তাইওয়ান ঘিরে চিন-মার্কিন দুই সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দ্বন্দ্ব প্রকট

দীর্ঘ ন’মাস অতিক্রান্ত হলেও ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসী যুদ্ধ থামার কোনও লক্ষণ নেই। ইতিমধ্যে প্রায় ১০,০০০ মানুষ এই যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন। সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি কত হয়েছে তার সঠিক হিসেব এখনও পাওয়া যায়নি। এর আগে গণদাবীতে আমরা দেখিয়েছিলাম যে, এই যুদ্ধ আসলে আমেরিকা এবং রাশিয়া এই দুই সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দ্বন্দ্বেরই রাজনৈতিক প্রতিফলন। দু-পক্ষই ইউক্রেনের ওপর নিজেদের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে এবং এই যুদ্ধ তারই ফল। এরই মধ্যে সম্প্রতি তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে বর্তমান বিশ্বের দুই অর্থনৈতিক সুপার পাওয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চিনের মধ্যে আরও একটি সামরিক সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ক্রমাগত যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার পুরনো মার্কিন চাল এখন আর বিশেষ খাটছে না। তাই তারা এবার পূর্ব এশিয়ায় একটা নতুন যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি করতে চাইছে। স্পষ্টতই, মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো এবং রাশিয়া দু-পক্ষই নিজ নিজ দেশের সংকটগ্রস্ত অর্থনীতির সামরিকীকরণ এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকটের ফলে উভয় দেশেরই জনসাধারণের মধ্যে যে বিক্ষোভ ধূমায়িত হচ্ছে তার থেকে তাদের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে উগ্র জাতিদম্ভের বিষে দেশবাসীকে ফাঁসিয়ে দিতে চাইছে। এই দ্বিবিধ উদ্দেশ্যে উভয় শক্তিই ইউক্রেন যুদ্ধকে যতদিন পারবে টেনে নিয়ে যাবে।

যুদ্ধবাজ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তাইওয়ানকে আরও একটি রণাঙ্গনে পরিণত করতে চাইছে এবং সাম্রাজ্যবাদী চিনও পালটা হুমকি দিচ্ছে। এই সব ঘটনাই ‘সাম্রাজ্যবাদ যুদ্ধের জন্ম দেয়’– মহান লেনিনের এই শিক্ষাকেই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।

