ব্যাঙ্ক শিল্পের প্রত্যাহৃত ধর্মঘট ও কিছু প্রশ্ন

২৪-২৫ মার্চের পূর্বঘোষিত ব্যাঙ্ক ধর্মঘট শেষ পর্যন্ত প্রত্যাহৃত হল। ব্যাঙ্ক শিল্পে পর্যাপ্ত নিয়োগ, সপ্তাহে সর্বাধিক ৫ দিন ব্যাঙ্ক খুলে রাখা, কর্মক্ষমতা অনুযায়ী উৎসাহ-ভাতা (পারফরম্যান্স লিঙ্কড ইনসেন্টিভ বা পিএলআই) না দেওয়া প্রভৃতি দাবিতে দেশ জুড়ে এই ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল ব্যাঙ্কের অফিসার এবং কর্মচারীদের ৯টি ইউনিয়নের যুক্ত মঞ্চ ইউএফবিইউ (ইউনাইটেড ফোরাম অফ ব্যাঙ্ক ইউনিয়ন্স)। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিকে বেসরকারিকরণ না করা, কাজের দৈনিক সময় কমিয়ে প্রতিদিন ৬ ঘণ্টা করা, চুক্তিভিত্তিক ও অস্থায়ী কর্মীদের নিয়মিতকরণ, ‘হায়ার অ্যান্ড ফায়ার’ কার্যক্রম বাতিল, সমকাজে সমবেতন নীতি চালু, শিক্ষানবিশ (অ্যাপ্রেনটিস) নিয়োগের পরিকল্পনা বাতিল, অনুৎপাদক সম্পদ (এনপিএ) উদ্ধারে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, পেনশন আপডেশন, এনপিএস, ইউপিএস-এর পরিবর্তে পুরানো পেনশন স্কিম ফিরিয়ে আনা, সার্ভিস চার্জের মাধ্যমে সাধারণ গ্রাহকদের পকেট না কাটার মতো আরও গুরুত্বপূর্ণ কিছু দাবিকে যুক্ত করে এই ধর্মঘটকে বাইরে থেকে সমর্থন জানিয়েছিল অল ইন্ডিয়া ব্যাঙ্ক এমপ্লয়িজ ইউনিটি ফোরাম (এআইবিইইউএফ)।

ইউএফবিইউ-এর বক্তব্য, কেন্দ্রীয় শ্রম কমিশনারের উপস্থিতিতে সরকারি (ডিএফএস) এবং ইন্ডিয়ান ব্যাঙ্কস অ্যাসোসিয়েশন (আইবিএ) প্রতিনিধিদের আশ্বাসের ভিত্তিতে তারা এই ধর্মঘট প্রত্যাহার করেছে। এআইবিইইউএফ-এর মতে, ব্যাঙ্ক শিল্পের মূল সমস্যার বাইরে গিয়ে কিছু দাবি পূরণের আশ্বাস পেয়ে এ ভাবে ধর্মঘট তুলে নেওয়া ব্যাঙ্ককর্মী সহ সচেতন ব্যাঙ্ক গ্রাহকদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতি এক চরম আঘাত।

ধর্মঘটের দাবিগুলিকে বিচার করে দেখা যাক। মুখ্য দাবি ছিল, অবিলম্বে সমস্ত ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সংখ্যায় স্থায়ী কর্মী নিয়োগ করতে হবে। দিনে দিনে ব্যাঙ্কগুলিতে অস্থায়ী চুক্তিভিত্তিক কর্মীর সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে অবাধে। তাও করা হচ্ছে সম কাজে সম বেতনের নীতি লঙ্ঘন করে। চুক্তির ভিত্তিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে নানা দুর্নীতির শিকার হচ্ছেন অসহায় কর্মীরা। এঁদের চাকরির নিরাপত্তা বলতে কিছু নেই। যখন তখন অবাধে নেমে আসে ছাঁটাইয়ের খড়গ। তাই সঠিক ভাবেই দাবি উঠেছে, কোনও শিক্ষানবিশ নিয়োগ নয়, চুক্তিভিত্তিক ও অস্থায়ী কর্মীদের উপযুক্ত পদ্ধতি অবলম্বন করে স্থায়ী কর্মীতে পরিণত করতে হবে।

ব্যাঙ্ক কর্মচারীদের দীর্ঘ দিনের দাবি– সপ্তাহে সর্বাধিক ৫ দিন ব্যাঙ্ক খুলতে হবে। কর্তৃপক্ষ বহু বার আশ্বাস দিলেও এখনও তা মেনে নেয়নি। দৈনিক কাজের সময় ৬ ঘণ্টা করারও দাবি উঠেছে। কারণ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সুফল শুধু ব্যাঙ্কের মুনাফা বাড়ানোয় ব্যবহৃত হবে, শ্রমিক শ্রেণি তার সুফল পাবে না, তা হতে পারে না।

দাবি উঠেছে কর্মক্ষমতা অনুযায়ী উৎসাহ-ভাতা (পিএলআই) দেওয়া বন্ধ করতে হবে। এখানে কর্মক্ষমতা বা সম্পাদিত কর্মের পরিমাণ নির্ধারিত হবে কর্তৃপক্ষের বিচার অনুসারে, যা পক্ষপাতদুষ্ট হতে এবং পরিণামে কর্মচারীদের ঐক্য নষ্ট করতে বাধ্য।

