Breaking News

আয়কর ছাড় দিয়ে বাজার সঙ্কট দূর করা যাবে কি

২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে কেন্দ্রীয় বাজেটের শুরুতে অর্থমন্ত্রীর নির্মলা সীতারমণ বাজেটের প্রধান লক্ষ্যগুলি উল্লেখ করে বলেছেন, আর্থিক বৃদ্ধির হার দ্রুততর করা, সর্বজনীন উন্নয়নের পথে হাঁটা, বেসরকারি লগ্নিকে উৎসাহ দেওয়া, গৃহস্থালীর মনোবল বৃদ্ধি এবং ভারতের উদীয়মান মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধি। একই সাথে দেশবাসীর সামনে ‘বিকশিত ভারতে’র স্বপ্ন ফেরি করার কাজটিও তিনি করেছেন বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে।

এ বারের বাজেটের সবচেয়ে বড় চমক হল মধ্যবিত্তের জন্য আয় কর ছাড়, যা নাকি মধ্যবিত্তের ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করবে! আর এই চমক নিয়েই এখন দেশের রাজনীতি সরগরম। একচেটিয়া পুঁজির নিয়ন্ত্রণাধীন সংবাদমাধ্যম এটাকেই পাদপ্রদীপের আলোয় আনছে। আয় কর ছাড়ের মধ্য দিয়ে মানুষের হাতে যে বাড়তি টাকা আসবে, তা তারা কেনাকাটাতে ব্যয় করবে, কেন্দ্রীয় সরকারের এই দাবি ও প্রত্যাশা কতটা সঠিক সেটা অবশ্যই বিচার করা দরকার। যেমন, মধ্যবিত্ত বলে অর্থমন্ত্রী যে স্তরকে বোঝাতে চেয়েছেন তারা আসলে কোন মানুষগুলি তাও বোঝা দরকার। সেন্ট্রাল বোর্ড অফ ডিরেক্ট ট্যাক্সেস (সিবিডিটি)-র তথ্য অনুযায়ী ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে যে ৮ কোটির মতো মানুষ আয়কর রিটার্ন দিয়েছেন তাদের মধ্যে নতুন আয় কর ছাড়ের সুবিধা পাবেন ৪ কোটির সামান্য বেশি কিছু মানুষ। জনসংখ্যার ৩৩ শতাংশকে মধ্যবিত্ত বলে ধরলেও আয়কর দেওয়ার মতো আয় করেন এর মাত্র ৩ শতাংশ। অর্থাৎ ‘মধ্যবিত্ত’ বলে যাদের দেখানো হচ্ছে তারা আসলে মধ্যবিত্ত নয়, বরং আয়ের বিচারে এরা দেশের উপরের স্তরে থাকা মুষ্টিমেয় মানুষ। অর্থাৎ, বিজেপি সরকারের আয় কর নীতির মাধ্যমে লাভবান হতে চলেছে দেশের একটা বড় সংখ্যক উচ্চ আয়ের মানুষ।