ঐতিহাসিক পশ্চাৎপট

তাইওয়ান হল দক্ষিণ পূর্ব চিনের তটরেখা থেকে মোটামুটি ১০০ মাইল দূরে অবস্থিত একটি দ্বীপ। এর দক্ষিণে হল বাসি চ্যানেল যা আবার লুজোন প্রণালীর একটি অংশ। অল্প যে ক’টি আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথের মধ্য দিয়ে চিনের নৌবাহিনী তার নিজ দ্বীপগুলোর পাশ দিয়ে নিরাপদে পিচম প্রশান্ত মহাসাগরের উন্মুক্ত সমুদ্রপথে পৌঁছতে পারে, লুজোন প্রণালী হল তাদের একটি। সপ্তদশ শতকে কুইং রাজবংশের শাসনকালে তাইওয়ান সম্পূর্ণভাবে চিনা অধিকারে আসে। কিন্তু ১৮৯৫ সালে প্রথম চিন-জাপান যুদ্ধে চিন পরাজিত হওয়ার ফলে জাপান তাইওয়ান দখল করে নেয়। ১৯৪৫ সালে জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত হলে তারা তাইওয়ান আবার চিনকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়। চিনে তখন চিয়াং কাই শেক নেতৃত্বাধীন কুয়ো মিন তাং শাসনের আমল। কিন্তু ১৯৪৯ সালে যখন মহান মাও সে তুঙ-এর নেতৃত্বে বিপ্লব জয়যুক্ত হয় এবং চিনকে ‘পিপলস রিপাবলিক অফ চায়না’ নামে এক সমাজতান্ত্রিক রাষ্টে্র পরিণত করা হয় তখন পরাজিত চিয়াং কাই শেক নেতৃত্বাধীন বুর্জোয়া এবং কমিউনিস্ট বিদ্বেষী কুয়ো মিন তাং বাহিনী মূল চিন ভূখণ্ড থেকে বিতাড়িত হয়ে তাইওয়ান দ্বীপে আশ্রয় নেয় এবং তারা দাবি করে যে, তাইওয়ান হচ্ছে প্রকৃত চিন দেশ। তাইওয়ানকে ‘রিপাবলিক অফ চায়না’ নাম দিয়ে চিয়াং সেখানে সামরিক শাসন কায়েম করে। প্রথম অবস্থায় চিয়াং-এর একনায়কত্বে একদলীয় বুর্জোয়া শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। কিছু দিন পরে আংশিক রূপে একটি বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। সমাজতান্ত্রিক চিন এবং তাইওয়ান উভয়েই একটি মাত্র চিন দেশকে স্বীকৃতি দেয়। তাইওয়ানে গৃহযুদ্ধ চলতে থাকায় তার নিরসনের জন্য সমাজতান্ত্রিক চিনের রূপকার মহান মাও সে তুঙ শান্তিপূর্ণ উপায়ে তাইওয়ানের সঙ্গে দ্বন্দ্ব মেটানোর প্রস্তাব দেন এবং মিলিত চিন রাষ্টে্রর সরকারে চিয়াং কাই শেককে একটি প্রশাসনিক স্থান দেওয়ারও প্রস্তাব করেন। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার ঘোর বিরোধী চিয়াং কিন্তু সে-কথায় কর্ণপাত করেননি। তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল চিনের মূল ভূখণ্ডে পুনঃপ্রবেশ করে সমাজতন্ত্রকে উৎখাত করা। তাইওয়ান আমেরিকার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ আর্থিক সাহায্য পেতে থাকে যার ফলে সে তার মাথাপিছু আয় এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির চিত্রটাকে বাড়িয়ে দেখাতে পারে। এই সুযোগে আবার আমেরিকা প্রথম থেকেই তাইওয়ান প্রণালীতে তার রণতরীগুলো স্থাপন করে তাইওয়ানকে নিজ সামরিক প্রভাবের ছত্রছায়ায় নিয়ে আসতে শুরু করে। ১৯৫৮ সালে একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে। মার্কিন নৌ ও বিমানবাহিনীর সাহায্যে চিয়াং সমাজতান্ত্রিক চিনের জাহাজ চলাচলের পথে বাধা সৃষ্টি করতে থাকে এবং মূল ভূখণ্ডের কাছাকাছি দ্বীপ মাৎসু ও কুইময়-তে গুপ্তচর নিয়োগ এবং অন্তর্ঘাতমূলক কাজ চালানোর জন্য সশস্ত্র বাহিনীও পাঠাতে থাকে। চিয়াং মূল ভূখণ্ডে ক্ষমতা দখলেরও স্বপ্ন দেখত কারণ, তার ধারণা ছিল, সমাজতান্ত্রিক চিনে সাধারণ মানুষ অনাহারে আছে, তাই তারা চিয়াং বাহিনী দেশে প্রবেশ করলে তাদের স্বাগত জানাবে। চিয়াং তার নৌ বাহিনীর এক চতুর্থাংশকেই ওই এলাকায় স্থাপন করেছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও তার কুখ্যাত সপ্তম নৌবহরকে ওই এলাকায় ঘাঁটি গাড়তে পাঠিয়েছিল এবং চিনের সঙ্গে যুদ্ধ বাধলেই চিয়াং-এর সমর্থনে নেমে পড়ার নির্দেশও দিয়ে রেখেছিল। মাও সে তুঙ-এর নেতৃত্বাধীন চিনকে তখন বাধ্য হয়েই এবং সমাজতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য পাল্টা সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়েছিল এবং তাইওয়ান প্রণালী থেকে মার্কিন নৌবহর অপসারণ করার দাবি তুলতে হয়েছিল। ১৯৫৪ সালের জেনেভা সম্মেলনে চিন-মার্কিন কূটনৈতিক আলাপ আলোচনায় বসার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু ১৯৫৫ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত স্থগিত ছিল। তাইওয়ান প্রণালী সংক্রান্ত ঘটনার সময় চিন এই মুলতুবি আলাপ-আলোচনা আবার শুরু করার প্রস্তাব দেয়। সোভিয়েত ইউনিয়নও এই সময়ে তাইওয়ানে মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে পাল্টা সামরিক হস্তক্ষেপ করার হুমকি দেয়। চাপের মুখে পড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার যুদ্ধ প্রচেষ্টা স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়, কিন্তু তার নৌবহরকে সরিয়ে নেয়নি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তখনকার সেক্রেটারি অফ স্টেটস জন ফস্টার ডালাস চিন সম্পর্কে মার্কিন নীতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘গণপ্রজাতান্ত্রিক চিনকে ধবংস করার জন্য যা করা দরকার আমেরিকা তাই করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।’ কিন্তু ১৯৭০ সালের মধ্যেই কানাডা এবং আরও কয়েকটি পাচাত্য দেশ সমাজতান্ত্রিক চিনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। ১৯৭১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও তার পূর্ববর্তী নীতি থেকে সরে আসে এবং সমাজতান্ত্রিক চিন ও জাতীয়তাবাদী চিন বা তাইওয়ান উভয় রাষ্ট্রকেই রাষ্ট্রসঙ্ঘের অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেয়। ঐ বছরই রাষ্ট্রসঙ্ঘের ভোটে চিন রাষ্ট্রসঙ্ঘের সদস্যপদ লাভ করে এবং তাইওয়ানকে জাতিসঙ্ঘ থেকে বহিষ্কার করা হয়। ১৯৭২ সালে মার্কিন রাষ্ট্রপতি রিচার্ড নিক্সন চিন সফরে যান এবং তাইওয়ান থেকে মার্কিন বাহিনী ও সমরসজ্জা প্রত্যাহার করে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু তার পর থেকে বিগত ৫১ বছর ধরে আমেরিকা মুখে ‘একমাত্র চিন’ হিসেবে গণপ্রজাতান্ত্রিক চিনকেই কেবল স্বীকৃতি দিলেও তাইওয়ানের সঙ্গে অলিখিত সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। মার্কিন আইন ‘তাইওয়ান রিলেশনস অ্যাক্ট’ (টিআরএ)-এর মাধ্যমে তারা সমাজতান্ত্রিক চিনের আগ্রাসন থেকে ‘‘দ্বীপরাষ্ট্রটির আত্মরক্ষার সংগ্রামে” সহায়তা দানের নামে তাইওয়ানকে আইনসঙ্গতভাবেই অস্ত্র বিক্রি করে থাকে। এতে একথাও বলা আছে যে, তাইওয়ানের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে বিপন্ন করার জন্য তার ওপর কোনও রকম বলপ্রয়োগ করা হলে আমেরিকা সেখানে হস্তক্ষেপ করবে। বস্তুত, মুখে একটিমাত্র চিন দেশকে স্বীকৃতি জানালেও আমেরিকা তাইওয়ান সম্পর্কে একটি দুর্বোধ্য, এমনকি বলা চলে ষড়যন্ত্রমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলেছে এবং তাকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র বিক্রি করছে। ২০২১ সালের এপ্রিল মাসেই তারা তাইওয়ানকে ৭৫০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের অস্ত্রশস্ত্র বিক্রি করেছে।

