
‘মুসলমান শাসকরা ভয়ানক অত্যাচারী ছিলেন, তারা এ দেশে ঢুকে একের পর এক হিন্দু মন্দির ভেঙেছেন, হিন্দুদের সর্বনাশ করেছেনক্স– এ সব কথা বিজেপির আইটি সেলের কল্যাণে এখন সকলেই কমবেশি শোনেন বা সমাজমাধ্যমে প্রচার হতে দেখেন। ধর্মান্ধ, ক্ষমতালিপ্সু এবং হিন্দু মন্দির ধ্বংসকারী হিসেবে মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের নাম আসে একেবারে প্রথমের দিকে। আওরঙ্গজেব কি মন্দির ধ্বংস করেননি? করেছেন। ইতিহাসবিদ রিচার্ড এটনের মতে, আওরঙ্গজেবের আমলে ১৪টি বা তার কিছু বেশি মন্দির ধ্বংস করা হয়েছিল। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, এর পেছনে ধর্মীয় কারণ যতটা ছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি ছিল রাজনৈতিক কারণ। অর্থাৎ ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা, পররাজ্য দখল করে সাম্রাজ্য বিস্তারের মতো বিষয়, যেগুলো সে যুগে যে কোনও রাজার শাসনকালেরই সাধারণ বৈশিষ্ট্য বলা যায়। অধ্যাপক এটন তাঁর রচনায় দেখিয়েছেন, শুধু মুসলমান শাসকই নয়, অনেক হিন্দু রাজাও শত্রুপক্ষের রাজার এলাকার মন্দির ধ্বংস করতেন বা লুঠ করতেন।
ইতিহাস বলছে, আওরঙ্গজেব কাশীর বিশ্বনাথ মন্দির ভেঙেছিলেন, আবার ওই শহরেই জঙ্গমবাড়ি শিবমন্দিরকে বেশ বড় জায়গীর দান করেছিলেন। উজ্জ্বয়িনীর মহাকাল মন্দিরকে তিনি বড় জায়গীর দেন এবং মধ্যপ্রদেশের চিত্রকূটে নিজেই রামমন্দির বানিয়ে দেন। সোমনাথ মন্দির ধ্বংস করেছিলেন যে গজনির সুলতান মাহমুদ, তিনি কিন্তু সেই মন্দির আক্রমণের আগে মুলতান শহরের মুসলিম বাদশাকে যুদ্ধে পরাস্ত করেন এবং নিজে মুসলমান হয়েও সেই শহরের সমস্ত মসজিদ ধ্বংস করেন। কাশ্মীরের হিন্দু রাজা হর্ষ সোনাদানা লুঠের জন্য বহু হিন্দু মন্দির, দেবমূর্তি ধ্বংস করেছেন। কাশ্মীরে হিন্দু রাজাদের ‘দেবোৎপাটন নায়ক’ নামে একটি সেনাপতির পদ ছিল। যাদের কাজই ছিল মন্দিরের বিগ্রহের আসনের তলায় লুকানো ধনরত্ন লুঠ করা। তা হলে মন্দির ধ্বংস মানেই মুসলিম শাসকের হিন্দুধর্মবিদ্বেষ– এ কথা ঐতিহাসিকভাবেই অসত্য। কিন্তু ইতিহাসকে যুক্তির ভিত্তিতে সব দিক থেকে বিচার করে দেখা এবং বোঝার জন্য যে চিন্তা বা মনন দরকার, বিজেপি-আরএসএস আদর্শগত ভাবেই তার বিরোধী। তাই এ সব কথা গেরুয়া শিবিরের হোয়াটসঅ্যাপ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে স্বভাবতই থাকে না।
কিন্তু আপাতত ইতিহাস নয়, একেবারে বর্তমানের ভারতবর্ষ থেকে উঠে আসা তথ্য বলছে, হিন্দুধর্মের স্বঘোষিত রক্ষাকর্তা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শাসনকালে দেশে অনেক প্রাচীন মন্দির, মূর্তি ধ্বংস হয়েছে, এবং তার সংখ্যাটা আওরঙ্গজেবের ধ্বংস করা মন্দিরের চেয়ে বেশি! নরেন্দ্র মোদি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন ২০০৮ সালে গান্ধীনগরে অবৈধ দখলের অভিযোগ তুলে প্রায় ৮০টি মন্দির ধ্বংস করা হয়েছিল, কিছু হিন্দুত্ববাদী সংগঠন সেই সময় এর প্রতিবাদও