Breaking News

আর জি কর আন্দোলন যা দিল জনগণকে

দীর্ঘ ৬ মাস অতিক্রান্ত। আর জি কর হাসপাতালের চিকিৎসক-ছাত্রী-‘অভয়া’র খুন-ধর্ষণ মামলায় শিয়ালদা কোর্টের রায় মানুষকে হতাশ করেছে। মানুষ বেদনায়, ক্ষোভে প্রশ্ন করছে, কেন ন্যায়বিচার পেলাম না, মানুষ খুঁজছে ন্যায় বিচারের সামনে প্রতিবন্ধক কী ছিল? শুধুই কি একা সঞ্জয় রায় খুনি? কিন্তু এ কথা তো ভুললে চলবে না, জুনিয়র ডাক্তার, সিনিয়র ডাক্তার, নার্স সহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এ ছিল এক ঐতিহাসিক আন্দোলন। স্বাধীনতার পরে ভারতে এই প্রথম কোনও রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় না থেকে জনগণ এইরকম স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলন সংগঠিত করল। ‘অভয়া’র আন্দোলন এই বার্তাও দিয়ে গেল যে কোনও রাজনৈতিক দলের থেকে দলমত নির্বিশেষে সচেতন ঐক্যবদ্ধ জনগণের শক্তি অনেক বেশি।

এই আন্দোলনের সাফল্যের দিকগুলো আমাদের স্মরণে রাখা দরকার। যেমন আন্দোলন না হলে মানুষ জানতেই পারত না, এটা একটা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, খুনটাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। এখানে ধর্ষণের একটা গল্প সাজানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। হয়তো ‘অভয়া’ আর জি করের প্রশাসনের এমন কিছু বিষয় জানতেন, যা প্রকাশিত হলে রাজ্যের সর্বোচ্চ প্রশাসন পর্যন্ত বিপাকে পড়ত। তাই তাকে সরিয়ে দাও পৃথিবী থেকে। অভয়া হত্যাকে আত্মহত্যা বলে চালানোর সর্বাত্মক চেষ্টা করল রাজ্য প্রশাসন। ডাঃ অনিকেত, ডাঃ কিঞ্জলদের নেতৃত্বে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল যে, না এ আত্মহত্যা নয়, এক পরিকল্পিত হত্যা। এটাই কিন্তু ছিল আন্দোলন গড়ে উঠবার প্রেক্ষাপট।

এ আন্দোলনে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়। আন্দোলন চলার সময়েও ডাক্তার এবং রোগী ও রোগীর পরিজনদের আবেগের ও শ্রদ্ধার সম্পর্ক নষ্ট হয়নি। ডাক্তারদের কর্মবিরতিতে মানুষ অসুবিধায় পড়লেও এত বড় খুনের ঘটনার প্রতিবাদ না করে বসে থাকেনি। তারাও আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিল। বর্তমান ও অতীতের সমস্ত শাসকই চেষ্টা করে ডাক্তার নার্স স্বাস্থ্যকর্মী এবং রোগী-এর মধ্যে একটা যুদ্ধ জারি রাখতে। কারণ তাতে শাসকের লাভ। কিন্তু এবার সেই ষড়যন্ত্র সফল হয়নি।

অন্যদিকে এই আন্দোলনে নারী সমাজের জাগরণ এক অভূতপূর্ব বিষয়, যা আগে কখনও এইরূপে দেখা যায়নি। এই সময় যেখানেই আর জি কর আন্দোলনের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে– শহর-মফঃস্বলে, এমনকি কিছু কিছু গ্রামেও, সেখানে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী মানুষের মধ্যে নৈতিকতার ও চেতনার উন্নয়ন ঘটেছে। ৬ মাস আগে আন্দোলন শুরু হওয়ার পূর্বের মানুষ আজ আর একই রকম নেই, নিজেদের অজান্তেই যেন পাল্টে গেছে।

এই আন্দোলনের আরেকটি বড় দিক, পুলিশ প্রশাসন সিবিআই আদালত সম্পর্কে মানুষের মোহ কিছুটা ধাক্কা খেয়েছে। যাঁদের মানুষ অনেকটা দেবতার আসনে রাখতে অভ্যস্ত ছিল সেই বিচারপতিদের সম্পর্কে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন জেগেছে। শিয়ালদা কোর্ট, কি সুপ্রিম কোর্ট কোথাও অভয়ার খুনের ন্যায়বিচার মানুষ পায়নি। কিন্তু জনতার আদালতে আসল খুনি কারা তা প্রমাণিত হয়েছে।