কূটনৈতিক অবস্থান

মহান মাও সে তুঙ-এর অধিনায়কত্বাধীন গণপ্রজাতান্ত্রিক চিন যখন ‘একটি মাত্র চিনরাষ্টে্রর’ নীতি ঘোষণা করেছিল, তার অর্থ ছিল, সমগ্র চিন ভূখণ্ডে একটিমাত্র সরকার থাকবে এবং সেটি হবে সমাজতান্ত্রিক সরকার। চিন সরকার ঘোষণা করেছিল, তাইওয়ান চিনের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং শীঘ্রই তাকে তার মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। ১৯৪৯ সালে ভারত সরকার প্রথম এই নীতিকে স্বীকৃতি দেয়। ক্রমে জি-৭-এর অন্তর্ভুক্ত শক্তিশালী সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলোও ‘এক চিন’ নীতিকে মেনে নেয়। বর্তমানেও জি-৭-এর দেশগুলো যার মধ্যে আমেরিকা এবং জাপানও আছে, বলছে যে ‘এক চিন’ নীতি তারা এখনও স্বীকার করে এবং তাইওয়ান সম্পর্কে তাদের মূল নীতিরও কোনও পরিবর্তন হয়নি। ইতিমধ্যে অবশ্য চিনের অভ্যন্তরেই একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে গেছে। মহান মাও সে তুঙ এবং তার অল্প কিছুকাল পরেই চৌ এন লাই-এর মৃত্যুর পর শোধনবাদী দেং জিয়াও পিং চক্র চিনের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে এবং প্রতিবিপ্লবী পথে হাঁটা শুরু করে– যার পরিণতিতে অবশেষে ২০০৪ সালে প্রতিবিপ্লবের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়ে চিন এখন একটি আদ্যন্ত সাম্রাজ্যবাদী রাষ্টে্র রূপান্তরিত হয়েছে। কাজেই পূর্বতন সমাজতান্ত্রিক চিনের ‘এক চিন’ নীতি ঘোষণার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য এবং বর্তমান সাম্রাজ্যবাদী চিনের তাইওয়ান দখলের লক্ষ্য অভিন্ন নয়। সমাজতান্ত্রিক চিনের বক্তব্য ছিল, চিন নামে একটিই মাত্র সার্বভৌম রাষ্ট্র থাকবে এবং গণপ্রজাতান্ত্রিক চিন সরকারই হবে সে রাষ্টে্রর একমাত্র বৈধ সরকার। প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির এজেন্ট এবং সমাজতন্তে্রর ঘোর শত্রু চিয়াং শাসনাধীন তাইওয়ান সম্পর্কে তাদের বক্তব্য ছিল–তা চিনের অভ্যন্তরে কুয়ো মিন তাং ও কমিউনিস্ট দলের মধ্যেকার সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক গৃহযুদ্ধেরই জের এবং সেজন্য তাকে চিনের অভ্যন্তরীণ সমস্যা বলেই গণ্য করতে হবে। সুতরাং সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর সঙ্গে চিয়াং-এর আঁতাত আটকানোর জন্য তারা সঠিকভাবেই ‘এক চিন’ নীতি ঘোষণা করেছিল।

