Breaking News

মোদি-ট্রাম্প বৈঠকঃ মোদির কোনও আপত্তিই শুনবেন না বলে দিলেন ‘বন্ধু’ ট্রাম্প

বিজেপি-আরএসএস বাহিনী এবং অনুগত প্রচারমাধ্যম প্রচার করে করে দেশজুড়ে একটা হাওয়া তোলার চেষ্টা করে এসেছে যেন মোদির নেতৃত্বে ভারত আমেরিকার মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রের সঙ্গেও কূটনৈতিক সম্পর্ক কিংবা বাণিজ্যিক লেনদেন, সব ক্ষেত্রেই ভারত আমেরিকার সঙ্গে সমানে সমানে লড়তে পারে এবং মোদি তাঁর গুণের প্রভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্টদের ব্যক্তিগত বন্ধু করে ফেলেছেন। ভারত-আমেরিকার সদ্য বৈঠক সেই ফানুসকে একেবারে ফুটো করে দিয়েছে।

এই বৈঠক দেখাল যে, ভারতের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্কটি বাস্তবে প্রবল ক্ষমতাশালী একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে অপেক্ষাকৃত দুর্বল একটি রাষ্ট্রের ব্যবসায়িক সম্পর্ক যেমন হয় ঠিক তেমনই। মোদির সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্কটিও মোটেও বন্ধুত্বের নয়, সবচেয়ে ক্ষমতাশালী এক রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে অনেক কম শক্তিধর এক রাষ্ট্রপ্রধানের যেমন সম্পর্ক হওয়ার কথা ঠিক তেমনই। দুই দেশের শিল্পপতি-ধনকুবের গোষ্ঠীর রাজনৈতিক ম্যানেজার হিসাবে উভয়েই চেষ্টা করেছেন নিজ দেশের সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করতে। বলা বাহুল্য, সেই চেষ্টায় ডাহা ফেল করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদার দাস মোদি। মোদি নিজে এবং তাঁর অনুগামীরা যতই তাঁর ছাপান্ন ইঞ্চি ছাতি নিয়ে গর্ব করুন (যা কেউ মেপে দেখেছে বলে প্রমাণ নেই), ট্রাম্পের পাশে বসা অবস্থায় তার এক ইঞ্চিরও হদিশ পাওয়া যায়নি। তাঁকে পাশে বসিয়ে রেখেই ট্রাম্প যে ভাবে ভারতের উপর এক তরফা মার্কিন বাণিজ্য-স্বার্থ গছিয়ে গেলেন এবং কাঁচুমাচু মুখে নরেন্দ্র মোদি সেগুলি গিলে এলেন তাতে তাঁকে দেখে নিতান্তই এক অনুগত রাষ্ট্রপ্রধান ছাড়া আর কিছু মনে হল না। মনে পড়ে যায় ইতিহাস বইয়ে পড়া গ্রিক সম্রাট আলেকজান্ডারের কাছে পরাজিত সম্রাট পুরুর সেই বিখ্যাত উক্তি। পুরু তাঁর থেকে কেমন ব্যবহার আশা করেন, আলেকজান্ডারের এই প্রশ্নের উত্তরে পুরু বলেছিলেন– রাজার মতো ব্যবহার। বিজেপি নেতারা কথায় কথায় প্রাচীন ইতিহাস তুলে ধরেন। অথচ ট্রাম্প যখন ভারতীয় পণ্যে পাল্টা শুল্ক চাপানোর ঘোষণা করে বললেন, ‘আমি (মোদির) কোনও তর্ক শুনব না’, তখন মোদি এ কথা ট্রাম্পকে শোনাতে পারলেন না যে, আমিও একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রধান। তাই আপনার ব্যবহার তেমনই হওয়া উচিত। পরিবর্তে ভারতের একচেটিয়া মালিকদের স্বার্থের উমেদারি করতে গিয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী হাত কচলালেন।

