Breaking News

আমেরিকা থেকে চড়া দামে তেল-গ্যাস-অস্ত্র আমদানি জনগণের কী কাজে লাগবে

তেল, গ্যাস আমদানির সিদ্ধান্তের পর এ বার আমেরিকা থেকে বিপুল অঙ্কের অস্ত্র আমদানির কথা জানাল কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। ৯ কোটি ৩ লক্ষ ডলারের এই যুদ্ধাস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী জ্যাভেলিন ক্ষেপণাস্ত্র এবং এ’ক্যালিবার নামের ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য নানা প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম।

ভারতের এই সিদ্ধান্তের কারণ কী? আমেরিকা থেকে এই সব পণ্য আমদানি কি ভারতের পক্ষে সুবিধাজনক, অর্থাৎ সস্তা হবে? না, বরং উল্টো। বিরাট দূরত্বের কারণে পরিবহণ খরচ অনেক বেশি হওয়ায় দাম অনেক বেশি পড়বে। আর তেল তো গত তিন বছর ধরে রাশিয়া থেকে কার্যত জলের দরে আমদানি করছে ভারত। তা হলে কী এমন ঘটল যে সে-সব বাতিল করে চড়া দামে আমেরিকা থেকে এই সব পণ্য আমদানি করছে ভারত?

মার্কিন পণ্যেভারতের চড়া শুল্ক চাপানোর অভিযোগ তুলে ২৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক এবং পরে রাশিয়া থেকে তেল কেনার জরিমানা হিসেবে বসানো আরও ২৫ শতাংশ শতাংশ, মোট ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপানোর কথা ঘোষণা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই চড়া শুল্কের মুখে পড়ে আমেরিকায় ভারতীয় রফতানি মার খেতে শুরু করে। অথচ বিশ্বে আমেরিকাই ভারতীয় পণ্যের সব চেয়ে বড় ক্রেতা। বাণিজ্য এবং বিদেশ মন্ত্রক নানা ভাবে এই শুল্ক হার কমানোর চেষ্টা চালাতে থাকে। পাল্টা মার্কিন পণ্যের জন্য ভারতীয় বাজার খুলে দিতে চাপ দিতে থাকে আমেরিকা। এই পারস্পরিক দড়ি টানাটানির মধ্যেই ভারত সরকার আমেরিকা থেকে তেল, গ্যাস এবং অস্ত্র আমদানির কথা ঘোষণা করে।

 তেল গ্যাসের দাম বাড়বে

মার্কিন চাপে নতিস্বীকার করে ভারত ইতিমধ্যেই রাশিয়া থেকে সস্তা তেল আমদানি বন্ধ করার কথা ঘোষণা করেছে। যদিও রাশিয়ার এই সস্তা তেল মূলত রিলায়েন্স সহ বেসরকারি কোম্পানিগুলিই আমদানি করত এবং তা পরিশোধন করে চড়া দামে বিশ্ববাজারে বেচে কোম্পানিগুলি বিপুল মুনাফা করলেও এই সস্তা দামের কোনও সুবিধা দেশের জনগণ পায়নি। দেশের বাজারে তেলের দাম কমানো হয়নি। বিজেপি সরকারই বেসরকারি একচেটিয়া কোম্পানিগুলিকে এই বিপুল মুনাফার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। জনগণকে এই সস্তা তেলের সুবিধা তারা পেতে দেয়নি।

অন্য দিকে যে ২৮টি মার্কিন পণ্যে শুল্কের হার চড়া ছিল, ট্রাম্পের মনোভাব বুঝেই গত বাজেটে ভারত তার মধ্যে ২০টি পণ্যে শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। বাজেটের আগেই ৮টি পণ্যে বাড়তি শুল্ক তুলে নেওয়া হয়েছিল। বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, ভারতীয় পণ্যে চড়া শুল্কের চাপ দিয়ে ভারতীয় বাজার মার্কিন পণ্যের জন্য খুলে দেওয়ানোর জন্যই ট্রাম্পের এই হুমকি। অন্য দিকে সেই হুমকির কাছে মাথা নত করে প্রথমে তেল, গ্যাস এবং শেষে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র কেনার কথা ঘোষণা করেছে বিজেপি সরকার। কিন্তু ভারতের মতো শক্তিশালী অর্থনীতির একটি দেশ এমন করে নতিস্বীকার করল কেন?

