আসামে এনআরসি চূড়ান্ত জাতিবিদ্বেষী ও চরম সাম্প্রদায়িক

৫ সেপ্টেম্বর সারা ভারত প্রতিবাদ দিবসে পশ্চিম মেদিনীপুরে বিক্ষোভ

আসামে এনআরসি চূড়ান্ত জাতিবিদ্বেষী ও

চরম সাম্প্রদায়িক

এই ফ্যাসিবাদী পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করুন

আসামের শোণিতপুর এলাকার দোলাবাড়ি গ্রামে শায়েরা বেগম কুয়োতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মঘাতী হয়েছেন৷ না, এনআরসি তালিকা থেকে তাঁর নাম বাদ যায়নি৷ তাঁর নিজের এবং পরিবারের সকলেরই তালিকায় নাম আছে৷ কিন্তু তালিকা প্রকাশের আগেই পড়শিরা জানিয়েছিল, তাঁদের পরিবারের কারও নাম নেই এবং পুলিশ ধরলে তাঁদের ডিটেনশন ক্যাম্পে থাকতে হবে৷ আতঙ্কে দিশাহীন হয়ে আত্মহত্যা করে বসেন তিনি৷ বাস্তবে আসামে চূড়ান্ত এনআরসি তালিকা (জাতীয় নাগরিক পঞ্জি) থেকে বাদ দিয়ে দেওয়া ১৯ লক্ষ ৬ হাজার ৬৫৭ জন নাগরিকের পরিবারই আজ এমন মারাত্মক আতঙ্কে ভুগছে৷ এনআরসি প্রক্রিয়া চলাকালীন এখন পর্যন্ত ৭২ জন আত্মহত্যা করেছেন৷ বহু মানুষ দুশ্চিন্তায় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছেন৷ চরম জাতিবিদ্বেষী, চূড়ান্ত সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গিপ্রসূত এনআরসির মধ্য দিয়ে ১৯ লক্ষাধিক মানুষকে এক ধাক্কায় নাগরিকত্বহীন করে দেওয়া হল, তাঁদের মানুষ হিসাবে বেঁচে থাকার সমস্ত অধিকার কেড়ে নিয়ে চরম অস্তিত্বসংকটে ফেলে দেওয়া হল, যা তাঁদের কাছে প্রায় মৃত্যুদণ্ডের সামিল৷

তালিকায় যে ১৯ লক্ষাধিকের স্থান হয়নি তার বাইরেও রয়েছে স্থানীয় নানা উপজাতির বহু মানুষ, যাঁরা তালিকায় নাম তোলার জন্য আবেদনই করেননি৷ তাঁদের দাবি, তাঁরা আসামের সবচেয়ে পুরনো অধিবাসী৷ তা সত্ত্বেও তাঁদের নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হবে কেন? এ ছাড়া লক্ষ লক্ষ নাগরিককে সরকার ডি–ভোটার তথা সন্দেহজনক ভোটার ঘোষণা করেছে৷ তাঁদের অধিকাংশই ভারতীয় হওয়া সত্ত্বেও তালিকায় তাঁদের নাম তোলা হয়নি৷ বাকি যাঁদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে প্রত্যেকে তাঁদের নাগরিকত্বের প্রমাণ জমা দিয়েছিলেন৷ অথচ চরম স্বেচ্ছাচারী কায়দায় তাঁদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে৷ এই তালিকা যে যড়যন্ত্রমূলক জাতিবিদ্বেষী মানসিকতা থেকে এবং চরম ত্রুটিপূর্ণ ভাবে তৈরি করা হয়েছে, তালিকা প্রকাশের পরে তার অজস্র প্রমাণ বেরিয়ে আসছে৷ দেখা যাচ্ছে, আসামের স্থায়ী অধিবাসী, যাঁরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেখানে বাস করছেন তেমন অজস্র মানুষের নাম চূড়ান্ত তালিকায় নেই৷ ১৯৭১ সালের আগে আসামে বসবাস করার প্রমাণ হিসাবে বাড়ির দলিল জমা দিয়েছেন এমন বহু মানুষের নামও বাদ দেওয়া হয়েছে৷ আবার আসামের এক প্রান্তে যে নথি দেখে নাগরিকত্ব নির্ধারিত হয়েছে অন্য প্রান্তে সেই নথিকেই গুরুত্বহীন বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে৷

বন্যা, ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন, ধস, ভূমিকম্প প্রভৃতি নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে যাঁরা পঞ্চাশ বছর আগেকার নথিপত্র হারিয়ে ফেলেছেন তাঁরা নাগরিকত্বের অন্য প্রমাণ জমা দিলেও সেগুলি গ্রাহ্য করা হয়নি৷ প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ফকরুদ্দিন আলি আমেদের পরিবারের সদস্যদের যেমন তালিকায় নাম নেই, তেমনই নাম নেই স্বাধীনতা সংগ্রামীর পরিবারের লোকজনের, সেনাবাহিনীতে কয়েক প্রজন্ম কাজ করা মানুষদেরও৷ এমন অজস্র ঘটনা দেখা গেছে, একই পরিবারের বাবা–মার নাম থাকলেও সন্তানদের নাম নেই, কিংবা সন্তানদের নাম থাকলেও বাবা–মার নাম নেই৷ স্বামীর নাম আছে স্ত্রীর নাম নেই কিংবা স্ত্রীর নাম আছে স্বামীর নাম নেই৷ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের পক্ষ থেকেও ফরেনার্স ট্রাইবুনালের শুনানিকে স্বৈরতান্ত্রিক কায়দায় অনুষ্ঠিত বলে বলা হয়েছে৷ অসমে সক্রিয় একশোরও বেশি ট্রাইবুনাল ছোটখাটো অজুহাত দেখিয়ে ভাষিক এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘু প্রকৃত ভারতীয় বহু মানুষের গায়ে ‘বিদেশি’ তকমা সেঁটে দিয়েছে৷ কোথাও ভোটার তালিকায় নামের বানান অথবা বয়স ভুল করার অজুহাত দেখিয়ে নাম বাদ দেওয়া হয়েছে৷ আবার কোথাও জিজ্ঞাসাবাদের সময় উত্তরে সামান্য অসঙ্গতির জন্যও তালিকা থেকে বাদ পড়েছে নাম৷ পুরো প্রক্রিয়াটির মধ্যে দেখা গেছে ফরেনার্স ট্রাইবুনাল যেন নাম বাদ দিতেই সক্রিয় থেকেছে৷ এনআরসির মাধ্যমে ভাষিক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু প্রকৃত ভারতীয়দের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার চক্রান্ত কার্যকর করতে গিয়ে ব্যাপক বেআইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, ন্যায়বিচারের সমস্ত নিয়মনীতি এবং সংবিধানের বিধিগুলি লঙ্ঘন করা হয়েছে৷

