয় হয়, তখন ভাঙচুর ও বিগ্রহের ক্ষতিসাধন অসম্ভব নয়। বিগ্রহের পেটে সোনাদানা, অলঙ্কার লুকিয়ে রাখা তখন প্রচলিত রীতি ছিল। যার ফলে বিগ্রহের ভাঙচুর ও ক্ষতিসাধন হওয়া স্বাভাবিক।

কলহনের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘রাজতরঙ্গিনী’তে দেখা যায়, কাশ্মীরের হিন্দু রাজা হর্ষদেব মন্দিরের সম্পদ লুট করার জন্য ‘দেবোৎপাটন-নায়ক’ নামের একটি বিশেষ দফতর বা পদ তৈরি করেছিলেন। কলহনের বর্ণনা অনুযায়ী রাজ্যের প্রায় প্রতিটি শহরের মন্দিরই তার সেনাপতির মাধ্যমে লুণ্ঠিত বা ক্ষতিগ্রস্ত ছিল।

হিন্দু সাম্প্রদায়িকতাবাদীরা যেমন মধ্যযুগকে ভারতের হিন্দুদের উপর মুসলমানদের জাতিগত বা সম্প্রদায়গত শাসন বলে, তেমনই মুসলিম সাম্প্রদায়িকতাবাদীরাও একে মুসলমানী শাসন বলে গর্ব অনুভব করে। ভারতে হিন্দু সাম্প্রদায়িক রচনা দেখায়, সুলতান-বাদশাদের শাসন মানে হিন্দুর ওপর মুসলমানের জাতিগত বা সম্প্রদায়গত শাসন। বাস্তবটা কি তাই? বাস্তব হল, সম্রাট অশোক, দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বা সুলতান আলাউদ্দিন কিংবা বাদশাহ আওরঙ্গজেব, সকলেই ছিলেন শোষক শ্রেণির প্রতিনিধি। সম্রাট অশোক কি সব বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী প্রজাদের কর মকুব করেছিলেন? কিংবা চন্দ্রগুপ্ত হিন্দু প্রজাদের? নাকি আওরঙ্গজের মুসলিমদের কর মকুব করেছিলেন? আর যে জিজিয়া কর সম্পর্কে হিন্দুত্ববাদীরা আওরঙ্গজেবকে কাঠগড়ায় তোলে সেই জিজিয়া কর কী ছিল? দিল্লির সুলতানি আমলে প্রথম এই কর চালু করা হয়। মুঘল সম্রাট আকবর ১৫৬৪ সালে এই কর তুলে নেন। ১৬৭৯ সালে সম্রাট আওরঙজেব আবার তা চালু করেন। এটা ছিল অমুসলিমদের ওপর ধার্য করা একটি বার্ষিক বিশেষ কর। এর বিনিময়ে রাষ্ট্র অমুসলিমদের জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা, ধর্মপালনের স্বাধীনতা এবং সামরিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিত। এই কর যারা দিত তাদের সুরক্ষিত নাগরিক বলা হত। নারী, শিশু, বৃদ্ধ, অসুস্থ, প্রতিবন্ধী, দরিদ্র এবং সন্ন্যাসীরা এই করের আওতার বাইরে থাকত। এ কথা সত্য যে, তিনি জীবনযাপনে ইসলামের গোঁড়া অনুসারী ছিলেন। শাসক হিসাবে হিন্দু রাজা এবং প্রজাদের ওপর অত্যাচারও হয়তো তিনি করেছেন। কিন্তু আলাদা করে তাঁর হিন্দু বিদ্বেষের কোনও প্রমাণ পাওয়া যায় কি? জিজিয়া চাপানোর উদ্দেশ্য যদি হিন্দু বিদ্বেষ হত তবে ক্ষমতা আরোহণের প্রায় ২০ বছর পর তিনি এই কর চাপালেন কেন? বাস্তবে একটানা যুদ্ধ এবং বিশাল সাম্রাজ্যের ব্যয় মেটানোর জন্য রাজকোষে নতুন আয়ের উৎসের প্রয়োজন থেকেই কার্যত এই কর চাপানো হয়। আবার তাঁর শাসনে মুসলিমদের ‘জাকাত’ বলে একটা কর দিতে হত, অ-মুসলিমদের ওপর চাপানো হত না, সে কথা হিন্দু সাম্প্রদায়িকতাবাদীরা বলেন না।

হিন্দুত্ব একটি মিশ্র সংস্কৃতি

রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘ভারততীর্থ’ কবিতায় বলেছেন– ‘হেথায় আর্য, হেথা অনার্য, হেথায় দ্রাবিড় চীন–/শক-হুন দল পাঠান মোগল এক দেহে হল লীন। …’ যে বিশুদ্ধ হিন্দুত্বের কথা বিজেপি কিংবা সংঘ পরিবারের হিন্দুত্ববাদী নেতারা প্রচার করেন, বাস্তবে তা কোথাও নেই, কোথাও ছিল না। শত শত বছর ধরে অসংখ্য জাতি ভারতীয় জীবনধারার সঙ্গে এসে মিলেছে, মিশেছে। সাম্রাজ্য বিস্তারের উদ্দেশ্যে হোক বা অন্য কোনও কারণে তারা এ দেশে এসে বাস করেছে, এ দেশেরই মানুষ হয়ে গিয়েছে।

খ্রিস্টাব্দের সূচনার সময়কাল থেকে কণিষ্ক সহ কুষাণ সম্রাটরা উত্তর ভারত জুড়ে রাজত্ব স্থাপন করেন এবং দীর্ঘ সময় শাসন করেন। মূলত চীনের একটি শক্তিশালী যাযাবর ইউয়েইচি সম্প্রদায়ের একটি শাখা হিসাবে ভারতে প্রবেশ করলেও তাঁরা আর ফিরে যাননি। কুষাণ সাম্রাজ্য আফগানিস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তানের কিছু অংশ, কাশ্মীর এবং উত্তর ভারতে বিস্তৃত ছিল। কুষাণরা বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করে ধীরে ধীরে ভারতীয় সমাজের সঙ্গে মিশে যায়। আজ আর ভারতীয় সমাজে কুষাণদের আলাদা করে চেনবার কোনও উপায় নেই। ঠিক একই রকম ভাবে গ্রিক, শক ও পার্থিয়ানরাও ভারতীয় জীবনের সঙ্গে মিশে গিয়েছে। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন জাতি-উপজাতির মানুষের ও তাদের সংস্কৃতির স্বাভাবিক মিশ্রণের মধ্য দিয়ে ভারতীয় সংস্কৃতি সমৃদ্ধ হয়েছে।

একই রকম সামাজিক মিশ্রণ এ দেশে গত প্রায় এক হাজার বছর ধরে হিন্দু-মুসলমান দুই ধর্মের মানুষের মধ্যে দেখা গেছে। দুই ধর্মের মানুষের সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের মধ্যে দিয়েও ভারতীয় সংস্কৃতি সমৃদ্ধ হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘মুসলমানেরা পুরুষানুক্রমে জন্মিয়া ও মরিয়া এ দেশের মাটিকে আপন করিয়া লইল। মুসলমান রাজত্ব ভারতবর্ষেই প্রতিষ্ঠিত ছিল, বাইরে তার মূল ছিল না। তাই মুসলমান ও হিন্দু সম্প্রদায় পরস্পর জড়িত হইয়াছিল এবং পরস্পরের আদানপ্রদানের সহস্র পথ ছিল’ (সমাজ)।

দ্বিতীয় কিস্তি (গণদাবী ৭৯ বর্ষ ৬ সংখ্যা ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬)

হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কঃ ফিরে দেখা (২)

‘হিন্দু’ একটি বিদেশি শব্দ!

ব্রিটিশ ইতিহাসবিদরা ভারতের ইতিহাসকে ধর্মের ভিত্তিতে হিন্দু, মুসলিম ও ব্রিটিশ পর্বে যে ভাবে ভাগ করেন, সেই বিভাজনটা ছিল কৃত্রিম, ঔপনিবেশিক লক্ষ্য পূরণের স্বার্থে ভারতীয়দের উপর চাপিয়ে দেওয়া।

ইতিহাসের এই কৃত্রিম বিভাজনের মধ্যে দিয়েই ধর্ম নির্বিশেষে ভারতীয়রা এক জাতি– এই সত্যের পরিবর্তে হিন্দু এবং মুসলমান আলাদা আলাদা জাতি– এই অনৈতিহাসিক ধারণার উদ্ভব। সত্যিই কি এই সময়কালকে হিন্দু এবং মুসলিম– এমন ধর্মভিত্তিক যুগ হিসাবে আখ্যায়িত করা যায়?