মোদির সঙ্গে বৈঠকের ঘণ্টাখানেক আগেই ট্রাম্প তাঁর পাল্টা শুল্ক নীতি ঘোষণা করে বলেছিলেন, ‘আমেরিকার বন্ধুরা অনেক সময় শত্রুদের থেকেও খারাপ’। যা শুনে কারও সন্দেহ ছিল না যে, তাঁর লক্ষ্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ছাড়া কেউ নন। তখনই স্পষ্ট হয়ে যায় যে বৈঠকে কী ঘটতে চলেছে। শুধু তাই নয়, বাস্তবে ট্রাম্প মোদিকে কেমন বন্ধু মনে করেন তা-ও বুঝিয়ে দেন– প্রথমে ১০৪ জনকে, পরে দফায় দফায় ভারতীয় অভিবাসীদের হাতে-পায়ে শিকল পরিয়ে যাত্রীবাহী বিমানের পরিবর্তে সেনা বিমানে পশুর মতো ফেরত পাঠিয়ে।

ভারতীয় পণ্যে বিপুল শুল্ক

মোদির সফরের ঠিক আগে আমেরিকা সে দেশে ভারত থেকে আমদানি করা ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের উপর ২৫ শতাংশ শুল্ক বসানোর কথা ঘোষণা করে। এর ফলে ভারত থেকে ১০০ কোটি ডলারের রফতানি সংকটের মুখে পড়বে। অন্য দিকে মোদি সরকার এমন একটা সম্ভাবনা বুঝে আগেই বাজেটে ২০টি মার্কিন পণ্যে থাকা চড়া শুল্ক প্রত্যাহার করে নেয়। মোট ২৮টি মার্কিন পণ্যে চড়া শুল্কের ৮টির চড়া শুল্ক তারও আগে প্রত্যাহার করা হয়েছিল। আমেরিকা উঁচু হারে শুল্ক চাপালে শুধু ইস্পাত কিংবা অ্যালুমিনিয়ামই নয়, ভারতের ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম, তথ্যপ্রযুক্তি রফতানিও ব্যাপক ভাবে মার খাবে। ইরানের চাবাহার বন্দর নিয়ে যে ছাড় এতদিন ভারত ভোগ করছিল তা প্রত্যাহার করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন ট্রাম্প। অথচ এই বন্দরে ভারতের কয়েক লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা রয়েছে।

বিপুল অঙ্কের অস্ত্র ও তেল-গ্যাস কিনতে বাধ্য করল আমেরিকা

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে পাশে বসিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করলেন, ২০২৫ থেকে আমেরিকা ভারতকে কোটি কোটি ডলারের সমরাস্ত্র এবং এফ-৩৫ যুদ্ধ বিমান বিক্রি করবে। এবং যুদ্ধাস্ত্র বিক্রির এই পরিমাণ ক্রমেই বাড়তে থাকবে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, বহু কোটি দামের এই এফ-৩৫ বিক্রির কথা ঘোষণার আগে ভারতের সঙ্গে কথা বলারও প্রয়োজন মনে করেনি আমেরিকা। অর্থাৎ একতরফা ভাবেই মার্কিন যুদ্ধবিমান নির্মাতা লকহিড কোম্পানির বিমান ভারতকে গছিয়ে দেওয়া হল। আর ছাপান্ন ইঞ্চি ছাতির ‘মহা শক্তিমান’ নরেন্দ্র মোদি নীরবে ট্রাম্পের বিপুল পরিমাণ অস্ত্র রফতানি আবদার মেনে এলেন। এখানেও শেষ নয়।

মোদিকে পাশে রেখেই ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, ভারতকে আমেরিকা থেকে বিপুল পরিমাণ তেল এবং গ্যাস কিনতে হবে। কারণ, আমেরিকা দু’দেশের বাণিজ্যিক ঘাটতি কমিয়ে আনতে চায়। অবশ্য এই ঘোষণাটি যুদ্ধ বিমান বিক্রির মতো এক তরফা নয়। ট্রাম্প বলেছেন, আমেরিকাই যে ভারতে সব থেকে বেশি পরিমাণে তেল এবং গ্যাস জোগান দেবে সে ব্যাপারে তাঁদের ঐক্যমত্য হয়েছে। তেল আমদানির পরিমাণ বার্ষিক ১৫ বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ২৫ বিলিয়ন ডলার করা হবে।