এখন দেখা যাক, ভারতে একজন মানুষের গড় আয় কত। পিরিয়ডিক লেবার পিএলএফএস-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী এ দেশে একজন স্বনিযুক্ত ব্যক্তির মাসিক আয় ১৩,২৭৯ টাকা। নিয়মিত বেতনভোগী মানুষের গড় আয় মাসিক ২০,৭০২ টাকা এবং ঠিকা শ্রমিকের মাসিক গড় আয় ১২,৭৫০ টাকা। তথ্য অনুসারে দেশের শ্রমশক্তির ২৫ শতাংশ মাসে ১৫ হাজার টাকার বেশি আয় করেন এবং নিচের দিকের ২৫ শতাংশ মানুষের মাসিক গড় আয় ৩ হাজার টাকার কম। এ ছাড়াও দেখা যাচ্ছে গ্রামের ৪৬ শতাংশ এবং শহরের ২৪ শতাংশ পুরুষ-শ্রমিকের দৈনিক আয় ৩০০ টাকার কম। ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে গ্রামের ৯১ শতাংশ এবং শহরের ৬৪ শতাংশ মহিলা-শ্রমিকের মাসিক আয় ছিল ৯ হাজার টাকার কম। দেখা যাচ্ছে, দেশের যে ৭০-৭৫ শতাংশ পরিবারের মাসিক আয় ১৫ হাজার টাকার কম, তাদের জন্য সরকারি সাহায্য অর্থাৎ বিনামূল্যে ভাল মানের শিক্ষা, বিনামূল্যের চিকিৎসা, খাদ্যে ভর্তুকির জন্য শক্তিশালী গণবণ্টন ব্যবস্থা, গ্রাম ও শহরের ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করার ভিত্তিতে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা প্রভৃতি পদক্ষেপগুলি কার্যকরী করা অত্যন্ত জরুরি প্রয়োজন। আরেকটি সমীক্ষা থেকে আমরা দেখছি যে ২০১৭-১৮ সালের পর থেকে চাকরিজীবী সহ সমস্ত ক্ষেত্রে এ দেশে পুরুষ ও মহিলা উভয় কর্মীরই প্রকৃত আয় কমেছে। তাৎপর্যপূর্ণ হারে বেড়েছে আর্থিক অসাম্য। অন্যদিকে এই সময়কালের মধ্যে পেট্রোলিয়াম সহ বিভিন্ন পণ্যে পরোক্ষ কর কমলেও তার সুবিধা সব মানুষের কাছে পৌঁছতে পারত, তা কিন্তু একেবারেই হয়নি। এমতাবস্থায় পরোক্ষ কর না কমিয়ে আয়ের শীর্ষে থাকা বাস্তবে ৫ শতাংশের কম মানুষকে কর ছাড় দিলে তা অসাম্যকে আরও বাড়াতে সাহায্য করবে।

এই বাজেটে কার্যকরী ভাবে ব্যক্তিগত আয়কর (পিআইটি) কমিয়ে ভারতের শহুরে মধ্যবিত্তের হাতে অতিরিক্ত এক লাখ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। প্রশ্ন হল অর্থনীতিতে এর প্রভাব কী পড়বে? আমরা জানি যখন মানুষের কাছে বেশি টাকা থাকে তখন তারা বেশি খরচ করে। যে দোকানদার বা ব্যবসায়ী এই অর্থ পায় তারা তাদের কর্মচারীদের এবং সরবরাহকারীদের আরও টাকা দেয় যা আরও বেশি ব্যয় করতে সাহায্য করে। এবং এই শৃঙ্খল প্রক্রিয়াটি মূল পরিমাণের প্রভাবকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে তখনই যখন মানুষের প্রকৃত আয় বৃদ্ধি ঘটার মধ্য দিয়ে প্রকৃত ব্যয় বৃদ্ধিও ঘটে থাকে। কিন্তু আমরা দেখছি যে বর্তমান কর ছাড় এ দেশের ভোগবৃদ্ধির অস্থিরতাকে কমিয়ে দিয়ে মধ্যবিত্তদের আকৃষ্ট করার জন্য কোনও ভাবেই যথেষ্ট নয়।

আবার পুঁজিবাদী অর্থনীতির পণ্ডিতরা বলেন যে মানুষের হাতে বেশি টাকা এলে চাহিদা বাড়বে, ফলে দামও বাড়বে (চাহিদা-চালিত মুদ্রাস্ফীতি)। এটাও সত্য নয়। দাম বাড়ছে চাহিদা কমের জন্য নয়, পুঁজিমালিকদের সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের জন্য এবং মূল্য নিয়ে ফাটকাবাজদের কারসাজির জন্য। লক্ষনীয় যে নতুন স্ল্যাব, রেট এবং রিবেটগুলি শুধুমাত্র নতুন ব্যবস্থার অধীনে থাকা করদাতাদের জন্য প্রযোজ্য। নুতন স্কিমের ভিত্তিতে মূল্য নির্ধারণ করলে যে কেউ এই সুবিধা পাবেন না। অর্থাৎ ২০২৫-২৬ বাজেটে অর্থমন্ত্রীর দেওয়া এক লক্ষ কোটি টাকা ত্রাণ থেকে যে সংখ্যক আয়কর দাতা উপকৃত হতে পারেন তারা আসলে মধ্যবিত্ত শ্রেণিভুক্ত নয়, উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণি। আবার নিয়মিত মজুরি বা বেতন প্রাপ্ত শ্রমিকরা ভারতের ৬৫ কোটি শক্তিশালী শ্রমিকের প্রায় ২০ শতাংশ বা প্রায় ১২ থেকে ১৩ কোটি শ্রমিক– যাদের প্রকৃত আয় ক্রমাগত কমছে। ফলে আয়কর ছাড় দিয়ে এই অংশের শ্রমিকদের কোনও সুবিধা দেওয়া বা এদের ভোগের মানকে উন্নত করা সম্ভবপর নয়। কারণ, এরা অধিকাংশই করদাতাদের মধ্যে থাকার মতো যথেষ্ট উপার্জনই করেন না।

