মানবপাচারের উর্বর জমি গুজরাটই নাকি উন্নয়নের ‘মডেল’ রাজ্য!

চোরাপথে কানাডা সীমান্ত পেরিয়ে আমেরিকায় ঢুকতে গিয়ে গুজরাটের ডিঙ্গুচা গ্রামের জগদীশ প্যাটেল, স্ত্রী বৈশালীবেন এবং তাঁদের এগারো ও তিন বছরের দুই সন্তান ঠাণ্ডায় জমে মারা গিয়েছিলেন ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে। শিকল ও হাতকড়া পরিয়ে যাঁদের এখন ভারতে ফেরত পাঠাচ্ছে আমেরিকা, সেই বেআইনি অভিবাসীদের দলে ভিড়ে জীবনটাকে একটু গুছিয়ে নিতে চেয়েছিলেন তাঁরা। এই নিয়ে তদন্ত করতে গিয়ে ইডি-র হাতে উঠে এসেছে এক বিস্ময়কর তথ্য। তারা জানাচ্ছে, ভারতে চোরাপথে মানুষ পাচারে যুক্ত চার থেকে সাড়ে চার হাজার এজেন্টের মধ্যে দু’হাজারই গুজরাটের বাসিন্দা। এরা কানাডার ভিতর দিয়ে আমেরিকায় বেআইনি ভাবে পাচার করে ভারতীয়দের। তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ২০২১ থেকে ’২৪-এর জুলাইয়ের মধ্যে কানাডার সহযোগী সংস্থাগুলির সঙ্গে ১২ হাজার বার লেনদেন করেছে এই এজেন্টরা। অর্থাৎ ১২ হাজার বার এক বা একাধিক মানুষের দলকে চোরাপথে আমেরিকায় পাঠানোর চেষ্টা করেছে তারা। আরও একটি রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, শুধু ২০২৩ সালেই বেআইনি ভাবে আমেরিকায় পাড়ি দিয়েছিলেন ভারতের যে ৬৭ হাজার ৩৯১ জন মানুষ, তাঁদের মধ্যে শুধু গুজরাটেরই বাসিন্দা ছিলেন ৪১ হাজার ৩৩০ জন। অর্থাৎ আমেরিকায় বেআইনি ভাবে ঢুকতে চাওয়া মানুষের ৬১ শতাংশেরও বেশি গুজরাটের বাসিন্দা!

এই গুজরাটই না উন্নয়নের মডেল রাজ্য, যা নিয়ে বিপুল ঢাক পেটায় বিজেপি! তা হলে প্রতি বছর এত মানুষ একটু রুজি-রোজগারের খোঁজে ঘরবাড়ি, আত্মীয়স্বজন ছেড়ে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে চোরাপথে বিদেশে পাড়ি দেয় কেন? ‘ডবল ইঞ্জিন’ গুজরাটের এই ঢাক-পেটানো উন্নয়নের আসল চেহারা তা হলে কেমন? একটু খতিয়ে দেখা যাক বরং।

পরিসংখ্যানের ভাষায় গুজরাট কিন্তু সত্যিই ‘ধনী’ রাজ্য। কারণ, দেশের যে রাজ্যগুলি বার্ষিক আর্থিক বৃদ্ধির হারে এগিয়ে রয়েছে, গুজরাট তাদের অন্যতম। তা ছাড়া ২০২২-’২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী এই রাজ্যের মাথাপিছু উৎপাদনের মূল্য ১ লক্ষ ৮১ হাজার ৯৬৩ টাকা– জাতীয় গড়ের দ্বিগুণেরও বেশি। এমন একটি রাজ্যের মানুষ তা হলে এত ঝুঁকি নিয়ে স্বদেশ-স্বজন ত্যাগ করে দলে দলে বেআইনি অভিবাসী হতে চাইছেন কেন?