এই পুরো প্রক্রিয়াটি যে ষড়যন্ত্রমূলক তা বেরিয়ে এসেছে সরকারি ক্ষমতার জোরে এনআরসি কার্যকর করার মূল হোতা বিজেপিরই নেতা আসাম সরকারের অর্থমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার কথা থেকে৷ তিনি বলেছেন, ‘এই এনআরসি তালিকা আসামের লক্ষ্যপূরণে সহায়ক হবে না৷ কারণ একদিকে যেমন প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকদের নাম বাদ গিয়েছে, তেমনই আবার বহু অনুপ্রবেশকারীর নামও ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে৷ আসামকে বিদেশি–মুক্ত করতে এনআরসির পরিবর্তে আমাদের এবার অন্য কোনও ব্যবস্থা শুরু করতে হবে৷ সেই প্রক্রিয়া শুরু হবে৷ রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে এ ব্যাপারে আলোচনা চলছে৷’ (বর্তমান : ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯)৷ তা হলে কেন্দ্র ও রাজ্যের বিজেপি সরকারের কী সেই উদ্দেশ্য, যা ১৯ লক্ষ মানুষের নাম বাদ দিয়েও চরিতার্থ হল না? সেই জঘন্য উদ্দেশ্যটি হল তালিকা থেকে সমস্ত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নাম বাতিল করা৷ লক্ষ্যপূরণ না হওয়ার কথা বলে আসলে এই নেতারা সমস্যাটিকে জিইয়ে রেখে ভোটের স্বার্থে উগ্র প্রাদেশিকতাবাদী এবং ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতিই চালিয়ে যেতে চাইছেন৷ গরিব মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন৷

চূড়ান্ত আমলাতান্ত্রিক, স্বেচ্ছাচারী, ফ্যাসিস্ট কায়দায় অনুষ্ঠিত এনআরসি তালিকা তৈরি করতে গিয়ে যাঁদের বাদ দেওয়া হয়েছে তাঁদের ৯০ শতাংশই বাংলাভাষী৷ এ ছাড়াও রয়েছে বিহারি, ওড়িয়া, পাঞ্জাবি প্রভৃতি অন্য নানা প্রদেশের মানুষ, যাঁরা সকলেই ভারতীয়৷ এঁদের মধ্যে প্রায় ১০ লক্ষ হিন্দু ধর্মাবলম্বী৷ লক্ষাধিক গোর্খা মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে৷ স্বাভাবিক ভাবেই তালিকায় বাদ পড়া মানুষেরা তাঁদের এই চরম পরিণতির জন্য বিজেপির দিকে আঙুল তুলছেন৷ গত লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি এনআরসি চালুর মধ্য দিয়ে বিদেশি বিতাড়নের হাওয়া তুলে ভোট জোগাড় করেছিল৷ এখন ‘এই এনআরসি ঠিক নয়’ বলে বাদ পড়া মানুষদের ক্ষোভের আগুনে জল ঢালতে চাইছেন বিজেপি নেতারা৷ প্রচার করছেন, কিছুদিনের মধ্যেই সরকার নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল (ক্যাব) নিয়ে আসতে চলেছে৷ এর ফলে বাদ পড়া সব হিন্দুই ভারতীয় নাগরিক হিসাবে ঘোষিত হবে৷

বিদেশি নির্ণয়ে বিচারের প্রহসন

তালিকা থেকে বাদ পড়া লক্ষ লক্ষ মানুষকে এখন নিজেদের ভারতীয় নাগরিক প্রমাণ করার জন্য ১২০ দিনের মধ্যে ফরেনার্স ট্রাইবুনালে আবেদন করতে হবে৷ বাদ পড়া মানুষদের বেশিরভাগই অত্যন্ত গরিব, সমাজের নিচু তলার মানুষ৷ ট্রাইবুনালে যেতে হলে উকিল নিয়োগ করতে হয়, যা অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ৷ এ ছাড়াও আদালত, প্রশাসনিক দপ্তরে দপ্তরে ঘুরে নতুন করে নথি সংগ্রহ করারও বিরাট খরচ৷ যা বহন করা এই গরিব মানুষগুলির পক্ষে অত্যন্ত কঠিন৷ তা ছাড়া, এঁরা তো একবার এই প্রচণ্ড কষ্টসাধ্য এবং ব্যয়সাপেক্ষ পদ্ধতিতে তাঁদের সংগ্রহ করা যাবতীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে নাগরিকত্বের আবেদন করেছিলেন৷ তালিকা তৈরির সময় সেইসব প্রমাণ মান্যতা পায়নি৷ আবার একবার সেই ব্যয়সাপেক্ষ ট্রাইবুনালে গিয়ে তাঁরা আর কী নতুন নথি জমা দিতে পারবেন ট্রাইবুনালে যাওয়ার সুযোগ আছে, এ কথা বলার দ্বারা তা হলে এই গরিব মানুষগুলির কী উপকারটা হবে!

ফরেনার্স ট্রাইবুনাল কোনও বিচারবিভাগীয় সংস্থা নয়– আধা বিচারবিভাগীয় প্রশাসনিক সংস্থার মতোই কাজ করে এটি৷ এর বিচারক কারা? সাধারণ আইনজীবী এবং আমলারা– অ–বিচারবিভাগীয় ব্যক্তি৷ নাম নথিভুক্তির জন্য নথিপত্র পরীক্ষার দায়িত্ব কাদের দেওয়া হয়েছিল? ৪০ হাজার সরকারি কর্মচারী, শিক্ষক ও ৮ হাজার অস্থায়ী কর্মীর উপর৷ অস্থায়ী কর্মীদের বেশির ভাগই শাসক উগ্র প্রাদেশিকতাবাদী এবং বিজেপি–আরএসএসের অনুগত সরকারি কর্মচারী৷ তাদের উপর মারাত্মক প্রশাসনিক চাপও কাজ করেছে৷ তারা নিরপেক্ষভাবে কতটুকু কাজ করতে পেরেছে? নাগরিকত্বের অধিকার মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারের সমতুল্য৷ এই রকম একটি মৌলিক বিষয়ের উপর সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব এমন একদল লোকের উপর ছেড়ে দিয়েছিল সরকার৷ ফলে সমাজের নিচু তলার বাসিন্দা হতদরিদ্র ভাষিক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষদের পদে পদে চরম অগণতান্ত্রিক এবং মনগড়া পক্ষপাতিত্বের শিকার হতে হয়েছে৷

