Breaking News

নয়ডার শ্রমিক বিক্ষোভ প্রমাণ করল মে দিবস আজও প্রাসঙ্গিক

১ মে আবার একটা মে দিবস চলে গেল। ১৪০ বছর আগে ১৮৮৬ সালে অমানবিক পরিবেশে উদয়াস্ত কাজ করানোর প্রতিবাদে ৮ ঘণ্টা শ্রমসময়ের দাবিতে আমেরিকার শিকাগো সহ নানা শহর শ্রমিক ধর্মঘটে উত্তাল হয়ে উঠেছিল। ১ থেকে ৪ মে দফায় দফায় পুলিশের গুলিতে ১০ জনের বেশি শ্রমিকের মৃত্যু হয়। আহত হন বহু শ্রমিক। বিচারের প্রহসনে ৪ জন নেতার ফাঁসি হয়। জেলের ভিতর রহস্যজনক মৃত্যু হয় ১ জনের। ১৮৮৯ সালে প্যারিসে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সম্মেলন থেকে ওই দিনটিকে শ্রমিক সংহতি দিবস হিসাবে পালন করার ঘোষণা হয়। সেই থেকে বিশ্বের প্রান্তে প্রান্তে শ্রমিক-মেহনতি মানুষ দিনটি মর্যাদার সঙ্গে পালন করেন। কিন্তু আজ থেকে প্রায় দেড়শো বছর আগে তোলা ওই দাবি আজও কতটা প্রাসঙ্গিক, সাম্প্রতিক উত্তরপ্রদেশের নয়ডা সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের উত্তাল শ্রমিক বিক্ষোভ তার প্রমাণ।

১৩ এপ্রিল উত্তরপ্রদেশের নয়ডায় ন্যূনতম বেতন বৃদ্ধি, উন্নত কাজের পরিবেশ ও ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে বিক্ষোভে ফেটে পড়লেন ৪৫ হাজারের বেশি শ্রমিক। সেখানে কাজের পরিবেশ অত্যন্ত খারাপ। ১০ বছরের বেশি মজুরি বাড়ানো হয়নি। অথচ ন্যূনতম মজুরি আইন ১৯৪৮ অনুযায়ী, যা নয়া শ্রমবিধিতেও রয়েছে– তাতে বেতনের ‘বেসিক’ সংশোধন করা অর্থাৎ বাড়ানোর কথা রয়েছে। শ্রমিকদের দিনে ১২ ঘণ্টারও বেশি কাজ করতে হয়। ওভার টাইম করলে যে টাকা দেওয়া হয়, তা নামমাত্র। কর্মক্ষেত্রে মহিলা শ্রমিকদের নিরাপত্তা নেই। সে কারণেই নয়ডার পোশাক শিল্প ও গাড়ির যন্ত্রাংশ নির্মাণ শিল্পের শ্রমিকরা ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। নয়ডার গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলি ও জাতীয় সড়ক অবরোধ করেন তারা। বিজেপির ডজন ডজন কেন্দ্রীয় নেতা শুধু নয়, খোদ প্রধানমন্ত্রী, উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী সকলেই যখন ভোটের প্রচারে পশ্চিমবঙ্গে এসে শ্রমিক কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে গলা ফাটাচ্ছিলেন সেই সময়য়েই এই বিক্ষোভ দমনে বিজেপি সরকারের পুলিশ বেপরোয়া লাঠি চালিয়েছে। মহিলা শ্রমিকরাও রেহাই পাননি। আহত হয়েছেন বহু শ্রমিক, গ্রেপ্তার হয়েছেন কয়েকশো। আন্দোলন করার অপরাধে বহু শ্রমিককে কাজ থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। আন্দোলন সমর্থন করার অপরাধে এআইইউটিইউসি-র উত্তরপ্রদেশ রাজ্য সম্পাদককে গৃহবন্দি করে রেখেছিল প্রশাসন। এখনও বহু শ্রমিক জেলবন্দি রয়েছেন।

