Breaking News

কুম্ভের জল স্নানেরও অযোগ্য জানালেন বিজ্ঞানীরা

কেন্দ্র ও রাজ্যের দুই বিজেপি সরকার এক সুরে সগর্বে ঘোষণা করেছিল, ১৪৪ বছরে মাত্র একবার যে সুযোগ মেলে সেই ‘অমৃতকুম্ভ’ তাঁরা দক্ষ হাতে উদযাপন করবেন। তাঁরা বলেছিলেন ৪০ কোটি মানুষ এইবারের মহাকুম্ভে স্নান করবেন। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, একের পর এক ঘটনা ও দুর্ঘটনায় দুই সরকারের চরম ব্যর্থতা প্রকট হচ্ছে। প্রথমে গত ২৯ জানুয়ারি মধ্যরাতে স্নান করতে গিয়ে পদপিষ্ট হয়ে সরকারি মতে অন্তত ৩০ জনের মৃত্যু ঘটে, আহত হন শতাধিক মানুষ। যদিও বাস্তবে দুটি সংখ্যাই অনেক বেশি। তারপর ১৫ ফেব্রুয়ারি কুম্ভের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার পথে নয়াদিল্লি রেল স্টেশনে পদপিষ্ট হয়ে মারা যান ভারতীয় রেলের হিসাব অনুযায়ী অন্তত ১৮ জন, আহত হন বহু মানুষ। যদিও মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যাটা এ ক্ষেত্রেও অনেক বেশি। প্রতিদিনই মহাকুম্ভে আসা-যাওয়ার পথে ছোট-বড় নানা দুর্ঘটনায়, সরকারি তথ্য অনুযায়ী এখনও পর্যন্ত ১৩২ জনের প্রাণ গিয়েছে।

কেবল দুর্ঘটনাই নয়, যে মহাকুম্ভে স্নান করলে ‘অমৃত-লাভে’র কথা বলা হচ্ছে, তার জলও ভয়ঙ্কর দূষিত হয়ে পড়েছে। কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ (সিপিসিবি)-এর তথ্য অনুসারে কুম্ভমেলা শুরু হওয়ার আগে গত ১৩ জানুয়ারির সমীক্ষা অনুযায়ী ত্রিবেণী সঙ্গমে বিওডি (বায়োলজিক্যাল অক্সিজেন ডিম্যান্ড)-এর মাত্রা ছিল প্রতি লিটারে ৩.৯৪ মিলিগ্রাম। ১৫ জানুয়ারি প্রথম শাহি-স্নানের পরের দিন ১৬ জানুয়ারি সেই মাত্রা গিয়ে পৌঁছায় প্রতি লিটারে ৫.০৯ মিলিমি.-এ। ২৯ জানুয়ারি মৌনী অমাবস্যার দিনে এই জলে বিওডির মাত্রা ছিল ৩.২৬ মিলিমি.। বলা প্রয়োজন, নদীতে ১১,০০০ কিউসেক অতিরিক্ত জল মেশানোর পরেও এই অবস্থা। জলে বিওডি-র মাত্রা ৩ মিলিমি-এর বেশি থাকলে সেই জল স্নানের পক্ষে নিরাপদ নয়। বিওডি-র মাত্রা যত বৃদ্ধি পাবে, জল তত বেশি দূষিত হবে। সিপিসিবি আরও বলেছে যে মহাকুম্ভের জলে মল-মূত্রে থাকা কলিফর্ম জীবাণু (কলেরা রোগের ব্যাকটিরিয়া) পাওয়া গিয়েছে। ফলে পান করা তো দূরের কথা, এই জল স্নানেরও অযোগ্য হয়ে পড়েছে।

কুম্ভমেলার আধিকারিকদের বয়ান অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৫৬ কোটি মানুষ কুম্ভ-স্নান সেরেছেন। এই স্নানের জন্য রাজনৈতিক নেতা-মন্ত্রী, সরকারি অফিসার, বিচারপতি, পয়সাওয়ালা ব্যক্তিদের জন্য আলাদা ভিআইপি ব্যবস্থা আছে। কিন্তু আমজনতার জন্যে যেমন উপযুক্ত ট্রেনের ব্যবস্থা নেই, থাকা-খাওয়ার সুবন্দোবস্ত নেই, তেমন স্নানের জন্যেও ভালো ব্যবস্থা নেই। এলাহাবাদ (বিজেপির দেওয়া নাম প্রয়াগরাজ) যাওয়ার পথে ২০০ কিমি দীর্ঘ ট্রাফিক-জ্যাম ঠিক তেমনই কুম্ভে স্নানের লাইনও কয়েক কিমি দীর্ঘ। মাঝে মাঝে দড়ি উঠছে, আর ভক্তরা উর্ধ্বশ্বাসে স্নানের জন্য দৌড়াচ্ছে।

