
কেন্দ্রের বিদ্যুৎমন্ত্রী গত ২ এপ্রিল বলতে বাধ্য হলেন যে, ‘স্মার্ট মিটার লাগানো বাধ্যতামূলক নয়, জোর করে কোনও বিদ্যুৎ গ্রাহককে এই মিটার লাগানো হবে না।’ এটা একটা মামুলি জয় নয়। বিজেপির মতো একটা দলের পরিচালনাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের থেকে এই ঘোষণা আদায় করাটা কোনও সাধারণ বিষয় নয়। সারা দেশের বিদ্যুৎ গ্রাহক আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী এবং সমর্থন-সাহায্য করেছেন যে গ্রাহকরা তাঁদের লাগাতার এবং দৃঢ়পণ আন্দোলনের ফলেই সরকারকে স্মার্ট মিটারের প্রশ্নে পিছু হঠতে হল।
বিগত ২০২১ সালের আগস্ট মাস থেকে সারা দেশের বিভিন্ন রাজ্যে রিভ্যাম্পড ডিস্ট্রিবিউশন সেক্টর স্কিমের (আর ডি এস এস) মাধ্যমে স্মার্ট প্রিপেইড মিটার বসানোর আদেশ জারি করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার। তোড়জোড় শুরু হয়েছিল একচেটিয়া পুঁজিপতিদের বিভিন্ন এজেন্টদের দিয়ে স্মার্ট প্রিপেইড মিটার লাগানোর কাজ। এ রাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেস সরকার প্রথম লটেই ৩৭ লক্ষ স্মার্ট মিটার কিনে সেগুলো লাগানোর ব্যবস্থা করেছে। দেশের সাধারণ মানুষ প্রথমটা এর সর্বনাশা ফল বুঝে উঠতে পারেননি। একে উন্নত প্রযুক্তির মিটার মনে করে বহু শিক্ষিত মানুষও বিভ্রান্ত হয়েছিলেন।
অল ইন্ডিয়া ইলেকট্রিসিটি কনজিউমার্স অ্যাসোসিয়েশন (এআইইসিএ) দেশব্যাপী এই স্মার্ট মিটারের ভয়ংকর দিকগুলো তুলে ধরে লাগাতার প্রচার আন্দোলন সংগঠিত করে চলেছে। এই মিটার যে বাস্তবে দেশের সরকারি বিদ্যুৎ বন্টন ব্যবস্থাটাকেই বেসরকারি একচেটিয়া বিদ্যুৎ ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দেওয়ার চক্রান্ত– এ কথা প্রচারপত্র, বুকলেট, সেমিনার, কনভেনশন, সম্মেলন এবং বিভিন্ন বিদ্যুৎ অফিসে বিক্ষোভ ডেপুটেশনের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। সাধারণ গ্রাহকদের বোঝানো হয়েছে যে, এই স্মার্ট মিটারের মাধ্যমে আগে টাকা তারপরে বিদ্যুৎ, টাইম অব ডে (টিওডি) সিস্টেম, ডাইনামিক প্রাইসিং সিস্টেম, রিয়াল টাইম মনিটরিং সিস্টেমের মধ্যে দিয়ে বাস্তবে গ্রাহকদের অন্ধকারে রেখে তাদেরই টাকা লুট করা হবে। প্রিপেইড ব্যবস্থায় গ্রাহকদের অগ্রিম টাকাতেই বন্টন কোম্পানিগুলো বিদ্যুৎ বন্টনের ব্যবসা করবে। বেসরকারি বন্টন কোম্পানিদের পিক অ্যান্ড চুজ করার অধিকার দেওয়ার মাধ্যমে সকল স্তরের গ্রাহকদের বিদ্যুৎ পাওয়ার অধিকার লঙ্ঘিত হবে।
কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎমন্ত্রীর কাছে সর্বভারতীয় গ্রাহক সমিতি এআইইসিএ, পশ্চিমবঙ্গের অ্যাবেকা সহ বিভিন্ন রাজ্যের বিদ্যুৎ গ্রাহক সমিতির পক্ষ থেকে প্রতিবাদপত্র পাঠানো, দেশের প্রতিটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের কাছে ওই একই প্রতিবাদপত্র পাঠিয়ে স্মার্ট মিটারের বিরোধিতা করার জন্য আবেদন করা হয়েছে। দেশের স্বনামধন্য অবসরপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ার, প্রাক্তন বিদ্যুৎ দপ্তরের আধিকারিকরা দিল্লিতে বিদ্যুৎ গ্রাহকদের সর্বভারতীয় কনভেনশনে অংশগ্রহণ করেন। এ ছাড়াও বহু কর্মসূচি পালিত হয়।