বর্তমান সাম্রাজ্যবাদী চিনের শাসকেরা পূর্বতন সমাজতান্ত্রিক চিনের উত্তরাধিকারী সাজার ভান করছে কিন্তু তাদের আসল উদ্দেশ্য আগ্রাসী ভূমিকা নিয়ে একটা নতুন সাম্রাজ্যবাদী সুপার পাওয়ারে পরিণত হওয়া এবং ওই ভূভাগে মার্কিন আধিপত্য খর্ব করা। এরই জন্য তারা তাইওয়ানকে নিজেদের শক্তিপ্রদর্শনের ক্ষেত্র রূপে ব্যবহার করতে চাইছে। পুরোপুরি মার্কামারা সাম্রাজ্যবাদীদের মতোই চিনের বর্তমান শাসকেরা ক্রমাগতই তাদের প্রভাবাধীন এলাকা বাড়িয়ে চলেছে এবং ইতিমধ্যেই আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি রূপে আবির্ভূত হয়েছে। কুখ্যাত ‘ব্রিকস’ পরিকল্পনার মাধ্যমে তারা ভারত মহাসাগর এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় এবং তাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর নিজেদের আধিপত্য ক্রমশই আরও শক্তপোক্ত ভাবে কায়েম করছে। চিন সাম্রাজ্যবাদের এই ক্রমবর্ধমান শক্তিবৃদ্ধির পাল্টা হিসারে আমেরিকা, জাপান, ভারত ও অস্টে্রলিয়াকে নিয়ে ‘কোয়াড’ ব্লক গঠন করেছে। তাইওয়ান সমস্যাকে এই পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করতে হবে। কিন্তু তা সত্ত্বেও যুক্তিসঙ্গত বিচারে ‘এক চিন’ নীতির বৈধতা অনস্বীকার্য। ১৯৭২, ১৯৭৯ এবং ১৯৮২ সালে পরপর চিন-আমেরিকা উভয় পক্ষের স্বাক্ষরিত তিনটি যৌথ ঘোষণাপত্রেই চিনকে একটিমাত্র দেশ এবং তাইওয়ানকে চিনেরই একটি প্রদেশ বলে মেনে নেওয়া হয়েছিল। অপরপক্ষে তাইওয়ানের শাসকেরাও ‘এক চিন’ এর কথাই বলে। কিন্তু তাদের ‘রিপাবলিক অফ চায়না’ সংবিধান (যা কুয়ো মিন তাং সরকার ১৯৪৭ সালে নানজিং-এ পাশ করিয়েছিল) অনুযায়ী ‘এক চিন’-এর অর্থ হল, চিনের মূল ভূখণ্ড এবং তাইওয়ান উভয়কে যুক্ত করে গোটা চিন দেশের ওপর একমাত্র ‘রিপাবলিক অফ চায়না’ সরকারের সার্বভৌমত্বকেই স্বীকার করতে হবে।

চিন কর্তৃপক্ষ বর্তমানে দাবি করছে, ১৯৯২ সালে চিন কমিউনিস্ট পার্টি ও তাইওয়ানের তৎকালীন শাসক কুয়োমিনতাং দলের মধ্যে যে বোঝাপড়া হয়েছিল তারই ভিত্তিতে তাইওয়ানকে দেখতে হবে। কিন্তু তাইওয়ানের বর্তমান শাসকেরা এই দাবি মানতে রাজি নয়। তাদের মতে ওই বোঝাপড়ায় তাইওয়ানের বৈধ অস্তিত্বের প্রশ্নে কোনও কথা হয়নি। স্পষ্টতই আমেরিকা ও চিন উভয়ের তাইওয়ানে ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। উপরন্তু সাম্রাজ্যবাদী চিন বর্তমানে তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত। কাজেই আমেরিকা, রাশিয়া ও অন্যান্য ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর মতো তারও অর্থনীতির সামরিকীকরণের জন্য যুদ্ধ উত্তেজনা সৃষ্টি করা প্রয়োজন। ইউরোপের উপর অর্থনৈতিক আধিপত্য কার থাকবে তাই নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। একই ভাবে ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার আধিপত্য নিয়ে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়েছে সাম্রাজ্যবাদী চিনের সঙ্গে।

তাইওয়ানের অর্থনীতি

আমেরিকার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ আর্থিক সাহায্য পেয়ে তাইওয়ান বর্তমানে একটি অত্যন্ত উন্নত পুঁজিবাদী অর্থনীতির দেশে পরিণত হয়েছে। তার বাৎসরিক পণ্য রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ৭৮৬ বিলিয়ন ডলার এবং পণ্য বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তাইওয়ান সবসময় দেশ হিসেবে আমেরিকার স্বার্থ এবং সেদেশের অর্থনৈতিক সুবিধেকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। গত বছরে তাইওয়ান আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যকারী অষ্টম বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের কাছে তাইওয়ানের গুরুত্ব অপরিসীম এই কারণে যে, সারা বিশ্বের নিত্যপ্রয়োজনীয় যাবতীয় ইলেকট্রনিক পণ্য যেমন, মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, কম্পিউটার, ঘডি, ভিডিও গেমসের উপকরণ বা অন্যান্য যা কিছুই কম্পিউটার চিপ পরিচালিত সেগুলোর অধিকাংশই উৎপাদন করে তাইওয়ান।

