Breaking News

ভারতে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কঃ ফিরে দেখা

প্রথম কিস্তি (গণদাবী ৭৯ বর্ষ ৫ সংখ্যা ২৮ আগস্ট ২০২৬)

অজাতশত্রু রাজা হল যবে, “পিতার আসনে আসি/পিতার ধর্ম শোণিতের স্রোতে/মুছিয়া ফেলিল রাজপুরী হতে–/সঁপিল যজ্ঞ-অনল-আলোতে/বৌদ্ধশাস্ত্ররাশি।

পূজারিণী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

অতীত যুগের ইতিহাস মূলত তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী রাজা-সুলতান-নবাবদের শৌর্য, বিজয়ের কাহিনি। সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম, যা আসলে উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত, এই ইতিহাসে তা স্থান পায়নি। ভারতের ইতিহাসও এর ব্যতিক্রম নয়। ভারতে ব্রিটিশ শাসনের সময়ে এসেই শুরু হয় ধারাবাহিক ইতিহাস রচনার কাজ। কিন্তু ব্রিটিশ শাসকরা সত্য ইতিহাস রচনার পরিবর্তে তাদের শাসন পাকাপোক্ত এবং দীর্ঘস্থায়ী করা, ব্রিটিশ বিরোধী বিক্ষোভকে দুর্বল করার লক্ষ্যকে সামনে রেখেই তা শুরু করে। স্বাভাবিক ভাবেই সেই ইতিহাস হয়ে ওঠে বিকৃত ইতিহাস।

ভারতে ইতিহাস বিকৃতির সূচনা ব্রিটিশ শাসকদের হাতে

১৮১৭-তে ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ জেমস মিল পরিকল্পনা মতো এই বিকৃত ইতিহাসের সূচনা করেন। ভারতীয় ইতিহাসকে তিনি হিন্দু, মুসলিম ও ব্রিটিশ– এই তিনটি পর্বে ভাগ করেন। প্রথম দুটি ভাগ ধর্মের নামে হলেও তৃতীয় ভাগটি ধর্মের নামের পরিবর্তে শাসকদের নামে ‘ব্রিটিশ’ বলে উল্লেখ করা হয়। অথচ প্রথম দুটি হিন্দু এবং মুসলিম হলে তৃতীয় ভাগটিও ‘খ্রিস্টান’ হওয়া উচিত ছিল। এই ভাবে ভাগের মধ্যেই শাসকের হীন উদ্দেশ্যমূলক মনোভাব স্পষ্ট। এই ইতিহাস বিচারে সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণ বাদ দিয়ে ধর্মীয় পরিচয়কেই রাজনৈতিক ক্ষমতার একমাত্র উৎস হিসাবে দেখানো হয়। শাসকদের রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক লড়াইকে উপনিবেশিক ইতিহাসবিদরা ধর্মীয় সংঘাত হিসাবে উপস্থিত করেন। যা ব্রিটিশের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতিকে তত্ত্বগত ভাবে বৈধতা দেয়। অথচ হিন্দু ও মুসলিম রাজা-সুলতানরা কেউই মূলত ধর্মীয় বিদ্বেষ থেকে রাজ্য শাসন করেছেন বিষয়টা এমন নয়। যে কোনও রাষ্ট্রই যেমন শ্রেণি-শোষণের ও দমন-পীড়নের হাতিয়ার– রাজতন্ত্রও তেমনই ছিল। হিন্দু রাজারা যেমন সকল প্রজাদের উপর শোষণের যাঁতাকল চালিয়েছে, তেমনই মুসলিম শাসকরাও তাই করেছে এবং এর ভিত্তি ধর্ম ছিল না। এই অনৈতিহাসিক ইতিহাস বিচারপদ্ধতি মেনেই উপনিবেশিক আমলের দেশীয় বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশ, দেশীয় সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলি এবং ভারতীয় পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থরক্ষাকারী রাজনীতিবিদরা ভারতবাসীর সামগ্রিক ঐক্যবদ্ধ জাতীয় পরিচয়কে অস্বীকার করে পৃথক হিন্দু বা মুসলিম জাতীয়তাবাদের তত্ত্ব হাজির করে।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে শাসক কংগ্রেস ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ধর্মকে ভোটের স্বার্থেই কাজে লাগাতে থাকে। জরুরি অবস্থার পরের নির্বাচনে কংগ্রেস নেত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেন, এত দিন আমরা সংখ্যালঘুদের স্বার্থ দেখে এসেছি, এ বার সংখ্যাগুরুদের স্বার্থ দেখব। বুর্জোয়া দলগুলির রাজনীতিতে ‘ভোটব্যাঙ্ক’ রাজনীতি স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। এই ভোটব্যাঙ্ক রাজনীতির কারণেই সাধারণ মানুষের মধ্যে ধারণা তৈরি হয় যে, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে আসলে তোষণের রাজনীতি। বাস্তবে যথার্থ ধর্মনিরপেক্ষতা রাষ্ট্রকে যে কোনও ধর্মীয় কাজকর্ম থেকে দূরে রাখে। পরবর্তী সময়ে বিজেপি এবং আরএসএস এই বিকৃত ইতিহাসকে রাজনৈতিক মেরুকরণের কাজে পুরোপুরি ব্যবহার করতে থাকে। নির্দিষ্ট একটি ধর্মের শাসকদের এবং সম্প্রদায়কে সম্পূর্ণ খলনায়ক বানিয়ে সাধারণ মানুষের মনে স্থায়ী বিদ্বেষ তৈরি করতে থাকে। যার ফলে অনেক শিক্ষিত মানুষও, যাঁরা হয়তো ব্যক্তিগত ভাবে সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন নন, কিন্তু ইতিহাসের ততখানি খোঁজ রাখেন না, তাঁরাও ইতিহাসের বিকৃত প্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। ভাবতে থাকেন, আজ ভারতে হিন্দু-মুসলমান বিরোধ-বিভেদ যে বিকৃত রূপ নিয়েছে তা বোধহয় বরাবরই ছিল। সুস্থ স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন মানুষের মনে বার বার প্রশ্ন ধাক্কা দেয়– এই দীর্ঘ সময় ধরে উভয় ধর্মের মানুষ কি তা হলে পারস্পরিক বিদ্বেষ-বিভেদের মধ্যেই বাস করেছে? সাম্প্রদায়িকতার শেকড় কি সমাজের এমন গভীরে প্রোথিত যে দীর্ঘ পরিচর্যায় তা এখন সমাজের স্বাভাবিক বৈশিষ্টে্য পরিণত হয়েছে? এই বিরোধ কি স্বাভাবিক? এই বিরোধ থেকে বের হওয়ার কি কোনও উপায় নেই? এই প্রশ্নগুলির যথাযথ উত্তর পেতে হলে আমাদের আশ্রয় নিতে হবে ইতিহাসের বিজ্ঞানভিত্তিকবিচারে।