করে। ২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রীর যে কাশী বিশ্বনাথ করিডর প্রজেক্টের কাজ শুরু হয়, তার জন্য ওই অঞ্চলের বহু প্রাচীন মন্দির সহ তিনশোর বেশি পরিবারের আশ্রয়স্থলও ধ্বংস করা হয়েছে, যাঁদের অধিকাংশই হিন্দু। বারাণসীতে এই ভাবে ছোট-বড় মন্দির যখন উন্নয়নের নামে ভেঙে ফেলা হচ্ছে, স্থানীয় বাসিন্দারা প্রতিবাদ করেছিলেন। কিন্তু বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ সে সবের কোনও তোয়াক্কা করেননি। এমনকি যে ‘হিন্দু ঐতিহ্যে’র নামে এত বাগাড়ম্বর তারা করেন, সেই ঐতিহ্য রক্ষার কোনও চেষ্টাই সরকারের তরফে দেখা যায়নি। ২০২২ সালে সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের মোহান্ত রাজেন্দ্রপ্রসাদ তিওয়ারি স্বয়ং মোদি-যোগীদের এই হিন্দুত্বের ব্যবসাকে অভিযুক্ত করে বলেন, আওরঙ্গজেবের প্রচলিত ভাবমূর্তিকে ব্যবহার করে এবং ইতিহাসকে বিকৃত করে আরএসএস-বিজেপি যে মুসলমানবিরোধী বয়ান তৈরি করছে, তার সাথে হিন্দুধর্মের বা হিন্দুদের সুরক্ষার কোনও সম্পর্ক নেই। তিনি বলেন, বারাণসী করিডর প্রজেক্টের জন্য ২৮৬টি শিবলিঙ্গ উপড়ে ফেলা হয়েছে, যার মধ্যে ১৪৬টি পরে বসানো হয়।
এই সাক্ষাৎকারেই জানা যাচ্ছে, আওরঙ্গজেব জঙ্গমবাড়ি মঠকে জমি এবং টাকা দিয়েছিলেন সেখানে শিবপুজো আর পুঁথির পাঠ চালানোর জন্য। এই ঘোষণা সম্বলিত যে পাট্টা এখনও রক্ষিত আছে, যোগী আদিত্যনাথ মন্দির দেখতে এসে তা সরিয়ে ফেলতে চেয়েছিলেন। অর্থাৎ প্রাচীন ভারতে যেখানে যতটুকু ধর্মীয় সহাবস্থান বা সহনশীলতার নজির আছে, বিজেপি তা মানুষের মন থেকে মুছে ফেলতে চায়। এই বছরের জানুয়ারিতে মণিকর্ণিকা ঘাট ঢেলে সাজানোর জন্য ভাঙতে গিয়ে একটি প্রাচীন মাধি বা প্রস্তরফলক ভেঙে ফেলা হয়। এই ফলকটি অহল্যাবাই হোলকার নামে এক রানির স্মৃতিবিজড়িত, যাকে বিজেপি বিভিন্ন সময় হিন্দু আইকন হিসেবে তুলে ধরেছে, এমনকি প্রজাতন্ত্র দিবসের শোভাযাত্রাতেও মধ্যপ্রদেশের ট্যাবলোতে এঁর বিরাট মূর্তি ছিল। কে এই অহল্যাবাঈ? মহারাষ্ট্রর গ্রামের ধাঙড় সম্প্রদায় থেকে আসা এই রমণী ঘটনাচক্রে ইন্দোরের শাসক হন এবং বহু হিন্দু মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু তিনি একই সাথে মুসলমান ধর্মের প্রতিও উদার এবং সহনশীল ছিলেন, বহু মসজিদ-মৌলানা-ফকিরদের দানধ্যান করতেন, জনপ্রিয় ছিলেন নিম্নবর্ণের হিন্দুসমাজেও।
খেয়াল করা দরকার, বিজেপির প্রচারে কিন্তু অহল্যাবাঈয়ের এই উদার ভাবমূর্তির কোনও জায়গা নেই। মণিকর্ণিকা ঘাটের এই ঘটনার পর যখন স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়, ধাঙড় সম্প্রদায় এবং অন্য কয়েকটি সম্প্রদায় বিক্ষোভ দেখায়, আদিত্যনাথের সরকার সে সবে কর্ণপাত তো করেইনি, বরং বিক্ষোভকারীদের ওপর লাঠি চালিয়েছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের ভাবাবেগ বা প্রাচীন ঐতিহ্য নিয়ে সত্যিই সংবেদনশীল হলে কি সরকার এই আচরণ করতে পারত? এই যে ‘সৌন্দর্যায়নক্স আর ‘আধুনিকীকরণ’ –এর সাথে দেশের কোটি কোটি সাধারণ হিন্দুর