আমরা জানি উপরের দিকে থাকা বিত্তবানদের ট্যাক্স ছাড় দিয়ে তাদের ব্যয়বৃদ্ধির ক্ষমতা বাড়িয়ে জাতীয় আয় বাড়ানোর তুলনায় সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যয় বাড়ালে তার মাল্টিপ্লায়ার এফেক্ট সবসময়ইবেশি হয়। এ ক্ষেত্রে শিক্ষা-স্বাস্থ্যের মতো সামাজিক ক্ষেত্রগুলিতে সরকার ব্যয়বৃদ্ধি করলে মানুষকে নিজের পকেটের টাকা খরচ করতে হয় কম, যা তার ক্রয়ক্ষমতাকে কিছুটা বৃদ্ধি করে। যেহেতু বিত্তবানদের তুলনায় দরিদ্র অংশের মানুষের ভোগব্যয় প্রবণতা বেশি থাকে, তাই দরিদ্র মানুষের সম্মিলিত আয় দেশের কিছু ভোগ্যপণ্যের কেনাকাটা বাড়তেও সাহায্য করে। সত্যটা হল, আয়কর ছাড়ের সুযোগ যে ১০ শতাংশ মানুষ পাবে তার বাইরে দেশের ৯০ শতাংশ মানুষের জন্য, তাদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য, কর্মসংস্থানের জন্য এই বাজেটে কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি। উপরন্তু কর ছাড় দিয়ে যে ১ লক্ষ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি হবে, তা সরকার জনগণের ঘাড় ভেঙে অর্থাৎ কেন্দ্রীয় সাহায্যে চলা বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা ছাঁটাই করে তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। বাজেটে নতুন কোনও ব্যয় বৃদ্ধির পরিকল্পনাও সরকার নেয়নি। এমতাবস্থায় মূল্যবৃদ্ধিকে রোধ করে ধারাবাহিক কর্মসংস্থান বাড়াতে না পারলে দেশের প্রকৃত উন্নয়ন বা বিজেপি সরকারের ‘বিকশিত ভারতে’র স্বপ্ন পূরণ হওয়া অসম্ভব। পুঁজিবাদী ভারতে আর্থিক বৈষম্য ক্রমাগত বাড়ছে। এটা পুঁজিবাদের অন্তর্নিহিত নিয়মের জন্যই হচ্ছে। আর পূর্বতন কংগ্রেস সরকারের মতো বর্তমান বিজেপি সরকারও দেশের পুঁজিপতি শ্রেণির সম্পূর্ণ সেবাদাস রূপে তাদের স্বার্থকেই রক্ষা করে চলেছে। যার প্রতিফলন ঘটছে দেশে কর্পোরেট সংস্থাগুলির মুনাফা বৃদ্ধি এবং ধনী পরিবারের সংখ্যা বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে। এই ব্যবস্থাই পুঁজিপতি শ্রেণির মুনাফা বৃদ্ধির লক্ষ্যেই সমস্ত সরকারি নীতি পরিচালিত হতে বাধ্য। অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে দেশের সিংহভাগ শ্রমিক-কৃষক-খেটে খাওয়া মানুষের জন্য কোনও সুরাহার দিশা এই বাজেটে নেই। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী কর্পোরেট সংস্থাগুলির মুনাফা গত বছর ১৫ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু মজুরি তো বাড়েইনি, বরং মুদ্রাস্ফীতিকে ধরলে অনেক কমেছে। সরকার ও প্রচারযন্ত্রের প্রচারের ঢক্কানিনাদে এই সত্য যেন আমরা ভুলে না যাই।