ধর্মান্তরণ সম্পর্কে বিবেকানন্দের বক্তব্য

দীর্ঘ সামন্তী ব্যবস্থা জুড়ে রাজার পরিবর্তনের সঙ্গে রাজধর্ম বদলেছে। পুরনো ধর্মকে মুছে ফেলা হয়েছে। তার প্রভাবে প্রজাদের ধর্মেরও পরিবর্তন ঘটেছে। এক কথায়, রাজার ধর্মই হয়েছে প্রজার ধর্ম। তা কখনও তরবারি বা রাজশাসনের জোরে, কখনও ভালবাসায়। মৌর্য সম্রাট অশোকের পৃষ্ঠপোষকতায় বর্তমান ভারতের অধিকাংশ অংশে, এমনকি ভারতের বাইরেও একটি বিরাট অংশে বৌদ্ধ ধর্ম ছড়িয়ে পড়েছিল। মনে রাখতে হবে, তখন এখনকার মতো ভারতের নির্দিষ্ট কোনও ভৌগলিক সীমারেখা ছিল না। পরবর্তী কালে গুপ্ত যুগে এসে হিন্দু ধর্ম তথা ব্রাহ্মণ্যধর্ম রাষ্ট্রীয় প্রধান ধর্মে পরিণত হয়। খ্রিস্টপূর্বের অজাতশত্রু শাসনে কিংবা বহু পরে বাংলায় শশাঙ্কের শাসনে দেখা যায় বৌদ্ধ ধর্মের বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাব এবং শৈব তথা হিন্দুধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা। এই ভাবেই চলেছে।

ভারতে মুসলমান অভিযানের পরও সেই একই জিনিস ঘটে। রাজধর্ম হিসাবে ইসলাম ধর্মের প্রসার শুরু হয়। যদিও পাঠান ও মুঘল শাসকরা ভারতে গোটা মধ্যযুগ ধরে কয়েক শতকের স্থায়ী সাম্রাজ্যের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও ইসলাম ধর্মের বিরাট প্রসার ঘটেনি। সাধারণ মানুষের ধর্ম পরিবর্তন যদি এই শাসকদের উদ্দেশ্য হত, তবে এই দীর্ঘ সময়ে মুসলমানরা হয়ে দাঁড়াত সংখ্যাগুরু। তা হয়নি। ধর্মপরিবর্তন যতটা ঘটেছে তা-ও তরবারির জোরে সম্ভব হয়েছে বলে এমনকি বিবেকানন্দও মনে করতেন না। তিনি মনে করতেন, বর্ণাশ্রম প্রথার জের হিসাবে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের দ্বারা নিম্নবর্ণের মানুষের ওপর চলা সামাজিক অত্যাচার ও অস্পৃশ্যতা একটা অংশের হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষের এবং আগ্রাসী হিন্দুত্বের উৎপীড়ন বৌদ্ধদের একাংশের ইসলাম ধর্ম গ্রহণের কারণ। বাস্তবে এটাই ইতিহাস।

রামের জন্মস্থানে মন্দির ভেঙে মসজিদ তৈরির যে অভিযোগ বাবর সম্পর্কে হিন্দুত্ববাদীরা তোলেন তার কোনও ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যে সময় রামমন্দির ভাঙা হয়েছে বলা হচ্ছে, অর্থাৎ আল হিজরি ৯৩৫, সেই সময় বাবর তার ছেলে হুমায়ুনকে একটি চিঠিতে লিখেছেন– ‘হিন্দুস্তানের জনগণের মন জয় করার জন্য গোহত্যা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করো। অন্যান্য ধর্মের মন্দির বা ভজনালয়গুলো অপবিত্র কোরো না। শিয়া-সুন্নি ভেদাভেদ কোরো না, ওটি ইসলামের দুর্বলতা। তরবারির জোরে নয় দয়ার দ্বারা ইসলামের প্রচার করো।’ (দ্য সেকুলার এম্পারার বাবর, সুরিন্দার কাউর ও তপন সান্যাল, পৃ. ৬৫-৬৬)। বাবরনামা থেকে স্পষ্ট হয়, পরবর্তী মুঘল সম্রাট আকবরের বিখ্যাত উদারনীতির মূল নৈতিক বনিয়াদটা বাবরেরই অবদান।