রাজ্য ও কেন্দ্র সরকার উভয়েই অভয়ার ন্যায়বিচারের আন্দোলনকে দমিয়ে দেওয়ার তীব্র চেষ্টা করেছে। একদিকে রাজ্য সরকারের ভয়, অভয়ার খুনের সঙ্গে যুক্ত দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা যে শাসকদলের ঘনিষ্ঠ, সেটা মানুষের সামনে চলে আসবে। আর অন্যদিকে আন্দোলনের আগুন যদি বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে তবে সেই সব রাজ্যে প্রতি মিনিটে যে খুন ধর্ষণ ঘটছে তার বিরুদ্ধে মানুষ ন্যায়বিচারের দাবিতে রাস্তায় নামবে, যা কেন্দ্রীয় শাসকের কাছে অভিপ্রেত নয়। ফলে আর জি করের ন্যায়বিচারের আন্দোলন দমন করার ক্ষেত্রে রাজ্য এবং কেন্দ্র উভয়ের স্বার্থ মিলে গেছে। তাই আমাদের অবাক হওয়ার কোনও কারণ নেই যখন দেখা গেল, সুপ্রিম কোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে অভয়ার বিচারের পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব নিজে নিল এবং রাজ্য ও কেন্দ্রীয় প্রশাসন উভয়েই এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানাল।

এই আন্দোলনের ফলে মেডিকেল কলেজগুলির মধ্যে থাকা পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতির চক্র ফাঁস হয়ে গেছে। আর এই হত্যাকাণ্ড যে দুর্নীতি চক্রের ফলশ্রুতিতে তাও অজানা নেই। এই আন্দোলনের অভিঘাতে রাজ্য প্রশাসনের ভিত টলে গিয়েছিল। অতীতে এভাবে কেউ এই প্রশাসনকে এতটা মাথা নত করতে বাধ্য করতে পারেনি। আন্দোলনের চাপে স্বাস্থ্যদপ্তর ও পুলিশ প্রশাসনের অনেক কর্তাব্যক্তিকে অপসারণ করতে বাধ্য হয়েছিল রাজ্য প্রশাসন।

সঠিক পথে গড়ে ওঠা কোনও আন্দোলন অভীষ্ট লক্ষ্যে শেষ পর্যন্ত পৌঁছতে না পারলেও তা কোনওদিন ব্যর্থ হতে পারে না। আমরা তো গান্ধীজির অসহযোগ আন্দোলন, ’৪২-এর ভারত ছাড়ো আন্দোলন, সুভাষ বোসের আত্মত্যাগ ব্যর্থ হয়েছে বলে কখনও মনে করি না। যদিও এই সমস্ত ঐতিহাসিক ঘটনাগুলি ঘটে যাওয়ার পরপরই আমাদের দেশ স্বাধীন হয়নি। তারপরেও বেশ সময় লেগেছে। তাই হতাশার কোনও জায়গা নেই। ন্যায়বিচারের আন্দোলনকে আমাদের চালিয়ে যেতে হবে, যতক্ষণ না পর্যন্ত প্রকৃত খুনি কারা, খুনের উদ্দেশ্য কী ছিল আমরা জানতে না পারি। না হলে আগামী দিন যে কোনও মুহূর্তে আরেক জন ‘অভয়া’ তৈরি হবে।

যে কোনও আন্দোলনেরই ওঠানামা থাকে। তাই এই আন্দোলনটিও এর ব্যতিক্রম নয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই আন্দোলনে ছিল দুটি ধারা। একটি ধারা ছিল ন্যায়বিচারের দাবিতে সর্বাত্মক প্রতিবাদ সংগঠিত করা। আরেকটি ধারা ছিল এই আন্দোলনকে নির্বাচনমুখী করে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি করা। আন্দোলনের নামে মহড়া দেওয়া। শেষ পর্যন্ত প্রথম ধারাটি মানুষের মনে আবেগের সাথে স্থান করে নিয়েছে এবং ওয়েস্ট বেঙ্গল জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্টের নেতৃত্বকে মানুষ সাদরে গ্রহণ করেছে। কোনও মূল্যেই আন্দোলনের পথ ছাড়লে চলবে না। যতই আন্দোলনকারী ডাক্তারদের ওপর আঘাত আসুক, মানুষ তার লড়াইয়ের সাথীকে ঠিক চিনে নেবে। ইতিহাস বলে, সঠিক পথে দৃঢ়ভাবে লড়তে গেলে কিছু মূল্য দিতে হয়, আবার ইতিহাস তার হিসেব মিলিয়ে দেয়। মানুষের মনের মধ্যে এখনও আন্দোলনের যে আগুন জ্বলছে, তা যে কোনও দিন আবার অগ্নুৎপাতের রূপে ফেটে পড়তে পারে। তখন শাসক ন্যায়বিচার না দিয়ে পার পাবে না।