সরকারি উদাসীনতা চাপা দিতেই কি মাতৃত্বের মহিমাকীর্তন

সুভাষ মুখোপাধ্যায় ‘আমার বাংলা’ বইতে জগদ্দলের পাট কলের শ্রমিক পার্বতীয়া-র কথা লিখেছিলেন। কোলের ছেলেকে দুধ খাওয়ানোর জন্য পাঁচ মিনিটও ছুটি মিলত না কারখানায়, ছেলে কেঁদে মরে গেলেও কান্না থামানোর মতো কেউ ছিল না। তাই একরত্তি ছেলের মুখে আফিং গুঁজে দিয়ে কাজে যেত পার্বতীয়া। ছেলে কাঁদত না, ঘুমাত মড়ার মতো। দেশে তখন ব্রিটিশ শাসন। ২০২৫-এর স্বাধীন ভারতবর্ষে দিল্লির পুলিশ কনস্টেবল রিনার অবস্থা পার্বতীয়ার চেয়ে ভাল নিশ্চয়ই। ডিউটিতে আসার সময় এক বছরের ছেলেকে সাথে নিয়ে আসার সুযোগ অন্তত তাঁর হয়েছে। যে স্টেশনে আগের দিনই কুম্ভমেলার যাত্রীদের প্রবল ভিড়ে পদপিষ্ট হয়ে মারা গেছেন আঠেরো জন, সেই স্টেশনে সারাদিন ধরে ভিড় সামলানো আর সুরক্ষার দেখভাল করার দায়িত্ব পালন করতে রিনা এসেছিলেন শিশুসন্তানকে বুকে বেঁধে। একজন মা এইভাবে প্রতিকূলতার সাথে লড়ে পুলিশের কর্তব্য পালন করছেন, পেশার দায়িত্ব এবং মায়ের ভূমিকা দুইই পালন করছেন কত দক্ষতার সাথে, এই মর্মে সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে রিনার ছবি, ভিডিও। সম্ভবত মহাকুম্ভের সাথে যোগ থাকার কল্যাণেই রিনার এই কর্তব্য পালন আরও ‘মহিমান্বিত’ হয়ে উঠেছে বিজেপি শাসিত ভারতবর্ষে।

কিন্তু এ দৃশ্য কি সত্যিই গর্বের? নাকি লজ্জার? সে দিনের পাট-শ্রমিক পার্বতীয়ার সাথে আজকের পুলিশকর্মী রিনার মিল একটাই– তারা দু-জনেই নিরুপায় মা, যাঁদের সামনে সন্তানকে নিশ্চিন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে রেখে এসে শান্ত, নিঃশঙ্ক মনে নিজের পেশাগত দায়িত্ব পালন করার কোনও পথ খোলা রাখেনি এই কঠিন সমাজব্যবস্থা। একজন মা স্বাভাবিক ভাবেই নিজের সব রকম শারীরিক অসুবিধা উপেক্ষা করে যন্ত্রণা সহ্য করেও সন্তানকে নিরাপদ, সুরক্ষিত রাখতে চান। কিন্তু যে সন্তান বড় হয়ে এই দেশের একজন নাগরিক হবে, অবদান রাখবে দেশ ও সমাজের গঠনে, যে মানুষকে ‘মানবসম্পদ’ বলে উল্লেখ করা হয়, অমিত সম্ভাবনাময় সেই প্রাণকে কী দৃষ্টিতে দেখছে আজকের সমাজ, আজকের রাষ্ট্র? চারপাশের ভুরি ভুরি উদাহরণ বলে দেবে, স্বাধীনতার ছিয়াত্তর বছর পার করেও মায়েদের, শিশুদের সুস্থতা, সুরক্ষার ব্যবস্থা করাকে এই রাষ্ট্র নিজের কর্তব্য এবং দায়িত্ব বলে মনে করে না। নানা বাধা এবং অসুবিধার উঁচু দেওয়াল পেরিয়ে বিপদের ঝুঁকি নিয়ে সন্তানকে বড় করাই আজও এ দেশের বিরাট সংখ্যক মায়ের জীবনের স্বাভাবিকতা। ঘটনাচক্রে রিনা একজন পুলিশকর্মী, যে পুলিশ রাষ্ট্রের পাহারাদার, সরাসরি নিযুক্ত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে। অথচ রাষ্ট্রের দেখভালে নিযুক্ত এই মায়েদের চিন্তা দূর করার দায় কিন্তু রাষ্ট্র ছিটেফোঁটাও নেয়নি। রিনা বা রিনার মতো যে হাজার হাজার সাধারণ মহিলা পুলিশকর্মী মুখ বুজে নিজের কাজটুকু করে যাচ্ছেন, তাঁরা জেনেই গিয়েছেন, সন্তান পালনের দায় এবং দায়িত্ব সমস্তটাই একান্ত ভাবে তাঁদের। তাও রিনার একরত্তি সন্তান মায়ের বুকের কাছে লেপটে থাকার সুযোগটুকু পেয়েছে, সমাজের প্রান্তিক অংশের শিশুদের অবস্থা আরও ভয়ানক, আরও করুণ। যে মা ইটভাটায় কাজ করার সময় শিশুকে আগুনের আঁচের পাশেই বসিয়ে রাখতে বাধ্য হন, যে মা শিশুকে পিঠে বেঁধে সিমেন্টের পাত্র মাথায় ভারা বেয়ে ওঠেন, যে মা ফুটপাথের বিছানায় সন্তানকে ঘুম পাড়িয়ে সারা দিন ঘোরেন এক মুঠো ভাতের সন্ধানে, এদের কারও অবস্থা দেখেই মাতৃত্বের মহিমার কথা মনে আসে না, মনে ভিড় করে একরাশ অসহায় রাগ এবং লজ্জা। এর বাইরেও রইলেন তুলনামূলক সচ্ছল পরিবারের উচ্চশিক্ষিত মায়েরা যাঁরা সন্তান প্রতিপালনের স্বার্থে নিজের পেশা, উপার্জন বা ভাল লাগার ক্ষেত্রটি থেকে সরে আসতে বা বছরের পর বছর সরে থাকতে বাধ্য হয়েছেন। ২০২২-২৩ সালের পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভের তথ্য বলছে, কর্মক্ষেত্রে মাতৃত্বকালীন সুযোগ সুবিধা পান সারা দেশের সমস্ত কর্মরত মহিলার মাত্র ৬.৫ শতাংশ। অসংগঠিত ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ০.১ শতাংশ, অর্থাৎ নেই বললেই চলে। এমনকি নিয়মিত বেতন পান, এমন মহিলাদের মধ্যেও মাত্র ৩২.৩ শতাংশ মাতৃত্বকালীন আইনকানুনের সুবিধা পেয়ে থাকেন। নানা সমীক্ষায় দেখা গেছে, দশ জনের মধ্যে একজন মহিলা তাঁর কাজে যোগ না দেওয়ার কারণ হিসেবে সন্তান প্রতিপালনের অসুবিধার কথা বলছেন। এই আবহে দাঁড়িয়ে ভারি নিষ্ঠুর শোনায় প্রধানমন্ত্রীর ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’ স্লোগান, যে প্রকল্পে বরাদ্দ অর্থের প্রায় আশি শতাংশ খরচ হয়েছে শুধু বিজ্ঞাপনের জৌলুসে। অন্য দিকে ‘কন্যাশ্রী’, ‘রূপশ্রী’ নিয়ে যতই ঢাক পেটানো হোক, এ রাজ্যে কন্যাদের সুস্থভাবে বাঁচার পরিবেশটুকুও যে দিন দিন সঙ্কুচিত হয়ে আসছে, গত বছরের ৯ আগস্টে আর জি করের ঘটনার পর তা আর মানুষকে তথ্য দিয়ে দেখাতে হয় না।