এ প্রশ্নের উত্তরও পরিসংখ্যান থেকেই পাওয়া যায়। এ কথা ঠিকই যে, দেশের বেশ কিছু বিপুল সম্পদশালী মানুষের বাস গুজরাটে, যাদের আকাশছোঁয়া আয়ের জোরে রাজ্যের আর্থিক বৃদ্ধির এমন উচ্চগতি। আর গড়ের অঙ্কের নিয়ম মেনে এদের দৌলতেই রাজ্যের মাথাপিছু গড় আয় জাতীয় গড়কে ছাপিয়ে গেছে। কিন্তু বিপুল সম্পদের অধিকারী হাতে-গোনা এই মানুষগুলিকে বাদ দিলে রাজ্য জুড়ে রয়েছেন সংখ্যাগরিষ্ঠ যে সাধারণ মানুষ, পরিসংখ্যান থেকেই তাঁদের জীবনের দুর্দশাও স্পষ্ট হয়ে যায়। সরকারি হিসাবেই দেখা যাচ্ছে, আর্থিক বৃদ্ধির হারের তুলনায় কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার গুজরাটে যথেষ্ট কম। শুধু তাই নয়, সে রাজ্যে চাকরি-বাকরির মানও অত্যন্ত নিচু। ২০২২-এর পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভের পরিসংখ্যান অনুযায়ী গুজরাটে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীদের ৭৪ শতাংশের কাছেই চাকরির কোনও লিখিত চুক্তিপত্র নেই। এর মানে হল, এই বিপুল সংখ্যক মানুষের কাজ টিকে থাকার কোনও স্থিরতা নেই। মজুরির হারও গুজরাটে ভীষণ রকমের কম। ২০২৪-এর এপ্রিল-জুনের পরিসংখ্যান বলছে, অস্থায়ী শ্রমিকদের দৈনিক গড় মজুরি এ রাজ্যে মাত্র ৩৭৫ টাকা যা জাতীয় গড়ের তুলনায় অনেকটাই কম। শুধু অস্থায়ী শ্রমিকরাই নন, গুজরাটে নিয়মিত বেতনের কর্মীদেরও বেহাল দশা। গত বছরের এপ্রিল-জুনের হিসাবে তাঁদের গড় মাসিক আয় সাড়ে ১৭ হাজার টাকার মতো এবং এ-ও জাতীয় গড়ের তুলনায় অনেকটাই কম। সবচেয়ে দুর্গতির মধ্যে আছেন গুজরাটের কৃষি-শ্রমিক তথা খেতমজুররা। তাঁদের দৈনিক মজুরি মাত্র ২৪২ টাকা, ভারতের সমস্ত রাজ্যের মধ্যে সর্বনিম্ন। স্বাভাবিক ভাবেই গুজরাটের গ্রাম-শহরের সাধারণ মানুষ মাসিক খরচের পরিমাণের দিক দিয়েও দেশের বেশিরভাগ রাজ্যের থেকে পিছিয়ে আছেন, খোদ সরকারি সংস্থা এনএসএসও-র পরিসংখ্যান জানাচ্ছে এই তথ্য। নানা সমীক্ষা থেকে এ কথাও বেরিয়ে আসছে যে, গুজরাটের ৩৮ শতাংশ মানুষেরই ভরপেট খাবার জোটে না। এই অবস্থায় সন্তান-সন্ততি, পরিজন বা বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জন্য দু’বেলা দু’মুঠো ভাতের ব্যবস্থা করতে জীবন বাজি রেখে গুজরাটের দরিদ্র মানুষ যে চোরাপথে আমেরিকা পাড়ি দেওয়াটাকেই ভালো মনে করবেন, এতে বিস্ময়ের কী আছে!

চলমান পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থার কল্যাণে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য ভারতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কিন্তু তথাকথিত উন্নয়নের মডেল গুজরাটে সেই বৈষম্য এত বেশি প্রকট কেন– এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের এই রাজ্যে একচেটিয়া পুঁজিপতি শ্রেণির সেবায় নিয়োজিত ক্ষমতাসীন বিজেপির সরকারি নীতির মধ্যে। ১৯৯৫ সাল থেকে গুজরাটে সরকারি ক্ষমতায় আছে বিজেপি। এর মধ্যে ২০০১ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন নরেন্দ্র মোদি। মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসেই মোদিজি স্বাস্থ্য, শিক্ষার মতো সামাজিক খাতগুলিতে সরকারি বরাদ্দ কমাতে শুরু করেন। বন্দর, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি ইত্যাদি পরিকাঠামো ক্ষেত্রে যে সব প্রকল্প তাঁর সরকার হাতে নেয়, সেখানে ধীরে ধীরে শ্রমিকের প্রাধান্য কমিয়ে সেগুলিকে পুঁজি-নির্ভর করে তোলা হয়। বিজেপি সরকারে বসার আগে গুজরাটে যে শিল্পনীতি চালু ছিল, সেখানে খানিকটা গুরুত্ব পেত ছোট ও মাঝারি সংস্থাগুলি। ২০০৩ ও তার পরে ২০০৯-এ সে রাজ্যের নরেন্দ্র মোদি সরকার শিল্পনীতির চেহারা পাল্টে দেয়। বিধানসভায় পাশ করানো হয় ‘গুজরাট বিশেষ বিনিয়োগ অঞ্চল আইন’। রাজ্যকে ভারতের নানা রাজ্যের এবং বিশ্বের নানা দেশের বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণস্থল বানানোর লক্ষ্যে নতুন নতুন উদ্যোগ নেয় গুজরাট সরকার। শিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশন তৈরি করে বৃহৎ শিল্পপতিদের হাতে জমি তুলে দেওয়া শুরু হয়। তৈরি হতে থাকে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বা এসইজেড, যেখানে শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার যে সব আইন দেশে আছে, সেগুলি কার্যকর নয়। যে সমস্ত কল-কারখানা সেই সময় তৈরি হয়, বাড়তি মুনাফার লক্ষ্যে স্বাভাবিক ভাবেই সেগুলি পুঁজিনিবিড় করে গড়ে তোলা হয়। কল-কারখানা হলে কাজ জুটবে বলে স্বপ্ন দেখেছিলেন যাঁরা সেইসব শ্রমিক-কর্মচারীর কাজ পাওয়ার আশা শূন্যে মিলিয়ে যায়।

