বাজারদরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নাকি চলতে পারছেন না সাংসদরা! চাল-ডাল-সবজির আগুন-ছ্যাঁকা দামে নাকি নাজেহাল হচ্ছেন তাঁরা! সে জন্য কেন্দ্রের বিজেপি সরকার তাঁদের বেতন এক লাফে ২৪ হাজার টাকা বাড়িয়ে করল ১ লক্ষ ২৪ হাজার টাকা। এ ছাড়া নির্বাচনী এলাকা ভাতা হিসাবে মাসে ৮৭ হাজার টাকা, অফিস খরচ বাবদ মাসে ৭৫ হাজার টাকা মিলিয়ে তাঁরা প্রত্যেকে প্রতি মাসে পাবেন প্রায় ৩ লক্ষ টাকা। এর সাথে অন্যান্য সুবিধা বাবদ প্রাপ্ত অর্থও বাড়ানো হয়েছে অনেকটা। প্রাক্তন সাংসদদেরও পেনশন মাসে ২৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ৩১ হাজার টাকা। এই বৃদ্ধি আবার কার্যকর হবে ২০২৩-এর ১ এপ্রিল থেকে। অর্থাৎ দু-বছরের বাড়তি টাকা পাবেন তাঁরা। এই বৃদ্ধিকে দু’হাত তুলে স্বাগত জানিয়েছে বিজেপি, কংগ্রেস, তৃণমূল, সিপিএম সহ সব শাসক দল এবং তাদের সাংসদরা। ভাতা-বৃদ্ধি অনৈতিক এবং অন্যায্য বলে প্রতিবাদে সরব হয়েছে একমাত্র এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট)।
স্বাভাবিক ভাবেই এ প্রশ্ন ওঠে, সাধারণ মানুষ যখন বাজারে গিয়ে চড়া মূল্যবৃদ্ধিতে নাজেহাল হচ্ছেন, অসুস্থদের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধটুকুও কিনতে পারছেন না, কৃষক যখন ফসলের দাম না পেয়ে আত্মহত্যার পথে যেতে বাধ্য হচ্ছেন, শ্রমিক যখন কারখানা বন্ধ হওয়ায় সন্তানের স্কুলের মাইনে দিতে না পেরে পড়া বন্ধ করে দিচ্ছেন, তখন সরকারের ভূমিকা কী? সাংসদদেরই বা ভূমিকা কী? তাঁরা কি সেই সমস্যাগুলি সমাধানের দাবি তোলেন? সরকার কি একই রকম ভাবে সাধারণ মানুষের দাবি মেনে দাম কমিয়ে দেয়, কাজের ব্যবস্থা করে, ফসলের দাম পেতে সাহায্য করে, ফি মকুব করে? উল্টে তাঁরা শিক্ষা-স্বাস্থ্য-খাদ্য সবক্ষেত্রেই বরাদ্দ ছাঁটাই করছে। তা হলে সরকার কি ‘দারিদ্রের প্রতিচ্ছবি’ দেখতে পাচ্ছে কেবল যথেষ্ট সচ্ছল সাংসদদের মধ্যেই? উল্লেখ্য, দেশের ৯৩ শতাংশ সাংসদই বহু কোটি টাকার মালিক। অথচ তাঁদের দুঃখে সরকার-মন্ত্রীদের চোখে জল আসছে! আরও আশ্চর্যের বিষয়, আশাকর্মী-মিড ডে মিল কর্মীদের হাড়ভাঙা খাটুনির পরেও তাঁদের ন্যায্য বেতন দিতে সরকার যখন টালবাহানা করে চলেছে দীর্ঘ দিন ধরে, তখন সেই সরকারেরই সাংসদদের বেতন দৃষ্টিকটু ভাবে বাড়াতে এতটুকু চক্ষুলজ্জাতেও বাধল না! এই সরকার যে আসলে কাদের, বুঝতে অসুবিধা হয় কি?