মোদি সরকারের সম্মতিতেই ঢালাও মার্কিন পণ্য আমদানি

বাস্তবিক মার্কিন পণ্য আমদানির এই সিদ্ধান্ত নতুন নয়। দ্বিতীয় বার প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হওয়ার পরই দলবল নিয়ে আমেরিকা পৌঁছে যান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দু’দেশের প্রতিনিধি দলের বৈঠকের পর গত ১৪ ফেব্রুয়ারি মোদিকে পাশে বসিয়ে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ২০২৫ সাল থেকে ভারতকে যুদ্ধাস্ত্র বেচার পরিমাণ বাড়াবে আমেরিকা। ভারত আমেরিকা থেকে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান সহ কোটি কোটি ডলারের যুদ্ধাস্ত্র কিনবে। দু’দেশের আলোচনায় ঠিক হয়েছে, ভারত আমেরিকার থেকে আরও বেশি পরিমাণে তেল ও গ্যাস কিনবে, যাতে দু’দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক ঘাটতি কমে আসে। ট্রাম্প জানান, আমেরিকাই ভারতে তেল ও গ্যাস সব থেকে বেশি পরিমাণে জোগান দেবে বলে তাঁদের ঐকমত্য হয়েছে। অর্থাৎ এই সিদ্ধান্ত দু’দেশের ঐকমত্যের ভিত্তিতেই।

অথচ ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ট্রাম্পের এই ঘোষণাকে একতরফা বলে দেখাতে চাইছে। বাস্তবে ট্রাম্পের এই ঘোষণা মোটেই একতরফা ছিল না। তা যদি হত নিশ্চয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার প্রতিবাদ করতেন। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন ওঠে, কোন গোপন শর্তে প্রধানমন্ত্রী এই বিপুল পরিমাণ তেল, গ্যাস এবং যুদ্ধাস্ত্র কিনতে রাজি হলেন, যেখানে রাশিয়ার থেকে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের থেকে অনেক সস্তায় ইচ্ছামতো তেল আমদানি করছিল ভারত? গ্যাস তথা এলপিজির ক্ষেত্রে মোট আমদানির ৯০ শতাংশ এত দিন এসেছিল সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার, কুয়েত ও সৌদি আরব থেকে। ১৭ নভেম্বর আমেরিকার সঙ্গে হওয়া চুক্তি অনুযায়ী ২০২৬ সালের জন্য ২২ লক্ষ টন এলপিজি কিনতে রাজি হল ভারত। যা এ দেশের মোট চাহিদার ১০ শতাংশ। এই পরিমাণ আগামী দিনে আরও বাড়াবে বলে জানিয়েছে আমেরিকা।

তেলমন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী এই চুক্তিকে ঐতিহাসিক সূচনা বলেছেন। বলেছেন, বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল এলপিজি বাজারের দরজা খুলে গেল আমেরিকার সামনে। কিন্তু কীসের ভিত্তিতে এই সূচনা ঐতিহাসিক হল, যেখানে তেল বা গ্যাস আমেরিকা থেকে আমদানি করতে শুধুমাত্র বিপুল পরিবহণ খরচের জন্যই আন্তর্জাতিক বাজারের থেকে দাম অনেক বেশি পড়বে। আমেরিকা থেকে একটি জ্বালানিবাহী কন্টেনার ভারতে সমুদ্রপথে পৌঁছতে ৪৫ দিন লাগে, যেখানে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলি থেকে একই সময়ে ছ’টি জ্বালানিবাহী কন্টেনার আনা যায়। তা ছাড়া আমেরিকার সামনে ভারতের বিরাট বাজার খুলে যাওয়াতে ভারতের তেলমন্ত্রীর এত আহলাদেরই বা কারণ কী?