হিন্দুত্ববাদীরা মুঘল সম্রাট আকবরের বিরুদ্ধে মেবারের রানা প্রতাপের লড়াইকে স্বাধীনতার লড়াই বলে দেখান। অথচ স্বাধীনতা বলতে আজ আমরা যা বুঝি, স্বাধীনতার সেই ধারণা সে সময়ে ছিল না। ওই স্বাধীনতা ছিল রাজার, প্রজাদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল না। তাই তাঁরা এটা বলেন না যে, প্রতাপের সেনাদলে ও সেনাপতিদের মধ্যে কতজন মুসলিম ছিলেন। তাঁর প্রধান সেনাপতিদের অন্যতম ছিলেন শের শাহ সুরির বংশধর আফগান সর্দার হাকিম খান সুরি। তাঁর অধীনে ৮০০ জনের এক আফগান বাহিনী মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। আবার আকবরের প্রধান সেনাপতিই ছিলেন হিন্দু মান সিংহ। যশোবন্ত সিংহ ছিলেন আওরঙ্গজেবের অন্যতম প্রধান সেনাপতি। আর মোগল সম্রাটদের শক্তি কারা ছিলেন? রাজপুতরা নয় কি? অম্বর, যোধপুর, এমনকি করণ সিংহ-জগৎ সিংহদের সময়ে মেবার কি মোগল মনসবদারি ছিল না? বাবর দিল্লি জয় করেছিলেন কোনও হিন্দুকে হারিয়ে নয়, ইব্রাহিম লোদিকে হারিয়ে। তাঁকে এ দেশে আহ্বান করে এনেছিলেন আর এক হিন্দু– রানা সঙ্গ। একে কি মুসলমান রাজার বিরুদ্ধে হিন্দু রাজার লড়াই বলা যায়? বাস্তবে এর চরিত্র ছিল সামন্ততান্ত্রিক বা রাজতান্ত্রিক। ধর্ম নয়, রাজ্যবিস্তার এবং রাজ্য রক্ষার লড়াই-ই ছিল মূল কথা। ইতিহাসের এ সব তথ্য হিন্দুত্ববাদীরা দেশের মানুষের সামনে সচেতন ভাবে উত্থাপন করেন না।

উৎপীড়নের চরিত্র ছিল রাজতান্ত্রিক

মধ্যযুগে, মুঘল আমলে অত্যাচার কি হয়নি? হয়েছে। তবে সে উৎপীড়নের চরিত্র রাজতান্ত্রিক– ধর্মীয় নয়। রাজা, নবাব, সুলতান– কে অত্যাচার করেনি? অত্যাচার কি কেবল মুসলমান নবাবরাই করেছে? হিন্দু রাজারা করেনি? বৌদ্ধদের ওপর হিন্দু রাজারা কি ব্যাপক অত্যাচার চালায়নি? গৌড়ের রাজা শশাঙ্ক প্রচণ্ড অত্যাচারী বলেই পরিচিত ছিলেন। যে শিবাজিকে হিন্দুত্ববাদীরা আদর্শ হিন্দু রাজা বলে প্রচার করেন সেই শিবাজির সুরাট অভিযানের বীভৎস অত্যাচার ইতিহাসের পাতাতেই রয়েছে। মারাঠা বর্গীদের বঙ্গ বিজয়ের পথে কয়েক লক্ষ মানুষের হত্যা, নির্বিচার লুঠতরাজের কাহিনি তো আজও প্রবাদ হয়ে আছে (‘ছেলে ঘুমোল পাড়া জুড়োল, বর্গি এল দেশে’)। তারাও ছিল হিন্দু, তার নেতা ভাস্কর পণ্ডিত।

ইতিহাসবিদদের অনেকের ইতিহাস-দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে হিন্দুত্ববাদী ঝোঁক মিশে থাকায় ইতিহাসের উপস্থাপনাটাও হয়ে পড়েছে একপেশে। পলাশির যুদ্ধে সিরাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন মিরজাফর, উমিচাঁদ, রাজবল্লভ, জগৎশেঠ প্রভৃতি অভিজাতরা। অথচ কেবল মিরজাফরই বেইমানির প্রতীক হিসেবে পরিচিত হয়ে গেলেন। তুর্ক, আফগান বা মুঘলদের ভারত বিজয়কে যারা মুসলমানদের জয় বলছেন তাঁরা কি ব্রিটিশের ভারত বিজয়, কিংবা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পরদেশ দখলকে খ্রিস্টানদের বিজয় বলবেন? নাকি তা সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিকতা?

সাম্প্রদায়িকতা পুঁজিবাদের প্রতিক্রিয়াশীল স্তরের বৈশিষ্ট্য

বাস্তব হল, দীর্ঘ মুসলমান শাসনের ইতিহাসকে যদি আমরা সেই সময়ের সাপেক্ষে এবং তার রাজতান্ত্রিক চরিত্রের পরিপ্রেক্ষিতে বিচার না করি তবে বিচারে ভুল হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। মনে রাখতে হবে ধর্মীয় বিদ্বেষ তথা সাম্প্রদায়িকতা চরিত্রে পুঁজিবাদী তথা ধনতান্ত্রিক। পুঁজিবাদ বিকাশের সর্বোচ্চ স্তর অতিক্রম করে তার প্রগতিশীল চরিত্র হারিয়ে মুমূর্ষু তথা প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে পড়ার পরই সাম্প্রদায়িকতা নামক সামাজিক ব্যাধির জন্ম। তাই গজনির সুলতান মাহমুদকে লুঠেরা বলাটাই সঙ্গত। হিন্দু মন্দির লুঠ করেছিলেন বলে তাঁকে হিন্দু বিদ্বেষী বা সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন বলে দেগে দেওয়া হবে অনৈতিহাসিক। সুলতান মাহমুদের ভারত অভিযানের পেছনে ধর্মীয় মনোভাবের আলাদা কোনও উদ্দেশ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি। বিজিত অঞ্চলগুলিতে ধর্মপ্রচারেরও কোনও প্রমাণ ইতিহাসে পাওয়া যায় না। বর্তমান ভারতের বড় বড় মন্দিরগুলির সম্পদের বিশালতা দেখলেই বোঝা যায় সে দিনও সোমনাথ সহ বড় বড় মন্দিরগুলি কী বিপুল সম্পদের অধিকারী ছিল! সেই সম্পদের লোভেই বিদেশি শাসকরা বারবার মন্দির আক্রমণ করেছে, কোনও রকম ধর্মীয় বিদ্বেষ থেকে নয়। সুলতান মাহমুদ শুধু হিন্দু রাজাদের বিরুদ্ধেই অভিযান চালাননি, মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধেও অভিযান চালিয়েছেন। মুক্তির বিনিময়ে তাঁদের কাছ থেকে অর্থ লাভ করেছেন। যেমন পরাজিত হিন্দু রাজাদের কারও কারও কাছ থেকেও অর্থ লাভ করেছেন। নেহেরু তাঁর ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়াতে লিখেছেন, সুলতান মাহমুদ যা করেছেন, তিনি মুসলমান না হয়ে অন্য কোনও ধর্মাবলম্বী হলেও তাই করতেন। সুলতান মাহমুদ তাঁর রাজত্ব এবং সেনাবাহিনীর খরচের উৎস হিসাবেই বার বার ভারত অভিযান চালিয়েছেন– যে সেনাবাহিনীকে তিনি এমনকি মধ্য এশিয়ায় তার সহধর্মী মুসলমানদের বিরুদ্ধেও মোতায়েন করেছিলেন। এগুলি যুক্ত সেই সময়ের শাসনতন্ত্রের সঙ্গে, ধর্মের সঙ্গে নয়।

