মহান নেতা কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষা থেকে
‘‘কেউ ভাবতে পারে, আমি একটু লেখাপড়া শিখে ডাক্তার হব, এটা হল অনারেবল ওয়ে (সম্মানজনক)। কিন্তু ডাক্তার হলেও তো হবে না। কারণ এই সমাজে ডাক্তার যদি এথিক্স অফ মেডিকেল সায়েন্স-কে আপহোল্ড করে (নিয়ে চলে), ডাক্তারের নোবল লাইফ লিড করতে (মহৎ জীবন নিয়ে চলতে) চায়, তা হলে হয়ত কখনও কখনও তাকে না খেয়ে থাকতে হবে। তার দ্বারা হয়ত প্র্যাক্টিসও তেমন হবে না এবং সে নামও করতে পারবে না এবং টাকাপয়সাও তার হবে না। কেউ হয়ত তাকে ব্যাক (মদত) করবে না। সে একটা পাগল বলে গণ্য হবে। সর্বস্তরে তার রীতিনীতি, নৈতিকতা, মেডিকেল এথিক্স নিয়ে সংঘর্ষ হবে। ফলে সে কিছুই করতে পারবে না। তা হলে মেডিকেল এথিক্স বা বিজ্ঞানের যে এথিক্স, একজন বিজ্ঞানী বা ইঞ্জিনিয়ার বা কেমিস্ট হোক বা ফিজিক্সের ছাত্র হোক, তার কোনও কিছু পরোয়া না করে, হোয়াট ইজ দ্য এথিক্স অফ সায়েন্স– তার পরোয়া না করে তিনি যদি নিজেকে গোলাম, চাকুরিজীবীতে পর্যবসিত করেন, পয়সার বিনিময়ে টাটার কাছে, না হয় বিড়লার কাছে, না হয় কোনও ফার্মের কাছে, না হয় গভর্নমেন্টের কাছে, নিজের বিবেক বিক্রি করেন, হ্যাঁ তা হলে তার পয়সা হবে, নাম হবে। এই তো? কিন্তু সে যদি ভাবে যে না না, আমি তো ওয়াগন ব্রেক করে বা রেস খেলে বা গুন্ডাদল তৈরি করে টাকা করে তো নাম করিনি, আমি ডাক্তারি করে নাম করেছি, ফাঁকি দিয়ে নয়। কিন্তু তুমি কি জানো যে শুধু ডাক্তারি করে তুমি নাম করোনি। ডাক্তারির সঙ্গে তুমি গোলামি করেছ, তোষামোদি করেছ। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সাথে গোলামি করেছ, তোষামোদি করেছ। অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেছ। মানব সভ্যতার চরম দুশমনদের কুকার্যগুলোকে চুপ করে থেকে হজম করেছ। তাদের কাছে নিজের বিদ্যাবুদ্ধি জ্ঞান বিকিয়ে দিয়েছ। তবে তুমি পয়সা করেছ। এর নাম কি মর্যাদা? এই মর্যাদার জন্য সিদ্ধার্থবাবুর দল দৌড়চ্ছে, অন্য দলগুলো দৌড়চ্ছে। পৃথিবীতে দু’দল মানুষ আছে। একদল মানুষ ঠুনকো মর্যাদার জন্য দৌড়তে থাকে। আর এক দল মর্যাদা বলতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র জিনিস মনে করে। মনে করে বিবেকের দংশন কী করতে বলে, মনে করে সত্যিকারের প্রগতি আছে সেখানেই যেখানে সমাজের অগ্রগতি নিহিত রয়েছে, যে অগ্রগতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রত্যেকটি ব্যক্তি মানুষকে তার কূপমণ্ডুকতা, দুর্বলতা, লোভ, ভয়-ভীতি থেকে মুক্ত করা এবং সেই রাস্তায় মাথা উঁচু করে সংগ্রাম করা। সমাজকে শোষণমূলক অবস্থা থেকে মুক্তি দেওয়া, অবিরাম সমাজের পরিবর্তন আনা। আর সমাজের এই পরিবর্তন আনার মধ্য দিয়ে নিজের মধ্যে পরিবর্তন আনা এবং তার বিকাশের রাস্তা খুলে দেওয়া।
