বাংলাদেশ নিয়ে মায়াকান্না থামিয়ে  আয়নায় মুখ দেখুক বিজেপি

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার এবং দীপু চন্দ্র দাসের হত্যায় সরকারি ভাবে ‘উদ্বেগ’ জানিয়েছে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক। গণতান্ত্রিক শাসনের অন্যতম শর্ত যখন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের সুরক্ষা, তাদের আগলে রাখা, তাদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করতে না দেওয়া– তখন মনে হতে পারে বিজেপি সরকার বেশ উচিত কাজই করেছে! কিন্তু ভারতে? কেন্দ্রীয় সরকারি দল বিজেপি কি সেই শর্ত মানে?

তা হলে, বাংলাদেশের আগে নিজেদের ঘরের পরিস্থিতিটাই দেখা যাক। ২০১৪-তে বিজেপি কেন্দ্রীয় সরকারে বসার পর থেকে ২০২৩-এর মধ্যে গোরক্ষার নামে নরহত্যায় প্রাণ গেছে ৫০ জনের বেশি মানুষের। আহত বহু। অধিকাংশই সংখ্যালঘু মুসলিম এবং দলিত। সাম্প্রতিক কালে চলছে মুসলিম অনুপ্রবেশকারী নাম দিয়ে বাংলাভাষী ভারতীয় নাগরিকদের ওপর আক্রমণ, হত্যা, বিনা বিচারে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠিয়ে দেওয়া। বিগত ডিসেম্বর মাসেই বিজেপি শাসিত বিহারে গণপিটুনিতে প্রাণ হারানো জামা কাপড়ের ফেরিওয়ালা আতাহার হোসেন এর অন্যতম সংযোজন। উত্তরাখণ্ডে বিজেপি ঘনিষ্ঠ উন্মত্ত বাহিনীর হাতে ত্রিপুরার অ্যাঞ্জেল চাকমার মতো মানুষদের ‘চিনা’ তকমা দিয়ে অত্যাচার ও হত্যার ঘটনাও আজ আর অজানা নয়। ২৫ ডিসেম্বর বড়দিন পালনের সময় দেশের নানা জায়গায় খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের ওপর আক্রমণের কথাও ভোলা যাচ্ছে না। এ দিকে গো-রক্ষক এবং হিন্দুত্বের চ্যাম্পিয়ানদের হাতেই প্রাণ হারিয়েছেন হরিয়ানার হিন্দু ঘরের কিশোর আরিয়ান মিশ্র, কেরালায় বাংলাদেশি বলে পিটিয়ে খুন করা হয়েছে ছত্তিশগড়ের রাম নারায়ণ বাঘেলকে। গত ডিসেম্বরেই বিজেপি শাসিত আসামে জাতি-গোষ্ঠীগত বৈরিতার কারণে পশ্চিম কার্বি আংলং জেলায় পুড়িয়ে মারা হয়েছে দুই ভারতীয়কে। যাঁরা ধর্মীয় পরিচয়ে হিন্দু এবং বাংলাভাষী। তা হলে বিজেপি শাসন সংখ্যালঘু মুসলিম এবং খ্রিস্টান শুধু নয়, হিন্দুদেরও রক্ষা করছে কি? এই পরিস্থিতিতে যখন আরএসএস-এর অভিভাবকত্বে চলা বিজেপি পরিচালিত উত্তরপ্রদেশ রাজ্য সরকার দাদরির মহম্মদ আখলাকের হত্যায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলাটাই বন্ধ করতে কোর্টে আবেদন করে, তখন কি বলা যায় বিজেপি সংখ্যালঘুদের স্বার্থ রক্ষার জন্য উদগ্রীব? বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের জন্য বিজেপির ‘হিন্দু স্বার্থ রক্ষার্থে’ ফেলা চোখের জলকে মায়াকান্না ছাড়া আর কিছু বলা যায় কি?

