
শিশুকন্যার নিথর দেহ বুকে চেপে ধরে শেষবারের মতো বাবার আদর, কিশোর পুত্রের মৃতদেহে মুখ গুঁজে মায়ের হাহাকার– খবরের কাগজ আর সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে থাকা গাজার মর্মান্তিক ছবিগুলি সহ্যের সমস্ত সীমা ছাড়িয়ে মানুষের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। অথচ বিনা দ্বিধায় গত ১৮ মার্চ থেকে প্রতিদিন প্যালেস্টাইনের নিরীহ সাধারণ মানুষকে বোমার আঘাতে আবার ছিন্ন ভিন্ন করে চলেছে উগ্র ইহুদিবাদী ইজরায়েল। পাশে আশীর্বাদের হাত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা। এ বারের আক্রমণে এক দিনেই নিহত হয়েছেন গাজার পাঁচশো মানুষ, যার একটা বড় অংশ ফুলের মতো শিশুরা। দারাজ, গাজা ও রাফা শহরের বিভিন্ন স্কুল, যেগুলি ত্রাণশিবির হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছিল, বোমা ফেলে সেগুলিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে ইজরায়েলি যুদ্ধবিমান। হাসপাতালগুলিকেও রেহাই দেয়নি তারা।
গাজার এই ধ্বংসস্তূপ আর সর্বস্ব হারানো মানুষের আর্তনাদের বুক চিরে যে সত্যটি বেরিয়ে আসছে, তা হল– এ আসলে কোনও যুদ্ধ নয়, এ হল সাম্রাজ্যবাদের একতরফা পৈশাচিক বর্বরতা। ২০২৩-এর অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইজরায়েলের এই ধ্বংসলীলায় এখনও পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন ৫০ হাজারেরও বেশি প্যালেস্টিনীয়। মৃত শিশুর সংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার। আমেরিকার তৈরি হাজার হাজার পাউন্ডের বোমা প্যালেস্টিনীয়দের কবরস্থানে পরিণত করেছে গাজা ভূখণ্ডকে। ধ্বংস করেছে সেখানকার গোটা অর্থনীতি।
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মদতপুষ্ট ইজরায়েলের আগ্রাসনে ঘর হারিয়ে উদ্বাস্তু হতে হয়েছে ২ কোটি ৩০ লক্ষ প্যালেস্টিনীয়কে। খাবার, পানীয় জল, জ্বালানি, ওষুধের অভাবে প্রবল ভাবে বিপর্যস্ত প্যালেস্টাইনের আরব অধিবাসীদের জীবন। গাজা ভূখণ্ড ধ্বংসের যত অতলে তলিয়ে যাচ্ছে, ততই ফুলে ফেঁপে উঠছে লকহিড মার্টিন, রেথিয়নের মতো অস্ত্র উৎপাদনকারী মার্কিন একচেটিয়া কোম্পানিগুলির মুনাফার ভাণ্ডার, চড়ছে তাদের শেয়ারের দাম।
স্বাধীনতাকামী প্যালেস্টিনীয়দের উপর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মদতে ইজরায়েলের বর্বর হামলার বিরুদ্ধে বিশ্ব জুড়ে, এমনকি খোদ ইজরায়েল ও আমেরিকার ভিতরে শান্তিকামী মানুষ বিক্ষোভ ফেটে পড়লে অনিচ্ছাসত্তে্বও ইজরায়েল গত ১৯ জানুয়ারি থেকে যুদ্ধবিরতিতে যেতে বাধ্য হয়। যুদ্ধবিরতির এই চুক্তিতে তিনটি পর্যায়ের কথা বলা হয়েছিল। কথা ছিল ইজরায়েলের হাতে বন্দি প্যালেস্টিনীয়দের মুক্তির বিনিময়ে প্যালেস্টাইনের স্বাধীনতা-যোদ্ধাদের সংগঠন ‘হামাস’ মুক্ত করে দেবে বন্দি ইজরায়েলিদের। আরও কথা ছিল, কাতার ও মিশরের মধ্যস্থতায় ধীরে ধীরে এই হানাহানিকে বন্ধের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। ১ মার্চ যুদ্ধবিরতির প্রথম পর্যায় শেষ হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ের আলোচনা শুরু হওয়ার কথা ছিল বেশ কয়েক সপ্তাহ আগেই। সেই আলোচনায় বসেনি ইজরায়েল। তার বদলে ২ মার্চ থেকেই প্যালেস্টাইনে সমস্ত রকম ত্রাণ, জ্বালানি সহ মানবিক সাহায্য ঢোকার পথ বন্ধ করে দেয় তারা। ১৮ মার্চ থেকে ইজরায়েল নতুন করে হামলা শুরু করে গাজার উপর।