ভারতীয় একচেটিয়া পুঁজির স্বার্থেই মার্কিন চাপের কাছে নতিস্বীকার

এই যে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ভারত আমদানি করতে রাজি হল, যার পরিমাণ আগামী দিনে আরও বাড়বে তারই বা কী প্রয়োজন ছিল? মার্কিন অর্থনীতি এখন পুরোপুরি অস্ত্র উৎপাদন তথা অস্ত্র ব্যবসা নির্ভর। আমেরিকার মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) একটি বড় অংশ আসে অস্ত্র ব্যবসা থেকে। তাই বিশ্ব জুড়ে প্রতিটি যুদ্ধের পিছনে আমেরিকার রয়েছে কোথাও প্রত্যক্ষ কোথাও পরোক্ষ ভূমিকা। ভারত কার সাথে যুদ্ধে এই অস্ত্র ব্যবহার করতে চায়– চিনের সঙ্গে? পাকিস্তানের সঙ্গে? পাকিস্তানের উপর এক দিকে যেমন মার্কিন প্রভাব বাড়ছে, তেমনই চিনও পাকিস্তানকে ক্রমাগত আধুনিক অস্ত্র জুগিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ ভারত যতই আধুনিক অস্ত্র সংগ্রহ করবে, পাকিস্তানও ততই একই কাজ করবে। অর্থাৎ যে অর্থ ব্যয় হওয়ার কথা জনকল্যাণে, জনগণের শিক্ষা-চিকিৎসার পিছনে, দারিদ্রমুক্তিতে, তা ছেঁটে ফেলে সেই অর্থ প্রতিরক্ষার নামে মার্কিন অস্ত্র কিনতে ব্যয় করা হবে।

দ্বিতীয়ত, আমেরিকা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তার নিজের স্বার্থে প্রতিদ্বন্দ্বী সাম্রাজ্যবাদী শক্তি চিনকে প্রধান শত্রু খাড়া করে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিতে চেষ্টার কসুর করছে না। দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় এবং ভারত মহাসাগর, প্রশান্ত মহাসাগরের আশেপাশের দেশগুলিতে চিনের সঙ্গে টক্কর দিয়ে বাণিজ্য করার জন্য মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের প্রয়োজন ভারতের মতো সাম্রাজ্যবাদী শিবিরের অন্যতম অংশীদারের সাহায্য। একই কারণে ভারতীয় পুঁজিপতিদেরও প্রয়োজন মার্কিন ঘনিষ্ঠতা। তাই মার্কিন কর্তাদের চাপে দেশের মানুষের স্বার্থ বলি দিতে ভারতীয় পুঁজিপতিদের পলিটিক্যাল ম্যানেজার বিজেপি সরকারের কোনও দ্বিধা নেই। অন্য দিকে ভারতের জনগণের চোখে চিনকে শত্রু হিসাবে দেখিয়়ে আমেরিকা তার কারখানায় তৈরি অস্ত্র গছিয়ে চলেছে ভারতকে। বাস্তবে যুদ্ধের থেকেও যুদ্ধ-আতঙ্কই আমেরিকার বেশি দরকার। কিন্তু ভারতের শাসক পুঁজিপতি শ্রেণিরও কি তা-ই দরকার নয়?

ভুট্টা ও সয়াবিন আমদানিতে ভারতীয় কৃষক বিপর্যস্ত হবে

ভারত যে নতমস্তকে মার্কিন হুকুম তামিল করে যাচ্ছে এর পিছনে শুধুমাত্র মার্কিন চাপই কাজ করছে এমন নয়। ভারতীয় একচেটিয়া পুঁজির চাপও এর পিছনে কাজ করছে। আমেরিকার টালমাটাল অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো আমেরিকার পক্ষে বিশেষ প্রয়োজন ছিল। রফতানি ক্ষেত্রে ভারতের অতিরিক্ত আমেরিকা নির্ভরতা ভারতকে মার্কিন শর্ত মানতে বাধ্য করেছে ঠিকই, কিন্তু রফতানি বাণিজ্য অব্যাহত রাখতে ভারত সরকারকে প্রয়োজনে জনস্বার্থ বলি দিতে বাধ্য করেছে ভারতীয় পুঁজিপতি শ্রেণি। আমেরিকা থেকে আমদানি করা তেল বা গ্যাসের বাড়তি দাম জনগণের ঘাড়েই শেষ পর্যন্ত চাপানো হবে। শুধু তাই নয়, মার্কিন চাপে ভুট্টা এবং সয়াবিন আমদানি করতেও রাজি হয়েছে। নরেন্দ্র মোদি সরকার– যা ভারতীয় কৃষকদের দুরবস্থার মধ্যে ফেলবে।