শুধু নয়ডা শিল্পাঞ্চলে নয়, আজ গোটা দেশে শ্রমিকরা অসহনীয় দুর্দশার মধ্যে কাজ করে চলেছেন। এঁদের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বিষহ পরিস্থিতি ঠিকা শ্রমিকদের। বকেয়া বেতন না দেওয়া, ক্ষতিপূরণ না দিয়ে ইচ্ছামতো ছাঁটাই, দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করানো, সরকার নির্ধারিত নূ্যনতম মজুরি না দেওয়া –এ সব এখন কারখানাগুলির স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। বহু কারখানায় বিশুদ্ধ খাবার জল, এমনকি উপযুক্ত শৌচালয়ের ব্যবস্থাও নেই। সম্প্রতি কর্মক্ষেত্রে যথাযথ নিরাপত্তা না থাকার মাশুল দিতে হয়েছে বিজেপি শাসিত ছত্তিশগড়ের তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে বয়লার ফেটে ঝলসানো ২০-র বেশি শ্রমিককে। বহু জায়গায় শ্রমিকরা শুধুমাত্র মৌখিক চুক্তিতেই মালিকের নির্দেশমতো কাজ করতে বাধ্য হন। চুক্তি শ্রমিকের সংখ্যা ঠিকাদার ছাড়া কেউ জানে না। ফলে এঁদের পিএফ, গ্র্যাচুইটি, ইএসআই দূরের কথা, কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে তাদের হদিশ পাওয়াই দুরূহ। উত্তরপ্রদেশ, গুজরাট, রাজস্থান, হরিয়ানার মতো বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ কাজ করছেন কোনও লিখিত চুক্তি ছাড়াই।

পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভের রিপোর্ট, সারা দেশে ৫৮ শতাংশ মানুষ কোনও লিখিত চুক্তি ছাড়াই বিভিন্ন সংস্থায় কাজ করছেন (বর্তমান-১৭ এপ্রিল)। কিছু দিন আগে কলকাতার আনন্দপুরে গাদাগাদি ঘরের মধ্যে বন্দি বহুজাতিক মোমো কারখানা ও ডেকরেটরের গুদামে ১৮ জন শ্রমিক দমবন্ধ হয়ে মারা যান। কর্মচারীদের সংখ্যা নথিভুক্ত না থাকার কারণে মৃত কম¹দের সঠিক সংখ্যা সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো সম্ভব হয়নি। এই অমানবিক পরিস্থিতিতে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে মালিকের মুনাফা জুগিয়ে চলেছেন শ্রমিকরা। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওযায় মাঝে মাঝেই বিক্ষোভে ফেটে পড়ছেন তাঁরা। মাস দুয়েক আগে বিহারের বারাউনিতে হাজার হাজার ঠিকা শ্রমিক আন্দোলনে পথে নেমেছিলেন। দেশের প্রায় সর্বত্র বিশেষ করে বিজেপি শাসিত ‘ডবল ইঞ্জিন’ রাজ্য– উত্তরপ্রদেশের গুরগাঁও, নয়ডা, হরিয়ানার পানিপত, মানেসর, বিহারের বারাউনি, গুজরাটের সুরাট– গত দু’মাসে সর্বত্র পথে নেমে বিক্ষোভ দেখাতে বাধ্য হয়েছেন শ্রমিকরা।

মে দিবস উপলক্ষে উত্তরাখণ্ডের গাড়োয়ালে সভা

সরকারের বিরুদ্ধে শ্রমিকরা ক্ষুব্ধ কেন? কারণ মুনাফা সর্বোচ্চ করার জন্য মালিকরা শ্রমিক-শোষণ বাড়িয়েই চলেছে। আর তার সেবক সরকারগুলি মালিকদের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে শ্রমিকদের বহু লড়াইয়ে অর্জিত অধিকারগুলি একের পর এক ছিনিয়ে নিচ্ছে।