যদিও ১.১৪ লক্ষ পাবলিক টয়লেট তৈরি করা ও দূরে নিয়ে গিয়ে সেই বর্জ্য শোধন করার দাবি করেছেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যসচিব মনোজ কুমার সিং। কিন্তু সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা এবং ইতিমধ্যে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত দাবিতে দেখা যাচ্ছে, ভিআইপি ঘাট ছাড়া বাকিগুলি ভয়াবহ রকমের দূষিত। এর সাথে প্রতিদিন কয়েক কোটি মানুষের আগমন ও স্নানের ফলে ত্রিবেণী সঙ্গমের জলে রোজ মিশছে ১৬ মিলিয়ন লিটার বর্জ্য মিশ্রিত জল, আর রান্না-ধোয়াধুয়ি-স্নানে ২০০ মিলিয়ন লিটার দূষিত জল।

ফলে ‘অমৃতকুম্ভ’ কার্যত বিষকুম্ভ হয়ে উঠেছে। অথচ বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ বলছেন, সঙ্গমের জল শুধু স্নানযোগ্যই নয়, ‘আচমন’ (পবিত্র জলপানের রেওয়াজ)-এরও যোগ্য। তিনি এই কথা বললেও সাউথ এশিয়া নেটওয়ার্ক অন ড্যামস, রিভারস অ্যান্ড পিপল (এসএএনডিআরপি)-এর সমন্বয়কারী হিমাংশু ঠক্কর বলেন, রাজ্য সরকার অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন হয়ে দাবি করেছে যে, নদীতে স্নান করা মানুষের কোনও ক্ষতি হয়নি, যদিও জল স্নানের অযোগ্য। তিনি বলেন, স্নানের জন্য বিশুদ্ধ জল সরবরাহ করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। যখন জল নিরাপদ থাকে না, তখন সংক্রমণের ঝুঁকি সবসময়ই বেশি থাকে। বিশিষ্ট চিত্রাভিনেতা বিশাল দাদলানি আবার এক কদম এগিয়ে যোগীর উদ্দেশ্যে বলেছেন, আপনি নিজেই কুম্ভের জল খেয়ে দেখান। কুম্ভের এই দূষিত জলের এমনই মহিমা যে ৫৬ কোটি মানুষের ‘পাপ ধোয়ার’ পরেও উত্তরপ্রদেশ জেল প্রশাসন প্রয়াগরাজের সঙ্গম থেকে রাজ্য জুড়ে ৭৫টি জেলে পবিত্র জল আনার ব্যবস্থা করছে। বিজেপি সহ কংগ্রেস-সপার মতো দলগুলি জানে, ধর্মের জিগির তুলতে পারলে মানুষ এই সব কোনও কিছুর তোয়াক্কা করবে না। তাই তারা সকলেই একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে সে চেষ্টাতেই ব্যস্ত। ‘নমামি গঙ্গে’ প্রকল্পের ৪০ হাজার কোটি টাকা কোন জলে ধুয়ে গেছে, তা নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। এমনিতেই বিজেপি তাদের এক দশকের অধিক শাসনকালে দেখিয়েছে, তাদের দলে যোগ দিলেই ‘সাত-খুন মাফ’ হয়ে যায়। দুর্নীতিগ্রস্তরা ক্লিনচিট পায়। এককালে যাদের বিরুদ্ধে ‘হঠাও অভিযান’ চালিয়েছিল বিজেপি, তাদেরই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বা প্রধান মুখ করে দেওয়া হয়। বিজেপির দূষিত রাজনীতি যেমন এদের পাপ ধুতে পারেনি, তেমনই এবার কুম্ভের জলে জেলের কয়েদিদের স্নান করিয়ে তাদের শোধনের অভিনব ব্যবস্থা করেছে যোগী-প্রশাসন। কিন্তু কুম্ভের দূষিত জলে সেই কয়েদিদের শোধন বা সংশোধন হবে কি?

একবিংশ শতকে মানুষকে অন্ধতা-কুসংস্কার থেকে মুক্ত করার পরিবর্তে কুম্ভের জলে স্নান করলে অমৃত-লাভের কল্পকাহিনী পরিবেশন করছে বিজেপি। সাথে সাথে নদীর স্বাস্থে্যর অবনতি ঘটিয়ে সেই দূষিত জলে যারা স্নান করছে তাদের সংক্রামক ব্যাধির দিকে ঠেলে দিচ্ছে তারা। আর এই দূষণের শিকার হচ্ছেন সেই সব হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ, বিজেপি ও সংঘ পরিবার ভোট-রাজনীতির পালে হাওয়া দিতে যাদের ক্রীড়নকে পরিণত করেছে।