
নানা রাজ্যে আরএসএস-বিজেপি পরিচালিত সরকারগুলি সাধারণ মানুষের ঐকমত্যের তোয়াক্কা না করেই যে ভাবে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালুর সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তার তীব্র বিরোধিতা করে এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট)-এর সাধারণ সম্পাদক কমরেড প্রভাস ঘোষ ৯ জুন এক বিবৃতিতে বলেন,
আরএসএস-বিজেপি পরিচালিত গুজরাট, উত্তরাখণ্ড এবং আসাম রাজ্য সরকার বিধানসভায় তাদের একচেটিয়া সংখ্যাধিক্যের জোরে ‘এক দেশ, এক ভাষা, এক আইন’-এর ধুয়ো তুলে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তব পরিস্থিতির সঠিক বিচার না করেই তারা এই ধরনের একটা চরম বিতর্কিত আইনের বিষয়ে একতরফা সিদ্ধান্ত নিয়ে চলেছে। এমনকি এত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্নে জাতীয় স্তরে কোনও ঐকমত্য গড়ে তোলার চেষ্টাও তারা করেনি। আরএসএস-বিজেপি পরিচালিত সরকারগুলির এই কাজ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, আচার-আচরণ ও রীতিনীতিকে চূড়ান্ত ভাবে লঙ্ঘন করছে।
মনে রাখা দরকার, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ভারতীয় জাতীয় ঐক্য রাজনৈতিক দিক থেকে গড়ে উঠলেও সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকে ধর্ম, জাত, ভাষা, বর্ণ, উপজাতীয়তা ইত্যাদি নানা দিক থেকে বিভেদ থেকেই গেছে। এর জন্য দায়ী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব আপসমুখী বুর্জোয়াদের দ্বারা পরিচালিত জাতীয় কংগ্রেসের হাতে থেকে যাওয়া। এই কারণেই স্বাধীনতা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সমাজের গণতন্ত্রীকরণের কাজটা অপূরিতই থেকে গেছে। ফলস্বরূপ ভারতের নানা সম্প্রদায়ের সামাজিক রীতিনীতি, বিবাহ এবং সম্পত্তির উত্তরাধিকার সংক্রান্ত আইন, ধর্মীয় উৎসব, খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাত্রার ধরন ইত্যাদি বহু বিষয়ে পার্থক্য থেকে গেছে। এই বাস্তবতাকে মাথায় রেখে সংবিধান রচয়িতারাও অভিন্ন দেওয়ানি বিধির বিষয়টিকে সযত্নে এড়িয়ে গেছেন। তাঁদের ভাবনা ছিল জাতীয় ঐক্য ও সংহতিকে সম্পূর্ণভাবে জোরদার করার আগে তাড়াহুড়ো করে এই কাজ করতে গেলে বিপরীত ফল ফলবে। তাতে এমন একটা আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্যই সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে যাবে। পরবর্তীকালে ২১তম আইন কমিশনও ২০১৮-তে সংবিধান সংক্রান্ত বিস্তৃত আলাচনাপত্রে দৃঢ় অভিমত প্রকাশ করে বলেছে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি ‘বর্তমান সময়ে প্রয়োজনীয় নয় এবং অভিপ্রেতও নয়’। বোঝাপড়ার পরিবেশ, জাতীয় ঐকমত্য গড়ে না তুলে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালুর উদ্যোগ হলে তা সমাজে ইতিমধ্যে বিদ্যমান বিভেদ, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, অবিশ্বাস এবং সম্প্রদায়গুলির মধ্যে পরস্পরের প্রতি বিরূপ মনোভাবকেই বাড়তে সাহায্য করবে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এই চাপিয়ে দেওয়া অভিন্ন দেওয়ানি বিধি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ন্যায্য অধিকার ও আশা আকাঙক্ষাকে বিপন্ন করবে। বিশেষত, যে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ইতিমধ্যে বঞ্চিত ও বিজেপির ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলির হাতে ক্রমাগত লাঞ্ছনা, নির্যাতন এমনকি গণপিটুনিতে হত্যার সম্মুখীন হচ্ছে তাঁরা আরও বিপন্ন হবেন।
সংবিধান প্রণেতাদের আকাঙক্ষা, ২১তম আইন কমিশনের সুপারিশ সঃমস্ত কিছুকে উপেক্ষা করে যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করতে শাসক বিজেপি উঠেপড়ে লেগেছে তা কার্যত হিন্দু কোড বিলের নতুন সংস্করণ।
উদ্বেগের বিষয় হল যত দিন যাচ্ছে কোটি কোটি খেটে খাওয়া মানুষের মধ্যে সামাজিক সাংস্কৃতিক বিভেদ বেড়েই চলেছে। শাসক শক্তিগুলি বিশেষত বিজেপি সাম্প্রদায়িকতা, জাতিগত-গোষ্ঠীগত-প্রাদেশিকতা ভিত্তিক বিভেদ, উগ্র জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের প্রচার, ভাষাগত এবং আঞ্চলিক বিভেদ বৃদ্ধিতে ক্রমাগত ইন্ধন জুগিয়ে চলেছে। এতে একদিকে তারা পুঁজিবাদী শোষকদের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা শ্রেণি সংগ্রাম ও গণসংগ্রামের পথে বাধা সৃষ্টি করতে চাইছে, একই সাথে তাদের ‘হিন্দু ভোটব্যাঙ্ক’কে শক্তিশালী করতে চাইছে।
এই পরিস্থিতিতে আমরা দেশের সমস্ত শুভবুদ্ধি ও গণতান্ত্রিক বোধসম্পন্ন মানুষের কাছে আহ্বান জানাচ্ছি জাত-বর্ণ-ধর্ম-উপজাতিগোষ্ঠী-ভাষা নির্বিশেষে ঐক্য গড়ে তুলুন। সমস্ত স্তরের মানুষকে এক জোট করে শক্তিশালী দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলন গড়ে তুলে সমস্ত রাজ্যের বিজেপি সরকারকে বাধ্য করুন চরম ক্ষতিকর অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করার মতলব ত্যাগ করতে।