কেন মহম্মদ আখলাকের হত্যা মামলা এ ক্ষেত্রে একটা ভয়ঙ্কর উদাহরণ? কারণ এই হত্যায় অভিযুক্তদের পাশে দাঁড়িয়ে আদালতে তাদের সকলকে ছাড় দিয়ে মামলাটা বন্ধ করতে বলেছে ‘গণতান্ত্রিক’ ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ভারতের বিজেপি পরিচালিত উত্তরপ্রদেশ রাজ্য সরকার। এমনকি এই মামলার প্রধান তদন্তকারী অফিসার সুবোধ কুমার সিংকে ২০১৮-তে যারা পুড়িয়ে মেরেছিল, তাদের অন্যতম ছিল আখলাক হত্যার প্রধান অভিযুক্তরাই। উত্তরপ্রদেশ সরকার তারও কোনও বিচার করতে চায় না। ২০১৭-র় উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির প্রচারের অন্যতম বিষয় ছিল ওই হত্যাকারীদের ‘বীরত্ব’! উত্তরপ্রদেশের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ দাদরিতে প্রচার সভায় এই হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানিয়ে তাঁর পাশে মঞ্চে বসিয়ে ভাষণ দিয়েছিলেন। কেন? কারণটা পরিষ্কার– আখলাক থেকে শুরু করে অ্যাঞ্জেল চাকমা সব মিলিয়ে বিজেপির আসল উদ্দেশ্য সংখ্যালঘু বিরোধী বিদ্বেষ ছড়ানো। বাংলাদেশের জন্য ‘উদ্বেগটা’ এই কাজেই তারা লাগাতে চায়।

আপাতত আদালত উত্তরপ্রদেশ সরকারের মামলা তুলে নেওয়ার আর্জি মানেনি। কিন্তু আজকের ভারতে তাতে নিশ্চিন্ত হওয়ার জো নেই। এই প্রেক্ষিতেই বলতে হয় বাংলাদেশে দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যা এবং তার দেহটা প্রকাশ্যে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনার প্রতিবাদ করাটা কর্তব্য হলে, একই সাথে মহম্মদ আখলাকের খুনিদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বিজেপি সরকারকে ধিক্কার জানানোটাও কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। দুটি হত্যায় একই ভাবে কেউ উদ্বিগ্ন না হলে বুঝতে হবে– বাংলাদেশের সংখ্যালঘু অংশের জনগণের স্বার্থ রক্ষা নিয়ে তার উদ্বেগটি আসলে ছদ্ম উদ্বেগ। ভারতের নাগরিক সুনালি খাতুনদের কোনও কথা না শুনে বাংলাদেশে ঠেলে দিতে পারে যারা, তারা ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান কিংবা কোনও দেশের সংখ্যালঘু মানুষের দুঃখ আদৌ বোঝে?

গণতান্ত্রিক শাসনের শর্ত মানলে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রথমেই উচিত ছিল আখলাকের জঘন্য হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী খুনিদের শাস্তি দিতে উত্তরপ্রদেশ সরকারকে বাধ্য করা। কিন্তু কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কিংবা প্রধানমন্ত্রী টুঁ শব্দটিও করেননি। ২০১৪ থেকে ২০২৩-এর মধ্যে এই ভারতে গণপিটুনির নথিভুক্ত ঘটনা ১৮৯। তার অধিকাংশেরই শিকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। মনে করিয়ে দেওয়া ভাল সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশ, যুক্তিবাদী লেখক গোবিন্দ পানসারে, নরেন্দ্র দাভোলকরদের হত্যাকারীরা সকলে আরএসএস-বিজেপি ঘনিষ্ঠ এবং এদের কারও শাস্তি হয়নি। এমনকি গৌরী লঙ্কেশের হত্যায় অভিযুক্ত একজন এবার মহারাষ্টে্র বুক ফুলিয়ে পুরসভা নির্বাচনে দাঁড়াচ্ছে। এর পরেও কি বলতে হবে কোনও দেশের সংখ্যালঘুদের জন্য বিজেপির চোখে সত্যিই জল আসতে পারে? বাংলাদেশের মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে তাদের দেশের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে গণতান্ত্রিক বোধসম্পন্ন মানুষ লড়াই করছেন এটাই আশার। আবার, ভারতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কারবারিরা সেই মৌলবাদীদের অজুহাত করে এ দেশে সংখ্যালঘু বিরোধী জিগির তুললে তাকে প্রতিহত করার দায়িত্ব ভারতের গণতন্ত্রপ্রিয় শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরই।