মথুরা, বৃন্দাবন প্রভৃতি ধর্মীয় স্থান এবং সোমনাথ মন্দিরে অভিযান, মন্দির ভাঙচুর, বিগ্রহের ক্ষতিসাধনের যে অভিযোগ কিছু ভারতীয় ও ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ এবং রাজনীতিক করেছেন, তাতে মুসলিম বিদ্বেষ যতটা দেখানো হয়, বাস্তব অবস্থা ও সত্যতা ততটা নয়। মন্দির যখন যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়, অর্থভাণ্ডার হিসেবে আকর্ষণীয় হয়, তখন ভাঙচুর ও বিগ্রহের ক্ষতিসাধন অসম্ভব নয়। বিগ্রহের পেটে সোনাদানা, অলঙ্কার লুকিয়ে রাখা তখন প্রচলিত রীতি ছিল। যার ফলে বিগ্রহের ভাঙচুর ও ক্ষতিসাধন হওয়া স্বাভাবিক।

কলহনের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘রাজতরঙ্গিনী’তে দেখা যায়, কাশ্মীরের হিন্দু রাজা হর্ষদেব মন্দিরের সম্পদ লুট করার জন্য ‘দেবোৎপাটন-নায়ক’ নামের একটি বিশেষ দফতর বা পদ তৈরি করেছিলেন। কলহনের বর্ণনা অনুযায়ী রাজ্যের প্রায় প্রতিটি শহরের মন্দিরই তার সেনাপতির মাধ্যমে লুণ্ঠিত বা ক্ষতিগ্রস্ত ছিল।

হিন্দু সাম্প্রদায়িকতাবাদীরা যেমন মধ্যযুগকে ভারতের হিন্দুদের উপর মুসলমানদের জাতিগত বা সম্প্রদায়গত শাসন বলে, তেমনই মুসলিম সাম্প্রদায়িকতাবাদীরাও একে মুসলমানী শাসন বলে গর্ব অনুভব করে। ভারতে হিন্দু সাম্প্রদায়িক রচনা দেখায়, সুলতান-বাদশাদের শাসন মানে হিন্দুর ওপর মুসলমানের জাতিগত বা সম্প্রদায়গত শাসন। বাস্তবটা কি তাই? বাস্তব হল, সম্রাট অশোক, দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বা সুলতান আলাউদ্দিন কিংবা বাদশাহ আওরঙ্গজেব, সকলেই ছিলেন শোষক শ্রেণির প্রতিনিধি। সম্রাট অশোক কি সব বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী প্রজাদের কর মকুব করেছিলেন? কিংবা চন্দ্রগুপ্ত হিন্দু প্রজাদের? নাকি আওরঙ্গজের মুসলিমদের কর মকুব করেছিলেন? আর যে জিজিয়া কর সম্পর্কে হিন্দুত্ববাদীরা আওরঙ্গজেবকে কাঠগড়ায় তোলে সেই জিজিয়া কর কী ছিল? দিল্লির সুলতানি আমলে প্রথম এই কর চালু করা হয়। মুঘল সম্রাট আকবর ১৫৬৪ সালে এই কর তুলে নেন। ১৬৭৯ সালে সম্রাট আওরঙজেব আবার তা চালু করেন। এটা ছিল অমুসলিমদের ওপর ধার্য করা একটি বার্ষিক বিশেষ কর। এর বিনিময়ে রাষ্ট্র অমুসলিমদের জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা, ধর্মপালনের স্বাধীনতা এবং সামরিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিত। এই কর যারা দিত তাদের সুরক্ষিত নাগরিক বলা হত। নারী, শিশু, বৃদ্ধ, অসুস্থ, প্রতিবন্ধী, দরিদ্র এবং সন্ন্যাসীরা এই করের আওতার বাইরে থাকত। এ কথা সত্য যে, তিনি জীবনযাপনে ইসলামের গোঁড়া অনুসারী ছিলেন। শাসক হিসাবে হিন্দু রাজা এবং প্রজাদের ওপর অত্যাচারও হয়তো তিনি করেছেন। কিন্তু আলাদা করে তাঁর হিন্দু বিদ্বেষের কোনও প্রমাণ পাওয়া যায় কি? জিজিয়া চাপানোর উদ্দেশ্য যদি হিন্দু বিদ্বেষ হত তবে ক্ষমতা আরোহণের প্রায় ২০ বছর পর তিনি এই কর চাপালেন কেন? বাস্তবে একটানা যুদ্ধ এবং বিশাল সাম্রাজ্যের ব্যয় মেটানোর জন্য রাজকোষে নতুন আয়ের উৎসের প্রয়োজন থেকেই কার্যত এই কর চাপানো হয়। আবার তাঁর শাসনে মুসলিমদের ‘জাকাত’ বলে একটা কর দিতে হত, অ-মুসলিমদের ওপর চাপানো হত না, সে কথা হিন্দু সাম্প্রদায়িকতাবাদীরা বলেন না।