উল্লেখ করা দরকার, যে হামাস-এর সশস্ত্র যোদ্ধাদের নিকেশ করার নাম করে প্যালেস্টাইনে হামলা চালাচ্ছে ইজরায়েল, সেই হামাস সংগঠনটি তৈরি হয়েছিল আন্তর্জাতিক আইনকানুনকে দু’পায়ে মাড়িয়ে প্যালেস্টাইনের উপর ইজরায়েলের বর্বর হানাদারি ও আগ্রাসন রোখার উদ্দেশ্যেই। এটাও উল্লেখ্য, দু’পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতির চুক্তি যখন স্বাক্ষরিত হয়, ইজরায়েল লিখিত ভাবে স্বীকার করতে রাজি হয়নি যে, বিরতির প্রথম পর্যায় শেষ হলে তারা নতুন করে আর যুদ্ধ শুরু করবে না। কিন্তু, ইজরায়েল আবার প্যালেস্টাইনে গণহত্যা শুরু করবে না– মধ্যস্থতাকারী মিশর, কাতার ও আমেরিকার এই মৌখিক প্রতিশ্রুতিতে আস্থা রেখে হামাস যুদ্ধবিরতির শর্তে রাজি হয়েছিল। বিশ্ববাসী দেখতে পাচ্ছে, ইজরায়েল সেই প্রতিশ্রুতি সম্পূর্ণ লংঘন করেছে শুধু তাই নয়, সে দেশের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এক ভিডিও বিবৃতিতে হুমকি দিয়ে বলেছেন– ‘এ তো সবে শুরু! বন্দুকের নলেই হামাসের সঙ্গে কথা হবে’। অন্যতম মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতার মন্তব্য করেছে যে, ইজরায়েল স্পষ্টতই যুদ্ধবিরতির চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লংঘন করেছে। আরও জানা গেছে, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনার পরেই প্যালেস্টাইনের বাসিন্দা আরব মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র রমজান মাসের মধ্যেই গাজায় এই একতরফা হামলা শুরু করেছে ইজরায়েল।
এ ভাবেই বিশ্ব-সাম্রাজ্যবাদের চূড়ামণি আমেরিকা ও তার দোসর ইজরায়েল চূড়ান্ত অন্যায় ভাবে নারী-শিশু নির্বিশেষে প্যালেস্টাইনের আদি বাসিন্দা আরবদের নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে পশ্চিম এশিয়ায় নিজেদের আধিপত্য আরও বাড়িয়ে নিতে চাইছে। সমাজতান্ত্রিক শিবির এবং বিশ্বজোড়া সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী শান্তি আন্দোলনের অনুপস্থিতির কারণেই সাম্রাজ্যবাদীরা আজ বিনা বাধায় এই পৈশাচিক বর্বরতা চালিয়ে যেতে পারছে।
ভারতের শাসকদের হাতেও কিন্তু নিহত প্যালেস্টিনীয়দের রক্ত লেগে আছে। এ দেশের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার দীর্ঘ ঐতিহ্যকে পায়ে মাড়িয়ে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদি সরকার গণহত্যাকারী ইজরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে চলেছে। ইজরায়েলের এই ভয়ঙ্কর গণহত্যার বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিবাদের বদলে দেশের একচেটিয়া মালিকদের মুনাফার স্বার্থে বিপুল পরিমাণ মারণাস্ত্র জোগান দিয়ে চলেছে ইজরায়েলকে।
কাজ দেওয়ার অজুহাতে কর্মহীন ভারতীয় যুবকদের ইজরায়েলের ভাড়াটে সৈন্য হিসাবে কামানের মুখে ঠেলে দিচ্ছে এই সরকার। সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিশ্বের দেশে দেশে প্রবল বিক্ষোভে পথে নামছেন মানুষ। ভারতের শান্তি ও গণতন্ত্রপ্রিয় সাধারণ মানুষও সোচ্চার হয়েছেন প্রতিবাদে। এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট)-এর উদ্যোগে দেশের প্রান্তে প্রান্তে ধিক্কার ধ্বনিত হচ্ছে মার্কিন মদতপুষ্ট ইজরায়েলের সাম্রাজ্যবাদী হানাদারির বিরুদ্ধে।
রক্তে ভেজা গাজার মাটিতে শোয়ানো সারি সারি মৃতদেহ, মৃত শিশুদের ক্ষতবিক্ষত শরীর আর কোনও ক্রমে প্রাণে বেঁচে যাওয়া আহত, প্রবল আতঙ্কে কাঁপতে থাকা ফুলের মতো বাচ্চাদের অসহায় আর্ত দৃষ্টি আজ গোটা দুনিয়ার মানুষের কাছে আকুল আবেদন জানাচ্ছে– বন্ধ করো এই পৈশাচিক বর্বরতা। তা যদি করতে হয়, তা হলে বিশ্ব জুড়ে দেশে দেশে গড়ে তুলতে হবে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধবিরোধী গণপ্রতিরোধ। প্রতিটি দেশের সরকারকে বাধ্য করতে হবে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের সঙ্গে যে কোনও রকম সংস্রব সম্পূর্ণ রূপে ত্যাগ করতে। মেহনতি মানুষকে সঠিক নেতৃত্বে সংগঠিত করে প্রতিটি দেশে জোরদার করতে হবে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী প্রতিবাদ-প্রতিরোধ আন্দোলনের শক্তিকে। গড়ে তুলতে হবে বিশ্বজোড়া সংগ্রামী শান্তি আন্দোলন। এই উদ্যোগে নিজেকে শামিল করতে না পারলে মানুষ হিসাবে নিজের পরিচয় দেওয়ার অধিকার আমাদের থাকতে পারে কি?