আজ সমাজের সমস্ত পরিবেশটা হল কুসংস্কারাচ্ছন্ন। আমি তো একটা মানুষ বা সোসাল বিইং! আমি সচেতন শুভবুদ্ধি নিয়ে ঘরে বাইরে, সমাজে, চাকরির ক্ষেত্রে, সর্বত্র এই যে বিরুদ্ধ পরিবেশ তাতে আমি ঠিক থাকতে পারি না। কারণ, এই সমাজের উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে আমাকে বাঁচতে হবে। আর এই বাঁচার দুটো রাস্তা আছে। একটা হল এই অবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা, প্রতিবাদ করা, এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করা এবং এই লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে না খেয়ে মরলেও মাথা উঁচু করে চলা। আর না হয়, লেখাপড়া শিখে শিক্ষার অভিমান নিয়ে শেষ পর্যন্ত গোলামি করা, মাথাটাকে বিকিয়ে দেওয়া। এই উৎপাদন ব্যবস্থা এবং অন্যায় ব্যবস্থার সাথে এই যুক্তি সেই যুক্তি খাড়া করে গোলামির পক্ষে ওকালতি করা। অন্য দিকে এই পরিবেশের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে যে এগোতে শুরু করল সে মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের মর্মবস্তু গ্রহণ করতে শিখবে। তার কিছু চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকবে না।
আর একটা বিষয়ও বুঝতে হবে। এই সমাজে স্নেহ-মমতার বন্ধন কি শুধু পরিবারের মধ্যেই রয়েছে? জ্ঞান অর্জন করার সঙ্গে সঙ্গে ফ্রিডম কথাটার যথার্থ মানে বুঝলে সে বুঝতো, কোটি কোটি মানুষের সঙ্গে রয়েছে আমার হৃদয়ের কারবার। ঘরের পাঁচজন লোক চোখের জল ফেলবে বলে সত্য পথে আমি পা বাড়াতে পারলাম না– এর নাম কি স্নেহ-মমতাকে স্বীকার করলাম? না। স্নেহ-মমতা আর দুর্বলতা এক জিনিস নয়। স্নেহ-মমতা তো মানুষকে দুর্বল হতে বলে না। কাপুরুষতা মানুষকে দুর্বল হতে বলে। স্নেহ-মমতার সাথে কোনও বিরোধ নেই বিপ্লবের। কিন্তু স্নেহ-মমতা আমাকে দুর্বল হতে বললে আমি দুর্বল হব কেন? মমতা আছে বলে আমি দুর্বল হব কেন? মমতা আছে বলে আমি বিবেক ছাড়ব কেন? মমতা আছে বলে আমি সত্য পথ পরিত্যাগ করব কেন? এইগুলো যার গোলমাল হয় না, তার তো এ রকম প্রশ্ন মনের মধ্যে আসতে পারে না। আর এই ধরনের প্রশ্নে গোলমাল বা হবে কেন? গোলমাল হয় তার, যে এ সব প্রশ্ন ভাল করে বোঝে না, পরিষ্কার করে বোঝে না। নতুন নতুন কর্মীরা এ সব কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে ভাবতে শুরু করল– কোথায় যাব, কোথায় থাকব? তার মানে কী? সে এই কোটি কোটি মানুষের মধ্যে থাকার জায়গা দেখতে পায় না। তার মানে দে হ্যাভ নট লার্নড টু ওয়ার্ক উইথ দ্য মাসেস (তারা জনগণের সঙ্গে থেকে কাজ করতে শেখেনি)। সেইজন্যই বলছি যে, জ্ঞান ক্রিয়াধর্মী হয় তখন, যখন ফ্রিডম সম্বন্ধে সত্য জ্ঞান আমাকে প্রথমেই জনসাধারণকে সংগঠিত করার মধ্যে নিয়ে যায়, পার্টি সংগঠন গড়ার মধ্যে নিয়ে যায়। আই লিভ ইন দ্য পার্টি, আই লিভ উইথ দ্য মাসেস, অ্যামং দ্য মাসেস (আমি দলের মধ্যে থাকি, জনগণের সঙ্গে থাকি, জনগণের মাঝে থাকি)। এ জায়গায় আমার বিরোধ হচ্ছে না। খাওয়া, না-খাওয়া, চলা-বসা, দুঃখ-কষ্ট সবই এ ভাবে ভাবতে শিখি। ফলে একদল এক সম্পর্ক ভেঙে আর এক সম্পর্ক গড়ে তোলে। পরিবারের পাঁচটা লোকের সঙ্গে সম্পর্ক গিয়েছে, পাঁচশো লোকের সঙ্গে হৃদয়ের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তা আরও গভীর, আরও মমতায় ভরপুর, আরও রসপূর্ণ। এই তো বিপ্লবীর জীবন। যে এটা বোঝে তার তো এ সব প্রশ্ন ওঠার জায়গাই নেই।’’
বিপ্লবী জীবনই সর্বাপেক্ষা মর্যাদাময়– শিবদাস ঘোষ
লেখাটি গণদাবী ৭৭ বর্ষ ৩৪ সংখ্যা ৪-১০ এপ্রিল ২০২৫ প্রকাশিত