অনুপ্রবেশ নিয়ে ডাহা মিথ্যা প্রচার

এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট) প্রথম থেকেই দাবি করে আসছে যে আসামে স্রোতের মতো অনুপ্রবেশের  যে গল্প প্রচার করা হয়েছে তা সত্য নয়৷ বাস্তবে সরকারি সমীক্ষাতেও বারে বারে প্রমাণ হয়েছে আসামে লক্ষ লক্ষ অনুপ্রবেশকারী রয়েছে বলে আসু, অগপ, কংগ্রেস, বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে যে উগ্র জাতিবিদ্বেষে, মুসলিম বিদ্বেষে সারা রাজ্যকে জর্জরিত করে তুলেছিল, সেই দাবি মিথ্যা৷ এত রকমের ত্রুটি এবং প্রথম থেকেই ভাষিক ও সংখ্যালঘু বিদ্বেষী মানসিকতা নিয়ে তৈরি এনআরসির চূড়ান্ত তালিকাও এস ইউ সি আই (সি)–র দাবিকেই প্রমাণ করল৷ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর সাথে আসাম চুক্তি স্বাক্ষর করার পর উগ্র প্রাদেশিকতাবাদী ও জাতিবিদ্বেষী নেতারা অসম গণপরিষদ (অগপ) গঠন করে ১৯৮৫ সালে আসামের ক্ষমতা দখল করে৷ ক্ষমতায় বসেই এই সরকার ‘বাংলাদেশি’ কিংবা ‘অনুপ্রবেশকারী’ খোঁজার কাজে সমস্ত শক্তি নিয়োগ করে৷ গায়ের জোরে এবং সম্পূর্ণ ফ্যাসিস্টিক উপায়ে এই কাজ করা সত্ত্বেও অগপ সরকার সেদিন মাত্র ৮ হাজারের মতো ভাষিক ও সংখ্যালঘু প্রকৃত ভারতীয় নাগরিককে ‘বিদেশি’ বলে চিহ্ণিত করেছিল৷ ১৯৯৬ সালে দ্বিতীয় বার অগপ সরকারে বসার পর ‘বিদেশি’র সংখ্যা বেশি করে দেখাতে নতুন পদ্ধতি নেয়৷ ধর্মীয় ও ভাষাগত সংখ্যালঘু প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকদের নাম ‘ডি ভোটার’, অর্থাৎ ডাউটফুল বা সন্দেহজনক ভোটার হিসাবে ইচ্ছামতো চিহ্ণিত করতে শুরু করে৷ এই কাজ করতে গিয়ে তারা কোনও আইনসঙ্গত পদ্ধতি বা বৈধতার ধার ধারেনি৷ চরম স্বেচ্ছাচারী কায়দায় লক্ষ লক্ষ গরিব নিরক্ষর মানুষগুলিকে জানতে না দিয়ে, সম্পূর্ণ একতরফা ভাবে তাদের নাগরিক অধিকার কেড়ে নিয়ে তাদের ডি–ভোটার ঘোষণা করে দেওয়া হয়৷ বলা হয়েছিল, ছ’মাসের মধ্যে তথাকথিত ফরেনার্স ট্রাইবুনালের মাধ্যমে তথ্যপ্রমাণ যাচাই করে তাঁদের ডি ভোটারের তকমা থেকে মুক্ত করে দেওয়া হবে৷ এ ক্ষেত্রেও ন্যূনতম গণতান্ত্রিক রীতিনীতিকে অগ্রাহ্য করে নাগরিকত্ব প্রমাণের দায় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল অভিযুক্ত ডি–ভোটারদের উপরই৷ তারপর দু’দশকের বেশি অতিক্রম করে গেলেও কোনও যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই ডি ভোটাররা এখনও সন্দেহের হাত থেকে রেহাই পাননি৷ ফলে বহু ভারতীয় নাগরিক ও তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম, জন্মসূত্রেই যাঁদের ভারতের নাগরিকত্ব পাওয়ার কথা, তাঁদের ডি ভোটার হিসাবে চিহ্ণিত করে দিয়ে ভোট দেওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হল৷ এরকম ডি ভোটারের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ লক্ষ ৭০ হাজার৷ এই ডি ভোটারদের বেশ কিছু মামলা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের অজ্ঞাতে ফরেনার্স ট্রাইবুনালে পাঠানো হয় এবং ন্যায়বিচারের মূল নীতিকেই পদদলিত করে একতরফা ভাবে তাদের ‘বিদেশি’ বলে ঘোষণা করা হয়৷

এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট) এবং গণতান্ত্রিক শক্তিগুলির প্রবল চাপে যে আইএমডিটি অ্যাক্ট –ইললিগ্যাল মাইগ্র্যান্টস (ডিটারমিনেশন বাই ট্রাইবুনাল) অ্যাক্ট– চালু করা হয়েছিল তা প্রকৃত ভারতীয় ধর্মীয় ও ভাষিক সংখ্যালঘু মানুষদের চূড়ান্ত হেনস্থা ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে কিছুটা নিরাপত্তা দিয়েছিল৷ কিন্তু জাতিবিদ্বেষী শক্তি এবং আরএসএস–বিজেপি জোটের মদতে আসু এই নিরাপত্তা বাতিলের দাবিতে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানায়৷ সুপ্রিম কোর্ট আইএমডিটি বাতিল করে দেয়৷ এর মারাত্মক ফল হল, ফরেনার্স ট্রাইবুনাল সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশের তৈরি চূড়ান্ত অগণতান্ত্রিক ‘ফরেনার্স অ্যাক্ট– ১৯৪৬’ অনুযায়ী ‘বিদেশি’ নির্ধারণ করতে থাকল৷ এটি একটি সাম্রাজ্যবাদী আইন, যা ভারতীয়দের ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকারকেও হরণ করেছিল৷ গণতান্ত্রিক আইনের গোড়ার কথা– অভিযোগকারীকেই অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ করতে হবে৷ এই আইনে একে পুরোপুরি লঙঘন করে অভিযুক্তের ঘাড়েই নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হল৷ ফলে বিরাট সংখ্যক দরিদ্র, নিরক্ষর ভাষিক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষের উপর চাপিয়ে দেওয়া হল নিজেদের ভারতীয় নাগরিক প্রমাণ করার দায়িত্ব৷ স্বাভাবিক ভাবেই ফরেনার্স ট্রাইবুনালের তথাকথিত বিচারপতিরা তাদের মনগড়া ধারণার ভিত্তিতে কাজ করেছেন এবং ইচ্ছেমতো ভারতীয় নাগরিক ভাষিক এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নাম বাদ দিয়েছেন৷ এ ক্ষেত্রে বিচারকরা তাঁদের সাবজেক্টিভ স্যাটিসফেকশন অর্থাৎ নিজেরা যা ঠিক মনে করেছেন তার দ্বারাই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন৷ ফলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বিচারকদের পক্ষপাতমূলক দৃষ্টিভঙ্গি, বাঙালি বিদ্বেষী, মুসলিম বিদ্বেষী ঝোঁক কাজ করেছে৷ মানুষের বাঁচার অধিকারের (রাইট টু লাইফ) সমতুল্য নাগরিকত্বের অধিকার (রাইট টু সিটিজেনশিপ)৷ এই ভাবে আধা–বিচারবিভাগীয় ট্রাইবুনালে দরিদ্র অসহায় মানুষগুলির রাইট টু লাইফকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে৷ ট্রাইবুনালে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর কত জন গরিব মানুষের ক্ষমতা রয়েছে হাইকোর্টে–সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার৷ সেখানেও তো সেই প্রাদেশিকতাবাদী জাতিবিদ্বেষীরাই বিচারক৷ গরিব মানুষকে তারা চোখ বন্ধ করে কোতল করবে৷ এর অজস্র উদাহরণ রয়েছে৷ ফলে গরিব মানুষের কাছে ট্রাইবুনাল–কোর্ট প্রহসন ছাড়া কিছু নয়৷

এখানে উল্লেখ করা দরকার, পদ্ধতিগত নানা কারচুপি, নিয়ম–কানুনের ব্যাপক লঙঘন সত্ত্বেও আর্থিক দিক থেকে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী যে ডি ভোটাররা আইনের সাহায্য নিতে পেরেছেন তাঁদের ৯৭ শতাংশেরই ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণিত হয়৷ এই যে বিপুল সংখ্যক মানুষ, যাঁদের আড়াই দশক আগে ডি–ভোটার ঘোষণা করা হয়েছিল, এখন তাঁদের সন্তান–সন্ততিরাও প্রাপ্তবয়স্ক৷ তাঁরাও নাগরিকত্বের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে দিন কাটাচ্ছেন৷ এ দেশে জন্মানো, বড় হওয়া, লেখাপড়া শেখা, এ দেশের নানা কাজে নিয়োজিত এই মানুষগুলিকে কেন নাগরিক হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে না? রাষ্ট্র কেন এঁদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করবে? জন্মসূত্রে যে নাগরিকত্ব তাঁদের ন্যায্যত প্রাপ্য, কেন তাঁদের সেই নাগরিকত্ব সরকার দেবে না?