সারা পৃথিবীর ইলেকট্রনিক পণ্য বাজারের অর্ধেকেরও বেশি তাইওয়ানের একটিমাত্র কোম্পানি ‘তাইওয়ান সেমিকনডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি’ বা টিএসএমসি দখল করে রেখেছে। বিশ্ববাজারে চিনের সঙ্গে বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে সেমিকনডাক্টর শিল্প গড়ে তোলা আমেরিকার বর্তমানে অত্যন্ত প্রয়োজন। এইজন্য টিএসএমসি আমেরিকায় চিপ ফ্যাক্টরি তৈরি করতে ১২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু এদিকে তাইওয়ান থেকে চিন বর্তমানে বছরে ১২৬.২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য কিনছে যা তাইওয়ান থেকে আমেরিকায় রপ্তানি বাণিজ্যের (৬৫.৯ বিলিয়ন) প্রায় দ্বিগুণ। চিনের ভোগ্যপণ্য উৎপাদক কোম্পানিগুলো তাইওয়ান থেকে আমদানি করা সেমিকনডাক্টর প্রভৃতির ওপর নির্ভরশীল হলেও তাইওয়ানকে আবার ভারী বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য পণ্য চিন থেকেই আমদানি করতে হয়। সুতরাং চিনের সঙ্গে শত্রুতা করতে গেলে তাইওয়ানের অর্থনীতিকে বড় রকমের মাশুল দিতে হতে পারে। দ্বিতীয়ত, তাইওয়ান প্রণালীতে কোনও সশস্ত্র সংঘর্ষ শুরু হলে চিপ বাণিজ্যের চেন ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্প বিঘ্নিত হলে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা ও চিন উভয় দেশেরই অর্থনীতি ভালোরকম ধাক্কা খাবে, এবং তাইওয়ানের অর্থনীতি যে ভয়াবহ সংকটের মধ্যে পড়বে সে কথা তো বলাই বাহুল্য।

ভারত এখনও নিরপেক্ষহয়ে রয়েছে কেন?

সাধারণভাবে ‘এক চিন’ নীতিকে সমর্থন জানানোর জন্য ভারত আজ পর্যন্ত তাইওয়ানের সঙ্গে কোনও কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলেনি। কিন্তু কূটনৈতিক কার্যাবলী পরিচালনার জন্য ‘ভারত-তাইপেই অ্যাসোসিয়েশন’ (আইটিএ) নামে তাইপেই শহরে ভারত সরকারের একটা দপ্তর আছে। একজন অভিজ্ঞ কূটনৈতিক অফিসারকেই এই দপ্তরের দায়িত্বে নিয়োগ করা হয়ে থাকে। আবার দিল্লিতেও ‘তাইপেই অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’ নামে তাইওয়ানের একটা দপ্তর আছে। এই দুই দপ্তরই প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৫ সালে।

এইভাবে ভারত সরকার কার্যত চিন ও তাইওয়ান উভয় দেশের সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলছে। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে ভারত ও চিন উভয় দেশেরই সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের মধ্যে পুরোনো সীমান্ত সমস্যা ছাড়াও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ভূরাজনৈতিক প্রভাবাধীন এলাকা দখলকে কেন্দ্র করে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের সংঘাত বেধেছে। এই কারণে ভারতের সাম্রাজ্যবাদী শাসকগোষ্ঠী খোলাখুলিভাবেই আমেরিকার সঙ্গে গাঁটছড়া আরও শক্তপোক্ত করছে এবং তাদের সাহায্য নিয়ে শুধু এশিয়া নয়, গোটা বিশ্বের মধ্যেই একটি সুপারপাওয়ার হিসেবে উঠে আসার চেষ্টা করছে। ভারত সরকার এমনকি আমেরিকার বহির্বিশ্ব সম্পর্কিত মন্ত্রকের জয়েন্ট সেক্রেটারিকে ভারতের হয়ে তাইপেইতে দৌত্য করতে পাঠিয়েছে।

২০১৬ সালে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি তার দুজন সাংসদকে নির্দেশ দিয়েছিল নবনিযুক্ত তাইওয়ান প্রেসিডেন্ট সাই ইং ওয়েন এর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারচুয়াল মোডে উপস্থিত থাকতে। অবশ্য তা সত্ত্বেও সম্প্রতি তাইওয়ানের রাজধানী তাইপেইতে আমেরিকার হাউস অফ রিপ্রেজেনটেটিভের স্পিকার ন্যানসি পেলোসির সফরকে কেন্দ্র করে চিন আমেরিকার মধ্যে যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে সে ব্যাপারে ভারত সরকার এখনও পর্যন্ত কোনও পক্ষাবলম্বন করেনি এবং রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ কোনও বিবৃতিও দেয়নি।