হিন্দুত্ব একটি মিশ্র সংস্কৃতি

রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘ভারততীর্থ’ কবিতায় বলেছেন– ‘হেথায় আর্য, হেথা অনার্য, হেথায় দ্রাবিড় চীন–/শক-হুন দল পাঠান মোগল এক দেহে হল লীন। …’ যে বিশুদ্ধ হিন্দুত্বের কথা বিজেপি কিংবা সংঘ পরিবারের হিন্দুত্ববাদী নেতারা প্রচার করেন, বাস্তবে তা কোথাও নেই, কোথাও ছিল না। শত শত বছর ধরে অসংখ্য জাতি ভারতীয় জীবনধারার সঙ্গে এসে মিলেছে, মিশেছে। সাম্রাজ্য বিস্তারের উদ্দেশ্যে হোক বা অন্য কোনও কারণে তারা এ দেশে এসে বাস করেছে, এ দেশেরই মানুষ হয়ে গিয়েছে।

খ্রিস্টাব্দের সূচনার সময়কাল থেকে কণিষ্ক সহ কুষাণ সম্রাটরা উত্তর ভারত জুড়ে রাজত্ব স্থাপন করেন এবং দীর্ঘ সময় শাসন করেন। মূলত চীনের একটি শক্তিশালী যাযাবর ইউয়েইচি সম্প্রদায়ের একটি শাখা হিসাবে ভারতে প্রবেশ করলেও তাঁরা আর ফিরে যাননি। কুষাণ সাম্রাজ্য আফগানিস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তানের কিছু অংশ, কাশ্মীর এবং উত্তর ভারতে বিস্তৃত ছিল। কুষাণরা বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করে ধীরে ধীরে ভারতীয় সমাজের সঙ্গে মিশে যায়। আজ আর ভারতীয় সমাজে কুষাণদের আলাদা করে চেনবার কোনও উপায় নেই। ঠিক একই রকম ভাবে গ্রিক, শক ও পার্থিয়ানরাও ভারতীয় জীবনের সঙ্গে মিশে গিয়েছে। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন জাতি-উপজাতির মানুষের ও তাদের সংস্কৃতির স্বাভাবিক মিশ্রণের মধ্য দিয়ে ভারতীয় সংস্কৃতি সমৃদ্ধ হয়েছে।

একই রকম সামাজিক মিশ্রণ এ দেশে গত প্রায় এক হাজার বছর ধরে হিন্দু-মুসলমান দুই ধর্মের মানুষের মধ্যে দেখা গেছে। দুই ধর্মের মানুষের সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের মধ্যে দিয়েও ভারতীয় সংস্কৃতি সমৃদ্ধ হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘মুসলমানেরা পুরুষানুক্রমে জন্মিয়া ও মরিয়া এ দেশের মাটিকে আপন করিয়া লইল। মুসলমান রাজত্ব ভারতবর্ষেই প্রতিষ্ঠিত ছিল, বাইরে তার মূল ছিল না। তাই মুসলমান ও হিন্দু সম্প্রদায় পরস্পর জড়িত হইয়াছিল এবং পরস্পরের আদানপ্রদানের সহস্র পথ ছিল’ (সমাজ)।

দ্বিতীয় কিস্তি (গণদাবী ৭৯ বর্ষ ৬ সংখ্যা ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬)

‘হিন্দু’ একটি বিদেশি শব্দ!

ব্রিটিশ ইতিহাসবিদরা ভারতের ইতিহাসকে ধর্মের ভিত্তিতে হিন্দু, মুসলিম ও ব্রিটিশ পর্বে যে ভাবে ভাগ করেন, সেই বিভাজনটা ছিল কৃত্রিম, ঔপনিবেশিক লক্ষ্য পূরণের স্বার্থে ভারতীয়দের উপর চাপিয়ে দেওয়া।

ইতিহাসের এই কৃত্রিম বিভাজনের মধ্যে দিয়েই ধর্ম নির্বিশেষে ভারতীয়রা এক জাতি– এই সত্যের পরিবর্তে হিন্দু এবং মুসলমান আলাদা আলাদা জাতি– এই অনৈতিহাসিক ধারণার উদ্ভব। সত্যিই কি এই সময়কালকে হিন্দু এবং মুসলিম– এমন ধর্মভিত্তিক যুগ হিসাবে আখ্যায়িত করা যায়?

খ্রিস্টপূর্ব ১০০ সাল থেকে ১২০০ খিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কে সাধারণত হিন্দুযুগ বলা হয়। যদি রাজত্বের অর্থেও ধরা হয় তবে এর মধ্যে একটা দীর্ঘ সময় কি মৌর্য, ইন্দো-গ্রিসীয়, শক, কুষাণ রাজারা রাজত্ব করেননি? তাঁরা তো হিন্দু ছিলেন না! অনেক রাজাই ছিলেন বৌদ্ধ। এই যুক্তিতে খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময় তো বৌদ্ধযুগ! অথচ এই ইতিহাসবিদরা বৌদ্ধযুগের অস্তিত্ব স্বীকার করেন না।

