এস ইউ সি আই (সি)-র পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির পূর্বতন প্রবীণ সদস্য, শিক্ষক তথা গণআন্দোলনের বিশিষ্ট নেতা কমরেড সদানন্দ বাগল ২২ মার্চ ক্যালকাটা হার্ট ক্লিনিক অ্যান্ড হসপিটালে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। দীর্ঘ দিন তিনি বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন। বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর।
কমরেড সদানন্দ বাগল ১৯৪৮-এ ছোটবেলাতেই পরিবারের সাথে পূর্ববঙ্গ থেকে এসে উত্তর ২৪ পরগণার জগদ্দলে একটি শ্রমিক মহল্লায় থাকতেন। পরে শ্যামনগরের শরৎ পল্লিতে তাঁরা চলে আসেন। তাঁর বাবা ছিলেন একজন চটকল শ্রমিক। ছোটবেলা থেকেই তিনি ডানপিটে এবং আমুদে স্বভাবের মানুষ ছিলেন। কিশোর বয়স থেকেই বামপন্থার প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল। সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের অন্যতম রূপকার মহান স্ট্যালিনের মৃত্যুসংবাদ কীভাবে জগদ্দল এলাকার শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে গভীর শোকের জন্ম দিয়েছিল, সমস্ত জুটমিল বন্ধ করে শ্রমিকরা দলে দলে খালি পায়ে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন, চোখের জলে স্ট্যালিনকে স্মরণ করেছিলেন– সে ঘটনা তিনি বারবার বলতেন।
১৯৫৩-তে তিনি ‘এসইউসি স্টুডেন্ট বুরো’র সঙ্গে যুক্ত হন। এ বিষয়ে তাঁর শিক্ষক কাঁকিনাড়ার মাদ্রাল অঞ্চলের কমরেড রতন ভৌমিকের ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৫৪-তে এআইডিএসও-র প্রতিষ্ঠা কনভেনশনে তিনি একজন প্রতিনিধি হিসাবে যোগ দেন ও কমিটিতে নির্বাচিত হন। সেই সময় কংগ্রেস ও অবিভক্ত সিপিআইয়ের বিপুল দাপটের সামনে এসইউসিআই(সি)-র রাজনীতি করাটা ছিল খুবই কঠিন। দরিদ্র পরিবারেও ছিল নানা বাধা। কিন্তু কমরেড সদানন্দ বাগল সমস্ত প্রতিকূলতার মধ্যেও মহান নেতা কমরেড শিবদাস ঘোষের চিন্তার ভিত্তিতে নিজেকে উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে থাকেন। সংগঠনের সাথে আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন এবং কিছুদিন পর ভাটপাড়া অফিসেই থাকতে শুরু করেন। কমরেড শিবদাস ঘোষ সেই অফিসে এক সময় গেছেন। পরে কলেজে ভর্তি হয়ে নৈহাটির ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র কলেজে এআইডিএসও-র প্রতিনিধি হিসাবে ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন কমরেড সদানন্দ বাগল। এই সময় তিনি প্রয়াত কমরেড তাপস দত্ত (পরবর্তীকালে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য), কমরেড সনৎ দত্ত এবং বর্তমান সাধারণ সম্পাদক কমরেড প্রভাস ঘোষের প্রত্যক্ষ সান্নিধ্যে কাজ করতে থাকেন। ষাটের দশকে গুটিকয়েক কর্মীকে নিয়ে তাঁর পৈতৃক বাড়িতেই শ্যামনগর পার্টি ইউনিট গঠন করেন। শ্যামনগরের বর্তমান পার্টি অফিস তাঁরই উদ্যোগে গড়ে উঠেছিল।
কমরেড সদানন্দ বাগল স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। পরবর্তীকালে প্রধান শিক্ষক হলেও দলের কাজের দায়িত্ব বেড়ে যাওয়ায় তিনি প্রধান শিক্ষকের পদ ছেড়ে দেন। শিক্ষক আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ছিল নেতৃত্বকারী। ১৯৭০-এর দশকে সিপিএমের সংকীর্ণ দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে দলমত নির্বিশেষে সমস্ত শিক্ষককে নিয়ে বৃহত্তর ঐক্যের ভিত্তিতে মাধ্যমিক শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতি (এসটিইএ) গড়ে তোলার উদ্যোগে তিনি ছিলেন প্রথম সারিতে। শিক্ষক আন্দোলনে তিনি রাজ্যস্তরে নেতৃত্বকারী ভূমিকা পালন করেছেন। সিপিএম সরকারের প্রাথমিকে ইংরেজি ও পাশ-ফেল প্রথা তুলে দেওয়ার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক আন্দোলনে তিনি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন।