বাস্তবে এনআরসি প্রকাশ করার পিছনে বুর্জোয়া শাসকদের সমর্থনপুষ্ট জাতিবিদ্বেষী–উগ্র প্রাদেশিকতাবাদী–সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলির একমাত্র মতলব হল ধর্মীয় ও ভাষাগত সংখ্যালঘু প্রকৃত ভারতীয় জনগণকে ‘বেআইনি অনুপ্রবেশকারী’ হিসাবে দাগিয়ে দেওয়া এবং তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া৷ দেশের শোষিত জনগণকে হিন্দু–মুসলমানে ভাগ করার পাশাপাশি নাগরিক এবং নাগরিকত্বহীন এই দুই ভাগে বিভক্ত করে দেওয়া৷ দীর্ঘদিন ধরেই নানা রকমের উগ্র প্রাদেশিকতাবাদী–সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলি আসামে সক্রিয়৷ সেখানকার অ–সমীয়া ভারতীয় নাগরিকদের বিরুদ্ধে অসমীয়াভাষী সাধারণ মানুষকে খেপিয়ে তোলার উদ্দেশ্যে তারা প্রচার করেছে, অ–সমীয়া অধিবাসীদের সংখ্যাবৃদ্ধি অসমীয়া ভাষা ও সংস্কৃতিকে বিপন্ন করে তুলবে, অসমীয়াভাষীদের হাত থেকে রাজনৈতিক ক্ষমতা কেড়ে নেবে, তাদের সংখ্যালঘুতে পরিণত করবে এবং এইভাবে কার্যত তাদের গ্রাস করে ফেলবে৷

এস ইউ সি আই (সি) সেদিন অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে আসামের মানুষকে বলেছিল, এই জাতিবিদ্বেষীদের আসল লক্ষ্য হল, জনগণের দৃষ্টিকে তাদের দারিদ্র, দুদর্শার প্রকৃত কারণ থেকে সরিয়ে দিয়ে ভ্রাতৃঘাতী রক্তাক্ত দাঙ্গায় মাতিয়ে দেওয়া৷ বলেছিল, অসমীয়াভাষী জনগণ তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে এ প্রচার ডাহা মিথ্যা, কারণ, রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রশ্নটি পুরোপুরি রাষ্ট্রক্ষমতার উপর নির্ভর করে, যা এখন ভারতের শাসক একচেটিয়া পুঁজিপতি এবং তাদের তাঁবেদারদের দখলে৷ বলেছিল, ইতিহাসে এমন কোনও উদাহরণ নেই যেখানে দেখা যায় এক অংশের দরিদ্র মানুষ অপর অংশের দরিদ্র মানুষের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অধিকার হরণ করেছে বা তার ক্ষতি করেছে বা তাদের অর্থনৈতিক ভাবে শোষণ করেছে৷ শুধুমাত্র নিপীড়নকারীরাই নিজেদের শোষণমূলক শ্রেণি শাসন বজায় রাখার স্বার্থে জনগণের সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক অধিকারগুলিকে বিপন্ন করে তোলে৷ সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ তাদের শত্রু শোষক শ্রেণির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলতে গিয়ে একে অপরের ভাষাকে সমৃদ্ধ করে তোলে এবং পারস্পরিক দেওয়া–নেওয়ার মধ্য দিয়ে একে অপরের সংস্কৃতির বিকাশ ঘটায়৷

যুক্তি এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

আসামে উগ্র প্রাদেশিকতাবাদী–সাম্প্রদায়িক শক্তি আরএসএস–বিজেপির আজকের এই বাড়বাড়ন্ত রাতারাতি ঘটেনি৷ ব্রিটিশ আমলে অবিভক্ত আসামকে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল৷ ১৯০৬ সালে অবিভক্ত আসাম পূর্ব বাংলার অন্তর্ভুক্ত হয়৷ ১৯১২ সালে অবিভক্ত বাংলার গোয়ালপাড়া ও সিলেট জেলাকে আসামের সঙ্গে যুক্ত করে চিফ কমিশনারের প্রদেশ হিসাবে একে পুনর্গঠিত করা হয়৷ ১৯১৩ সালে একটি বিধান পরিষদ এবং ১৯৩৭ সালে আসাম বিধানসভা গঠিত হয়৷ ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক, উভয় দিক থেকে উত্তর–পূর্ব আসাম রাজ্যের একটি বিশেষ স্থান আছে৷ বহু ভাষা, ধর্ম, জনজাতির মানুষের বাসভূমি এই রাজ্যে কোনও অংশের মানুষই সংখ্যাগুরু ছিলেন না৷ হাজার হাজার বছর ধরে নিজস্ব রীতিনীতি পালনের মধ্য দিয়ে তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে উঠেছিল৷

স্বাধীনতার পর আসামের সমস্ত খেটে–খাওয়া মানুষ, অসমীয়া, অ–সমীয়া, হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান সকলেই দেখলেন, বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয় জিনিসগুলি থেকেও বঞ্চিত হয়ে তাঁরা যখন কার্যত ধ্বংসের দিকে এগিয়ে চলেছেন, তখন সমস্ত সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের সুফল ভোগ করছে অল্পসংখ্যক ধনী ব্যক্তি৷ ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধি ও বেকারত্ব, ন্যূনতম প্রয়োজনীয় শিক্ষা–স্বাস্থ্য এবং পৌর সুযোগ–সুবিধার অভাব ইত্যাদি কারণে সাধারণ মানুষের দুর্দশা সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে৷ এই ব্যাপক প্রতারণা ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে তাদের মনে ক্রমাগত ক্ষোভ ধূমায়িত হতে থাকে৷

এই ক্ষোভ যাতে সংগঠিত আন্দোলনে রূপ নিতে না পারে, সেই উদ্দেশ্যে শাসক কংগ্রেস অন্যান্য উগ্র প্রাদেশিকতাবাদী সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলির সঙ্গে একযোগে মিথ্যা প্রচার শুরু করে৷ ধীরে ধীরে সেই প্রচারকে তুঙ্গে তুলে প্রথমে বাংলাভাষী হিন্দুদের বিরুদ্ধে এবং পরে বাংলাভাষী মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষকে ‘বেআইনি বসবাসকারী’ ও ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসাবে দাগিয়ে দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে এক ধরনের জেহাদ শুরু করল৷ শাসক কংগ্রেস দেখল, এই উগ্র প্রাদেশিকতাবাদী–সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার আবহাওয়া বজায় রাখতে পারলেই এই ক্ষোভকে বিপথগামী করে দেওয়া যাবে৷ তা হলে আর তাদের বিরুদ্ধে নিপীড়িত জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবে না৷

