‘প্রতিরক্ষা খাতে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি কাদের রক্ষা করতে’ (৭৭ বর্ষ ২৭ সংখ্যা, ১৪ ফেব্রুয়ারি) লেখাটিতে সঠিক ভাবেই বলা হয়েছে যে, ইউক্রেন এবং প্যালেস্টাইন যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু, লক্ষ লক্ষ মানুষের আহত হওয়া এবং বিস্তীর্ণ এলাকার ঘরবাড়ি, স্কুল, হাসপাতাল ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে গুঁড়িয়ে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়ার পরও পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলি কেউই যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ নিচ্ছে না। বাস্তব তথ্যের দিকে তাকালে বুঝতে অসুবিধা হয় না কেন এই রাষ্ট্রগুলি কেউই শান্তি স্থাপনের উদ্যোগ নিচ্ছে না। এমনকি ভারতও মুখে শান্তির কথা বললেও উভয় যুদ্ধেই ভারতীয় যুদ্ধাস্ত্র উৎপাদন কোম্পানিগুলির অস্ত্র কাজ করছে। ক’দিন আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন যে, গত তিন বছরের যুদ্ধে আমেরিকা ইউক্রেনকে ৩০ হাজার কোটি ডলার মূল্যের সহায়তা করেছে। বলা বাহুল্য, এই সহায়তা আসলে অত্যাধুনিক অস্ত্র ও যুদ্ধ সরঞ্জাম জুগিয়ে সহায়তা। এই সুযোগে মার্কিন অস্ত্র উৎপাদন কোম্পানিগুলি ফুলে-ফেঁপে লাল হয়ে উঠেছে (সূত্রঃ আবাপ, ৫ ফেব্রুয়ারি)। সম্প্রতি আর একটি তথ্যে দেখা যাচ্ছে, আমেরিকার পূর্বতন প্রতিরক্ষা সচিব লয়েড অস্টিন ইউক্রেনকে অস্ত্র জোগানোর জন্য ইউরোপের রাষ্ট্রগুলিকে নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক ফোরাম তৈরি করেছিলেন। গত তিন বছরে ৫০টি রাষ্ট্র সম্মিলিত ভাবে ইউক্রেনকে ১২৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অস্ত্র এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম জুগিয়েছে (দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ১২ ফেব্রুয়ারি)। সম্প্রতি আরও একটি ঘটনা বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। ট্রাম্প এবং পুতিন ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের ব্যাপারে নাকি কথা চালাচালি করছেন। কিন্তু ইউক্রেনকে এই আলোচনায় ডাকা হয়নি। এর থেকে স্পষ্ট যে, এই যুদ্ধে হাজার হাজার ইউক্রেনীয় সৈনিক প্রাণ দিলেও এই দীর্ঘ যুদ্ধে ইউক্রেনের ভূমিকা কার্যত দাবার বোড়ের। ইউক্রেনকে সামনে রেখে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলি সবাই নিজ নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করে চলেছে। তাই যুদ্ধ বন্ধে উদ্যোগ নেওয়ার পরিবর্তে ইউক্রেনকে ‘তুমি যুদ্ধ চালিয়ে যাও, আমরা তোমার পিছনে আছি’ বলে তালি দিয়ে চলেছে।
বাস্তবে আজ সমস্ত পুঁজিবাদী রাষ্ট্রই তীব্র বাজার সঙ্কটে ভুগছে। পুঁজিবাদী তীব্র শোষণের অনিবার্য ফল হিসাবে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা তলানিতে নেমে গেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতেই মানুষ হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে, ভোগ্যদ্রব্যের বাজারে তাই তীব্র মন্দা। আর সেই সঙ্কট থেকে রেহাই পেতে অর্থনীতির সামরিকীকরণের রাস্তাকেই বেছে নিয়েছে রাষ্ট্রগুলি। অস্ত্র এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাণ আজ প্রতিটি অগ্রসর পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের প্রধান উৎপাদন হয়ে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদিত অস্ত্র খালাস করা এবং আরও উৎপাদন বাড়ানোর জন্যই তাদের যুদ্ধ চাই। তাই যুদ্ধ বাধানোই আজ তাদের প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। অথচ যতদিন সমাজতান্ত্রিক শিবির ছিল, তত দিন তাদের ঘোষিত নীতি ছিল, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের। এই নীতিতে ঘোষণা করা হয়েছিল, সমাজতান্ত্রিক শিবির কাউকে আক্রমণ করবে না, কোনও দেশে সৈন্য পাঠাবে না, কোনও দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করবে না। সাম্রাজ্যবাদীদেরও একই নীতি অনুসরণ করতে হবে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ১৯৫৬ সালে মিশরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের সুয়েজ ক্যানেলের জাতীয়করণ ঘোষণা করলে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স তার তীব্র প্রতিবাদ করে। আমেরিকা ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের সমর্থনে নৌবহর পাঠালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আমেরিকাকে ২৪ ঘণ্টা সময় দেয় নৌবহর প্রত্যাহারের জন্য। সোভিয়েত শক্তির কাছে নতি স্বীকার করে আমেরিকা ২৪ ঘণ্টার আগেই তা প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়। এই ভাবে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েতের হস্তক্ষেপে সে দিন আরব অঞ্চলে যুদ্ধ পরিস্থিতিকে এড়ানো সম্ভব হয়। আজ সমাজতান্ত্রিক শিবিরের অনুপস্থিতিতে অন্য দেশের উপর চড়াও হওয়া, আক্রমণ করা, হত্যা ও লুঠতরাজ চালানো সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির নিত্যদিনের কাজ হয়ে উঠেছে। বাস্তবে আজ যুদ্ধ বন্ধের জন্য এক দিকে যেমন দেশে দেশে জঙ্গি শান্তি আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে, তেমনই শোষিত মানুষের মুক্তি আন্দোলনগুলিকে শক্তিশালী করার মধ্য দিয়ে শোষণমূলক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েমের সংগ্রামকে তীব্র করতেই হবে। তাবেই যুদ্ধ বন্ধ করতে পুঁজিবাদী শিবিরকে বাধ্য করা সম্ভব হবে।
মানব মিত্র, কলকাতা ৯৯