খ্রিস্টপূর্ব ১০০ সাল থেকে ১২০০ খিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কে সাধারণত হিন্দুযুগ বলা হয়। যদি রাজত্বের অর্থেও ধরা হয় তবে এর মধ্যে একটা দীর্ঘ সময় কি মৌর্য, ইন্দো-গ্রিসীয়, শক, কুষাণ রাজারা রাজত্ব করেননি? তাঁরা তো হিন্দু ছিলেন না! অনেক রাজাই ছিলেন বৌদ্ধ। এই যুক্তিতে খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময় তো বৌদ্ধযুগ! অথচ এই ইতিহাসবিদরা বৌদ্ধযুগের অস্তিত্ব স্বীকার করেন না।

ব্রিটিশ কিংবা তাঁদের অনুসারী এ দেশীয় ইতিহাসবিদরা এই সময়টিকে ‘হিন্দুযুগ’ বললেও এ দেশের সেই সময়কার মানুষরা কি নিজেদের হিন্দু বলে পরিচয় দিতেন? এ দেশে মুসলমান রাজত্বের আগেকার ভারত সম্পর্কে ইতিহাসের যে উপাদান পাওয়া যায়, সেখানে কোথাও হিন্দু কথাটি পাওয়া যায় না। এমনকি হিন্দু ধর্মশাস্ত্র বলে পরিচিত রামায়ণ, মহাভারত বা গীতাতেও কোথাও ‘হিন্দু’ শব্দটির উল্লেখ নেই। ইতিহাস বলছে, খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের পারস্য সম্রাট প্রথম দরায়ুসের লিখনে সিন্ধু উপত্যকাকে ‘হিন্দু’ বা ‘হিন্দুস’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। এই পারসিক শব্দ অনুকরণে গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাস ‘হিন্দিকে’ এবং পরবর্তী গ্রিক লেখকরা ‘ইন্ডিকা’ বা ‘ইন্ডিয়া’-র মতো শব্দ ব্যবহার করেছেন। সিন্ধু থেকে আসা ‘হিন্দুস’ বা ‘ইন্দোস’ শব্দের সঙ্গে ভূখণ্ডবাচক পারসিক প্রত্যয় তান (যেমন উজবেকিস্তান, আফগানিস্তান) যুক্ত করে হয়েছে হিন্দুস্তান এবং গ্রিক রোমান জগতের প্রত্যয় ইয়া (যেমন সিরিয়া, সার্বিয়া) যোগ করে তৈরি হয়েছে ইন্ডিয়া। অর্থাৎ হিন্দু শব্দটি গোড়ায় হিন্দুরা নিজেরা ব্যবহার করেনি। বাস্তবে এটি একটি বিদেশি শব্দ, যা পরে হিন্দুরা গ্রহণ করেছে। প্রাচীন ভারতের ঐতিহাসিক উপাদানগুলি থেকে স্পষ্ট হয়, মুসলমান যুগের আগেকার ভারত বলে পরিচিত ভূখণ্ডে বসবাসকারী বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায় ও গোষ্ঠীগুলি নিজেদের হিন্দু বা কোনও ঐক্যবদ্ধ ধর্মসম্প্রদায় বলে মনে করতেন না। বৌদ্ধদের ধর্মীয় সংগঠনের রূপ হিন্দু ধর্মীয় সংগঠনের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ফলে বৌদ্ধ রাজাদের রাজত্বের সময়কে কোনও ভাবেই হিন্দু যুগ বলে অভিহিত করা যায় না।

ভারতে মুসলিম যুগের ইতিহাসের কথা বলতে গেলে এখন আরব, তুর্কি এবং পারসিক সকলকেই এক সঙ্গে ‘মুসলমান’ বলা হয়। অথচ সমসাময়িক যে সব গ্রন্থ থেকে সেই যুগের বর্ণনা পাওয়া যায় সেগুলিতে ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত মুসলমান শব্দের ব্যবহার বিরল। এই সব গ্রন্থে ধর্মীয় পরিভাষার পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। তুরস্কের লোকেদের তুর্কী, আরবদের যবন বলা হত। অবশ্য পশ্চিম এশিয়া বা ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসা গ্রিক, রোমান-আরব নির্বিশেষে সকলকেই যবন বলার রীতি ছিল।

ব্রিটিশ এবং তার অনুগামী সব ইতিহাসবিদরা মুসলিম শাসকদের সময়টিকে হিন্দুদের উপর মুসলিমদের অত্যাচারের এবং জোর করে ধর্মান্তরিত করার যুগ হিসাবে চিত্রিত করেন। অর্থাৎ দুই ধর্মের মানুষকে পরস্পরের শত্রু হিসাবেই তুলে ধরেন। এর মধ্যে ঐতিহাসিক সত্যতা কতখানি?

তুর্কি শাসন থেকে শুরু করে অন্য মুসলিম শাসকদের ভারত অভিযানের প্রথম স্তরে সংঘর্ষ, হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ, অত্যাচার– এগুলো সেই সময়কার রাজ্যজয়ের অনুষঙ্গ হিসাবেই দেখা দিয়েছিল। ক্ষমতা দখল সম্পূর্ণ হওয়ার পর প্রাথমিক এই বিশৃঙ্খলা যেমন স্বাভাবিক ভাবেই ধীরে ধীরে কমে আসে, তেমনই শান্তি এবং শৃঙ্খলার ব্যবস্থা করাটা শাসকদের স্থায়ী শাসন গড়ে তোলার জন্যও দরকার ছিল। দ্বিতীয়ত রাজ্য দখল সম্পূর্ণ হলে স্থানীয় ক্ষমতাশালী শাসকদের পরাজিত করার পর সেই শাসকদের নিচের স্তরে যাঁরা থাকতেন, মূলত জমিদার শ্রেণির লোকেদের সাথে সুলতানরা একটা রফা করতেন। কারণ তখনই বিকল্প নতুন শাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা তাঁদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। জমিদাররা সুলতানকে একটা কর দিয়ে তাঁদের জমি, পদমর্যাদা, সুযোগ-সুবিধা সবই রাখতে পারতেন। এই ভাবে শাসনব্যবস্থার নিচের স্তরে স্থানীয় হিন্দুদেরই শাসন থেকে যায় এবং পারস্পরিক বিদ্বেষ এবং অবিশ্বাসও হ্রাস পেতে থাকে। এই অংশের শাসকদের সঙ্গে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কারণে সুলতান-নবাবদের কখনও বিরোধ দেখা দিলে তাকে প্রায়ই ধর্মীয় রূপ দিয়ে দেখানো হত। মনে রাখতে হবে, যুদ্ধে রাজ্য জয়, তা হিন্দু শাসক বনাম মুসলিম শাসক হোক কিংবা মুসলিম শাসক বনাম মুসলিম শাসক বা হিন্দু শাসক বনাম হিন্দু শাসক, সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় সব যুদ্ধের ক্ষেত্রেই হত্যা, বর্বরতা, নিষ্ঠুরতা, লুঠপাট প্রভৃতি বিষয়গুলি একই থাকে। বাবর দিল্লির সুলতান ইব্রাহিম লোদিকে যুদ্ধে পরাজিত ও হত্যা করেন। শের শাহের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে হুমায়ুন ভারত ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। গৌড়ের রাজা শশাঙ্ক থানেশ্বরের রাজা প্রভাকর বর্ধনের পুত্র রাজ্যবর্ধনকে পরাজিত ও হত্যা করেন। প্রতিটি যুদ্ধেই নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের নিদর্শন রয়েছে। সম্রাট অশোকের কলিঙ্গ যুদ্ধে যে রক্তের নদী বয়ে গিয়েছিল তা বহুল প্রচলিত। এ সত্তে্বও যাঁরা মুসলিম শাসকের বিজয়ে শুধু বর্বরতা দেখেন এবং হিন্দু শাসকের বিজয়ে শৌর্যবীর্য ছাড়া আর কিছু দেখতে পান না, তাঁদের বিচার ইতিহাসম্মত নয়।

সারা দেশেই, বিশেষ করে বাংলায় মুসলিমরা ছিল সংখ্যালঘু, হিন্দুরা সংখ্যাগুরু। তাই কেবল তরবারি তথা ক্ষমতার জোরে হিন্দুদের ধর্মান্তরণ সহজ ছিল না। যদিও শাসন ক্ষমতার জোরে ধর্মান্তরণের ঘটনা কম ছিল না। তবে সমাজের বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তিরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেও প্রধানত নিম্নশ্রেণির মানুষদের ধর্মান্তরণই বেশি ঘটেছে। নিম্নবর্গের মানুষের ব্যাপক হারে ইসলাম ধর্ম গ্রহণই এই ধর্মের প্রসারের অন্যতম কারণ বলা যায়।

মনে রাখতে হবে, এর আগে যারা ভারত আক্রমণ করেছে, শক, হুন, কুষাণ প্রভৃতি বিদেশিরা, তারা সভ্যতার দিক থেকে ভারতীয়দের তুলনায় অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে পড়া ছিল। সেই জন্যই হিন্দু সভ্যতার সঙ্গে তারা সহজেই মিশে গিয়েছিল। মুসলিম ধর্মের ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। কারণ ইসলাম ছিল এক নবীন ধর্ম, যা শ্রেণিগত, জাতিগত, বংশ ও বর্ণভিত্তিক স্বাতন্ত্র্য বাতিল করে এমন এক ধর্মীয় সম্প্রদায় স্থাপন করে যেখানে সকল অনুগামীর মধ্যে সমতা বিরাজ করে।