ব্রিটিশ কিংবা তাঁদের অনুসারী এ দেশীয় ইতিহাসবিদরা এই সময়টিকে ‘হিন্দুযুগ’ বললেও এ দেশের সেই সময়কার মানুষরা কি নিজেদের হিন্দু বলে পরিচয় দিতেন? এ দেশে মুসলমান রাজত্বের আগেকার ভারত সম্পর্কে ইতিহাসের যে উপাদান পাওয়া যায়, সেখানে কোথাও হিন্দু কথাটি পাওয়া যায় না। এমনকি হিন্দু ধর্মশাস্ত্র বলে পরিচিত রামায়ণ, মহাভারত বা গীতাতেও কোথাও ‘হিন্দু’ শব্দটির উল্লেখ নেই। ইতিহাস বলছে, খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের পারস্য সম্রাট প্রথম দরায়ুসের লিখনে সিন্ধু উপত্যকাকে ‘হিন্দু’ বা ‘হিন্দুস’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। এই পারসিক শব্দ অনুকরণে গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাস ‘হিন্দিকে’ এবং পরবর্তী গ্রিক লেখকরা ‘ইন্ডিকা’ বা ‘ইন্ডিয়া’-র মতো শব্দ ব্যবহার করেছেন। সিন্ধু থেকে আসা ‘হিন্দুস’ বা ‘ইন্দোস’ শব্দের সঙ্গে ভূখণ্ডবাচক পারসিক প্রত্যয় তান (যেমন উজবেকিস্তান, আফগানিস্তান) যুক্ত করে হয়েছে হিন্দুস্তান এবং গ্রিক রোমান জগতের প্রত্যয় ইয়া (যেমন সিরিয়া, সার্বিয়া) যোগ করে তৈরি হয়েছে ইন্ডিয়া। অর্থাৎ হিন্দু শব্দটি গোড়ায় হিন্দুরা নিজেরা ব্যবহার করেনি। বাস্তবে এটি একটি বিদেশি শব্দ, যা পরে হিন্দুরা গ্রহণ করেছে। প্রাচীন ভারতের ঐতিহাসিক উপাদানগুলি থেকে স্পষ্ট হয়, মুসলমান যুগের আগেকার ভারত বলে পরিচিত ভূখণ্ডে বসবাসকারী বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায় ও গোষ্ঠীগুলি নিজেদের হিন্দু বা কোনও ঐক্যবদ্ধ ধর্মসম্প্রদায় বলে মনে করতেন না। বৌদ্ধদের ধর্মীয় সংগঠনের রূপ হিন্দু ধর্মীয় সংগঠনের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ফলে বৌদ্ধ রাজাদের রাজত্বের সময়কে কোনও ভাবেই হিন্দু যুগ বলে অভিহিত করা যায় না।

ভারতে মুসলিম যুগের ইতিহাসের কথা বলতে গেলে এখন আরব, তুর্কি এবং পারসিক সকলকেই এক সঙ্গে ‘মুসলমান’ বলা হয়। অথচ সমসাময়িক যে সব গ্রন্থ থেকে সেই যুগের বর্ণনা পাওয়া যায় সেগুলিতে ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত মুসলমান শব্দের ব্যবহার বিরল। এই সব গ্রন্থে ধর্মীয় পরিভাষার পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। তুরস্কের লোকেদের তুর্কী, আরবদের যবন বলা হত। অবশ্য পশ্চিম এশিয়া বা ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসা গ্রিক, রোমান-আরব নির্বিশেষে সকলকেই যবন বলার রীতি ছিল।

ব্রিটিশ এবং তার অনুগামী সব ইতিহাসবিদরা মুসলিম শাসকদের সময়টিকে হিন্দুদের উপর মুসলিমদের অত্যাচারের এবং জোর করে ধর্মান্তরিত করার যুগ হিসাবে চিত্রিত করেন। অর্থাৎ দুই ধর্মের মানুষকে পরস্পরের শত্রু হিসাবেই তুলে ধরেন। এর মধ্যে ঐতিহাসিক সত্যতা কতখানি?

তুর্কি শাসন থেকে শুরু করে অন্য মুসলিম শাসকদের ভারত অভিযানের প্রথম স্তরে সংঘর্ষ, হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ, অত্যাচার– এগুলো সেই সময়কার রাজ্যজয়ের অনুষঙ্গ হিসাবেই দেখা দিয়েছিল। ক্ষমতা দখল সম্পূর্ণ হওয়ার পর প্রাথমিক এই বিশৃঙ্খলা যেমন স্বাভাবিক ভাবেই ধীরে ধীরে কমে আসে, তেমনই শান্তি এবং শৃঙ্খলার ব্যবস্থা করাটা শাসকদের স্থায়ী শাসন গড়ে তোলার জন্যও দরকার ছিল। দ্বিতীয়ত রাজ্য দখল সম্পূর্ণ হলে স্থানীয় ক্ষমতাশালী শাসকদের পরাজিত করার পর সেই শাসকদের নিচের স্তরে যাঁরা থাকতেন, মূলত জমিদার শ্রেণির লোকেদের সাথে সুলতানরা একটা রফা করতেন। কারণ তখনই বিকল্প নতুন শাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা তাঁদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। জমিদাররা সুলতানকে একটা কর দিয়ে তাঁদের জমি, পদমর্যাদা, সুযোগ-সুবিধা সবই রাখতে পারতেন। এই ভাবে শাসনব্যবস্থার নিচের স্তরে স্থানীয় হিন্দুদেরই শাসন থেকে যায় এবং পারস্পরিক বিদ্বেষ এবং অবিশ্বাসও হ্রাস পেতে থাকে। এই অংশের শাসকদের সঙ্গে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কারণে সুলতান-নবাবদের কখনও বিরোধ দেখা দিলে তাকে প্রায়ই ধর্মীয় রূপ দিয়ে দেখানো হত। মনে রাখতে হবে, যুদ্ধে রাজ্য জয়, তা হিন্দু শাসক বনাম মুসলিম শাসক হোক কিংবা মুসলিম শাসক বনাম মুসলিম শাসক বা হিন্দু শাসক বনাম হিন্দু শাসক, সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় সব যুদ্ধের ক্ষেত্রেই হত্যা, বর্বরতা, নিষ্ঠুরতা, লুঠপাট প্রভৃতি বিষয়গুলি একই থাকে। বাবর দিল্লির সুলতান ইব্রাহিম লোদিকে যুদ্ধে পরাজিত ও হত্যা করেন। শের শাহের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে হুমায়ুন ভারত ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। গৌড়ের রাজা শশাঙ্ক থানেশ্বরের রাজা প্রভাকর বর্ধনের পুত্র রাজ্যবর্ধনকে পরাজিত ও হত্যা করেন। প্রতিটি যুদ্ধেই নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের নিদর্শন রয়েছে। সম্রাট অশোকের কলিঙ্গ যুদ্ধে যে রক্তের নদী বয়ে গিয়েছিল তা বহুল প্রচলিত। এ সত্তে্বও যাঁরা মুসলিম শাসকের বিজয়ে শুধু বর্বরতা দেখেন এবং হিন্দু শাসকের বিজয়ে শৌর্যবীর্য ছাড়া আর কিছু দেখতে পান না, তাঁদের বিচার ইতিহাসম্মত নয়।