কারও মনে হতে পারে, শুধু পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা কেন বলছেন? এই সব শিল্পে কর্মরত বিরাট সংখ্যক শ্রমিক-কর্মচারীদের কর্মসংস্থানের বিষয়টিও কি গুরুত্বপূর্ণ নয়? না একেবারেই নয়। মালিক শ্রেণি সব সময়ই তাদের স্বার্থ চরিতার্থ করার লক্ষ্যকে আড়াল করতে জনস্বার্থ রক্ষার অজুহাত দেয়। যেন জনগণের কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যেই তাদের পণ্য উৎপাদন! তাই দেশের ৭৩ শতাংশ সম্পদ আজ গিয়ে জমা হয়েছে ১ শতাংশ পুঁজিপতির ভাণ্ডারে। আর ১ শতাংশ সম্পদ কোনও ক্রমে এখনও রয়েছে সমাজের সব চেয়ে নিচে পড়ে থাকা ৫০ শতাংশ মানুষের হাতে! শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রতি গভীর দরদ থেকেই বোধহয় তারা নিয়ে এসেছে শ্রম কোড, যেখানে শ্রমিকদের ১২ ঘণ্টা শ্রম দেওয়ার বাধ্যতার কথা যেমন রয়েছে, তেমনই তাঁদের বহু সংগ্রামে অর্জিত সুবিধা এবং অধিকারগুলিকেও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্পের পাশে বসে মোদি বলেছিলেন, ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের উপর ভর করে রয়েছে। এর মধ্যে কোথায় গণতন্ত্র? তার চিহ্নমাত্র কোথাও রয়েছে? কার্যত এই চুক্তিতে ‘জোর যার মূলুক তার’ নীতিই প্রমাণিত হয়েছে। এ এক চূড়ান্ত নীতিহীন প্রতিযোগিতা, যেখানে উভয়েরই চেষ্টা নিজ দেশের পুঁজিপতি শ্রেণির জন্য কী আনতে পারল। বাস্তবে এইটুকুই তাদের কাছে গণতন্তে্রর অর্থ।

মার্কিন ঘনিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে আধিপত্যবাদী ক্ষমতাবৃদ্ধিই লক্ষ্য

বাস্তবে সাম্রাজ্যবাদের কাছে গণতন্তে্রর কোনও মূল্য নেই। মুনাফার প্রয়োজনে এমন কোনও কাজ নেই যা সে করতে পারে না। আজ সব চেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্যবাদী শক্তি আমেরিকার লক্ষ্য সমস্ত রকম প্রতিযোগিতায় তার চূড়ান্ত আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তিরও লক্ষ্য ভারতীয় পুঁজিকে শক্তিশালী মার্কিন পুঁজির উপর নির্ভরশীল করে তোলা, ভারতের বাজারকে তাঁর দেশের ধনকুবের গোষ্ঠীর পণ্য বিক্রির খোলা ময়দানে পরিণত করাই তার লক্ষ্য। ভারতেরও লক্ষ্য, মার্কিন ঘনিষ্ঠতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেকে আঞ্চলিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তি থেকে বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী শক্তির জায়গায় নিয়ে যাওয়া, ভারতীয় লগ্নিপুঁজির জন্য অপেক্ষাকৃত দুর্বল দেশগুলির নতুন নতুন বাজারে প্রবেশের জন্য মার্কিন সমর্থন পাওয়া। সব মিলিয়ে ভারত-মার্কিন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির মধ্যে জনস্বার্থ কোথাও নেই, বরং দেশীয় পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থে জনস্বার্থকে বিসর্জনই দেওয়া হয়েছে।