অন্য দিকে হিন্দু সমাজে ছিল বর্ণাশ্রম। ব্রাহ্মণ তথা উচ্চবর্ণের আধিপত্য ও অস্পৃশ্যতার রীতি নিম্নবর্ণের মানুষের উপর চেপে বসেছিল। তা ছাড়া, ভারতের অন্যান্য প্রান্তের মতো পূর্ব ভারতে ব্রাহ্মণ্যধর্ম কোনও সময়ই দৃঢ় রূপ নিতে পারেনি। পালযুগের উদারবাদী শাসনের পর সেন আমলে ব্রাহ্মণ্যধর্মের পুনরুত্থানের ফলে বৌদ্ধরা নিগ্রহের শিকার হয়েছিল। তাই সামাজিক উৎপীড়ন এড়াতে নিম্নশ্রেণির লোকেরা ইসলামকে স্বাগত জানান। সমাজে অবজ্ঞাত ও অবহেলিত মানুষের কাছে ইসলাম তার সমতার বাণী নিয়ে সামাজিক বাধানিষেধ ও নিগ্রহ থেকে মুক্তির উপায় হিসাবে উপস্থিত হয়। বিবেকানন্দ ভারতে মুসলিম শাসনের প্রভাব সম্পর্কে মাদ্রাজে ‘ভারতের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘‘এমনকি মুসলিম শাসনের কাছেও আমরা সেই মহান আশীর্বাদের জন্য ঋণী, যা হল বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণির একচেটিয়া ক্ষমতার অবসান। … ভারতের মুসলিম বিজয় দলিত ও দরিদ্রদের কাছে একটি পরিত্রাণ হিসেবে এসেছিল। আর এই কারণেই আমাদের জনগণের পাঁচ ভাগের এক ভাগ মুসলিম হয়েছে। শুধু তলোয়ারের জোরেই এটি হয়নি। এটি সম্পূর্ণ ভাবে তলোয়ার এবং অগ্নিসংযোগের কাজ ছিল বলে মনে করাটা হবে চরম উন্মাদনা।’

শাসকরা যে কখনও ব্যাপক ভাবে সব হিন্দুদের মুসলমান ধর্মে দীক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, বা প্রচণ্ড উৎসাহে ইসলামি আদর্শ প্রচার করেছিলেন, এ রকম প্রমাণ নেই। শুধুমাত্র সেই সব ব্যক্তিদেরই ধর্মান্তরের কথা উঠত যাঁরা হয় বিদ্রোহ করেছেন অথবা রাষ্টে্রর বিরোধিতা বা অনুরূপ কাজ করেছেন। তাই দেখা যায়, তুর্কি সুলতান বা মোগল রাজসভায় বা সেনাবাহিনীতে উচ্চপদে বহু হিন্দু কর্মরত ছিলেন। মুসলিম শাসকরা যদি ধর্মীয় বিদ্বেষ নিয়ে চলতেন তবে শাসন প্রক্রিয়ার মধ্যে হিন্দুদের এ ভাবে নিয়োগ করতেন না। মোগল শাসনে বহু হিন্দু উচ্চপদে আসীন ছিলেন। বাংলায়ও সুলতান হুসেন শাহের শাসনের সময়ে তাঁর প্রশাসনের দুই স্তম্ভ ছিলেন ব্রাহ্মণ মহাপণ্ডিত ও মহাকবি সনাতন এবং তাঁর ভাই রূপ, যাঁরা পরে শ্রীচৈতন্যের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। সিরাজউদ্দৌল্লার দরবারে রায়দুর্লভ, জগৎশেঠ, উমিচাঁদরাও উচ্চপদে ছিলেন। একই রকম ভাবে মোগলদের সঙ্গে প্রতাপসিংহের যুদ্ধে প্রতাপের পক্ষে হিন্দুর তুলনায় মুসলমান যোদ্ধা কম ছিলেন না। মোগলদের পক্ষেও মুসলমানের চেয়ে হিন্দু অল্প ছিলেন না।

পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ শাসনের প্রথম একশো বছরেও সমাজ জুড়ে হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ বা ধর্মকে কেন্দ্র করে দাঙ্গা প্রায় ছিল না। বরং ব্রিটিশের বিরুদ্ধে ১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহের শক্তির প্রধান উৎস হয়ে উঠেছিল হিন্দু-মুসলমান ঐক্য। যেমন সিপাহিদের মধ্যে তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যেও হিন্দু-মুসলমান কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংগ্রামে নেমেছিল।

অন্য দিকে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দও পরস্পরের সহযোগী হয়েছিলেন। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বিদ্রোহীরা বাহাদুর শাহ-কে, যিনি মুসলমান ছিলেন, সবার সম্রাট বলে মেনে নিতে দ্বিধা করেননি। হিন্দু ও মুসলিমরা পরস্পর বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব নিয়ে চললে এটা হত কি? বিদ্রোহের বিভিন্ন স্তরে নেতা-নির্বাচনের কালে লক্ষ রাখা হত যাতে উভয় সম্প্রদায়েরই যোগ্য ব্যক্তিদের স্থান হয়। বিদ্রোহের সময়ে হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের ঘটনা যে বাস্তব ছিল সেটা ইংরেজদেরও বুঝতে অসুবিধা হয়নি। পরে এক উচ্চপদস্থ ইংরেজ রাজকর্মচারী আফসোস প্রকাশ করে লিখেছিলেন, ‘এই একটা উপলক্ষ্য, যেখানে আমরা হিন্দুদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের খেপিয়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছিলাম।’ ১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহ প্রকৃতপক্ষে এটা সুস্পষ্টরূপে প্রমাণ করে দিয়েছিল যে মধ্যযুগ এবং অন্তত ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতের মানুষ সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন ছিলেন না।

কানপুরে বিদ্রোহের নেতা ছিলেন পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাও-এর দত্তকপুত্র নানা সাহেব। নানা সাহেবের এক বিশ্বস্ত অনুচর ছিলেন আজিমুল্লা। লক্ষ্ণৌর বিদ্রোহ অযোধ্যার বেগমের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছিল। মহাবিদ্রোহের অন্যতম নেত্রী ছিলেন ঝাঁসির তরুণী রানি লক্ষ্মীবাঈ। লক্ষ্মীবাঈয়ের ব্যক্তিগত রক্ষী হিসেবে প্রধানত দুই আফগান (পশতুন) ভাই, গুল মোহাম্মদ খান ও কাসিম খান দায়িত্ব পালন করেছিলেন। রানির সেনাবাহিনীতে প্রায় ৫০০ জন আফগান পাঠান সৈন্য ছিল, যারা ইতিহাসে ‘ওয়ালায়তি’ (Walayatis) নামেও পরিচিত ছিলেন। এ ছাড়াও রানির অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও প্রধান সহযোগীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মুন্দার খাতুন (বা মুন্দার বাই)। তিনি ছিলেন রানীর ঘনিষ্ঠ মুসলিম মহিলা দেহরক্ষী ও সহচরী, যিনি গোয়ালিয়রের যুদ্ধক্ষেত্রে রানির সাথেই বীরত্বের সাথে লড়াই করে প্রাণ দেন। গোলাম গৌস খান ছিলেন ঝাঁসি দুর্গের প্রধান গোলন্দাজ বাহিনীর প্রধান। খুদা বক্স ছিলেন রানির রাজকীয় অশ্বারোহী বাহিনীর প্রধান। সমাজে ধর্মের বিভেদ থাকলে এ সব সম্ভব হত কি!

তবে এই বিদ্রোহে সবচেয়ে বীরত্বের সম্মান সিপাহিদেরই প্রাপ্য। গভীর স্বদেশপ্রেমের প্রেরণায় এরা নিজেদের মধ্যে বদ্ধমূল পরধর্ম বিদ্বেষকেও বলি দিয়েছিল। একদিন তারা ধর্মীয় কুসংস্কারের কারণে চর্বিযুক্ত টোটা ব্যবহার করতে অস্বীকার করেছিল, কিন্তু ঘৃণিত বিদেশি শত্রুকে দেশ থেকে বিতাড়নের প্রয়োজনে বিদ্রোহের সময়ে হিন্দু-মুসলমান উভয় সিপাহিরাই এই টোটা বিনা আপত্তিতে ব্যবহার করেছিল। ১৮৫৯-এর মধ্যে ভারতের সর্বত্রই ব্র্রিটিশরাজ পূর্বমহিমায় সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। শৌর্য ও দেশাত্মবোধ এবং সম্প্রীতির বোধে সমুজ্জল ১৮৫৭-র এই মহাবিদ্রোহ ভারতবাসীর মনে একটা অবিস্মরণীয় ছাপ রেখে গিয়েছিল, স্বাধীনতা সংগ্রামে অফুরন্ত প্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছিল।

আজকের বিজেপি-আরএসএস নেতারা দেশের একচেটিয়া পুঁজির নির্মম শোষণের বিরুদ্ধে শোষিত মানুষের প্রতিবাদী ঐক্যকে ভাঙতে দেশের এই গৌরবময় সম্প্রীতির ইতিহাসকে ভুলিয়ে দিতে চায়। তারা দেখাতে চায়, দেশটা শুধুই হিন্দুদের, মুসলমানরা সেখানে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। বাস্তবে সাম্প্রদায়িকতা ছাড়া তাঁদের রাজনীতিতে আর এমন কিছু নেই যা দিয়ে তাঁরা আজ দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারেন। তার জন্য তাঁরা ইতিহাসকে বিকৃত করছেন, মিথ্যা ইতিহাস দেশের ছাত্রদের সামনে তুলে ধরছেন। এই সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে মোকাবিলা করতে হলে সম্প্রীতির রাজনীতিকে তুলে ধরতে হবে। তার জন্য দেশের সম্প্রীতির ইতিহাস জানা খুবই জরুরি।