তাইওয়ানে বর্তমান যুদ্ধ উত্তেজনার কারণ

হাউস অফ রিপ্রেজেনটেটিভের স্পিকার আমেরিকান প্রশাসনে গুরুত্বের মাপকাঠিতে তৃতীয় সর্বোচ্চ স্থানে অধিষ্ঠিত। গত পঁচিশ বছরের মধ্যে এত উচ্চ পর্যায়ের কোনও আমেরিকান প্রশাসক তাইওয়ান সফর করেননি। ন্যানসি পেলোসির গত বছর মার্চেই এই সফর করার কথা ছিল। কিন্তু কোভিডের জন্য তা স্থগিত রাখা হয়। চিন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে বারণ করেছিলেন যে, তাঁরা যেন ন্যানসিকে তাইওয়ান সফরে না পাঠান– পাঠালে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাবে। এই অনুরোধ পাঠানোর কয়েক দিনের মধ্যেই আপত্তি অগ্রাহ্য করে আমেরিকা ন্যানসিকে তাইওয়ানে পাঠায়। এর ফলে চিন অত্যন্ত রুষ্ট হয়। কারণ, চিন সাম্রাজ্যবাদের চোখে উচ্চ পর্যায়ের কোনও আমেরিকান প্রশাসকের তাইওয়ান সফরের অর্থ তাইওয়ানের স্বাধীনতার দাবিতে আমেরিকার সমর্থন জোগানো। পিচম দুনিয়া এবং ভারতের সংবাদমাধ্যম শুধুমাত্র চিনের বিরুদ্ধে একতরফা প্রচার চালাচ্ছে যে, কেবলমাত্র চিনই তাইওয়ানের চারধারের সমুদ্রে সামরিক তৎপরতা বাড়িয়েছে, দ্বীপটির আকাশের উপর দিয়ে মিসাইল ছুঁড়ছে, আকাশসীমা লঙ্ঘন করে জেট প্লেন ওড়াচ্ছে। কিন্তু যে কথাটা তারা চেপে যাচ্ছে, তা হল, মার্কিন নৌবাহিনীর সপ্তম নৌবহর এই বছরেই এখনও পর্যন্ত প্রতি মাসে গড়ে একটা করে মিসাইল বিধবংসী যুদ্ধজাহাজ তাইওয়ান প্রণালীতে পাঠিয়েছে। মার্কিন নৌবহরের সর্বোচ্চ কম্যান্ড ‘রিম অফ দি প্যাসিফিক অ্যামফিবিয়াস অ্যাসল্ট ট্রেনিং’ ১৭০টি বিমান, ৩৮টি যুদ্ধজাহাজ, চারটি সাবমেরিন এবং জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোর সম্মিলিত মোট ২৫ হাজার সৈন্য সেখানে মোতায়েন করেছে। এ ছাড়াও এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় আরও প্রায় ১৯টি দেশকে প্রতীকী অংশগ্রহণের জন্য আহ্বান করা হয়েছে। ‘রিমপ্যাক’ হল পৃথিবীর বৃহত্তম নৌ-সেনাবাহিনীর সম্মিলন। তাদের কম্যান্ডার বলেছেন, চিনা সামরিক বাহিনীর অগ্রগতি রোধ করাই তাদের উদ্দেশ্য। ন্যানসি পেলোসির তাইওয়ান সফরের সময়ও এই আগ্রাসী সামরিক মহড়া চালু ছিল। আমেরিকা স্বভাবসিদ্ধ ভাষায় এই বিপুল সমরসজ্জাকেও রুটিন এবং দৈনন্দিন মহড়া বলেই বিবৃতি দিয়েছে। এও জানা গেছে যে, গত মার্চ মাসেই আমেরিকার উচ্চপদস্থ সামরিক ও গোয়েন্দা বিভাগের কর্তাব্যাক্তিরা তাইওয়ান সফর করেছেন। তার পর পরেই এপ্রিল মাসে সব মার্কিন যুদ্ধ চক্রান্তের প্রধান কারিগর লিন্ডসে গ্রাহামের নেতৃত্বে সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা বিভাগ, বিচারবিভাগ ও অর্থমন্ত্রকের প্রতিনিধিদের একটি বড় দল তাইওয়ানে আসে। গত ২১ আগস্ট আসে ইন্ডিয়ানা রাজ্যের গভর্নর এরিক হলকম্বের নেতৃত্বে তৃতীয় আর একটি দল। হলকম্বের দপ্তরের একটি বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, সফরটির উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বের সর্বাধিক সেমিকনডাক্টর উৎপাদক দেশ তাইওয়ানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও উন্নত ও সুদৃঢ় করা। কিন্তু সারা বিশ্বে আধিপত্য কায়েম করার উদ্দেশ্যে একের পর এক দেশের উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ায় ওস্তাদ কুখ্যাত মার্কিন বিদেশনীতির সম্পর্কে ওয়াকিবহাল মানুষ মাত্রেই জানেন যে, এই আপাত নিরীহ বিবৃতিটি মোটেও বিশ্বাসযোগ্য নয়। আমেরিকার আসল উদ্দেশ্য এই সব একের পর এক প্ররোচনা সৃষ্টি করে চিনকে পালটা পদক্ষেপ গ্রহণে বাধ্য করা। চিনও এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে সামরিক মহড়া শুরু করেছে এটা দেখানোর জন্য যে, চিনা সামরিক বাহিনী দ্বীপটাকে অবরুদ্ধ করে রাখার মতো যথেষ্ট ক্ষমতা ধরে। আর এর ফলেই ইউক্রেনের যুদ্ধ পুরোদমে চলতে চলতেই তাইওয়ানের আকাশে একটি নতুন যুদ্ধের কালো মেঘ ঘনিয়ে উঠেছে।