উগ্র প্রাদেশিকতাবাদী আসাম আন্দোলনের ডানায় ভর করে ১৯৭৯ সালে সরকারি ক্ষমতা পুনর্দখলের লক্ষ্যে কংগ্রেস নেতারা আসুকে সামনে রেখে উগ্র প্রাদেশিকতাবাদী ও উগ্র সাম্প্রদায়িকতাবাদী আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিল৷ ভাষিক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষদের সেই সময় সন্দেহ ও আক্রমণের লক্ষ্য বানানো হয়েছিল৷ পরিকল্পিত উপায়ে আসামের বিভিন্ন ক্ষেত্রে মেহনতি মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস ও বিভেদের বাতাবরণ তৈরি করা হয়েছিল৷ ১৯৭৯ থেকে ’৮৫ পর্যন্ত চলা আসাম আন্দোলনের হোতা অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন তথা ‘আসু’–র বহু নেতা ও কর্মী ছিলেন প্রাক্তন কংগ্রেসকর্মী৷

ফ্যাসিস্ট হিটলারের কুখ্যাত প্রচারমন্ত্রী গোয়েবলস বলেছিলেন, কোনও মিথ্যা বারবার বলে যেতে থাকলে একসময় মানুষ তা সত্য বলে বিশ্বাস করে নেয়৷ কংগ্রেস, আসু সহ আসাম আন্দোলনের জাতিবিদ্বেষী হোতারাও তাই করেছেন৷ শ্বাসরোধকারী জীবনযন্ত্রণা থেকে মুক্তির দিশা না পাওয়া দরিদ্র হতভাগ্য অসমীয়াভাষী মানুষদের এই উগ্র জাতিবিদ্বেষী প্রচারে ভাসিয়ে দেওয়ার জঘন্য ষড়যন্ত্র করে তারা৷ তাঁদের আরও তাতিয়ে তোলার জন্য এই নেতারা প্রচার তুলল, প্রতিদিন হাজার হাজার বাংলাদেশি মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে আসামে প্রবেশ করছে এবং ইতিমধ্যে ৪০–৫০ লক্ষেরও বেশি বাংলাদেশি বেআইনিভাবে আসামে অনুপ্রবেশ করেছে৷ সেই সময় সংবাদপত্রেও এমন সব পরিসংখ্যান প্রকাশিত হতে থাকল৷ উত্তেজনা এমন পর্যায়ে পৌঁছাল যে, এদের প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় নেলি, মুকালমোয়া, চালখোয়া, সিলাপাথার, দরং, লখিমপুর, কামরূপ, গোয়ালপাড়া, বরপেটা এবং আরও বহু জায়গায় একের পর এক ভয়ঙ্কর গণহত্যা ঘটতে থাকল এবং ধর্মীয় এবং সংখ্যালঘুভুক্ত বহু নিরীহ মানুষের প্রাণ গেল৷

ইতিহাস বিকৃতির ষড়যন্ত্র

এই উগ্র প্রাদেশকিতাবাদী–সাম্প্রদায়িক নেতারা আওয়াজ তুলেছিল, গোয়ালপাড়া ও ধুবড়ির মতো ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকার জেলাগুলিতে বসবাসরত বাংলাভাষী মুসলমান ধর্মের মানুষরা সকলেই বাংলাদেশ থেকে আসা ‘বেআইনি অনুপ্রবেশকারী’, ফলে তারা ‘বিদেশি’৷ এ হল ইতিহাসের অপরাধমূলক বিকৃতি৷ বিশ শতকের প্রথম দিকে আসাম এবং পূর্ববাংলা উভয়েই ছিল প্রশাসনিক ভাবে একই কমিশনারের অধীন৷ উভয় অঞ্চলই ছিল একই রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত৷ একই জেলা থেকে রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত অন্য জেলায় যাতায়াত খুবই স্বাভাবিক বিষয় ছিল৷ দ্বিতীয়ত, দরিদ্র ভূমিহীন বাংলাভাষী মুসলমান চাষিরা জঙ্গল পরিষ্কার করে চাষযোগ্য জমি তৈরি করা এবং চর এলাকার পতিত জমিগুলিকে উর্বর কৃষিজমিতে পরিণত করার কাজে দক্ষ ছিলেন৷ ফলে তৎকালীন অবিভক্ত গোয়ালপাড়া জেলার জমিদাররা নিজেদের মালিকানাধীন অকৃষিযোগ্য পতিত জমিগুলিতে বসবাস করার জন্য ময়মনসিংহ, রংপুর ও পাবনা জেলার এই সমস্ত পরিশ্রমী মুসলমান চাষিদের উৎসাহিত করত৷ ব্রিটিশ সরকারেরও এতে আপত্তি ছিল না, কারণ এর ফলে তাদের রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পেত৷ এই দরিদ্র চাষিরা যাতে স্থায়ীভাবে ওই এলাকায় বাস করে সেজন্য কোনও কোনও জমিদার এমনকি জিনিসপত্র দিয়েও তাদের সাহায্য করত৷ সেই সময় অসমীয়াভাষী সাধারণ মানুষ অত্যন্ত সৌহার্দ্য ও সহমর্মিতার সঙ্গেই এই মানুষগুলিকে স্বাগত জানিয়েছিল৷ এই কারণেই আসামের এই এলাকায় এখনও বিরাট সংখ্যক বাংলাভাষী মুসলমান মানুষ বাস করেন যাঁদের অধিকাংশ চাষের কাজে নিযুক্ত৷ ফলে এটা কোনও ভাবেই অনুপ্রবেশ ছিল না, ছিল দেশের এক অংশের মানুষের অন্য অংশে স্বাভাবিক আসা–যাওয়া, স্বাভাবিক পথে বসবাস করা, যা অসমীয়াভাষী মানুষের সঙ্গে সঙ্গে অ–সমীয়াভাষী সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নকেই সেই সময় সাহায্য করেছে৷

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়লে নিম্ন আসামের বাংলাভাষী মুসলমান সম্প্রদায়ের একটি অংশ পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও অপর একটি বড় অংশ, যাঁরা ভারতকেই তাঁদের আপন দেশ বলে মনে করলেন, তাঁরা এদেশেই থেকে যান৷ ভারত স্বাধীন হওয়ার পর নিম্ন আসামের মুসলমান জনগণ এ দেশে বসবাস করার জন্য এবং নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার জন্য শাসক কংগ্রেসের সঙ্গে আপসে থাকতে গিয়ে অসমীয়া ভাষাকেই তাঁদের নিজেদের ভাষা বলে মেনে নেন৷ আজও পর্যন্ত তাঁরা সেই ভাষাতেই পড়াশোনা ও অন্যান্য কাজ করে আসছেন৷ এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থাকা সত্ত্বেও এবং এ সব জানা সত্ত্বেও শুধুমাত্র গায়ের জোরে আসামে আজকের উগ্র জাতিবিদ্বেষীরা এবং সাম্প্রদায়িকতাবাদী আরএসএস–বিজেপিরা দাবি করছে, এই ভারতীয়দের উত্তরপুরুষরা, যাঁরা এ দেশে জন্মেছেন, বড় হয়েছেন এবং যাঁরা এ দেশেরই দরিদ্রতম অধিবাসীদের একটি অংশ, তাদের সম্পর্কে প্রকৃত ইতিহাস চেপে দিয়ে অবিরাম প্রচার করেছে– এরা অনুপ্রবেশকারী৷ যারা উদ্বাস্তু তাদের উপরও চলছে বিদেশি অনুপ্রবেশকারীর তকমা দিয়ে তাদের নাগরিকত্ব হরণ করার জঘন্য চক্রান্ত৷