তৃতীয় কিস্তি (গণদাবী ৭৯ বর্ষ ৭ সংখ্যা ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬)

হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কঃ ফিরে দেখা (৩)

মধ্যযুগের ভারতে সাহিত্য শিল্প সঙ্গীত হিন্দু-মুসলমান যুক্ত সাধনার উৎকৃষ্ট ফসল

ভারতীয় উপমহাদেশীয় অঞ্চলের স্থাপত্য, শিল্পকলা, সঙ্গীত, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার যে সমৃদ্ধ ঐতিহ্য, সেই ঐতিহ্য কোনও একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের দ্বারা সৃষ্ট হয়নি। যুগ যুগ ধরে বহিরাগত নানা সম্প্রদায় এখানকার সভ্যতায় মিলিত হয়েছে। মনে রাখতে হবে এই ভারত আজকের ভারত নয়। ভারত বলতে তখন দক্ষিণ-এশিয়া জুড়ে বিস্তৃত উপমহাদেশ। এই উপমহাদেশীয় সভ্যতার উদারবাদী মানসিকতা তাদের সাদরে গ্রহণ করেছে। এই মিলনের মধ্যে যেমন গ্রিক, শক, হুনেরা রয়েছে তেমনই রয়েছে ইসলামের অনুসারীরা। সবার মিলনের মধ্যে দিয়ে, সবার সম্মিলিত সাধনার মধ্যে দিয়েই গড়ে উঠেছে এখানকার সাহিত্য, সঙ্গীত, স্থাপত্য চিত্রকলার উন্নত ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার নিয়ে আজ যে কোনও সম্প্রদায়ের ভারতবাসীই গৌরব অনুভব করার অধিকারী।

দুঃখের বিষয় এই সাধারণ ঐতিহ্য সম্বন্ধে সাধারণ মানুষকে অবহিত করা হয়নি। সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসনের সময়ে বহু ব্রিটিশ রাজকর্মচারী এবং ইংরেজ লেখক তাঁদের জাতিগত অহঙ্কার থেকে ভারতকে হেয় করতে প্রায়ই লিখতেন যে, ভারতবাসীর ধর্ম, সামাজিক অবস্থা এতই নিচুস্তরের যে তারা গণতন্ত্র অথবা স্বাধীনতার অনুপযুক্ত। এরই পাল্টা সমাজের একাংশের মানুষের মধ্যে দেখা দিল– আমাদের কিছুই কি নেই? কিছুই কি ছিল না? তখন তাঁরা মুখ ফেরালেন অতীতের দিকে। বললেন, অতীতে আমাদের সব ছিল। আর অতীত ঐতিহ্যের কথা বলতে গিয়ে তাঁরা ভারতের মধ্যযুগটিকে টপকে গিয়ে প্রাচীন যুগের কথাই আলোচনা করতেন। মধ্যযুগকে তাঁরা অবক্ষয়ের যুগ বলে দাগিয়ে দিতেন। এই ধারণা অবশ্যই ইতিহাস বিরোধী। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টি ও যুক্তিবাদের বিপরীত ধারার ফসল। যেখানে সভ্যতায় নিজেদের সমাজের অবদানগুলির যথাযথ মূল্যায়ন করে ঘাটতিগুলি বুঝে নিয়ে সেগুলি পূরণের জন্য চেষ্টা করা দরকার ছিল, পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক চিন্তাভাবনার সর্বোচ্চ ভাবনাগুলিকে আয়ত্ত করার দরকার ছিল, তার পরিবর্তে ভারতের অতীত গরিমা স্ফীতাকারে তুলে ধরতে থাকলেন তাঁরা। ফলে সাধারণ দেশবাসীর মনে একটা মিথ্যা দম্ভ ও আত্মতুষ্টির মনোভাব তৈরি হল। বাস্তবে তা জাতীয় অগ্রগতি তথা গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তা গ্রহণ ও প্রসারের সংগ্রামকেই দুর্বল করে তুলল। হিন্দু, মুসলমান, শিখ, পারসি সম্প্রদায়ের পরস্পরের মধ্যে বিভেদের মানসিকতাকে বাড়িয়ে তুলল। ইতিহাস হয়ে উঠল এক একটা বিশেষ সম্প্রদায়ের ইতিহাস। মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণির এক অংশ হিন্দুদের অনুকরণে তাঁদের ঐতিহ্য চর্চা এবং গর্ববৃদ্ধির জন্য পশ্চিম এশিয়ার দিকে দৃষ্টি ফেরালেন। ক্রমশ দেখা গেল যে হিন্দু, মুসলমান, শিখ, পারসি এমনকি নিম্নবর্ণের হিন্দুরাও ঐতিহ্যের ক্ষেত্রে কেউই নিজেদের এক সভ্যতার উত্তরাধিকারী বলে ভাবছে না, তারা সকলেই নিজেদের এক একটি ভিন্ন ঐতিহ্যের ধারক বা বাহক বলে মনে করতে শুরু করল। এর বিপরীতে নবজাগরণের চিন্তার ভিত্তিতে রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, অক্ষয় কুমার দত্ত প্রমুখ আধুনিক চিন্তা সমাজে প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেছেন। কিন্তু তা প্রাধান্য বিস্তার করতে পারেনি। বাস্তবে জাতীয় কংগ্রেসের আপসকামী নেতৃত্বের বড় অংশ আধুনিক গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তার পরিবর্তে হিন্দু বর্ণবাদী চিন্তার দ্বারা প্রভাবিত থাকার জন্যই এ জিনিস ঘটতে পারল। তাই সংখ্যাগরিষ্ঠ তথাকথিত নিম্নবর্ণের ভারতবাসীকে যেমন তাঁরা জাতীয় আন্দোলনে সামিল করতে পারলেন না, তেমনই মুসলিমদেরও বড় অংশকে দূরে ঠেললেন। না হলে মধ্যযুগ জুড়ে হিন্দু-মুসলমান মিলনের সুরে কাব্য, সাহিত্য, সংস্কৃতি, চিত্রকলা, স্থাপত্য ক্ষেত্রে অনন্য সৃষ্টিগুলি কারও দৃষ্টি এড়াত না। এই অনৈতিহাসিক চিন্তারই পরিণতিতে সাম্প্রদায়িক এবং বিদ্বেষকে হাতিয়ার করে আজ আবার শাসক বিজেপি মোগল যুগকে ইতিহাসের পাঠ্য পুস্তক থেকে ছেঁটে ফেলছে। যেন মোগল যুগটা সত্যিই ইতিহাসে ছিল না। যেন তারা ছাঁটলেই অন্তত পাঁচশো বছরের ইতিহাস মুছে যাবে। এই বিকৃত ভাবনা নিয়েই নাকি তাঁদের কোনও নেতা বিশ্বগুরু হবেন!

সাহিত্যে সম্মিলন

গোটা মধ্যযুগ জুড়ে অজস্র নিদর্শন রয়েছে যা নিঃসংশয়ে প্রমাণ করে ভারতবর্ষের সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্য, সব কিছুই হিন্দু-মুসলমান মিলিত সাধনার ফলশ্রুতি। সংস্কৃতকে দেবভাষা বলে আখ্যায়িত করেছে হিন্দুদের একাংশ। মধ্যযুগীয় শাসনে সেই সংস্কৃত ভাষায় কাব্য রচনা করেছেন দরাফ খাঁ ও আবদুর রহিম। ভারতে তুর্কি বা মোগল অভিযানের প্রাথমিক পর্যায় পার করে সমাজে শান্তি স্থাপিত হওয়ার পর সারা দেশের মতো বাংলায়ও সংস্কৃত, লৌকিক পুরাণ ও সাধারণ সাহিত্যের চর্চা সুলতান ও কর্মচারীদের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছে। ডঃ সুকুমার সেনের মতে, ‘মধ্যযুগের পৌরাণিক বাংলাসাহিত্য প্রধানত রাজসভাশ্রিত।’ বাংলার সুলতান হুসেন শাহের (১৪৯৩-১৫২৫) দরবারে রূপ, সনাতন, পুরন্দর খাঁ সহ হিন্দু মুসলমান একত্রে শাস্ত্র অনুশীলন ও আলাপ আলোচনা করতেন। তাঁরই আমলে পরাগল খাঁ মুসলমান হয়েও বাংলায় মালাধর বসুকে দিয়ে লিখিয়েছিলেন ‘পরাগলী মহাভারত’। বিপ্রদাস পিপলাই ও বিজয় গুপ্তের বিখ্যাত মনসামঙ্গলও এই সময়েই লেখা হয়। সেই যুগের লেখক কবীন্দ্র পরমেশ্বর ও শ্রীকর নন্দীর মহাভারতের অনুবাদ তাঁরই উৎসাহে। বিজয়গুপ্তের পদ্মপুরাণেও হুসেন শাহের নাম দেখা যায়। ব্রজবুলি সাহিত্যে বহু মুসলমান পদকর্তার নাম পাওয়া যায়। এই যুগের নাট্যকারদের মধ্যে কবি মীর মশার্রফ হুসেনের নাম উল্লেখযোগ্য।