গুজরাটের নরেন্দ্র মোদি সরকারের এই নতুন শিল্পনীতির কল্যাণে রাজ্য ও গোটা দেশের হাতে-গোনা কয়েকজন একচেটিয়া পুঁজির মালিক ব্যাপক ভাবে লাভবান হন। কিন্তু মালিকদের হাতে দেদার জমি তুলে দেওয়ার পরিণামে সেখানকার কৃষক সমাজের একটা বড় অংশ জমি হারিয়ে খেতমজুরে পরিণত হন। মোট বার্ষিক উৎপাদন তথা আয়ের নিরিখে রাজ্যের বিপুল অগ্রগতি ঘটে, কিন্তু কাজ না পেয়ে বা কাজ হারিয়ে শ্রমিক-কর্মচারীদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। এ দিকে বৃহৎ পুঁজির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ২০০৪ থেকে ২০১৪– এই দশ বছরে বন্ধ হয়ে যায় গুজরাটের ৬০ হাজার ছোট ও মাঝারি উৎপাদন সংস্থা। পথে বসেন অসংখ্য শ্রমিক-কর্মচারী।

কেন্দে্র ক্ষমতায় বসে বিজেপি যেমন বৃহৎ একচেটিয়া পুঁজিমালিকদের অবাধ লুটের সুযোগ করে দিয়ে চলেছে, একই ভাবে তাদের ‘মডেল রাজ্য’ গুজরাটে তাদেরই ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার উন্নয়নের যাবতীয় সুফল তুলে দিয়েছে শুধুমাত্র অতি অল্পসংখ্যক একচেটিয়া পুঁজিমালিকের হাতে। আর তাদের জনস্বার্থবিরোধী নীতির বোঝা বয়ে নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর হওয়ার পথে হাঁটছে গুজরাটের সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমিক-চাষি-সাধারণ মেহনতি মানুষ। কোনও রকমে প্রাণে বাঁচার, পরিজনদের বাঁচিয়ে রাখার় উপায় খুঁজতে তাই দলে দলে তাঁদের পাড়ি দিতে হচ্ছে বিদেশ-বিভুঁইয়ে। বিপদসঙ্কুল গভীর জঙ্গল পার হয়ে, ডিঙি নৌকায় সমুদ্র পাড়ি দিয়ে প্রাণ হাতে নিয়ে ছুটছেন তাঁরা জীবনের খোঁজে। কেউ সফল হচ্ছেন, কারও জীবন পথেই শেষ হয়ে যাচ্ছে, আবার কাউকে হাতকড়া আর শিকল পরে আমেরিকা-সরকারের চাপিয়ে দেওয়া অসম্মানের বোঝা মাথায় নিয়ে নিয়ে ফিরে আসতে হচ্ছে জন্মভূমির মাটিতে, অনেক যন্ত্রণায় যে মাটি একদিন ছেড়ে গিয়েছিলেন তাঁরা। এটাই দেশের উন্নয়নের মডেল রাজ্যের আসল ছবি, প্রচারের ঢাক পিটিয়ে যা চেপে রাখতে চায় কেন্দ্র ও গুজরাটে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের কর্তারা।

(সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ, ৪ মার্চ ‘২৫ ও দ্য ওয়্যার, ১২ ফেব্রুয়ারি ’২৫)

লেখাটি গণদাবী ৭৭ বর্ষ ৩৪ সংখ্যা ৪-১০ এপ্রিল ২০২৫  প্রকাশিত