সাংসদরা হলেন জনপ্রতিনিধি। এটি কোনও চাকরি নয়, স্বেচ্ছামূলক কাজ। ভোটে জিতে জনসাধারণের সুবিধা-অসুবিধা দেখা তাঁদের কর্তব্য। কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনের ন্যূনতম প্রয়োজনটুকুও পূরণে কী ভূমিকা তাঁরা নিচ্ছেন? মূল্যবৃদ্ধি কমাতে, কাজের সুযোগ তৈরিতে, ফসলের ন্যায্য দাম পেতে কিংবা কারখানা খুলতে সাংসদদের সংসদে দাঁড়িয়ে সওয়াল করতে দেখা যাচ্ছে কি? উল্টে কোনও ভোটাভুটি ছাড়াই কয়েক মিনিটের মধ্যে সংসদে পাশ হয়ে যাচ্ছে একের পর এক জনবিরোধী বিল। সাংসদরা ব্যস্ত থাকছে কখনও ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি দিতে, কখনও পরস্পরের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে চিৎকার চেঁচামেচিতেই। এই হল পবিত্র ‘সংসদীয় গণতন্ত্র’! এ ভাবেই ইতিমধ্যে সংসদে পাশ হয়ে গিয়েছে শিক্ষাস্বার্থ বিরোধী নয়া জাতীয় শিক্ষানীতি। পাশ হয়েছে কৃষক স্বার্থবিরোধী নয়া কৃষিনীতি। চালু হয়েছে গ্রাহক স্বার্থবিরোধী বিদ্যুৎ আইন, সাধারণ মানুষের স্বার্থবিরোধী স্বাস্থ্যনীতি। এই সব ক’টিতেই সাধারণ মানুষের স্বার্থ চূড়ান্ত বিপন্ন হচ্ছে, লাভবান হচ্ছে কর্পোরেট মালিকরা। সরকারে বসে এই আইনগুলির মাধ্যমে শিক্ষা-স্বাস্থ্য-কৃষি-বিদ্যুৎ ইত্যাদি ক্ষেত্রেকর্পোরেটদের আরও মুনাফা লোটার বৈধ ছাড়পত্র দিচ্ছে মন্ত্রী-সাংসদরা। সর্বোচ্চ মুনাফার উপর দাঁড়িয়ে আছে যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা, তার সেবা করে যে সব দল, তাদের সাংসদরা কি জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধি হতে পারেন? পারেন না বলেই প্রতিটি অধিবেশনে একের পর এক জনবিরোধী বিল সহজেই পাশ হয়ে যায়। মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব নিয়ে, শিক্ষা-স্বাস্থ্যের দাবি নিয়ে সংসদ অচল হয় না। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণের স্বার্থ বলি দিয়ে তাদের প্রতি কোন দায়বদ্ধতা প্রকাশ করছেন এই জনপ্রতিনিধিরা? জনসাধারণের প্রকৃত প্রতিনিধি তারাই, যারা এই সমাজের মধ্যেও তাদের স্বার্থরক্ষায় বলিষ্ঠ ভাবে দাঁড়াতে পারেন। সংগ্রামী বামপন্থী দল এস ইউ সি আই (সি) সাংসদ-বিধায়করা তাঁদের এমন ভূমিকা বারেবারেই প্রমাণ করেছেন। ২০০৯-১৪ এই সময়কালে সংসদে ভাতাবৃদ্ধির একমাত্র প্রতিবাদ জানিয়ে ছিলেন এস ইউ সি আই (সি) সাংসদ ডাঃ তরুণ মণ্ডল। তিনি বলেছিলেন, যাদের ভোটে সাংসদরা নির্বাচিত হন, তাদের চরম আর্থিক দুর্দশার মধ্যে ফেলে রেখে নিজেদের বেতন-বৃদ্ধির দাবি চূড়ান্ত অনৈতিক। সাংসদরা খেয়ে-পরে-গাড়ি চড়ে জীবন নির্বাহ করার মতো যথেষ্ট বেতন পান, অন্যান্য অনেক সুবিধাও পান। বিদ্যুৎ, জল, টেলিফোন, ইন্টারনেট চার্জ বাবদ যথেষ্ট টাকা পান। সে জন্য সাংসদদের ভাতা-বৃদ্ধির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি সেই টাকায় তাঁর সংসদীয় এলাকা জয়নগরে সাধারণ মানুষের বিনামূল্যে শিক্ষা-চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন। দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত নীতি-আদর্শহীন দলগুলির নীতিহীন আচরণের বিরুদ্ধে এটা আজও দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।
দেশে ৫৪৩ জন সাংসদের মধ্যে যেখানে ৯৩ শতাংশ কোটিপতি, সম্পদের পাহাড় চূড়ায় বসে তাঁদের কি একবারও মনে পড়ে ক্ষুধা সূচকে ভারতের স্থান ১০৫তম, শিশু-অপুষ্টিতে প্রথম স্থানে, মহিলা-অপুষ্টিতে সামনের সারিতে? খর্বাকার-শীর্ণ শিশুর দল কঙ্কালসার চেহারা নিয়ে দুটো ভাতের আশায় মিড ডে মিলের জন্য যখন স্কুলে ছোটে, তখন নিজেদের বেতন আরও বাড়িয়ে নেওয়ার আগে কি তাদের পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার কথা এই সাংসদদের একবারও মনে পড়ে না? যে সরকার মিড ডে মিলে কখনও ১৩ পয়সা বাড়িয়ে ‘দাতা’ সাজছেন, যে প্রধানমন্ত্রী এই হতভাগ্য শিশুদের ‘মেদবৃদ্ধিতে’ আশঙ্কিত হয়ে তেলের বরাদ্দ ১০ গ্রামেরও কম করার হাস্যকর নিদান দিচ্ছেন, তাঁরাই কেমন অনায়াসে সাংসদদের মাইনে বাড়িয়ে যাচ্ছেন।
বাস্তবে এই সব দলগুলি এবং তাদের সাংসদরা সাধারণ মানুষ থেকে সম্পূর্ণ রূপে বিচ্ছিন্ন। তাই তাদের দুঃখ-কষ্ট, খিদে-অসুস্থতা, অশিক্ষা এই জনপ্রতিনিধিদের মনে এতটুকুও দাগ কাটে না। যদি কাটত তবে তাদের বঞ্চিত রেখে নিজেদের মাইনে বাড়ানোর মতো এত বড় অনৈতিক কাজ তাঁরা করতে পারতেন না।
লেখাটি গণদাবী ৭৭ বর্ষ ৩৪ সংখ্যা ৪-১০ এপ্রিল ২০২৫ প্রকাশিত