বহু সংস্কৃত শাস্ত্র ও গ্রন্থ আরব ও পারস্য দেশে আগেই অনুবাদ হয়েছিল। তার পর আল বিরুনি ভারতের ধর্ম ও দর্শনের সম্বন্ধে চমৎকার পরিচয় দিয়ে গিয়েছেন। তার পরেও বহু সংস্কৃত গ্রন্থের পারসি অনুবাদ হয়েছে। আকবরের সময় নাগোরী মুবারকের পুত্র আবুল ফজল ও ফৈজী অনেক সংস্কৃত গ্রন্থের অনুবাদ করেন। সেই যুগে মহাভারত থেকে যোগাবাশিষ্ঠ তাঁর দরবারে সংস্কৃত সাহিত্য ও ভারতীয় ধর্মের গভীর আলোচনা চলত। তাঁরই উপনিষদের অনুবাদ সির-ই-আকবর ভাষান্তরিত হয়ে ইউরোপে প্রথম উপনিষদের পরিচয় দিয়েছে।

উত্তর ভারতের সব ভাষার সাহিত্যেই মুসলমানদের সাধনা আছে। ১৫৪০-এ মালিক মুহম্মদ জায়সী তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ পদ্মাবতী লেখেন। কাব্যটির মূল পটভূমি দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি ও চিতোরের রানি পদ্মাবতীকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হলেও এটি আলাউদ্দিন খিলজির মৃত্যুর (১৩১৬) প্রায় ২২৪ বছর পর শেরশাহ সুরির রাজত্বকালে আওয়াধি ভাষায় রচিত হয়। জায়সীর এই পদ্মাবতী বাংলা অনুবাদ করেন আরাকান রাজসভার প্রতিভাধর কবি সৈয়দ আলাওল। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম নিদর্শন ‘লোর-চন্দ্রানী’ উপাখ্যান।

হোলির দিনে ব্রাহ্মণেরা যে মদনাষ্টক পাঠ করে, তার রচয়িতা আকবরের সেনাপতি ও মন্ত্রী আবদুর রহিম খান। আকবর বিভিন্ন ধর্মের সমন্বয়ে শুধু দীন-ইলাহি ধর্মের প্রবর্তন করেন তাই নয়, তাঁর আদেশে বহু সংস্কৃত গ্রন্থ পারসি ভাষায় অনুদিত হয়, এই সময়ে ফতেপুর সিক্রির উপাসনালয় এবাদতখানায় সমস্ত ধর্মের প্রধান ও দার্শনিকের মতবিনিময় চলত। ইতিহাসবিদ অমলেশ ত্রিপাঠী লিখেছেন, ‘‘আকবরই প্রথম মুসলিম সম্রাট যিনি সচেতন ভাবে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সেতু বাঁধতে চেয়েছিলেন, যদিও তার পিছনে ঐহিক প্রেরণাও ছিল। প্রথমেই তিনি তুলে দিলেন জিজিয়া। হিন্দুদের দেওয়া হল বড় বড় মনসবদারি (তার সঙ্গে জায়গীর)। মানসিংহ সাতহাজারি মনসবদার, টোডরমল দেওয়ান, বীরবল প্রিয় সভাসদ। হিন্দুদের সতীদাহ বন্ধ করতে চেয়েছিলেন তিনি। ধর্ম নির্বিশেষে শিক্ষার ব্যবস্থা করলেন, মহাভারত, রামায়ণ, গীতা ফার্সিতে অনুবাদ করালেন। বৃন্দাবনের বৈষ্ণব মন্দির, মঠের পৃষ্ঠপোষকতাও করলেন।’’ আকবরের সময়ে গো-হত্যা বন্ধের নির্দেশ ছিল। বেদান্ত চর্চা চলত। তুলসীদাসী রামায়ণ সম্রাট আকবরের আমলেই রচিত হয়। এমনকি কৃত্তিবাসী রামায়ণটিও গৌড়ের সুলতান গিয়াসুদ্দিন আজম শাহের পৃষ্ঠপোষকতায় রচিত বলে একাংশের গবেষকদের মত। সব মিলিয়ে এ কথা স্পষ্ট যে, আজকের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশ অনেকাংশেই বাংলার মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায়।

সঙ্গীতে হিন্দু-মুসলমান সম্মিলিত চর্চা

ক্ষিতিমোহন সেনের ‘ভারতে হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনা’ গ্রন্থে পাইঃ ‘‘ভারতের মোল্লা পণ্ডিতের দল যখন বিবাদ করিয়া মরিতেছিল তখনই সঙ্গে সঙ্গে চলিয়াছিল সাহিত্য-কলা-সঙ্গীতে সর্বত্র হিন্দু ও মুসলমানের যুক্ত সাধনা। সঙ্গীতে তো বহু রাগরাগিণী খুসরুর। আমির খুসরু, ১২৫৩ খ্রিস্টাব্দ হইতে আরম্ভ করিয়া তানসেন প্রভৃতির ধারা ধরিয়া সঙ্গীতকলার মুসলমান গুণীদেরই জয়জয়কার। এখনকার ধ্রুপদ-খেয়াল টপ্পা-ঠুংরী সর্ববিধ উত্তর-ভারতীয় সংঙ্গীতকলারই গুরু তাঁহারা।

সেতার যন্ত্রটি হিন্দু-মুসলমান দুই যন্ত্রেরই সমন্বয়ে। এসরাজ সুরবাহার সারেঙ্গী প্রভৃতি হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনার ফল। তবলাও তাই। রামপুরের নবাব কলব আলি খাঁ সুরশৃঙ্গার প্রবর্তন করেন।

‘‘ইমন ও ইমনযুক্ত সব রাগ মুসলমান গুরুদের প্রবর্তিত। তুরস্কতোড়ি, তুরস্কগৌড়ের নাম সংস্কৃত সঙ্গীতরত্নাকর গ্রন্থেও দেখা যায়। ‘তুরস্ক’ নামেই তাহাদের কুল-পরিচয় জানা যাইতেছে। বাহার, আলাইয়া, সরফরদা, সাজগিরি, সাহানা, আড়ানা, সোহিনী, সুহা, সুঘরাই, জিলফ, মারু, পিলু, বারোয়াঁ, লুম, ঝিঁঝোটি প্রভৃতি রাগ-রাগিণী মুসলমান গুরুদেরই গৌরব। মিঞা-সারঙ্গ মিঞা-মল্লার প্রভৃতিও তাই। মিঞা নামেই তাহাদের পরিচয় সুস্পষ্ট। এগুলি তানসেনের কীর্তি। …’’

‘‘আওরংজেব বাদশাহ হিন্দুস্তানি সঙ্গীত রচয়িতাদেরও যথেষ্ট সমাদর করিতেন। তাঁহার জন্মদিনে প্রতি বৎসর যে সব নূতন সঙ্গীত রচিত হইয়াছে তাহা আজও তাল-মান সহকারে সুরক্ষিত আছে। ধ্রুপদ একসময় লোকগীত ছিল। ইঁহারাই ইহাকে ক্লাসিকাল বা শাস্ত্রীয় করিয়া তোলেন।’’

স্থাপত্য ও চিত্রশিল্প

স্থাপত্য এবং চিত্রশিল্পেও একই রকম হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনার অজস্র উদাহরণ আছে।

প্রখ্যাত পারস্য পণ্ডিত আল বিরুনির মতে ভারতীয় নৃপতিদের শিল্পকলা ছিল জগতে অতুলনীয়। আরব, তাতার, মোগল, পারস্য শিল্পীরা ভারতীয় শিল্পীদের কাছে শিক্ষা নিয়েছেন। ব্রিটিশ শিল্প-ইতিহাসবিদ ই ভি হ্যাভেলের মতে, তাজমহল ভারতীয় প্রতিভারই ফল। তাজের ভারতীয়ত্বের একটা বড় প্রমাণ, তাজ পশ্চিমমুখী নয়। আর এফ চিজলম, যিনি একজন বিখ্যাত ব্রিটিশ স্থপতি এবং ঔপনিবেশিক ভারতে ‘ইন্দো-সারাসেনিক’ স্থাপ্যত্যশৈলীর অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ বলে পরিচিত, দেখিয়েছেন, তাজের চার কোণে চারটি মিনার, মাঝে গম্বুজযুক্ত রচনা– এই রচনারীতি যুবদ্বীপের চণ্ডীসেবার পঞ্চরত্ন মন্দিরের নকশার সঙ্গে মেলে। হিন্দু শিল্পশাস্ত্রের পঞ্চরত্ন মন্দিরেরও এইরূপই গঠনপ্রণালী। অজন্তার চিত্রেও তাজের নকশার নমুনা পাওয়া যায়। আকবরের সেকেন্দ্রাতেও এমন সব শৈলী দেখা যায় যাকে ঠিক মুসলমানি বলা যায় না।