ভারত ও আমেরিকার মধ্যে গত বছর বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১২,৯২০ কোটি ডলার। ভারত আমেরিকায় রফতানি করেছে ৮,৭৪০ কোটি ডলারের পণ্য। আমেরিকা থেকে এ দেশে আমদানি হয়েছে ৪,১৮০ কোটি ডলারের পণ্য। ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন ২০৩০-এর মধ্যে উভয় দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছবে। এই বিপুল অঙ্কের বাণিজ্যে আমেরিকা যদি ভারতে সমপরিমাণ পণ্য রফতানি করে তবে ভারতীয় বাজার যে মার্কিন পণ্যে ছেয়ে যাবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

ট্রাম্পের চাপের কাছে নতি স্বীকার মোদির

স্বাভাবিক ভাবেই দেশ জুড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে যে, এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি টাকা খরচ করে আমেরিকা থেকে এই বিপুল পরিমাণ অস্ত্র কি ভারতের নিরাপত্তার জন্য সত্যিই দরকার ছিল? যে দেশ বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে ১২৫টি দেশের মধ্যে ১১১তে স্থান পায়, যে দেশের বিরাট এলাকায় পানীয় জলের জন্য পরিবারের মহিলাদের এখনও মাইলের পর মাইল হাঁটতে হয়, সুপেয় পানীয় জলের অভাবে হাজার হাজার মানুষ প্রতি বছর আমাশয়ে ভোগে, হেপাটাইটিস-বিতে মারা যায়, যে দেশের লোকাল ট্রেনগুলিতে প্রতি দিন কোটি কোটি মানুষ পশুর মতো যাতায়াত করে, যে দেশের ৫০ শতাংশ প্রসূতি মা অপুষ্টিতে ভোগেন, শিশুদের বড় অংশ কম উচ্চতা এবং কম ওজন নিয়ে বেড়ে ওঠে, যে দেশে করোনা অতিমারি দেখিয়ে দেয় হাসপাতালগুলিতে বেডের সংখ্যা এক হাজার দেশবাসী পিছু ১.৩, সে দেশে কার নিরাপত্তার কথা ভেবে এই বিরাট সমরায়োজন চালাচ্ছেন নরেন্দ্র মোদিরা? বুঝতে অসুবিধা হয় না, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের করের টাকা খরচ করে এই বিরাট অস্ত্রসম্ভার কেনার উদ্দেশ্য আসলে মার্কিন যুদ্ধ অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখার মার্কিন প্রচেষ্টার কাছে নতি স্বীকার ছাড়া আর কিছু নয়। ভারত সরকারের বৈদেশিক বাণিজ্যে সব চেয়ে বেশি মার্কিন নির্ভরতাও এ কাজে ভারতকে বাধ্য করেছে।

তা ছাড়া যুদ্ধে ইজরায়েল এবং ইউক্রেনকে ভারত যে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র রফতানি করেছে তা মার্কিন অনুমতি সাপেক্ষেই। বিজেপি সরকার দেশীয় পুঁজিপতিদের এই স্বার্থের কথা মাথায় রেখেই প্যালেস্টাইনের স্বাধীনতার দাবিকে সমর্থনের দীর্ঘদিনের ভারতীয় ঐতিহ্যকে লঙ্ঘন করে প্যলেস্টাইন প্রশ্নে আমেরিকা-বন্ধু ইজরায়েলের পাশে দাঁড়িয়েছে।