অর্থনীতির সামরিকীকরণ এবং যুদ্ধ বাধানো সাম্রাজ্যবাদের বৈশিষ্ট্য

আমরা বিভিন্ন সময় বারবার দেখিয়েছি, সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর নিজেদের অর্থনীতি তার নিজের নিয়মেই প্রতি মুহূর্তে তীব্র থেকে তীব্রতর সংকটে নিমজ্জিত হচ্ছে এবং এই চূড়ান্ত সংকটগ্রস্ত অর্থনীতিকে কৃত্রিম উপায়ে যথাসম্ভব কিছুটা চাঙ্গা করার মরিয়া প্রচেষ্টা থেকেই প্রতিটি সাম্রাজ্যবাদী দেশই অর্থনীতির সামরিকীকরণ করতে বাধ্য হচ্ছে। সামরিকীকরণের ফলে কৃত্রিমভাবে কিছু শিল্প সৃষ্টি হয় এবং তার ফলে অর্থনীতিও খানিকটা চাঙ্গা হয়। যুদ্ধে অস্ত্রশস্ত্র প্রভৃতি সামরিক উপকরণ প্রচুর পরিমাণে ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে আবার প্রচুর পরিমাণে নতুন সামরিক উপকরণ উৎপাদন করতে হয়। এর ফলে অর্থনীতি কিছুটা তেজি হয়। এইজন্যই সাম্রাজ্যবাদ সবসময় যুদ্ধ উত্তেজনা জিইয়ে রাখতে এবং স্থানীয় বা আঞ্চলিক ভাবে হলেও যেখানে যতটুকু সম্ভব যুদ্ধ বাধানোর ফিকির খোঁজে। এই কারণেই আমেরিকা, রাশিয়া, বৃহৎ ইউরোপীয় শক্তিগুলো, ভারত সহ সব সাম্রাজ্যবাদী দেশেই অর্থনীতির সামরিকীকরণ বর্তমানের একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর সাম্রাজ্যবাদীদের চূড়ামণি আমেরিকা তো দীর্ঘদিন আগে থেকেই যুদ্ধ চক্রান্তকেই তার প্রধানতম আন্তর্জাতিক নীতিতে পরিণত করে ফেলেছে এবং একটার পর একটা দেশে ‘দুঃশাসনের অবসান’ করে গণতন্ত্র রপ্তানি করার অজুহাতে যুদ্ধ বাধিয়ে চলেছে। তাইওয়ানের ক্ষেত্রেও ন্যানসি পেলোসি বলেছেন, ‘তিনি এমন একটা সময়ে সফর করছেন যখন বিশ্বকে গণতন্ত্র এবং একনায়কতন্তে্রর মধ্যে একটাকে বেছে নিতে হবে।’ আর তাদের পেটোয়া বুর্জোয়া মিডিয়াও এইসব কথাগুলোর সপক্ষে অনর্গল মিথ্যা প্রচার করে চলেছে। আমেরিকান একচেটিয়া পুঁজিপতি গোষ্ঠীর পত্রিকা ‘পাবলিকো’ ইরাক আক্রমণ সহ আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের সবকটি যুদ্ধচক্রান্তকে সমর্থন যুগিয়ে গেছে। ফক্স নিউজ, সিএনএন, এপি, দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, দি ওয়াশিংটন পোস্ট ধনকুবেরদের পরিচালিত সবকটি মিডিয়াই আমেরিকান যুদ্ধাস্ত্রশিল্পের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ভাণ্ডার দখল করার লক্ষে্য সেখানে আধিপত্য বিস্তারের জন্য মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বাধিয়ে রাখতে চায়। তাদের সব থেকে বড় বন্ধু উগ্র ইহুদিবাদী ইজরায়েলকে দিয়ে প্যালেস্টাইনের ওপরও তারা ক্রমাগত ছায়াযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে এবং অসংখ্য মানুষকে হত্যা করছে। বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরে ক্যু ঘটানো, সশস্ত্র জাতিদাঙ্গা বাধিয়ে দেওয়া, যেসব দেশের শাসনকর্তারা আমেরিকার নির্দেশে উঠতে বসতে রাজি নয় তাদের গুপ্তহত্যা করা, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে পুতুল সরকার বসানো– এ সবই আমেরিকার বহু পুরোনো কারবার। ১৯৯০ সালে যখন সংশোধনবাদী দেং নেতৃত্বাধীন চিন তাইওয়ান প্রণালীতে সামরিক মহড়া শুরু করে, আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টন তৎক্ষণাৎ সেখানে যুদ্ধবিমানবাহী জাহাজ পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু এখন চিন একটি পুরোদস্তুর সাম্রাজ্যবাদী শক্তিতে পরিণত এবং বিশ্বের বৃহত্তম নৌবাহিনীর অধিকারী হওয়ায় আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তিত। কাজেই বর্তমান আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আর সে সাহস দেখাচ্ছেন না। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েকমাস ধরে তিনি বারবার বলছেন, তাইওয়ান আক্রান্ত হলে আমেরিকা তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসবে। আমেরিকা সারা বিশ্বের ৮৫টা দেশে ৭৫০টার মতো সেনাঘাঁটি এবং আটটা দেশে নৌঘাঁটি বানিয়েছে। সাম্রাজ্যবাদী চিনও বর্তমানে অন্য দেশে নৌঘাঁটি বানাতে শুরু করেছে। ২০১৭ সালে তারা তাদের প্রথম বৈদেশিক নৌঘাঁটি বানায় হর্ন অফ আফ্রিকার উপকূলের জিবুতিতে। এখন সে নিরক্ষীয় গায়নাতে আরও একটি নৌঘাঁটি বসানোর পরিকল্পনা করছে। শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরটি চিন ইতিমধ্যেই ৯৯ বছরের জন্য লিজ নিয়ে নিয়েছে এবং এই চুক্তির শর্তানুযায়ী লিজ আরও ৯৯ বছরের জন্য বাড়ানো যাবে। স্থানীয় স্তরে আধিপত্য বিস্তার না করতে পারলে কোনও সাম্রাজ্যবাদী শক্তিই আন্তর্জাতিক সুপারপাওয়ার হয়ে উঠতে পারে না। সুতরাং তাইওয়ান প্রণালীতে দুজনের মধ্যে কে দখলদারি কায়েম করতে পারবে তারই ওপর নির্ভর করছে তাইওয়ানের অর্থনীতি ও প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ চিন না আমেরিকা কার হাতে থাকবে।