সারা দেশেই, বিশেষ করে বাংলায় মুসলিমরা ছিল সংখ্যালঘু, হিন্দুরা সংখ্যাগুরু। তাই কেবল তরবারি তথা ক্ষমতার জোরে হিন্দুদের ধর্মান্তরণ সহজ ছিল না। যদিও শাসন ক্ষমতার জোরে ধর্মান্তরণের ঘটনা কম ছিল না। তবে সমাজের বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তিরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেও প্রধানত নিম্নশ্রেণির মানুষদের ধর্মান্তরণই বেশি ঘটেছে। নিম্নবর্গের মানুষের ব্যাপক হারে ইসলাম ধর্ম গ্রহণই এই ধর্মের প্রসারের অন্যতম কারণ বলা যায়।

মনে রাখতে হবে, এর আগে যারা ভারত আক্রমণ করেছে, শক, হুন, কুষাণ প্রভৃতি বিদেশিরা, তারা সভ্যতার দিক থেকে ভারতীয়দের তুলনায় অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে পড়া ছিল। সেই জন্যই হিন্দু সভ্যতার সঙ্গে তারা সহজেই মিশে গিয়েছিল। মুসলিম ধর্মের ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। কারণ ইসলাম ছিল এক নবীন ধর্ম, যা শ্রেণিগত, জাতিগত, বংশ ও বর্ণভিত্তিক স্বাতন্ত্র্য বাতিল করে এমন এক ধর্মীয় সম্প্রদায় স্থাপন করে যেখানে সকল অনুগামীর মধ্যে সমতা বিরাজ করে।

অন্য দিকে হিন্দু সমাজে ছিল বর্ণাশ্রম। ব্রাহ্মণ তথা উচ্চবর্ণের আধিপত্য ও অস্পৃশ্যতার রীতি নিম্নবর্ণের মানুষের উপর চেপে বসেছিল। তা ছাড়া, ভারতের অন্যান্য প্রান্তের মতো পূর্ব ভারতে ব্রাহ্মণ্যধর্ম কোনও সময়ই দৃঢ় রূপ নিতে পারেনি। পালযুগের উদারবাদী শাসনের পর সেন আমলে ব্রাহ্মণ্যধর্মের পুনরুত্থানের ফলে বৌদ্ধরা নিগ্রহের শিকার হয়েছিল। তাই সামাজিক উৎপীড়ন এড়াতে নিম্নশ্রেণির লোকেরা ইসলামকে স্বাগত জানান। সমাজে অবজ্ঞাত ও অবহেলিত মানুষের কাছে ইসলাম তার সমতার বাণী নিয়ে সামাজিক বাধানিষেধ ও নিগ্রহ থেকে মুক্তির উপায় হিসাবে উপস্থিত হয়। বিবেকানন্দ ভারতে মুসলিম শাসনের প্রভাব সম্পর্কে মাদ্রাজে ‘ভারতের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘‘এমনকি মুসলিম শাসনের কাছেও আমরা সেই মহান আশীর্বাদের জন্য ঋণী, যা হল বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণির একচেটিয়া ক্ষমতার অবসান। … ভারতের মুসলিম বিজয় দলিত ও দরিদ্রদের কাছে একটি পরিত্রাণ হিসেবে এসেছিল। আর এই কারণেই আমাদের জনগণের পাঁচ ভাগের এক ভাগ মুসলিম হয়েছে। শুধু তলোয়ারের জোরেই এটি হয়নি। এটি সম্পূর্ণ ভাবে তলোয়ার এবং অগ্নিসংযোগের কাজ ছিল বলে মনে করাটা হবে চরম উন্মাদনা।’

শাসকরা যে কখনও ব্যাপক ভাবে সব হিন্দুদের মুসলমান ধর্মে দীক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, বা প্রচণ্ড উৎসাহে ইসলামি আদর্শ প্রচার করেছিলেন, এ রকম প্রমাণ নেই। শুধুমাত্র সেই সব ব্যক্তিদেরই ধর্মান্তরের কথা উঠত যাঁরা হয় বিদ্রোহ করেছেন অথবা রাষ্টে্রর বিরোধিতা বা অনুরূপ কাজ করেছেন। তাই দেখা যায়, তুর্কি সুলতান বা মোগল রাজসভায় বা সেনাবাহিনীতে উচ্চপদে বহু হিন্দু কর্মরত ছিলেন। মুসলিম শাসকরা যদি ধর্মীয় বিদ্বেষ নিয়ে চলতেন তবে শাসন প্রক্রিয়ার মধ্যে হিন্দুদের এ ভাবে নিয়োগ করতেন না। মোগল শাসনে বহু হিন্দু উচ্চপদে আসীন ছিলেন। বাংলায়ও সুলতান হুসেন শাহের শাসনের সময়ে তাঁর প্রশাসনের দুই স্তম্ভ ছিলেন ব্রাহ্মণ মহাপণ্ডিত ও মহাকবি সনাতন এবং তাঁর ভাই রূপ, যাঁরা পরে শ্রীচৈতন্যের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। সিরাজউদ্দৌল্লার দরবারে রায়দুর্লভ, জগৎশেঠ, উমিচাঁদরাও উচ্চপদে ছিলেন। একই রকম ভাবে মোগলদের সঙ্গে প্রতাপসিংহের যুদ্ধে প্রতাপের পক্ষে হিন্দুর তুলনায় মুসলমান যোদ্ধা কম ছিলেন না। মোগলদের পক্ষেও মুসলমানের চেয়ে হিন্দু অল্প ছিলেন না।

পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ শাসনের প্রথম একশো বছরেও সমাজ জুড়ে হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ বা ধর্মকে কেন্দ্র করে দাঙ্গা প্রায় ছিল না। বরং ব্রিটিশের বিরুদ্ধে ১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহের শক্তির প্রধান উৎস হয়ে উঠেছিল হিন্দু-মুসলমান ঐক্য। যেমন সিপাহিদের মধ্যে তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যেও হিন্দু-মুসলমান কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংগ্রামে নেমেছিল।

অন্য দিকে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দও পরস্পরের সহযোগী হয়েছিলেন। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বিদ্রোহীরা বাহাদুর শাহ-কে, যিনি মুসলমান ছিলেন, সবার সম্রাট বলে মেনে নিতে দ্বিধা করেননি। হিন্দু ও মুসলিমরা পরস্পর বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব নিয়ে চললে এটা হত কি? বিদ্রোহের বিভিন্ন স্তরে নেতা-নির্বাচনের কালে লক্ষ রাখা হত যাতে উভয় সম্প্রদায়েরই যোগ্য ব্যক্তিদের স্থান হয়। বিদ্রোহের সময়ে হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের ঘটনা যে বাস্তব ছিল সেটা ইংরেজদেরও বুঝতে অসুবিধা হয়নি। পরে এক উচ্চপদস্থ ইংরেজ রাজকর্মচারী আফসোস প্রকাশ করে লিখেছিলেন, ‘এই একটা উপলক্ষ্য, যেখানে আমরা হিন্দুদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের খেপিয়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছিলাম।’ ১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহ প্রকৃতপক্ষে এটা সুস্পষ্টরূপে প্রমাণ করে দিয়েছিল যে মধ্যযুগ এবং অন্তত ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতের মানুষ সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন ছিলেন না।

কানপুরে বিদ্রোহের নেতা ছিলেন পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাও-এর দত্তকপুত্র নানা সাহেব। নানা সাহেবের এক বিশ্বস্ত অনুচর ছিলেন আজিমুল্লা। লক্ষ্ণৌর বিদ্রোহ অযোধ্যার বেগমের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছিল। মহাবিদ্রোহের অন্যতম নেত্রী ছিলেন ঝাঁসির তরুণী রানি লক্ষ্মীবাঈ। লক্ষ্মীবাঈয়ের ব্যক্তিগত রক্ষী হিসেবে প্রধানত দুই আফগান (পশতুন) ভাই, গুল মোহাম্মদ খান ও কাসিম খান দায়িত্ব পালন করেছিলেন। রানির সেনাবাহিনীতে প্রায় ৫০০ জন আফগান পাঠান সৈন্য ছিল, যারা ইতিহাসে ‘ওয়ালায়তি’ (Walayatis) নামেও পরিচিত ছিলেন। এ ছাড়াও রানির অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও প্রধান সহযোগীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মুন্দার খাতুন (বা মুন্দার বাই)। তিনি ছিলেন রানীর ঘনিষ্ঠ মুসলিম মহিলা দেহরক্ষী ও সহচরী, যিনি গোয়ালিয়রের যুদ্ধক্ষেত্রে রানির সাথেই বীরত্বের সাথে লড়াই করে প্রাণ দেন। গোলাম গৌস খান ছিলেন ঝাঁসি দুর্গের প্রধান গোলন্দাজ বাহিনীর প্রধান। খুদা বক্স ছিলেন রানির রাজকীয় অশ্বারোহী বাহিনীর প্রধান। সমাজে ধর্মের বিভেদ থাকলে এ সব সম্ভব হত কি!

তবে এই বিদ্রোহে সবচেয়ে বীরত্বের সম্মান সিপাহিদেরই প্রাপ্য। গভীর স্বদেশপ্রেমের প্রেরণায় এরা নিজেদের মধ্যে বদ্ধমূল পরধর্ম বিদ্বেষকেও বলি দিয়েছিল। একদিন তারা ধর্মীয় কুসংস্কারের কারণে চর্বিযুক্ত টোটা ব্যবহার করতে অস্বীকার করেছিল, কিন্তু ঘৃণিত বিদেশি শত্রুকে দেশ থেকে বিতাড়নের প্রয়োজনে বিদ্রোহের সময়ে হিন্দু-মুসলমান উভয় সিপাহিরাই এই টোটা বিনা আপত্তিতে ব্যবহার করেছিল। ১৮৫৯-এর মধ্যে ভারতের সর্বত্রই ব্র্রিটিশরাজ পূর্বমহিমায় সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। শৌর্য ও দেশাত্মবোধ এবং সম্প্রীতির বোধে সমুজ্জল ১৮৫৭-র এই মহাবিদ্রোহ ভারতবাসীর মনে একটা অবিস্মরণীয় ছাপ রেখে গিয়েছিল, স্বাধীনতা সংগ্রামে অফুরন্ত প্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছিল।

আজকের বিজেপি-আরএসএস নেতারা দেশের একচেটিয়া পুঁজির নির্মম শোষণের বিরুদ্ধে শোষিত মানুষের প্রতিবাদী ঐক্যকে ভাঙতে দেশের এই গৌরবময় সম্প্রীতির ইতিহাসকে ভুলিয়ে দিতে চায়। তারা দেখাতে চায়, দেশটা শুধুই হিন্দুদের, মুসলমানরা সেখানে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। বাস্তবে সাম্প্রদায়িকতা ছাড়া তাঁদের রাজনীতিতে আর এমন কিছু নেই যা দিয়ে তাঁরা আজ দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারেন। তার জন্য তাঁরা ইতিহাসকে বিকৃত করছেন, মিথ্যা ইতিহাস দেশের ছাত্রদের সামনে তুলে ধরছেন। এই সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে মোকাবিলা করতে হলে সম্প্রীতির রাজনীতিকে তুলে ধরতে হবে। তার জন্য দেশের সম্প্রীতির ইতিহাস জানা খুবই জরুরি। (চলবে)