বুর্জোয়া দলগুলি তো বটেই, এমনকী সিপিআইএম, সিপিআই এর মতো দলগুলি, যাদের একসময় আসামের মানুষের মধ্যে কিছুটা সমর্থন ছিল, এই উগ্র প্রাদেশিকতাবাদী–সংকীর্ণতাবাদী চিন্তার ফল কী মারাত্মক হতে পারে তা ধরতে ব্যর্থ হয়৷ কমিউনিস্ট নামধারী এই দলগুলি আসামে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করলেও এই উগ্র প্রাদেশিকতাবাদের বিরুদ্ধে কখনওই আদর্শগত সংগ্রাম গড়ে তোলেনি৷ আসলে তারা নিজেরাই এই প্রাদেশিকতাবাদী চিন্তার শিকার৷ ভোট রাজনীতির সুবিধা পেতে একসময় এমনকি এই মারাত্মক জাতিবিদ্বেষী শক্তিগুলির সাথে তারা নির্বাচনী জোটও গড়ে তোলে৷ ১৯৯৬ সালের অগপ সরকারের শরিক ছিল সিপিআই এবং সিপিএম সেই সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন করেছিল৷

একমাত্র এস ইউ সি আই (সি) আসাম পরিস্থিতির যথাযথ মূল্যায়ন করেছিল

নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক অধিকার হারিয়ে ফেলার যে আশঙ্কা সাধারণ অসমীয়াভাষী মানুষের মনে বদ্ধমূল হয়েছিল, তা যে সত্য নয়, যথার্থ প্রেক্ষাপটে সেই কঠিন পরিস্থিতির সঠিক বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন করে একমাত্র এস ইউ সি আই (সি) তা নানা দিক থেকে তুলে ধরেছে এবং সমস্ত রকমের প্রতিকূলতার মোকাবিলা করে আজও এই সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে৷ সমস্যার গভীরে গিয়ে এস ইউ সি আই (সি) দেখিয়েছিল, ভারতের মতো একটি পুঁজিবাদী দেশে সমাজ শ্রেণিবিভক্ত৷ আসামে এই বিভাজন অসমীয়া এবং বাঙালিদের মধ্যে অথবা হিন্দু–মুসলমানের মধ্যে নয়৷ বিভাজনটা হল একদিকে হাতেগোনা উঠতি ছোট–মাঝারি পুঁজিপতি শ্রেণি, আর অন্য দিকে ভাষা, ধর্ম, জাত, বিশ্বাস নির্বিশেষে অগণিত নিপীড়িত নিঃসম্বল সাধারণ মানুষের মধ্যে৷ যত দিন যাচ্ছে সারা দেশের মতো আসামেও ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে, গরিব মানুষ আরও গরিবির অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে৷ স্বাভাবিক ভাবেই ৯৯ ভাগ শোষিত আর এক ভাগ শোষকের স্বার্থ কখনও এক হতে পারে না, বরং তা সম্পূর্ণ বিপরীত৷ ফলে আসাম সমস্যার বিচারটাও এই সত্যের উপর দাঁড়িয়েই করতে হবে৷

অত্যন্ত সংবেদনশীল আসাম সমস্যার গুরুত্ব অনুভব করে এ সংক্রান্ত বিতর্কের যথার্থ সমাধানের জন্য এস ইউ সি আই (সি) নিম্নলিখিত চার–দফা সূত্র পেশ করেছিল : 

১) নিজেদের মাতৃভাষা সম্পর্কে অসমীয়াভাষী জনসাধারণের ভাবাবেগের কথা চিন্তা করে রাজ্যে রাজ্য–ভাষা হিসাবে অসমীয়া ভাষার যে বর্তমান মর্যাদা, জনবিন্যাসের পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত না করে তাকে স্থায়ী করার জন্য হয় সংবিধান সংশোধন করতে হবে, না হলে পার্লামেন্টে বিশেষ প্রস্তাব গ্রহণ করতে হবে৷ ছোট–বড় ভাষিক সংখ্যালঘুদের সংবিধানপ্রদত্ত অধিকার অক্ষুন্ন রেখেই তা করা সম্ভব এবং তাই করতে হবে৷

২) অনুপ্রবেশ সম্পর্কে জনগণকে আশ্বস্ত করার মতো করে সীমান্ত নিশ্ছিদ্র ভাবে সুরক্ষা করতে হবে৷

৩) আসামে শিল্প ও অর্থনীতির দ্রুত বিকাশ ঘটানোর জন্য সরকারকে বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করতে হবে৷

৪) বিদেশি নাগরিকদের চিহ্ণিতকরণের ক্ষেত্রে উগ্র প্রাদেশিকতাবাদীদের দাবি মতো ১৯৫১ সাল নয়, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার দিন অর্থাৎ ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চকে কাট–অফ তারিখ তথা ভিত্তিবর্ষ হিসাবে স্বীকৃতি দিতে হবে৷ এই ক্ষেত্রে সমস্ত স্বীকৃত ও প্রাসঙ্গিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নিয়ম, আইন ও রীতিনীতি মেনে চিহ্ণিতকরণের প্রক্রিয়াটি চালাতে হবে৷ উক্ত কাট–অফ তারিখের আগে যাঁরা এ দেশে এসেছেন, তাঁদের প্রকৃত ভারতীয় নাগরিক হিসাবে গণ্য করতে হবে৷ এই বিদেশি নির্ণয়ের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক রীতিনীতি (ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন) মেনে চলতে হবে এবং জাতীয় দায়বদ্ধতাকেও (ন্যাশনাল কমিটমেন্ট) মেনে চলতে হবে৷

অসমীয়াভাষী এবং অ–সমীয়াভাষী উভয় জনগণই এই চার–দফা সমাধান সূত্রকে সর্বান্তকরণে সমর্থন করেছিলেন৷ কিন্তু আসাম আন্দোলনের হোতা উগ্র প্রাদেশিকতাবাদী–সাম্ উন্মত্ত শক্তিগুলি সহ বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলি, মানুষে মানুষে দ্বন্দ্ব–বিভেদ জিইয়ে রাখাই যাদের স্বার্থ, তারা এই চার–দফা সূত্রকে এড়িয়ে গেলেন এবং শেষ পর্যন্ত এনআরসি চালু করলেন৷ যার পরিণতিতেই ১৯ লক্ষাধিক ভাষিক এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘু প্রকৃত ভারতীয় অধিবাসী আজ নাগরিকত্বহীন৷

ডিটেনশন ক্যাম্প কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের থেকেও জঘন্য

তালিকা থেকে বাতিল হওয়া ১৯ লক্ষ মানুষের মধ্যে ট্রাইবুনাল–কোর্টে গিয়েও যাঁরা নানা জটিলতার কারণে তাঁদের নাগরিকত্ব প্রমাণে ব্যর্থ হবেন তাঁদের পরিণতি কী হবে? লক্ষ লক্ষ প্রকৃত ভারতীয় নাগরিককে কি শেষ পর্যন্ত ডিটেনশন ক্যাম্পে যেতে হবে৷ ডিটেনশন ক্যাম্পগুলি বাস্তবে হিটলারের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের থেকেও জঘন্য৷ ইতিমধ্যেই অজস্র মানুষ এই ক্যাম্পে হয় মারা গেছেন, না হয় এর ভয়ঙ্কর জীবন সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন৷ জেলখানা কখনও স্বাধীনতার বিকল্প হতে পারে না৷ ভারতের বিদেশমন্ত্রী বলেছেন, এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়, তেমনই বাংলাদেশ সরকারও জানিয়ে দিয়েছে এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়৷ ফলে কাউকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয় নেই৷ এই অবস্থায় যদি কেউ বিদেশি বলে চিহ্ণিতও হন তাঁদের আন্তর্জাতিক নিয়ম–নীতি মেনে এ দেশেই আশ্রয় দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে৷ একটি গণতান্ত্রিক দেশে এভাবে  ডিটেনশন ক্যাম্পের নামে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প কখনও চলতে পারে না৷