বছরের পর বছর আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস চলে যায়। প্রতি বছরের মতোই মূল ধারার মিডিয়া শাড়ি-গয়না-প্রসাধনীর বিজ্ঞাপনে ঢেকে রাখতে চাইল প্রীতিলতা, রোকেয়া, সাবিত্রী ফুলে-র সংগ্রামী তেজকে, যাতে মেয়েদের অধিকার, মেয়েদের সুস্থ জীবনের দাবি সত্যিকারের আলোর পথ চিনতে না পারে। স্বাধীনতার এতগুলো বছর পার করেও, নেতা-মন্ত্রীদের বক্তৃতায় মেয়েদের উন্নতি নিয়ে এত প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি থাকা সত্ত্বেও ঘরে-বাইরে মন্ত্রীদের বক্তৃতায় মেয়েদের উন্নতি নিয়ে এত প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি থাকা সত্ত্বেও ঘরে-বাইরে মেয়েদের এই অনন্ত দুর্দশা কেন? এর কারণ শুধু পুরুষতন্ত্রকে দোষারোপ করে বোঝা যাবে না। এ কথা ঠিক, সন্তান ও সংসারের যাবতীয় দায়-দায়িত্ব এবং সেখানে পান থেকে চুন খসলেই অশেষ শারীরিক, মানসিক লাঞ্ছনা বহু যুগ ধরে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নির্দিষ্ট করে রেখেছে মেয়েদের জন্য।

 কিন্তু আজ বৈষম্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা যে সমাজ নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মানুষের ওপর শোষণ অত্যাচার চালাচ্ছে, তাকে সমস্ত ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে, সেই সমাজই পুরুষতন্ত্র এবং পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাকে জিইয়ে রাখছে নিজের স্বার্থে। বহু ঘাম-রক্ত-লড়াইয়ের বিনিময়ে অর্জিত মেয়েদের ন্যায্য অধিকারগুলো ক্রমশ সঙ্কুচিত, পদদলিত হচ্ছে। আজ স্মরণ করা দরকার সোভিয়েত ইউনিয়নের কথা, যেখানে শ্রমিক শ্রেণির সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র নারীমুক্তির এক বিরাট দিগন্ত খুলে দিয়েছিল। সেখানে মা এবং শিশুসন্তান রাষ্ট্রের চোখে বোঝা ছিল না, ছিল রাষ্ট্রের সম্পদ। সেই সমাজে একদিকে যেমন যৌন নির্যাতন, পতিতাবৃত্তি বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল, অন্য দিকে মেয়েদের সমবেতন, সমমর্যাদা, গর্ভবতী মা এবং শিশুসন্তানের যত্নের সমস্ত ব্যবস্থা রাষ্ট্রের দায়িত্বে সুনিশ্চিত ছিল।

পুলিশ কনস্টেবল রিনা বা তাঁর মতো আরও লক্ষ লক্ষ মাকে যদি সত্যিই এক সুস্থ, মর্যাদার জীবন দিতে হয়, শুধু মা হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে মেয়েদের মুক্ত আকাশে শ্বাস নিতে হয়, এই পচে যাওয়া সমাজ সে মুক্তি দিতে পারবে না। এ দেশের বুকেও নতুন শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক সমাজের স্বপ্নটাকে রূপ দিতে হবে। সেই সুমহান কাজকে মাতৃত্বের কর্তব্যের সাথে মিলিয়ে নিতে হবে এ যুগের মায়েদের।

লেখাটি গণদাবী ৭৭ বর্ষ ৩৪ সংখ্যা ৪-১০ এপ্রিল ২০২৫  প্রকাশিত