রাশিয়ার সস্তা তেল নয়, আমেরিকার দামি তেলই কিনতে হবে

তেল আমদানিতে যতই মোদি-ট্রাম্প ঐক্যমত্য হোক, তা ভারতীয় জনগণের ঘাড়ে বিরাট মূল্যবৃদ্ধিকে চাপিয়ে দেবে। ভারতকে তার প্রয়োজনের ৮৫ শতাংশ তেল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ইউক্রেন যুদ্ধের আগে পর্যন্ত এর বেশির ভাগটাই আসত ইরাক এবং সৌদি আরব থেকে। রাশিয়া থেকে আমদানি করত মাত্র ০.২ শতাংশ। ২০২২ এর ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আমেরিকা ইউরোপের দেশগুলিতে রাশিয়ার তেল কেনায় নিষেধাজ্ঞা জারি করলে রাশিয়া ভারতকে আন্তর্জাতিক বাজারের থেকে অনেক কম দামে তেল বিক্রির প্রস্তাব দেয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেল পিছু ১৪০ ডলারে পৌঁছে গেলেও রাশিয়া ভারতীয় কোম্পানিগুলিকে মাত্র ৪০ ডলারে, এমনকি তার থেকেও কম দামে তেল দিতে রাজি হয়। বর্তমানে ভারতের প্রয়োজনীয় তেলের ৫০ শতাংশের বেশি আমদানি হয় রাশিয়ার সস্তা তেল। সেখানে মার্কিন তেল আমদানির অংশ ২০১৯-এর ৪.৫ শতাংশ থেকে কমে ২০২৪-এ দাঁড়িয়েছে ৩.৪ শতাংশ। স্বাভাবিক ভাবেই ট্রাম্পের ফতোয়া মানতে গেলে রাশিয়ার সস্তা তেল বাদ দিয়ে আমেরিকার দামি তেলই এখন থেকে ভারতকে নিতে হবে। ভারত থেকে আমেরিকার দীর্ঘ দূরত্বের পরিবহন খরচ মিটিয়ে দেশের বাজারে তেল হয়ে উঠবে অনেক দামি। তাতে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলির বিপুল মুনাফা হবে। কিন্তু তার বোঝা বইতে হবে ভারতের সাধারণ মানুষকেই।

পরমাণু দুর্ঘটনায় মার্কিন কোম্পানিগুলির দায় থাকল না

মার্কিন চাপের কাছে নতি স্বীকার করে ভারত পরমাণু বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার দায়বদ্ধতা সংক্রান্ত আইন শিথিল করতে চলেছে। ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, এর ফলে আমেরিকার সংস্থাগুলি ভারতকে পরমাণু বিদ্যুৎ চুল্লি জোগান দিতে পারবে। এখানেও প্রশ্ন উঠছে যে, মোদি সরকার দুর্ঘটনার দায়বদ্ধতা আইন শিথিল করছে কার স্বার্থ রক্ষা করতে? নিশ্চয় ভারতীয় জনগণের স্বার্থ রক্ষা করতে নয়। কোনও পরমাণু বিদ্যুৎ চুল্লিতে দুর্ঘটনা ঘটলে মার্কিন কোম্পানিগুলি এ বার তার দায় ঝেড়ে ফেলতে পারবে।

দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে তর্কটুকুও সইবে না আমেরিকা

ট্রাম্পের সঙ্গে মোদির বন্ধুত্ব নিয়ে বিজেপি মহল কম ঢাক-ঢোল বাজায়নি। তাঁদের ভাবটা ছিল এমন যেন, পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক না কেন, মোদি আছেন মানে ভারতের স্বার্থ ঠিক ছিনিয়ে আনবেনই। ‘মোদি হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়।’ এ বারও ভারত-মার্কিন বৈঠকের সাফল্য প্রমাণ করতে সরকারের ধামাধরা প্রচারমাধ্যম ব্যাপক প্রচার চালিয়েছে। কিন্তু তার দ্বারা এ সত্য কোনও ভাবেই চাপা দেওয়া যাচ্ছে না যে, ট্রাম্প যা করতে চেয়েছিলেন সে কাজে তিনি পুরোপুরি সফল। বৈঠকের পরে মোদির উল্লেখ করেই ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, ‘আপনারা যে হারে শুল্ক চাপাবেন, আমিও সেই হারে চাপাব। এ ব্যাপারে আমার সঙ্গে কেউ তর্ক করতে পারবেন না।’ পুঁজিবাদী রাষ্ট্রনায়কদের কাছে পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থের থেকে কোনও ব্যক্তিগত বন্ধুত্বই যে বেশি দামি নয়, মোদিভক্তরা তা যত দ্রুত বুঝবেন ততই দেশের মঙ্গল। বাস্তবে বিজেপি-বাহিনী প্রচার চালিয়ে মোদিকে ‘অতিমানব’ হিসাবে তুলে ধরলেও এবং ভোটের রাজনীতিতে তার থেকে ফয়দা তোলা গেলেও বাস্তবে যে তিনি তা নন, তাঁর মুখের উপর ট্রাম্পের এত বড় কথাতেই স্পষ্ট হয়ে গেল এবং এটাও স্পষ্ট হয়ে গেল যে আমেরিকার তুলনায় ভারত কোথায় দাঁড়িয়ে আছে। অন্য দিকে তা এটাও দেখিয়ে দিয়েছে যে, মার্কিন অর্থনীতি বিশ্বে সবচেয়ে শক্তিশালী হলেও তা-ও আজ গভীর সঙ্কটে আচ্ছন্ন। সেই সংকট থেকে দেশকে বের করে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েই তিনি মানুষের সমর্থন আদায় করেছেন এবং দ্বিতীয় বারের জন্য ক্ষমতায় বসেছেন। ভারতীয় পণ্যে শুল্ক অন্যান্য শর্ত চাপানোর ঘটনা তাই কোনও ভারত-বিদ্বেষ থেকে নয়, এটা ট্রাম্পের বাধ্যতা। তাই শুধু ভারত নয়, ইউরোপ এবং সব রাষ্ট্রের উপরও একই রকম শুল্ক এবং শর্ত চাপানো ঘোষণা করেছেন।