এক দেশ থেকে আর এক দেশে মানুষ শখ করে যায় না৷ পূর্ব পাকিস্তান থেকে যাঁরা এ দেশে এসেছিলেন তাঁরা শখ করে আসেননি৷ সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশের ষড়যন্ত্রে এবং দেশীয় ক্ষমতালোভী নেতাদের সহযোগিতায় দেশভাগের বলি হয়ে সহায়–সম্বলহীন উদ্বাস্তুর মতো তাঁরা এসেছেন৷ এর জন্য তাঁরা নিজেরা দায়ী নন৷ দায়ী যে শাসক শ্রেণি তারাই আজ আবার তাঁদের বিদেশি বলে কাঠগড়ায় তুলছে৷ এ তো দেশ ভাগের বলি একই ভাষাভাষি মানুষদের প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় নেওয়ার বিষয়৷ যুদ্ধ, জাতিগত দাঙ্গা প্রভৃতি নানা কারণে এশিয়া–আফ্রিকার নানা দেশ থেকে উচ্ছেদ হয়ে হাজার হাজার মানুষ সমুদ্র পেরিয়ে ইউরোপের দেশগুলিতে ঢুকছে৷ সেখানকার জনগণের চাপে সরকারগুলির প্রবল অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাঁদের আশ্রয় দিতে বাধ্য হয়েছে৷ যে মানুষগুলি দীর্ঘদিন ধরে ভারতে বসবাস করছেন, তাঁদের অনেকেই এখানে জন্মেছেন, এখানকার উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে নিজেদের জড়িত করে কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে নিজেদের জীবিকা নিজেরাই অর্জন করছেন৷ এ ভাবে তাঁরা এই সমাজেরই অঙ্গীভূত হয়ে পড়েছেন৷ নাগরিক দায়িত্বও পালন করছেন৷ তা হলে তাঁদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হবে কেন?

শাসক পুঁজিপতি শ্রেণি এবং তাদের তাঁবেদার রাজনৈতিক দলগুলো তাদের শোষণ–শাসন অব্যাহত রাখার জন্য শোষিত জনগণকে জাতি–ধর্ম–ভাষার ভিত্তিতে ভাগ করে দুটো যুধ্যমান শিবিরে– একদল যাদের নাগরিকত্ব আছে, আর এক দল যাদের নাগরিকত্ব নেই– বিভক্ত করে দেওয়ার উদ্দেশ্য থেকেই এনআরসি প্রক্রিয়াটি চালু করেছে, ঠিক যেমন ব্রিটিশ শাসকরা স্বাধীনতা আন্দোলনকে দমন করার জন্য হিন্দু ও মুসলমান এই দুই ভাগে দেশের মানুষকে ভাগ করে রেখেছিল৷ শাসক পুঁজিপতি শ্রেণির উদ্দেশ্য– সমস্ত বিষয়ে এই দুই দলকে একে অপরের বিরুদ্ধে প্ররোচিত করা৷ এনআরসির নামে শাসক পুঁজিপতি শ্রেণি এই মারাত্মক খেলাটাই খেলতে চাইছে৷

চক্রান্তকারীরা আরও মারাত্মক আক্রমণ হানছে

কিন্তু ১৯ লক্ষে খুশি নয় আসামের প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলি৷ উগ্র জাতিবিদ্বেষী আসু ও অগপ–র উদ্দেশ্য ছিল হিন্দু–মুসলিম নির্বিশেষে বাংলাভাষীদের বিতাড়িত করা৷ অন্য দিকে আরএসএস–বিজেপির উদ্দেশ্য ছিল বাংলাভাষী মুসলিমদের বিতাড়িত করা৷ চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর আরও বেশি সংখ্যায় অ–সমীয়া মানুষের নাম বাতিলের দাবিতে নির্লজ্জ এবং একতরফা প্রচার শুরু করে দিয়েছে এই দুই শক্তি৷ এই প্রচারে সরকার এবং বিরোধী দলগুলি সব এক৷ একমাত্র এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট) এই জাতিবিদ্বেষীদের বিরুদ্ধে দরিদ্র নিপীড়িত অসহায় শোষিত মানুষগুলির পক্ষে দাঁড়িয়ে তার সমস্ত শক্তি নিয়ে লড়াই করে যাচ্ছে৷ এই দুষ্টশক্তিগুলি এখন আবার নতুন করে দাবি তুলেছে নাগরিকত্বের ভিত্তিবর্ষ হিসাবে ১৯৫১ সালকে ধরা হোক৷ এ যদি সরকার মেনে নেয় তবে বহু কষ্ট করে যাঁরা তালিকায় নাম তুলেছেন, তাঁদের সকলেই রাষ্ট্রহীন দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হবেন৷ এইভাবে অসহায় ভাষিক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষগুলির জীবন নিয়ে আবার তারা ছিনিমিনি খেলা শুরু করেছে৷

আসাম চুক্তির সময়ে জাতিবাদী–সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলির সাথে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী যে অন্যায় চুক্তি করেছিলেন তাতে অসমীয়াদের জন্য অর্থনৈতিক–রাজনৈতি সংরক্ষণের একটি ধারা যুক্ত করা হয়েছিল৷ এখন উগ্র প্রাদেশিকতাবাদীরা সেই সংরক্ষণ কার্যকর করার দাবি তুলছে৷ একদিন ভাষার ভিত্তিতে রাজ্য গঠিত হলেও আজ আসাম তো বটেই, দেশের প্রতিটি প্রদেশেই বহু ভাষিক ভারতীয়ের বাস৷ সেখানে নির্দিষ্ট করে একটি ভাষিক গোষ্ঠীকে এই ভাবে সংরক্ষণ দিলে সংবিধান স্বীকৃত ‘রাইট টু ইকুয়ালিটি’কেই নস্যাৎ করা হবে এবং এর ফলে দেশের সকল জনগণের ঐক্য এবং সংহতি ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে৷ দেশের ভৌগলিক অখণ্ডতা ধ্বংস হয়ে যাবে৷ উগ্র জাতিবাদীদের এই ষড়যন্ত্রে সামিল হয়েছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার৷ তারা শুধুমাত্র আসু এবং উগ্রজাতিবিদ্বেষীদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করেছে৷ কমিটি ইতিমধ্যে যা বলতে শুরু করেছে, তা সর্বনাশা৷ তাঁদের অভিমত ১৯৫১ সালকে ভিত্তিবর্ষ ধরে কারা অসমীয়া তা নির্ধারণ করা হোক৷ এর দ্বারা আসামের জনগণকে দুই গোষ্ঠীতে বিভক্ত করে দেওয়া হবে– ১৯৫১ ভিত্তিবর্ষের একটি ক্যাটিগরি আর ১৯৭১ ভিত্তিবর্ষের আর একটি ক্যাটিগরি৷ তারা দাবি করছে, বিধানসভা, লোকসভা, চাকরি, পড়াশোনা প্রভৃতি সমস্ত ক্ষেত্রে যারা অসমীয়া তাদের জন্য কমপক্ষে ৮০ শতাংশ সংরক্ষণ করতে হবে৷ এই দাবি মেনে নিলে এর ফলে অ–সমীয়া মানুষরা এই সমস্ত ক্ষেত্রে চূড়ান্ত বঞ্চনার শিকার হবে৷ বিরাট সংখ্যক মানুষ জীবন–জীবিকার অভাবনীয় সংকটের মধ্যে পড়বে৷ বাস্তবে এস ইউ সি আই (সি) ছাড়া বাকি সমস্ত শক্তি এ ক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধ হয়ে গেছে৷ এই অবস্থায় শোষিত সব স্তরের জনগণকে একজোট করে শাসক শ্রেণির এই ফ্যাসিস্ট আক্রমণের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে৷