দলের রাজ্য কমিটির প্রয়াত সদস্য কমরেড দীপঙ্কর রায় নরেন্দ্রপুরে কলেজ পড়া শেষ করে শ্যামনগরে ফিরে আসার পর কমরেড সদানন্দ বাগলের সঙ্গে যোগাযোগ করে এআইডিএসও এবং দলের কাজ শুরু করেন। কমরেড দীপঙ্কর রায়ের যোগাযোগে থাকা দৃষ্টিহীন ছাত্র-ছাত্রীদের সংগঠিত করে শ্যামনগরে দৃষ্টিহীনদের জন্য বিদ্যালয় ও লাইব্রেরি গড়ে তোলার কাজে কমরেড সদানন্দ বাগলের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তীকালে রাজ্যে দৃষ্টিহীনদের সংগঠন ও তাদের অধিকার নিয়ে আন্দোলনে কমরেড সদানন্দ বাগল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। শ্যামনগরের প্রতিষ্ঠান ও পরবর্তীকালে দক্ষিণ ২৪ পরগণার মল্লিকপুরে ব্রেল প্রেস ও দৃষ্টিহীনদের সংগঠনের কাজেও তিনি ভূমিকা নেন। জগদ্দল, নৈহাটি এলাকার জুটমিলে শ্রমিকদের মধ্যে ইউনিয়ন গড়ে তোলার কাজেও তাঁর উদ্যোগ ছিল। ’৭৪-এর রেল ধর্মঘটেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। খাদ্য আন্দোলনে তিনি গ্রেফতার হয়ে বেশ কয়েক দিন জেলও খেটেছেন। দক্ষিণ ২৪ পরগণায় দলের সংগঠনের কাজেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ সাহায্য করেছেন। ১৯৮৭-তে তিনি উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলা সম্পাদক এবং ওই বছরই তমলুকে দলের রাজ্য সম্মেলনে রাজ্য কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন।
শ্যামনগরে তাঁর বাসস্থান এলাকায় ক্লাব, সামাজিক সংগঠনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। তাঁরই উদ্যোগে গঠিত নাগরিক কমিটি সিইএসসি-র শ্যামনগর পাওয়ার হাউসের ছাইয়ের দূষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলে। শ্যামনগর-ভাটপাড়া অঞ্চলে নাগরিক কমিটির মাধ্যমে জলকর বিরোধী আন্দোলনেও তিনি নেতৃত্বকারী ভূমিকা পালন করেন। রাজ্য স্তরে মানবাধিকার আন্দোলন, পরিবহণ যাত্রী কমিটির আন্দোলনেও তিনি নেতৃত্ব দেন।
তিনি উত্তর ২৪ পরগণা জেলা সম্পাদক থাকাকালীন এবং পরবর্তী সময়েও দলের কর্মী এবং সাধারণ মানুষের সাথে নিবিড় যোগাযোগ রাখতেন। কমরেডদের, এমনকি অন্য দলের সমর্থক বহু মানুষের বাড়িতে যাওয়া ও তাদের সাথে মেশা তাঁর অভ্যাসের মধ্যেই ছিল। কথায় রসসৃষ্টির যে শৈলী তিনি আয়ত্ত করেছিলেন, তার দ্বারা তিনি যে কোনও মানুষকে উদ্দীপিত করতে পারতেন।
তাঁর চরিত্রের একটা বড় দিক হল, তাঁর থেকে বয়সে ছোট কেউ নেতৃত্বে এলেও তাঁকে মেনে অনায়াসে কাজ করতে পারতেন। জেলা বা রাজ্য স্তরে কাজ করলেও লোকালের সমস্ত কর্মসূচিতে তিনি নিজে সবসময় কিছু দায়িত্ব পালন করতেন। এক সময় জেলা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করলেও অসুস্থ অবস্থায় যখন ঠিক মতো চলাফেরা করতে পারছেন না, তখনও তিনি লোকাল সম্পাদক বা জেলা সম্পাদকের সঙ্গে কথা না বলে কোনও সিদ্ধান্ত নিতেন না। রাজনৈতিক চর্চার জন্য তাঁর প্রচেষ্টা ছিল সর্বদাই। যখন নিজে পড়তে পারতেন না, অন্যদের বলতেন দলের বইপত্র, কাগজ পড়ে শোনাতে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কমরেড সদানন্দ বাগল নিজেকে বিপ্লবী হিসেবে রক্ষা করার নিরলস সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন।
কমরেড সদানন্দ বাগল লাল সেলাম
লেখাটি গণদাবী ৭৭ বর্ষ ৩৪ সংখ্যা ৪-১০ এপ্রিল ২০২৫ প্রকাশিত