ভারতীয় অভিবাসীদের অমর্যাদার প্রতিবাদ করলেন না প্রধানমন্ত্রী

ভারতীয় অভিবাসীদের দফায় দফায় হাতে-পায়ে শিকল বেঁধে যুদ্ধ বিমানে ফেরত পাঠানোর কোনও প্রতিবাদ কেন প্রধানমন্ত্রী করলেন না– এ প্রশ্নও দেশজুড়ে মানুষের মনে প্রবল আলোড়ন তুলেছে। এই অভিবাসীরা কেউ দাগী অপরাধী নন। তা হলে তাঁদের সম্মানের সঙ্গে এ দেশে ফেরত পাঠানো হল না কেন? অভিবাসী বলেই কি তাঁদের জানোয়ারের মতো এ ভাবে বেঁধে ফেরত পাঠানো যায়? তা হলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বৈঠকে কার প্রতিনিধিত্ব করলেন? যদি তিনি ভারতীয় জনগণেরই প্রতিনিধিত্ব করে থাকেন তবে তো তাঁদের মর্যাদা রক্ষা করাটা ছিল তাঁর কর্তব্য। তিনি সেই মর্যাদা রক্ষা করেননি শুধু নয়, গোটা বিশ্বের সামনে ভারতীয় জনগণের মর্যাদাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছেন। প্রতিবাদ করার পরিবর্তে মোদি ট্রাম্পের সুরেই সুর মিলিয়ে বলছেন, অন্য দেশে বেআইনি ভাবে থাকার কারও অধিকার নেই। আর এর দায় তিনি সম্পূর্ণরূপে আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্রের উপর চাপিয়ে দিয়ে নিজে দায় এড়িয়েছেন। বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর বলেছেন, এটি কোনও নতুন ঘটনা নয়। অর্থাৎ তিনি এর মধ্যে মার্কিন প্রশাসনের দোষের কিছু দেখতে পাননি। অথচ কে না জানে, মোদির ভারত যদি যুব সমাজের যোগ্য কাজ তৈরি করতে পারত, যদি ভদ্র ভাবে বাঁচার মতো ব্যবস্থাটুকু করে দিতে পারত তবে দেশ ছেড়ে এমন বিপদসঙ্কুল রাস্তায় এত কষ্ট, এত অনিশ্চয়তা মধ্যে দিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা ধার করে, সম্পত্তি বেচে দালালদের খপ্পরে পড়ে তাঁরা কেউ বিদেশে পাড়ি দিতেন না। দালালরাও এ সুযোগ নিতে পারত না। প্রধানমন্ত্রী অনায়াসে এ কথা ট্রাম্পকে বলতে পারতেন যে এই অভিবাসীরা মার্কিন অর্থনীতিতে কম ভূমিকা পালন করেনি। সেখানকার নির্মাণশিল্পে, কৃষিতে, রেস্তোরাঁগুলিতে ভারত সহ বিভিন্ন দেশের এই অভিবাসীদের মার্কিন ব্যবসায়ীরা সস্তা শ্রমিক হিসাবেই ব্যবহার করে। তাই তাদের সাথে মানুষের মতো ব্যবহারটুকু ছিল মার্কিন প্রশাসনের কর্তব্য। পুঁজিপতি শ্রেণির সেবা করতে করতে প্রধানমন্ত্রী কি ভুলেই গেছেন যে, দেশের সাধারণ মানুষের মর্যাদা রক্ষা করাটাও প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তাঁর দায়িত্ব?