তাজের নির্মাণে যেমন কান্দাহার, কনস্টান্টিনোপল ও সমরখন্দের কারিগর ছিলেন, তেমনই মুলতান লাহোরের কারিগরেরও অভাব ছিল না। দিল্লিরও বহু কারিগর ছিলেন। তাঁদের শিক্ষায় ভারতীয় শৈলীই চালু ছিল। একজন বড় ওস্তাদ ছিলেন চিরঞ্জীব লাল, তাঁহার অনুবর্তী ছিলেন ছোটেলাল, মন্নলাল ও মনোহরলাল।

তাজের পুষ্পিত মোজেইক কাজের ডিজাইনের অনুপ্রেরণা পারস্যের হলেও সে সব রচনার শিল্পী ওস্তাদেরা ছিলেন সবই হিন্দু। তাজের বাগান রচনাও হয়েছিল এক হিন্দু শিল্পীর পরিকল্পনায়।

মুসলমান ধর্মশাস্ত্রের মূর্তি-চিত্র-গান প্রভৃতি নিষিদ্ধ। তবুও যেমন গানে এই দেশে মুসলমান ওস্তাদেরাই অগ্রণী, তেমনই মোগল আমলে চিত্রশিল্পের বিপুল প্রসার দেখা যায়। মোগল সম্রাটের দরবারে হিন্দু-মুসলমান উভয় ধর্মের চিত্রশিল্পীরই দেখা পাওয়া যায়। সেই সময়কার শ্রেষ্ঠ সব চিত্র মেলে পারসিক পুঁথির চিত্রের কাজে। হামাজার উপাখ্যান বারো খণ্ডে চোদ্দশো শ্লোকে লেখা। তার মধ্যে রয়েছে অপূর্ব সব চিত্র। চাঙ্গেজনামা, জাফরনামা, রজমনামা, পারসি রামায়ণ, পারসি নল-দময়ন্তী কথা, পারসি পঞ্চতন্ত্র, প্রভৃতি পুঁথি এই সব চিত্রের রত্ন-ভাণ্ডার। এই সব শিল্পের রচনার বস্তু নির্বাচনে হিন্দু-মুসলমান কোনও বাছবিচার ছিল না।

আকবরের সময়ের বহু চিত্রশিল্পীর পরিচয় আবুল ফজল রেখে গেছেন। শিল্পীদের মধ্যে চারজনের নাম তিনি বিশেষ ভাবে উল্লেখ করেছেন তার মধ্যে দু-জন মুসলমান দু-জন হিন্দু। এ ছাড়াও আরও তেরো জন চিত্রকরের পরিচয় আবুল ফজল দিয়েছেন তার মধ্যে হিন্দু-মুসলমান দুই-ই আছেন। নন্দলাল বসু মোগল আমলের শিল্পীদের যে তালিকা দিয়েছেন তাতে দেখা যায় প্রখ্যাত একশো আট জন হিন্দু ও একানব্বই জন মুসলমান শিল্পীর নাম।

সঙ্গীত শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির এই দীর্ঘ ইতিহাস থেকে মুসলিম অবদানকে কি বাদ দেওয়া যায়? বাদ দিলে সত্যিই কি তা আর ইতিহাস থাকে? অথচ আজ ক্ষমতার দম্ভে এই চেষ্টাই করে চলেছে শাসক বিজেপি-আরএসএসের নেতারা।

এই সব নবাব-সুলতানদের পরিবর্তে সে দিন যদি আজকের মতো বিজেপি কিংবা আরএসএস ক্ষমতায় বসে থাকত তবে হয়তো এই মিলন সম্ভবই হত না। বিধর্মী বলে তাদের হয়তো ‘দূর হটো’ বলে মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দেওয়া হত। সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন ইতিহাসবিদদেরও এ সব চোখে না পড়ার কথা নয়। তাঁরা যে ইচ্ছা করেই এগুলি দেখেন না বা দেখেও না দেখার ভান করেন, তা বলার অপেক্ষা রাখেন না। কিন্তু যাঁরা বিদ্বেষে পূর্ণ সমাজের পরিবর্তে একটা সুস্থ-সুন্দর সমাজ দেখতে চান, তাঁরা কি এই বিভেদের রাজনীতিকে নীরবে মেনে নেবেন? শাসকের এই বিকৃত ভাবনাকে নীরব থেকে মেনে নিলে আগামী প্রজন্মের কাছে জবাবদিহি করার কিছু থাকবে কি? 

চতুর্থ কিস্তি (গণদাবী ৭৯ বর্ষ ৮ সংখ্যা ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬)

হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কঃ ফিরে দেখা (৪)

জাতীয় নেতৃত্বের দুর্বলতাই সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলিকে পুষ্ট করেছিল

১৮৫৭-র সিপাহি বিদ্রোহে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ব্র্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। ব্রিটিশ এই বিদ্রোহকে সীমাহীন নির্মমতায় দমন করে। যেহেতু বিদ্রোহের বড় অংশের নেতৃত্বে ছিল মুসলিম নবাব এবং জমিদাররা, তাই বিদ্রোহ দমনের পর ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ বিশেষ ভাবে মুসলিমদের প্রতি প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠে। একমাত্র দিল্লিতেই ২৭ হাজার মুসলমানকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। বিদ্রোহে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে যে সম্প্রীতি ও একতা দেখা গিয়েছিল তা ইংরেজ শাসকদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল। তারা বুঝেছিল, হিন্দু-মুসলমানের মিলিত শক্তি ভবিষ্যতে তাদের বড় বিপদের কারণ হতে পারে। বাস্তবিক সিপাহি বিদ্রোহের ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে এক দিকে যেমন নবাব রাজা মহারাজাদের হারানো সাম্রাজ্য ফিরে পাওয়ার চেষ্টার সমাপ্তি ঘটে তেমনই ভারতে কোম্পানি শাসনের অবসানের মধ্য দিয়ে সরাসরি ব্রিটিশ পার্লামেন্ট তথা সাম্রাজ্যবাদী শাসনের সূচনা হয়। নতুন ব্যবস্থায় ভারত শাসন নীতিতে ব্রিটিশ শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও ব্যাংক পরিচালকদের প্রভাব অনেকখানি বেড়ে গিয়েছিল। ১৮৫৮ এর আগেকার সময়ের তুলনায় এখন ভারতে ব্রিটিশ সরকার আরও বেশি প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে উঠেছিল।

রক্ষণশীলদের সঙ্গে ব্রিটিশ সরকারের বোঝাপড়া

ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের মনে হয়, সরকারি সাহায্যে সতীদাহ প্রথা রোধ ও বিধবাবিবাহ আইন চালু রক্ষণশীল সমাজের একটা বড় অংশের মধ্যে ক্ষোভের ইন্ধন জুগিয়েছিল, যা-ও ১৮৫৭-র বিদ্রোহের বিশেষ কারণ। এর পর থেকেই সরকারি কর্তৃপক্ষ রক্ষণশীল সমাজের পক্ষে দাঁড়ানোর নীতি নেয়। অন্য দিকে সরকার শিক্ষা প্রসারের যতটুকু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সেখান থেকেও পিছিয়ে যায়। সমাজের রক্ষণশীল অংশের সঙ্গে জোট বাঁধার ফলে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ এর পর সমাজ সংস্কারকদের সহায়তা করার আগেকার নীতি পরিত্যাগ করে।

আবার এই সময় থেকেই জাতীয়তাবাদী চিন্তারও সূচনা। ভারতবাসী মাত্রেরই যে স্বার্থ এক, এই ভাবনাও এই সময় থেকেই ধীরে ধীরে প্রসারিত হতে থাকে। আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষা ও ভাবধারাও শিক্ষিত মানুষের মনে যুক্তিবাদী, ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক চিন্তার জন্ম দেয়। শিক্ষিত শ্রেণি বুঝতে সক্ষম হয় যে, ভারত যত দিন সাম্রাজ্যবাদী নিয়ন্ত্রণে থাকবে তত দিন অর্থনৈতিক উন্নতির সম্ভাবনা নেই। ভারতে শিল্প বিকাশেরও আশা নেই। উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে আধুনিক অর্থনৈতিক সামাজিক ও রাজনৈতিক চিন্তাধারা বিকাশে এবং জাতীয়তাবাদী চেতনা প্রসারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল সংবাদপত্র। দেশীয় এই সব সংবাদপত্রে যেমন সরাসরি ব্রিটিশ সরকারের কাজকর্মের সমালোচনা করা হত, তেমনই স্বায়ত্তশাসন, গণতন্ত্র, শিল্পবিকাশ প্রভৃতি নিয়ে জনমত গড়ে তোলা হত। বাংলা থেকে প্রকাশিত হত হিন্দু পেট্রিয়ট, অমৃতবাজার পত্রিকা, ইন্ডিয়ান মিরর, বেঙ্গলি, সোমপ্রকাশ ও সঞ্জীবনী। তেমনই মুম্বই, চেন্নাই, অন্ধ্র, কেরালা, উত্তরপ্রদেশ, পাঞ্জাব থেকেও বিভিন্ন পত্রিকা প্রকাশ পেত। এ ছাড়াও বিভিন্ন প্রদেশ থেকে প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকাগুলি, থিয়েটার এবং গোপন বৈপ্লবিক সমিতিগুলিও জাতীয়তাবাদী ভাবধারা গড়ে তুলতে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিল।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ধ্বংসের চেষ্টা শুরু ব্রিটিশের