মৌলবাদী এবং সাম্প্রদায়িক শক্তি সবসময়েই একে অপরের পরিপূরক। এক ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ অপর একটি ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা এবং মৌলবাদকে পুষ্ট করে। বিজেপি নেতৃত্ব যত উগ্র হিন্দুত্ববাদে ভর করে বাংলাদেশে হিন্দুর পাশে দাঁড়ানোর অজুহাত দেখিয়ে ভারতে অত্যন্ত রুচিহীনভাবে মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিষোদগার করছেন, আক্রমণ করছেন, সব ভারতীয় মুসলিমকে বিদেশি সাজাতে চাইছেন, তত ভারত, বাংলাদেশ এমনকি পাকিস্তানেরও ইসলামিক মৌলবাদীদের হাত শক্ত হচ্ছে। এই কারণেই কলকাতার মতো শহরে উর্দু অ্যাকাডেমিতে ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তার অনুসারী হওয়ার কারণে বিশিষ্ট কবি, গীতিকার ও চিত্রনাট্যকার জাভেদ আখতারের আমন্ত্রণ বাতিল করার কথা বলতে পারে মুসলিম মৌলবাদীরা। সারা দেশেই আজ এই চিত্র বেড়ে চলেছে। শাসকরা চিরকালই খেটে খাওয়া মানুষের ঐক্য ভাঙতে সবচেয়ে বেশি যে অস্ত্রটা ব্যবহার করে তা হল সাম্প্রদায়িকতা। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় হিন্দু-মুসলিম-খ্রিস্টান নির্বিশেষে খেটে খাওয়া মানুষেরই। পুঁজিপতি শ্রেণির রাজনৈতিক ম্যানেজার শাসকদলগুলো সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে বিপথে চালিত করতে এক দল দরিদ্র মানুষকে অপর এক দল দরিদ্রের শত্রু সাজিয়ে দেশে আতঙ্ক আর বিদ্বেষের পরিবেশ তৈরি করে। বাংলাদেশেও ফ্যাসিবাদী ও সাম্প্রদায়িক শক্তি সে দেশের মানুষের অভূতপূর্ব জুলাই অভ্যুত্থানের অকাঙক্ষাকে নষ্ট করতে, বিকৃত করতে নানা সাম্প্রদায়িক এবং রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে। এই পথেই তারা সে দেশের আসন্ন নির্বাচনে নিজ নিজ স্বার্থ রক্ষা করতে চায়। আশার কথা সে দেশের গণতান্ত্রিক ও বামপন্থী শক্তিগুলি যথাসাধ্য তার প্রতিবাদও করছে। এ দিকে ভারতে বিজেপি দেখছে পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে তারা জনস্বার্থে বলার মতো কিছুই নিয়ে মানুষের কাছে যেতে পারবে না। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের হিন্দুদের রক্ষাকর্তা সাজা তাদের কাছে সুবিধাজনক। বিজেপি নেতারা জানেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের আগুন দাম, বেকারত্ব, চুরি-দুর্নীতি, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ-খুন জনজীবনের এই সমস্ত সমস্যা নিয়ে তারা কিছু বলতে গেলেই কেন্দ্রীয় শাসক দল হিসাবে কালিটা তাদের গায়েও লাগছে। ফলে তাদের ভরসা সেই সাম্প্রদায়িক প্রচার। এ দিকে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসও নিজেদের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভের বিস্ফোরণ রুখতে বিজেপির সাথে পাল্লা দিয়ে একের পর এক মন্দির রাজনীতির স্রোতে গা ভাসানোয় বিজেপির আশঙ্কা হচ্ছে তাদের হাত থেকে হিন্দুত্বের চাম্পিয়ান সাজার ব্যাটনটা চলে যাবে। ফলে তারা আরও উগ্র রাস্তা নিচ্ছে। দীপু চন্দ্র দাসের নামটুকু তাদের এই কারণে দরকার। ভারতের হিন্দু, ভারতের মুসলমান-খ্রিস্টান সহ কেউ বাঁচল কি না, বিদ্বেষের শিকার হল কি না, চাকরি পেল কি না, আশ্রয়-খাদ্য পেল কি না, বিষ জল খেয়ে মধ্যপ্রদেশে হিন্দুরা মারা গেল কি না তাতে তাদের কিছুই আসে যায় না। অবশ্য সিপিএম নেতৃত্বের ‘আগে রাম পরে বাম’ নীতিও বিজেপির কাছে পড়ে একটা পাওয়া সুযোগ হয়েছে।

ভারত, বাংলাদেশ সর্বত্রই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির মোকাবিলা করতে হলে আজ সাধারণ মানুষের হাতে একমাত্র হাতিয়ার হতে পারে বাম-গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জোয়ার। কিন্তু নিছক ভোটের ছকে এই বিষয়টাকে দেখলে, বুর্জোয়া রাজনীতি ও তথাকথিত ‘নরম সাম্প্রদায়িকতার’ সাথে আপস করলে তা শেষ পর্যন্ত মেহনতি মানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধেই যাবে। এই কথাটা ভুলে গেলে চলবে না।