বিভিন্ন রাজ্যের সাধারণ মানুষ তাঁদের জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে যখন মিলিয়ে দেখেন যে, বিদ্যুৎ গ্রাহক সংগঠনের বক্তব্য সঠিক, তখন তাঁরা সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, পাঞ্জাব, দিল্লি, মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু, কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, কেরালা, পুদুচেরি সহ প্রায় ১৭টা রাজ্যে এই স্মার্ট মিটার বিরোধী আন্দোলনে হাজার হাজার বিদ্যুৎ গ্রাহক রাস্তায় নেমেছেন। বিভিন্ন বিদ্যুৎ অফিসে ডেপুটেশন, বিক্ষোভ, রাস্তা অবরোধ, অফিস অবরোধ, বিশাল বিক্ষোভ মিছিল, রাজ্য প্রশাসনিক দপ্তরে বিক্ষোভ মিছিল সহ অভিযান– এ সবই সংগঠিত হয়েছে অল ইন্ডিয়া ইলেকট্রিসিটি কনজিউমার্স অ্যাসোসিয়েশনের বিভিন্ন রাজ্য শাখার উদ্যোগে।
গত ১০ মার্চ, যেদিন লোকসভায় জনবিরোধী বিদ্যুৎ বিল ২০২৫ তোলার কথা ছিল, সেদিন সারা দেশের বিভিন্ন রাজ্যের জেলায় জেলায় এই বিলের প্রতিলিপি পুড়িয়ে ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ সচিবের আহ্বানে এক সর্বভারতীয় সভায় এই বিদ্যুৎ বিলের ওপর অল ইন্ডিয়া ইলেকট্রিসিটি কনজিউমার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং অল বেঙ্গল ইলেকট্রিসিটি কনজিউমার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিরা তাঁদের যুক্তিপূর্ণ বিরোধিতা উপস্থাপন করেছেন। পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলির গ্রাহক প্রতিনিধিদের নিয়ে আসামের গুয়াহাটিতে এবং দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলির প্রতিনিধিদের নিয়ে কর্ণাটকের ব্যাঙ্গালোরে আঞ্চলিক গ্রাহক কনভেনশন করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের জেলাস্তরে ও ব্লক স্তরে গ্রাহক কনভেনশন করে এলাকায় এলাকায় স্মার্ট মিটার প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
গত ১২ জুন ২০২৫, পশ্চিমবাংলার বিদ্যুৎ মন্ত্রী বিধানসভায় দাঁড়িয়ে ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছিলেন যে ‘স্মার্ট মিটার বন্ধ।’ আসামে টাটা পাওয়ার ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছিল নতুন করে তারা আর স্মার্ট মিটার লাগাবে না। অবশেষে এই দীর্ঘ আন্দোলনের পথ বেয়ে কেন্দ্রের বিদ্যুৎমন্ত্রী ২ এপ্রিল বলতে বাধ্য হলেন যে, ‘স্মার্ট মিটার লাগানো বাধ্যতামূলক নয়।’ তাই এই জয় সারা দেশের বিদ্যুৎ গ্রাহক আন্দোলনের বিশাল জয়। এই জয়ের বার্তা দেশের সমস্ত রাজ্যগুলোতে সাধারণ গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দিয়ে লাগিয়ে দেওয়া স্মার্ট মিটার খুলে নেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বিদ্যুৎ গ্রাহকদের সর্বভারতীয় সংগঠন আইকা, তারা দাবি করেছে– আরডিএসএস স্কিম বাতিল, স্মার্ট মিটার বাতিল এবং ‘বিদ্যুৎ আইন সংশোধনী বিল ২০২৫’ প্রত্যাহারের দাবি যত দিন না আদায় হয় তত দিন এই গ্রাহক আন্দোলনকে আরও তীব্র করার সংকল্প নিতে হবে। কারণ দলমত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনই জনগণের দাবি আদায়ের একমাত্র পথ।
সেই পথ চিনে নিয়ে তাকে শক্তিশালী করাই আজ সময়ের আহ্বান। লাগানো স্মার্ট মিটার খুলে নিতে হবে, ক্ষুদ্র শিল্পে বর্ধিত মিনিমাম চার্জ প্রত্যাহার করতে হবে, গৃহস্থের ২০০ ইউনিট পর্যন্ত এবং কৃষিতে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ দিতে হবে– এই দাবিতে আগামী ২ জুন রাজ্যের বিদ্যুৎ গ্রাহকদের বিদ্যুৎ ভবন অভিযানে দলে দলে যোগদান করতে আহ্বান জানিয়েছে অ্যাবেকা।