১৮৭০-এর পর জাতীয়তাবাদী আন্দোলন যতই প্রসারিত হতে থাকে ততই ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি ধ্বংস করতে সক্রিয় হয়ে ওঠে। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিভেদ বাড়িয়ে তোলাকে ভারতে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার নীতি হিসাবে গ্রহণ করে। এই লক্ষ্য নিয়েই ব্রিটিশ সরকার মুসলমানদের সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটায়। মুসলমান ভূস্বামী ও নব্য-শিক্ষিত মুসলমানদের নিজেদের দলে টেনে আনার পথ নেয়।

সিপাহি বিদ্রোহের ব্যর্থতার ফলে মুসলমান সমাজের গরিষ্ঠ অংশে হতাশার ছায়া নেমে আসে। যেহেতু ব্রিটিশরা মুলত মুসলিম শাসকদের হাত থেকেই ক্ষমতা কেড়ে নেয়, তাই ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে মুসলিমরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং তাদের নিয়ে আসা শিক্ষা সহ আধুনিকতা থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে। শিক্ষাক্ষেত্রে এই অনগ্রসরতা মুসলিম সমাজের পক্ষে বিশেষ ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁডায়। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে আধুনিক শিক্ষা ছিল নিতান্ত প্রয়োজনীয়। শিক্ষাগত দৈন্যের কারণে মুসলমানরা তা থেকে বঞ্চিতই থেকে যায়। আলিগড়ের সৈয়দ আহমেদ খানের মতো কিছু নেতা ছিলেন ব্যতিক্রম। স্কুল, কলেজ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তিনি মুসলমান সমাজের মধ্যে আধুনিক শিক্ষার প্রসারে বিশেষ ভাবে উদ্যোগী হন। এক সময় তিনি ছাত্র-যুব সমাজের মধ্যে বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী চিন্তার প্রসারের জন্য সায়েন্টিফিক সোসাইটি স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু তিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধতা থেকে সচেতন দূরত্ব বজায় রেখে চলতেন। প্রথম জীবনে তিনি বলেছিলেন, ‘‘… হিন্দু বা মুসলমান আখ্যা, কে কোন ধর্মাবলম্বী সেটাই চিহ্নিত করে দেয়। ধর্মের নাম আলাদা হলেও হিন্দুই হোক, বা মুসলমানই হোক, এমনকি এ দেশে বসবাসকারী খ্রিস্টানরাও এক হিসেবে একই জাতির অন্তর্ভুক্ত।’’ তিনিই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ব্রিটিশের বিভাজনের রাজনীতির আবর্তে পড়ে সঙ্কীর্ণতাবাদী তথা রক্ষণশীল হয়ে ওঠেন। তিনি ঘোষণা করেন যে হিন্দু ও মুসলমান সমাজের রাজনৈতিক স্বার্থ এক তো নয়ই বরং বিপরীত। তিনি তাঁর অনুগামীদের ব্রিটিশ রাজের প্রতি একান্ত অনুগত থাকার পরামর্শ দিতেন। এমনকি ১৮৮৬-তে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার সময়ে তিনি এর বিরোধিতা করেন। সৈয়দ আহম্মদ খান এই মত প্রচারে ব্রতী হন যে, ব্রিটিশ রাজত্বের অবসান ঘটলে বা ব্রিটিশ-শাসন দুর্বল হয়ে উঠলে মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায়ের অধীনতা স্বীকার করতে হবে। তাঁর এই বক্তব্যকেই পরবর্তী সময়ের মুসলিম লিগ নেতারা বিভেদপন্থী রাজনীতির প্রসারে কাজে লাগিয়েছিল।

সাধারণত প্রতিক্রিয়াশীল বড় বড় ভূস্বামীরাই মুসলমান সমাজের নেতৃত্ব দিত। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে জমিদার বা ভূস্বামী শ্রেণি নিজেদের কায়েমি স্বার্থ বজায় রাখার জন্যই সে সময় ব্রিটিশ শাসনের উগ্র উৎসাহী সমর্থকের ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। উচ্চশিক্ষা বিস্তার লাভের সঙ্গে সঙ্গে নব্যশিক্ষিত হিন্দু ও এই সম্প্রদায়ের উদীয়মান ব্যবসায়ী শিল্পোদ্যোগী শ্রেণি জনসাধারণের নেতৃত্ব দখল করে, জমিদার শ্রেণির চেয়ে সাধারণ মানুষের কাছে এই শিক্ষিত শ্রেণির মর্যাদা বেড়ে যায়। এ ক্ষেত্রে মুসলিম সমাজের অবস্থা ছিল বিপরীত।

এই অবস্থার সুযোগ নেয় ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ ও রাজভক্ত মুসলিম ভূস্বামী শ্রেণি। তাদের পক্ষে মুসলিম জনসাধারণকে শিক্ষিত হিন্দু সমাজের প্রতি বিদ্বিষ্ট করে তোলা সম্ভব হয়। সৈয়দ আহম্মদ খান সহ অন্যান্য মুসলিম নেতৃবৃন্দ সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে মুসলমানদের বিশেষ অধিকারের দাবি জানান। তাঁরা এই প্রচার চালিয়েছিলেন যে শিক্ষিত মুসলমানেরা যদি ব্রিটিশের অনুগত বা রাজভক্ত হয় তবে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ নিশ্চয়ই তাদের সরকারি চাকরিতে নিয়োগ করবে, অন্যান্য অনেক প্রকার বিশেষ অনুগ্রহও তারা ভোগ করতে পারবে। এই প্রক্রিয়াতে ব্রিটিশের অনুগত মুসলিম জমিদার ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীরা মুসলমান সমাজের নেতৃত্ব দখল করে।

সমাজের গণতন্ত্রীকরণের কাজটি এড়িয়ে যায় কংগ্রেস নেতৃত্ব

রাজনীতি ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িকতার আমদানি এবং সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির দ্বারা এগুলির মূল্যায়নের মূলে ছিল প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তাধারা, যা সংখ্যালঘু শ্রেণির মনে নিরাপত্তার অভাব জাগিয়ে তোলে। এই পরিস্থিতিতে জাতীয় নেতৃত্বের এমন বিচক্ষণ পদক্ষেপ বা কার্যপদ্ধতি গ্রহণ করা প্রয়োজন ছিল যার দ্বারা মুসলমানদের মন থেকে এই আশঙ্কা দূর করা যায়। সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের উদার দৃষ্টিভঙ্গি ও সংখ্যালঘুদের প্রতি তাদের আচরণের মধ্য দিয়েই মুসলমানদের মন থেকে সন্দেহের বীজ তুলে ফেলা সম্ভব ছিল। কিন্তু এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজটি উচ্চবর্ণ হিন্দু প্রধান জাতীয় তথা কংগ্রেস নেতৃত্বের দিক থেকে অবহেলিতই থেকেছে।

দ্বিতীয়ত আর্থিক ব্যবস্থা বা শাসননীতি প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনও বিশেষ ধর্মের প্রতি কোনও পক্ষপাতিত্ব করা হবে না, নেতৃত্বের পক্ষ থেকে এমন দৃঢ় আশ্বাসেরও প্রয়োজন ছিল। একটি যথার্থ গণতান্ত্রিক এবং ধর্মনিরপেক্ষতার অনুসারী রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষেই এটি নিশ্চিত করা সম্ভব ছিল। অথচ তৎকালীন জাতীয় কংগ্রেস গড়েই উঠেছিল আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে পড়া পুঁজিবাদের অংশ হিসাবে। স্বাভাবিক ভাবেই তা কোনও সংগ্রামী সংগঠন হিসাবে নয়, ব্রিটিশকে শাসক হিসাবে মেনে নিয়ে আবেদন-নিবেদনের মাধ্যমে কিছু দাবি আদায়ের প্ল্যাটফর্ম হিসাবেই গড়ে উঠেছিল। পরে ভারতীয় পুঁজি আরও শক্তিশালী হলে এ দেশে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশকে হঠিয়ে ভারতীয় পুঁজিপতি শ্রেণির নেতৃত্বে একটি পুঁজিবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা তার লক্ষ্য হয়ে ওঠে। রাশিয়ায় মহান লেনিনের নেতৃত্বে শ্রমিক-কৃষকের সরকার প্রতিষ্ঠার পর এ দেশেও শ্রমিক-কৃষক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে শোষণহীন সমাজপ্রতিষ্ঠা সম্পর্কে গভীর আকর্ষণ তৈরি হয়। কংগ্রেস নেতৃত্ব ভারতেও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী গণআন্দোলনের মারাত্মক ভয়ে ভীত ছিল। কারণ এই আন্দোলন সফল হলে আন্দোলনের নেতৃত্ব জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণির পরিবর্তে শ্রমিক শ্রেণির হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। ফলে কংগ্রেসের নেতৃত্বে স্বাধীনতার আন্দোলন ব্রিটিশের প্রতি আপসহীন হওয়ার পরিবর্তে কার্যত আপসমুখী তথা সংস্কারপন্থী বিরুদ্ধতাবাদী হয়ে পড়ে। ধর্মীয় চিন্তা, জাতপাত প্রভৃতির বিরুদ্ধে সমাজে গণতান্ত্রিক চিন্তার প্রসারের মধ্য দিয়ে সমাজের গণতন্ত্রীকরণের কাজটি কংগ্রেস এড়িয়ে যায়। এই অবস্থায় জাতীয় কংগ্রেস নেতৃত্বের পক্ষে যেমন যথার্থ গণতান্ত্রিক হওয়া সম্ভব ছিল না, তেমনই ধর্মনিরপেক্ষ হওয়াও সম্ভব ছিল না। ফলে ভারতীয় জনসাধারণ ধর্ম-বর্ণ-ভাষাগত কারণে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে পৃথক পৃথক সম্প্রদায় হিসাবেই থেকে গেল।