কলম্বিয়া মেক্সিকো যা পারে তা কেন পারে না ভারত?

এ প্রসঙ্গে আরও একটি ঘটনা উল্লেখ করা দরকার– কলম্বিয়া ভারতের থেকে অনেক ছোট দেশ হওয়া সত্ত্বেও সে দেশের নাগরিকদের সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের এমন ধরনের অন্যায় আচরণকে মেনে নেননি শুধু নয়, এমন আচরণের তীব্র প্রতিবাদ করে মার্কিন বিমান ফেরত পাঠিয়ে নিজেদের দেশের বিমান পাঠিয়ে অভিবাসীদের ফেরত এনেছেন এবং প্রেসিডেন্ট স্বয়ং বিমানবন্দরে গিয়ে তাঁদের অভ্যর্থনা জানিয়েছেন। উল্লেখ্য, কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট কখনও তাঁর ছাতির মাপ জনসমক্ষে প্রচার করেননি।

এর পরও নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, ‘ভারত আমেরিকার সম্পর্ক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের উপর ভর করে রয়েছে।’ বাস্তবে চুক্তির মধ্যে কোথাও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চিহ্নমাত্র নেই। সর্বত্রই রয়েছে শক্তিশালী পুঁজির দাপট। গোটা চুক্তি থেকে স্পষ্ট, মোদি ট্রাম্পের সঙ্গে সমানে সমানে বৈঠক করেননি, করেছেন সাম্রাজ্যবাদী শিবিরের জুনিয়র পার্টনার হিসাবে। মোদি যতই ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির গর্ব করুন, তা মার্কিন অর্থনীতির থেকে এখনও বহু দূরে। ট্রাম্পের কাছে কোনও একটি দেশ গণতান্ত্রিক না অগণতান্ত্রিক সেটা বিষয়ই নয়, আসলে সে দেশ শক্তিশালী কি না। তাই যত অগণতান্ত্রিকই হোক পুতিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাতে তাঁর কোথাও আটকায়নি।

আসলে একটা দেশের অর্থনীতি কত বড় সেটা বড় কথা নয়, দেশের মর্যাদা রক্ষা করতে গেলে, একটা দেশকে নেতৃত্ব দিতে গেলে রাষ্ট্রনেতার যে আত্মমর্যাদাবোধ থাকা দরকার তা যে নরেন্দ্র মোদির মতো বিজেপি নেতার যে নেই, তা এই ঘটনায় স্পষ্ট। মেক্সিকো ভারতের থেকে অনেক দুর্বল অর্থনীতির দেশ। তা সত্ত্বেও ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক চাপানোর ঘটনা মোদির মতো তাঁরা নীরবে হজম করেনি, প্রতিবাদ করেছে, মার্কিন পণ্যের উপর পাল্টা শুল্ক ঘোষণা করেছে। মোদি সরকার তা পারেনি। কলম্বিয়া, মেক্সিকো পেরেছে, কারণ, সেখানকার জনগণের মধ্যে যে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মানসিকতা রয়েছে তাই সেখানকার রাষ্ট্রপ্রধানদের বাধ্য করেছে প্রতিবাদ করতে। ভারতে বিজেপি, কংগ্রেসের মতো দলগুলোর একচেটিয়া পুঁজির তোষণের রাজনীতির কারণে এ দেশের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ঐতিহ্য আজ অনেকটাই মলিন। তাই মোদি যেমন ভারতীয় জনগণের এই অমর্যাদার প্রতিবাদ করেননি, তেমনই ট্রাম্পও ভারতের জনগণের প্রতি কোনও মর্যাদা দেখানোর কোনও চেষ্টা করেননি।