দেশজোড়া আন্দোলন গড়ে তুলে এনআরসি চালুর চক্রান্ত প্রতিহত করতে হবে

বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ বলেছেন, আসামের পর এবার সারা দেশেই এনআরসি হবে৷ সব বিদেশিদের বিতাড়ন করা হবে৷ স্বাভাবিক ভাবেই রাজ্যে রাজ্যে বিজেপি নেতারা তাঁর কথার প্রতিধ্বনি করতে শুরু করে দিয়েছেন৷ দিল্লির বিজেপি সভাপতি বলেছেন, দিল্লিতে তাঁরা এনআরসি করবেন৷ তেলেঙ্গানা, হরিয়ানার বিজেপি সভাপতিরাও একই কথা বলেছেন৷ বিজেপি নেতারা পশ্চিমবাংলায় দীর্ঘদিন ধরেই ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ বিতাড়নের স্লোগান তুলে যাচ্ছেন৷ সম্প্রতি এ রাজ্যের বিজেপি সভাপতি বলেছেন, পশ্চিমবাংলায় এনআরসি হবেই৷ বলেছেন, এ রাজ্যে অন্তত ২ কোটি অনুপ্রবেশকারী আছে৷ ঠিক আসামের জাতিবিদ্বেষী নেতাদের মতোই সেই একই কায়দা, একই সুর– মনগড়া একটা সংখ্যা যা হোক বলে দিয়ে মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি করা, বিদ্বেষ তৈরি করা, জনজীবনের মূল সমস্যাগুলিকে আড়াল করে শোষিত মানুষের মধ্যেই দু’দলে সংঘর্ষ বাধিয়ে দেওয়া৷ এদের মূল লক্ষ্য মুসলিম জনগণ৷ বিচারপতি সাচারের রিপোর্ট দেখিয়েছে, মুসলিমরা শোষিতদের মধ্যেও সবচেয়ে শোষিত৷ সমাজের সেই দরিদ্রতম অংশকেই বিজেপি আজ আক্রমণের লক্ষ্য করছে৷ এই মুসলিম–বিদ্বেষটাক তারা সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে চায় এবং তার মধ্য দিয়ে হিন্দু ভোটব্যাঙ্ক নিশ্চিত করতে চায়৷ দেশের মানুষ বিজেপির এই সর্বনাশা ষড়যন্ত্র কিছুতেই মেনে নেবে না৷

এ ব্যাপারে দেশের মানুষকে আসামের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে৷ আসাম অর্থনৈতিক ভাবে একটা অত্যন্ত পিছিয়ে পড়া রাজ্য৷ বেকারি, গরিবি, মূল্যবৃদ্ধির সংকট মারাত্মক৷ অথচ তার আর্থিক উন্নয়নের কোনও প্রচেষ্টা না নিয়ে গত প্রায় চার দশক ধরে মানুষে মানুষে বিভাজনকেই সমস্ত শাসক দল তাদের রাজনীতির প্রধান হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে চলেছে৷ এর দ্বারা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ধর্ম–বর্ণ–ভাষা নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ, গরিব মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষ৷ তাঁদের অন্য সব কাজকর্ম ছেড়ে পাগলের মতো শুধু নথি সংগ্রহে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে৷ তারপরও এত বিপুল সংখ্যক ভাষিক ও ধর্মীয় সংখ্যলঘু মানুষ নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত হয়ে আজ জীবন–মৃত্যুর মাঝে এসে দাঁড়িয়েছেন৷ এ রাজ্যেও সাধারণ মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষের জীবনে সমস্যার শেষ নেই৷ বিজেপি নেতারা সেই সমস্যা সমাধানে কোনও দিন একটি কথাও উচ্চারণ করেননি, কোনও আন্দোলনও গড়ে তোলেননি৷ আজ বিদেশি বিতাড়নের নাম করে শোষিত মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি করতে আবার রাজ্যের কোটি কোটি মানুষকে নাগরিকত্ব প্রমাণের অতি দুরূহ জটিল একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে ফাঁসিয়ে দিতে চাইছে৷ লক্ষ লক্ষ মানুষের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে সমাজ জুড়ে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে চাইছে৷ এ ব্যাপারে তাঁদের ব্যগ্রতা থেকেই স্পষ্ট যে, নিপীড়িত জনসাধারণের স্বার্থ নয়, তাঁরা আসলে দেশের শাসক–শোষক পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থরক্ষায় তাদের বিশ্বস্ত রাজনৈতিক ম্যানেজারের কাজই এর মধ্য দিয়ে করে চলেছে৷

দেশের শ্রমজীবী গরিব নিম্নবিত্ত মধ্যবিত্ত সাধারণ মানুষকে এ কথা বুঝতে হবে যে, শোষিত মানুষের স্বার্থ এক এবং অভিন্ন৷ হিন্দু ও মুসলমান গরিব শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ এক৷ জনজাতি ও অ–জনজাতি সাধারণ মানুষের স্বার্থের কোনও পার্থক্য নেই৷ পরিশ্রম করে সংসার চালানো সব মানুষের শত্রু পুঁজিবাদী শাসন এবং পুঁজিপতি শ্রেণি৷ অসমীয়া হোক, বাঙালি হোক বা অন্য যে কোনও প্রদেশের মানুষ হোক, সকলকে আজ আসামের এনআরসি তালিকায় বাদ পড়া মানুষদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়ার সংগ্রামে সামিল হতে হবে৷ দেশের অন্য কোথাও এনআরসি চালুর অপচেষ্টাকে প্রতিহত করতে হবে৷ এর জন্য সাম্প্রদায়িকতাবাদী, প্রাদেশিকতাবাদী চিন্তার বিপরীতে বামপন্থী ভাবাদর্শে, সাম্যবাদের ভাবাদর্শে উজ্জীবীত হয়ে পুঁজিবাদী শোষণ, নির্যাতন, বিভাজনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ভাবে গণআন্দোলনে সামিল হতে হবে৷ কারণ এই বামপন্থী তথা সাম্যবাদী ভাবধারাই ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতি–ধর্ম–ভাষা–বর্ণ নির্বিশেষে সমস্ত মানুষকে এক হিসাবে ভাবার শিক্ষা দেয়৷ এর মধ্য দিয়ে যেমন প্রাদেশিকতাবাদকে নির্মূল করা যাবে, তেমনই শোষণের বিরুদ্ধে শোষিত মানুষের দাবিগুলিও আদায় করা যাবে৷

(গণদাবী : ৭২ বর্ষ ৯ সংখ্যা)