কংগ্রেসের ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ

কংগ্রেস নেতৃত্ব জনসাধারণকে ধর্মের বন্ধন থেকে মুক্ত করে সমাজের গণতন্ত্রীকরণের ব্যাপারে নিশ্চেষ্ট ছিল তাই নয়, তারা ধর্মকে জাতীয়তাবাদী ভাবাদর্শ প্রচারের মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করেন। কংগ্রেস নেতারা জাতীয়তার ভারতীয় ভিত্তিভূমির খোঁজ করতে গিয়ে হিন্দু ধর্ম এবং সামন্ততান্ত্রিক হিন্দু সংস্কৃতিরই আশ্রয় নেন। অথচ তাঁরা যদি পাশ্চাত্যের আধুনিক রাষ্ট্রগুলির দিকে তাকাতেন, যদি এই সব দেশগুলিতে জাতি গঠনের প্রক্রিয়াটিকে পর্যবেক্ষণ করতেন তবে তাঁদের এই ভুল হত না। রাজনীতির সঙ্গে ধর্মের এই গাঁটছড়া জাতীয় ঐক্যের পক্ষে মারাত্মক হয়ে উঠেছিল। ধর্মকে জাতীয়তা প্রচারের মাধ্যম করায় কংগ্রেসের নেতাদের একটি অংশের বক্তৃতায় ও রচনায় হিন্দু ধর্মীয় প্রভাব কাজ করতে থাকে। ভারতের মধ্যযুগের হিন্দু-মুসলমান সম্মিলিত সংস্কৃতির উপর কোনও গুরুত্ব না দিয়ে এঁরা প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির দিকে দেশের মানুষের মনকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করতে থাকেন। বাল গঙ্গাধর তিলক প্রবর্তিত গণপতি ও শিবাজি উৎসব, অরবিন্দ ঘোষের পৌরাণিক ধাঁচে ভারতকে মাতৃরূপে চিন্তা বা জাতীয়তাবাদ ও ধর্মের অভিন্নতার ধারণা, বিপ্লবীদের কালী মূর্তির সামনে অথবা গীতা ছুঁয়ে শপথ, গঙ্গা-স্নান করে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সূচনা– এই ধরনের ব্যাপারগুলি ইসলাম ধর্মসম্মত না হওয়ায় মুসলমান সম্প্রদায় সমর্থন করতে পারেনি। এগুলি দেখিয়ে ব্রিটিশ শাসকরা ও জাতীয়তাবাদ বিরোধী সাম্রাজ্যবাদের দালাল মুসলিম নেতাদের পক্ষে মুসলিম জনতাকে বিভ্রান্ত করা সম্ভব হয়েছে। এ কথা বোঝানো সহজ হয়েছে যে, কংগ্রেসের নেতৃত্বে ভারত ব্রিটিশ শাসন মুক্ত হলে হিন্দুদের স্বৈরাচারী শাসনই কায়েম হবে। সেখানে মুসলিমদের কোনও নিরাপত্তা থাকবে না। এই প্রচার মুসলমানদের মনে জাতীয়তাবাদের প্রতি সন্দেহ ও বিতৃষ্ণা তৈরি করে। বহুসংখ্যক শিক্ষিত মুসলমান ক্রমবর্ধমান জাতীয়তাবাদী আন্দোলন থেকে দূরে সরে যান, কেউ কেউ এই আন্দোলনের বিরুদ্ধাচরণও করেছিলেন। বস্তুত এঁরা সহজেই সাম্প্রদায়িকতাবাদের শিকারে পরিণত হয়েছিলেন। জাতীয়তাবাদী নেতারা দেশের মধ্যে ‘হিন্দু’ শিবাজি অথবা ‘হিন্দু’ রানা প্রতাপকে কেন্দ্র করে যে উৎসাহ ও উদ্দীপনা সঞ্চারের চেষ্টা চালিয়েছিলেন তাঁদের ঐতিহাসিক ভূমিকা ও শৌর্যের প্রতি ততটা গুরুত্ব দেননি। এই জাতীয়-বীরেরা আকবরের মতো ‘বিদেশির’ বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন, এটার উপরই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বস্তুত এই ধরনের চিন্তা শিবাজি, রানা প্রতাপ, আকবর বা ঔরঙ্গজেব– কারওরই যথার্থ ইতিহাসসম্মত মূল্যায়ন নয়।

অবশ্য কংগ্রেসের সব নেতারা মুসলিম-বিদ্বেষী অথবা পুরোপুরি সাম্প্রদায়িকতাবাদী ছিলেন– এমন নয়। তিলক সহ এই জাতীয় নেতৃবৃন্দের প্রায় প্রত্যেকেই হিন্দু-মুসলমান ঐক্য স্থাপনে সবিশেষ আগ্রহী ছিলেন। তাঁরা বলতেন যে, দেশকে ভারতমাতারূপে কল্পনা একটি আধুনিক ধারণা, এর সঙ্গে ধর্ম বা হিন্দুত্বের কোনও সম্পর্ক নেই। কিন্তু এ কথার কোনও মুল্য স্বাভাবিক ভাবেই মুসলিম নেতা বা জনসাধারণের কাছে ছিল না। কারণ উনিশ শতকের শেষের দিক থেকে উত্তর ভারত জুড়ে নানা হিন্দুত্ববাদী সংগঠন শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে। বিশ শতকের শুরুতে হিন্দু মহাসভা গড়ে ওঠার পর দেখা যায়, কংগ্রেসের অনেক বড় নেতাই হিন্দু মহাসভারও নেতা হিসাবে কাজ করছেন। চতুর ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ ও তাদের স্বপক্ষীয় ব্যক্তিরা জাতীয়তাবাদী কার্যকলাপের উপর হিন্দুধর্মীয় প্রভাবের এই দিকটির ফলাও প্রচার চালায়।

ব্রিটিশের পৃষ্ঠপোষকতায় মুসলিম লিগের জন্ম

এই পরিপ্রেক্ষিতেই ১৯০৬-এ ইংরেজদের সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতায় মুসলিম লিগের জন্ম হয়। একশ্রেণির শিক্ষিত মুসলমান এবং মুসলমান নবাব ও ভূস্বামীদের বিচ্ছিন্নতাবাদের মনোভাব ও ব্রিটিশের প্রতি আনুগত্যের চরম প্রকাশ হিসাবে দেখা গিয়েছে সর্বভারতীয় মুসলিম লিগ প্রতিষ্ঠা। লিগ প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ঢাকার নবাব খাজা সলিমুল্লা এবং নবাব মহসীন-উল-মুলক। মুসলিম লিগ বঙ্গবিভাগে সম্মতি দিয়েছিল এবং সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে মুসলমান প্রার্থীদের জন্য আসন সংরক্ষণ বা রক্ষা-কবচের দাবি তুলেছিল। পরে, বড়লাট লর্ড মেয়োর প্ররোচনায় লিগ পৃথক নির্বাচনের অধিকার তুলে মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচনের অধিকার পেয়েছিল। বড়লাট লিগকে এ বিষয়ে সাহায্যও করেছিলেন। মনে রাখা দরকার, মুসলমানদের জন্য এই জাতীয় স্বাতন্ত্রের দাবি প্রথম কোনও মুসলিম প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আসেনি। ১৮৮৮ সালে ভাইসরয় লর্ড ডাফরিনই প্রথম এই রকম একটি প্রস্তাব দেন। এর অনেক পরে ১৯০৯-এ ভাইসরয় লর্ড মিন্টোর কাছে মুসলমানদের পক্ষ থেকে এই দাবি তোলা হয়। ১৯০৯ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাস হওয়া ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অ্যাক্ট অনুসারে (যা মর্লি-মিন্টো শাসন সংস্কার নামে পরিচিত), কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইনসভাগুলোর সদস্য সংখ্যা বাড়ানো হয়। মুসলিমদের জন্য স্বতন্ত্র নির্বাচনী এলাকা চালু করা হয়, যেখানে শুধুমাত্র মুসলিম ভোটাররা তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারতেন। সাম্প্রদায়িক ভিত্তির এই পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্রেরই পরিণাম। স্বাভাবিক ভাবেই মর্লি-মিন্টোর এই উদ্যোগ হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলিকে সংহত হতেই সাহায্য করেছিল। যা জন্ম দিয়েছিল প্রথমে হিন্দু মহাসভার, পরে আরএসএসের। (চলবে)

তথ্যসূত্রঃ মধ্যযুগের ইতিহাস, বিপান চন্দ্র। দেশভাগ, পশ্চাৎ ও নেপথ্য কাহিনি, ভবানীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়