এ সব কিছুই হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির বেসরকারিকরণের ‘লক্ষ্যে। সেই উদ্দেশ্যেই সংযুক্তিকরণের ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের সংখ্যা ২৭ থেকে ১২টিতে নেমে এসেছে। সরকার এই সংখ্যা আরও কমাতে চায়। ব্যাঙ্কে গচ্ছিত জনসাধারণের সমূহ অর্থের নিয়ন্ত্রক করতে চাওয়া হচ্ছে এ দেশের ধনকুবেরদের। বলা বাহুল্য, এই ধনকুবেররাই বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে শোধ না করায় ব্যাঙ্কের অনুৎপাদক সম্পদ (এনপিএ) বাড়ছে। ব্যাঙ্কগুলোর এই ক্ষতি সামাল দিতেই কর্মী সংকোচন, ব্যাঙ্কের আমানতের উপর সুদের হার কমানো, সাধারণ মানুষের ঋণের উপর সুদের হার বাড়ানো এবং গ্রাহক পরিষেবা ক্ষেত্রকে অযথা বড় করে দেখিয়ে সেখান থেকে উত্তরোত্তর বর্ধিত হারে পরিষেবা শুল্ক (সার্ভিস চার্জ) আদায় করা হচ্ছে। এনপিএ উদ্ধারে কঠোর ব্যবস্থা না নিয়ে কিংবা ইচ্ছাকৃত ঋণ-খেলাপিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিয়ে সরকারের নির্দেশে এই বিপুল পরিমাণ ঋণ খাতা থেকে মুছে দেওয়া হচ্ছে। এরপর এই সব ধনকুবেররা ব্যাঙ্কের মালিকের আসনে বসলে কী হবে তা সহজেই অনুমেয়।

বেসরকারি ব্যাঙ্কের কালো ইতিহাস মানুষ ভোলেনি। গত শতকে যখন তখন পাততাড়ি গুটিয়ে বেপাত্তা হয়ে যেত বেসরকারি ব্যাঙ্ক, পথে বসতেন গ্রাহকরা। ১৯১৩ থেকে ১৯৬৯-এ জাতীয়করণের আগে পর্যন্ত এ দেশে ২১৩২টি ব্যাঙ্কে লালবাতি জ্বলেছিল। কর্মচারীরা যেমন কাজ হারিয়েছিলেন, তেমনি অগণিত গ্রাহক হয়েছিলেন সর্বস্বান্ত। ধনকুবেরদের স্বার্থ রক্ষা করতে সেই দিনগুলিকে ফিরিয়ে আনতে চাইছে কেন্দ্রীয় সরকার। আজও বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাঙ্কের অভ্যন্তরীণ অবস্থা ভয়াবহ। নানা দুর্নীতি এদের সঙ্গী। এখানেও অস্থায়ী কর্মীর সংখ্যা বেশি এবং কাজের স্থায়িত্বও প্রশ্নের সম্মুখীন। বেসরকারি আইসিআইসিআই ব্যাঙ্কে গত কয়েক বছরে কয়েক হাজার কর্মীকে অন্যায়ভাবে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। বহু ক্ষেত্রে নিয়মকানুনও মানা হয়নি। এআইবিইইউএফ তাদের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

দাবি উঠেছে অবসরপ্রাপ্ত ব্যাঙ্ক কর্মীদের পেনশন, কর্মরত কর্মীদের দ্বিপাক্ষিক বেতন চুক্তির পরে পরেই আপডেট করতে হবে। সে দাবি পূরণ না করে সামান্য কিছু এ’গ্রাসিয়া দিয়ে দায় সেরেছে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ। আবার অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো ব্যাঙ্ক শিল্পেও নতুন পেনশন স্কিম হিসাবে এনপিএস বা ইউপিএস (ইউনিফায়েড পেনশন স্কিম) চালু করা হয়েছে, যা চূড়ান্ত অনিশ্চিত শেয়ার-বাজার নির্ভর। ফলে অবসরপ্রাপ্তরা পেনশন আদৌ পাবেন কি না কিংবা পেলে কত পাবেন তা অনিশ্চিত। তাই দাবি উঠেছে সবার ক্ষেত্রে পুরানো পেনশন স্কিম ফিরে আসুক।

ব্যাঙ্ক কর্মীদের এই আন্দোলন দু’দিনের ধর্মঘট ডেকে কিছু আশ্বাসের ভিত্তিতে তা প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে শেষ হতে পারে না। দাবি আদায় করতে হলে দীর্ঘস্থায়ী শক্তিশালী আন্দোলনের রাস্তায় যেতে হবে। এ জন্য চাই ঐক্য। ঐক্যবদ্ধ লাগাতার আন্দোলনই পারে দাবি আদায় করতে। অন্যতম পদক্ষেপ হিসাবে এ আই ইউ টি ইউ সি সহ ১০টি কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন এবং স্বতন্ত্র জাতীয় সেক্টর ভিত্তিক ফেডারেশন তথা অ্যাসোসিয়েশনগুলি ২০ মে দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। এই ধর্মঘট সফল করার দায়িত্ব ব্যাঙ্ককর্মীদেরও নিতে হবে।

লেখাটি গণদাবী ৭৭ বর্ষ ৩৪ সংখ্যা ৪-১০ এপ্রিল ২০২৫  প্রকাশিত