এরাই পাড়ায় পাড়ায় বুথ কন্ট্রোল করে, তাই এত তোয়াজ

দীর্ঘ দিন ধরে রাজ্য সরকার নানা অছিলায় ক্লাবগুলিকে টাকা দিয়ে আসছে। বছর তিনেক শুরু হয়েছে পুজো কমিটিগুলিকে টাকা দেওয়া। কয়েক দিন আগে পুজো কমিটিগুলিকে ৬০ হাজার টাকা করে পুজো-অনুদান দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী, যা গত বছরের থেকে ১০ হাজার টাকা করে বেশি। রাজ্যের ৪৩ হাজার পুজো কমিটিকে এ টাকা দিতে সরকারের খরচ হবে ২৫৮ কোটি টাকা। মুখ্যমন্ত্রী বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থাগুলিকে পুজো কমিটিগুলির বিদ্যুতের বিলে ছাড় ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬০ শতাংশ করার অনুরোধ করেছেন। সঙ্গে মনে করিয়ে দিয়েছেন, বিজ্ঞাপন বাবদ কোনও কর দিতে হয় না। এর সাথে আবার যোগ হয়েছে দুর্গাপুজোর স্বীকৃতি উৎসবে স্কুল-কলেজ-অফিস বন্ধ করে ১ সেপ্টেম্বরে মিছিল। এর টাকাও যোগাবে সরকার। সব মিলিয়ে পুজোবাবদ সরকারের খরচ বেড়ে গেল বিপুল অঙ্কের।

রাজ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান প্রভৃতি জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির হাল তলানিতে। মূল্যবৃদ্ধি আকাশ ছুঁয়েছে। কোভিডের আক্রমণ এবং লকডাউনে বিরাট সংখ্যক মানুষ রোজগার হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। জনজীবনের অপরিহার্য বিদ্যুতের দামের জন্য বহু মানুষ তা ব্যবহার করতে পারছে না। স্কুলগুলিতে শিশুদের খাবারের জন্য বরাদ্দ হাস্যকর রকমের কম। হাসপাতালগুলিতে বরাদ্দ যৎসামান্য, ওষুধের সংখ্যাও কমিয়ে চলেছে সরকার। এসব প্রতিটি ক্ষেত্রে সরকার বলছে, ‘টাকা নেই’। অথচ, পুজো কমিটিকে টাকা দেওয়ার ঘোষণার সময় মুখ্যমন্ত্রী বললেন, ‘আমার ভাঁড়ার শূন্য। মা দুর্গা ভাঁড়ার ভর্তি করবেন আশা করি।’ মুখ্যমন্ত্রীর এমন আশা শুধু পুজো কমিটিগুলিকে টাকা দেওয়ার বেলাতেই কেন? এই ধরনের আজগুবি কথা বলার আগে মুখ্যমন্ত্রী একবারও ভাবলেন না যে, রাজ্যে কর্মসংস্থানের কী ভয়ানক দুর্দশা! বেকারে রাজ্য ছেয়ে গেছে। যোগ্য প্রার্থীরা রাস্তায় বসে রয়েছেন প্রায় দু বছর ধরে। অথচ বছর বছর এই পরিমাণ সরকারি টাকায় কতজনের স্থায়ী কর্মসংস্থান হতে পারে সে হিসেবটাও মুখ্যমন্ত্রী করলেন না। উদাহরণ হিসেবে, বছরে ২৫৮ কোটি অনুদান যদি বন্ধ করা হয়, তা হলে সেই টাকায় মাসে ২০ হাজার টাকা বেতনে ১০/১১ হাজার জনের স্থায়ী চাকরি হয়। অথচ, এই পথে সরকার হাঁটছে না।

কেন হাঁটছে না? কারণ ভোটসর্বস্ব অন্য দলগুলির মতোই তৃণমূল সরকারেরও আসল লক্ষ্য– জনগণের দুর্দশাগুলি লাঘবের দুরূহ চেষ্টার পরিবর্তে সস্তা জনপ্রিয়তার রাজনীতিতে জনগণের সমর্থন আদায় করা। বছরে ১০ হাজার জনের স্থায়ী চাকরির থেকেও ৪৩ হাজার পুজো কমিটির সঙ্গে যুক্ত লক্ষ লক্ষ সদস্যের সমর্থন পাওয়া সেই লক্ষে্যরই অংশ। যে কমিটিগুলি এই টাকা পাবে তারা স্বাভাবিক ভাবেই শাসক দলের প্রতি আনুগত্য প্রকাশে বাধ্য হবে। এই সব কমিটি, ক্লাবের সদস্যরাই গত কর্পোরেশন, পৌরসভা কিংবা পঞ্চায়েত নির্বাচনে যেমন নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করেছে, তেমনই দেদার ছাপ্পা ভোট দিয়ে শাসক দলকে ক্ষমতা ধরে রাখতে সাহায্য করেছে। ভোটসর্বস্ব এই সব দলগুলির নীতিহীন রাজনীতি আজ যে পর্যায়ে নেমেছে তাতে জনস্বার্থে কাজ করে মানুষের সমর্থন আদায় করার সময়সাপেক্ষ, অপেক্ষাকৃত কঠিন রাস্তায় হাঁটার চেয়ে এমন সস্তা রাস্তা নেওয়াতে তারা আর বিন্দুমাত্র লজ্জাবোধ করে না। এ তাদের দেউলিয়া রাজনীতিরই স্পষ্ট পরিচয়। এই ভাবেই এই সব দল সাধারণ মানুষের মৌলিক সমস্যাগুলিকে পিছনে ঠেলে দিয়ে গুরুত্বহীন বিষয়গুলিকে সামনে নিয়ে এসে হইচই বাধিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে।