জীবনযন্ত্রণার কোনও সম্পর্ক আছে কি? থাকলে, যখন বারাণসীতে বা চারধামে কয়েকশো কোটি টাকা ব্যয় করে হিন্দুতীর্থ ঢেলে সাজানো হচ্ছে, সেই সময় দেশ জুড়ে বেড়ে চলা দারিদ্র, অপুষ্টি, অনাহার নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কোনও মাথাব্যথা নেই কেন? ছোট-বড় নানা ঘটনায় এ কথা আজ দিনের আলোর মতো পরিষ্কার যে আরএসএস-বিজেপির হিন্দুত্বের জয়গানের আসল উদ্দেশ্য হল হিন্দু-মুসলমান বিরোধ লাগানো এবং নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শন। এই উদ্দেশ্যের সাথে যেখানেই বিরোধ দেখা দেবে, ধর্মের কোনও পরোয়া তারা করবে না। গত বছর কুম্ভ মেলায় ভয়ংকর অব্যবস্থার জেরে প্রায় একশো তীর্থযাত্রীর শোচনীয় মৃত্যুর কথা দেশের মানুষ ভোলেনি। মানুষ ভুলবে না এই নির্বাচনের সামনে দাঁড়িয়ে ভয়ঙ্কর অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় লক্ষ লক্ষ মানুষকে নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করার কথা, যাঁদের মধ্যে বিরাট সংখ্যক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ যেমন আছেন, তেমনই আছেন দলিত, মতুয়া সহ অনেক সাধারণ শ্রমজীবী হিন্দু পরিবারও।
বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর তোলা একটি তথ্যচিত্রে এক বৃদ্ধা হিন্দু মহিলা কাঁদতে কাঁদতে মাইকের সামনে বলেছিলেন, ‘হায় রাম! তোমার শেষে এই দশা হল যে, অন্যের বাড়ি ভেঙে তোমায় বাস করতে হয়’?দেশের সাধারণ ধর্মবিশ্বাসী শান্তিপ্রিয় মানুষ আজও এ ভাবেই ভাবেন। হিন্দুত্বের যে স্বঘোষিত ঠিকাদারি মোদিজি এবং তাঁর অনুচরেরা নিয়েছেন, সেই উগ্রতার সাথে এই ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাস বা ধর্মাচরণের কোনও মিল নেই। হিন্দুধর্মের নাম করে, ধর্মকে ঢাল করে নরেন্দ্র মোদিরা যা করছেন, তা হল ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক রাজনীতির চাষ এবং একচেটিয়া পুঁজির কাছে নির্লজ্জ সমর্পণ।
আওরঙ্গজেবের মতো শাসকেরা সেকালে যুদ্ধ করে রাজ্যবিস্তারের জন্য যা করতেন, এ কালের শাসকরা তার চেয়েও ভয়ানক জিনিস করছেন গণতন্তে্রর মুখোশ পরে। এই চক্রান্তকে রুখতে পারে একমাত্র জনগণের সচেতন ঐক্য। মানুষকে বুঝতে হবে, শোষিত মানুষের ক্ষোভকে চাপা দিতে দারিদ্র-অশিক্ষা-বেকারির মতো সমাজজীবনের আসল সমস্যাগুলোকে তারা মন্দির-মসজিদের রাজনীতি দিয়ে আড়াল করে রাখতে চায়, এক ধর্মের মানুষকে আর এক ধর্মের মানুষের শত্রু সাজিয়ে নিজেদের অপশাসনকে আরও দীর্ঘায়িত করতে চায়। এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মানুষকেই আওয়াজ তুলতে হবে –
‘মন্দির-মসজিদ না ভেঙে আয় ভাঙি–
মিলেমিশে ভালোবেসে ছিলাম এতকাল,
মধ্যিখানে গড়ল কারা নফরতের দেওয়াল?
ধর হাতুড়ি-শাবল, চল সবাই মিলে চল
ঘা মেরে ওই ঠুনকো দেওয়াল ভাঙি’।
(সূত্রঃ কাউন্টার.অর্গ, ২১ জানুয়ারি ২০২৬, আক্রান্ত মানবতা-পথিকৃৎ সংকলন, ২০১৬, ফ্রন্টলাইন, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)