একদিকে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত শিবিরের পতন ও শ্রমিক আন্দোলনের দুর্বলতার ফলে পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী শক্তি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। অন্য দিকে দেশের তথাকথিত বৃহৎ বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়নগুলির মালিকদের সাথে সমঝোতার ফলে শ্রমিক আন্দোলন দিশাহীন হয়ে পড়ায় মালিকদের দাঁত-নখ বেরিয়ে পড়েছে। মুনাফা বৃদ্ধির লক্ষে্য তারা শ্রমিকদের উপর যে কোনও দমন-পীড়ন নামিয়ে আনতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করছে না। যথেচ্ছ শ্রমিক-শোষণের জন্য নয়া শ্রমকোড চালু করে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার শ্রমিকদের আইনি অধিকারকে নস্যাৎ করে দিয়ে শ্রমিক-শোষণ আরও তীব্র করেছে।

উত্তরপ্রদেশে শ্রমিক বিক্ষোভের পর মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ প্রথমে শ্রমিক প্রতিনিধি ও কারখানা কর্তৃপক্ষকে নিয়ে বৈঠক করে কমিটি গড়ার কথা বলেছেন। কিন্তু সেটা ওই রাজ্যে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে শ্রমিক-বিক্ষোভে জল ঢালার চেষ্টা, তা স্পষ্ট। এর পরেই যোগী আদিত্যনাথ শাসানির সুরে বলেছেন, যারা বিক্ষোভ দেখিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিক্ষোভকারীদের ‘বহিরাগতক্স, ‘পাকিস্তানের দালাল’ ইত্যাদি বলে দাগিয়ে দিয়ে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিগুলিকে লঘু করে দেখানোর চেষ্টাও করেছেন তিনি। নয়ডাতে বিক্ষোভের পর যোগী আদিত্যনাথ সরকার উত্তরপ্রদেশে বিধানসভা ভোটের আগে বড় ধরনের শ্রমিক অসন্তোষকে চাপা দিতে ১৪ এপ্রিল থেকে অদক্ষ শ্রমিকের মজুরি ১১ হাজার ৩১৩ টাকা থেকে বাড়িয়ে মাত্র ১৩ হাজার ৬৯০ টাকা করেছে। বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির সাথে পাল্লা দেওয়ার পক্ষে তা অত্যন্ত কম। ফলে শ্রমিকরা অন্তত ২০ হাজার টাকা বেতনের দাবি পূরণের আন্দোলন জারি রেখেছেন।

নয়ডায় শ্রমিক বিক্ষোভে বিজেপি সরকারের লাঠিচার্জের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে এআইইউটিইউসি। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক শঙ্কর দাশগুপ্ত ১৪ এপ্রিল আন্দোলনকারী শ্রমিকদের অবিলম্বে মুক্তি ও আহতদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। সাথে সাথে সমস্ত শ্রমিক সংগঠনগুলিকে বিজেপি সরকারের কর্পোরেট-বান্ধব নীতি এবং মালিকী-শোষণ নীতিকে প্রতিহত করার জন্য ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন।

এ বারের মে দিবস আরও একবার স্মরণ করিয়ে দিয়ে গেল যে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শ্রমিকের ওপর মালিকের শোষণ নির্যাতন বাড়তেই থাকবে। শাসক দলগুলিও নিজেদের গদি টিকিয়ে রাখার স্বার্থে মালিক শ্রেণিকে সাহায্য করে যাবে, যতদিন না শ্রমিক শ্রেণি চরম বৈষম্যে ভরা এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থাটাকে গোড়া থেকে উপড়ে ফেলে।

দেশের যে শ্রমিকশ্রেণি রক্ত-ঘাম ঝরিয়ে দেশের সম্পদ বৃদ্ধি করে, নিজেদের হাড়ভাঙা শ্রমে মালিকের মুনাফা বাড়ায়, আজ তাদের শপথ নিতে হবে সঠিক শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার,আন্দোলন গড়ে তোলার, যাতে পুঁজিবাদের সেবক সমস্ত দলের মুখোশ খুলে ফেলা যায়। মালিক শ্রেণিকেও বুঝিয়ে দেওয়া যায় যে, শ্রমিকরাই শেষ কথা বলে, মালিকরা নয়।