বিশ্বব্যাপী শক্তিশালী সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনই কেবলমাত্র এই যুদ্ধ জিগিরকে রুখে দিতে পারে

সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর প্রকৃত শাসক একচেটিয়া ও বহুজাতিক পুঁজিপতি গোষ্ঠীগুলোর নিজেদের মুনাফা লোটার উদগ্র লালসা চরিতার্থ করার জন্য, কোনও না কোনও তুচ্ছাতিতুচ্ছ অজুহাতে বিশ্বের দেশে দেশে এইভাবে একটার পর একটা যুদ্ধ বাধানোর জঘন্য চক্রান্তের জেরে বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রপ্রিয় শান্তিকামী মানুষ মাত্রেই উদ্বিগ্ন। তাঁরা সকলেই রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান এবং তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে ঘনিয়ে ওঠা এই সংকটেরও অবসান চাইছেন। কেন না, বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়েই পুঁজিবাদী অর্থনীতি ক্রমশই বেশি বেশি করে সংকটে নিমজ্জিত হচ্ছে এবং তার দায়ভার বইতে হচ্ছে কোটি কোটি শোষিত নিপীড়িত সাধারণ মানুষকে। কিন্তু শুধুমাত্র চাইলেই তা হবার উপায় নেই কারণ, মানবতার ঘৃণ্যতম শত্রু মুনাফালোভী একচেটিয়া সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিপতিদের কাছে ভালো কথায় আবেদন নিবেদন করে কোনও ফল হবার নয়। পূর্বতন সোভিয়েত নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক শিবির যতদিন ছিল, ততদিন তা সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধচক্রান্তকে প্রতিহত করার ক্ষমতা নিয়ে একটা শক্তিশালী প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু বর্তমানে সমাজতান্ত্রিক শিবির অবলুপ্ত হয়ে যাওয়ার ফলে সাম্রাজ্যবাদীদের আগ্রাসন উত্তরোত্তর বল্গাহীন গতিতে বেড়ে চলেছে। দুর্জনের ছলের অভাব হয় না। সাম্রাজ্যবাদীদেরও যুদ্ধ বাধানোর অজুহাতের অভাব নেই। যে দেশকেই তারা দেখছে যে তাদের তাঁবে থাকতে রাজি নয়, সেখানেই যে কোনও অজুহাতে তারা আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি সবকিছু লঙ্ঘন করে আগ্রাসন চালাচ্ছে, অসংখ্য নিরীহ জনসাধারণকে নির্মমভাবে হত্যা করছে এবং নিজেদের আধিপত্য কায়েম করার উদ্দেশ্যে সমস্ত রকম জঘন্য অত্যাচারের বন্যা বইয়ে দিচ্ছে। এই অবস্থায়, সারা বিশ্বের বিপ্লবী দলসমূহের নেতৃত্বে শান্তিকামী মানুষদের সুসংগঠিত সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনই কেবলমাত্র সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ-ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে তাদের এই যুদ্ধচক্রান্তকে রুখে দিতে পারে।

এ প্রসঙ্গে এ কথাও মনে রাখতে হবে, সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে যেমন আছে উন্নত গণবিধবংসী অস্ত্র, দুনিয়াজোড়া শ্রমিকশ্রেণির ভাণ্ডারেও রয়েছে তাদের অমোঘ অস্ত্র মার্কসবাদ-লেনিনবাদ। এ যুগের একজন অগ্রগণ্য মার্কসবাদী চিন্তানায়ক কমরেড শিবদাস ঘোষ বলেছিলেন, সঠিক বিপ্লবী নেতৃত্বে পরিচালিত সংগঠিত জঙ্গি শান্তি আন্দোলনই কেবলমাত্র সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ চক্রান্তকে কার্যকরীভাবে রুখে দিতে পারে। এইজন্যই পৃথিবীর দেশে দেশে সর্বস্তরের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রপ্রিয়, শান্তিকামী, দেশপ্রেমিক জনসাধারণ ও গোষ্ঠীসমূহকে ঐক্যবদ্ধ করে বিশ্বজোড়া শক্তিশালী ও জঙ্গি শান্তি আন্দোলন গড়ে তোলা বর্তমান সময়ের আশু প্রয়োজন। প্রকৃত কমিউনিস্টরা এই আন্দোলনের ‘কোর’ হিসেবে কাজ করবে এবং আন্দোলনকে সঠিক পথে পরিচালিত করবে। বিশ্বজুড়ে ঘনায়মান যুদ্ধ চক্রান্তের বিপদ থেকে মানবসভ্যতাকে রক্ষা করতে হলে এই দায়িত্ব আজ কমিউনিস্টদেরই গ্রহণ করতে হবে।