ক্লাবগুলি, যারা দীর্ঘদিন ধরে স্বাধীন ভাবে কাজ করে এসেছে, তারাই আজ শাসক দলের অনুদানের প্রলোভনে নিরপেক্ষতা বিসর্জন দিয়ে শাসক দলের ধামাধরা হয়ে পড়ছে। শাসক দলের নেতারা যত দুর্নীতিগ্রস্তই হোন, তবুও তাঁদেরই এই সব ক্লাব এবং কমিটিগুলি আজ প্রেসিডেন্ট কিংবা প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে।

তৃণমূলের এক নেতা বলেছেন, ‘‘দুর্গাপুজো আজ বাংলার গণ্ডি, দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। ইউনেস্কো স্বীকৃতি দিয়েছে। এত হাজার পুজো কমিটিকে মুখমন্ত্রী যেভাবে আর্থিক সাহায্য করেছেন, সেটা কোনও সরকার করতে পারেনি। ভাবটা এমন যেন সরকার একটা বিরাট কাজ করেছে? ইউনেস্কো দুর্গাপুজোকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ভাল কথা। কিন্তু ইউনেস্কো দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়েও তো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশেষত, স্কুলগুলিতে শিক্ষকের অভাব (পশ্চিমবঙ্গে ১.১ লক্ষ শিক্ষকের শূন্যপদ রয়েছে), পরিকাঠামোর অভাব নিয়ে যে পরিসংখ্যান ইউনেস্কো জানিয়েছে, সেগুলি নিয়ে তো এই সব নেতামন্ত্রীদের কোনও উদ্বেগ দেখা গেল না?

শারদোৎসব বহু কাল ধরে বাংলায় হয়ে এসেছে। তৃণমূল কংগ্রেস সরকার না থাকলেও তা হবে। উৎসবকে ভোট রাজনীতির হুল্লোড়ে পরিণত করা কি এই উৎসবের ঐতিহ্যের সঙ্গে মেলে? তা ছাড়া সরকারের কাজ কি পুজো কমিটিগুলিকে আর্থিক সাহায্য দেওয়া? এটি কি জনস্বার্থের মধ্যে পড়ে? এটি কি ধর্মীয় উৎসবকে কৌশলে ভোট রাজনীতির কাজে ব্যবহার নয়? সরকারি কোষাগারের বৃহদংশ খেটে খাওয়া মানুষের কষ্টার্জিত টাকা। সেই খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ চায় না তা কেউ ইচ্ছামতো অপব্যয় করুক, তা দিয়ে কোনও ভাবেই তোষণমূলক কাজ করুক। অবিলম্বে সরকার জনগণের টাকার এমন অপব্যয় বন্ধ করুক।

………………….

পুজো কমিটিকে দেদার সরকারি টাকা। প্রতিবাদ এসইউসিআই(সি)-র

দুর্গাপুজো কমিটিগুলিকে ৬০ হাজার টাকা করে অনুদান দেওয়া প্রসঙ্গে এসইউসিআই(সি) রাজ্য সম্পাদক চণ্ডীদাস ভট্টাচার্য ২২ আগস্ট এক বিবৃতিতে বলেন,

জনপ্রিয় এই উৎসব রাজ্যের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত যোগদান ও সহায়তার মধ্য দিয়েই এতদিন হয়ে এসেছে। তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসার পর কমিটিগুলিকে যে আর্থিক সাহায্য দেওয়া শুরু করে তা নির্বাচনসর্বস্ব রাজনীতিরই স্বার্থে, যার সাথে জনস্বার্থের কোনও সম্পর্ক নেই। রাজ্যে চরম আর্থিক সংকট চলছে। ফলে আশাকর্মী সমেত নানা ধরনের স্কিম ওয়ার্কাদের বেতন বৃদ্ধি, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আর্থিক সাহায্য বা সরকারি কর্মচারীদের ডিএ দিতে সরকার ব্যর্থ হচ্ছে। এই প্রেক্ষিতে পুজো কমিটিগুলিকে অনুদান দেওয়া বা তা বাড়ানোর আমরা তীব্র প্রতিবাদ করছি।