পাঠকের মতামতঃ বিজেপির ‘জিরো টলারেন্স’ সমালোচকদের প্রতিই

মহাকুম্ভ নিয়ে উত্তরপ্রদেশের বিজেপি সরকারের ফোলানো-ফাঁপানো প্রচারের শেষ নেই। কিন্তু যে ঘটনা তারা চেপে যেতে চাইছে, ওই উত্তরপ্রদেশেই এবার হিন্দি দৈনিকের জনপ্রিয় তরুণ সাংবাদিকের খুনে কার্যত দিশাহীন সরকার। প্রশ্ন উঠছে বিজেপি নেতাদের ঘোষিত দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে তথাকথিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়ে।

বিজেপি শাসিত উত্তরপ্রদেশে একের পর এক খুন, ধর্ষণকাণ্ডে জড়িতদের কোনও শাস্তি হয়নি। বেশ কিছু বিধায়ক ও সাংসদ খুন-ধর্ষণের আসামী! ধর্ষণ-খুনের অপরাধীরা জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর বিজেপি, আরএসএসের লোকজন ফুলের মালা দিয়ে তাদের বরণ করে ঘরে তুলেছে। খোদ প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী কেন্দ্র বেনারসেও তা ঘটেছে।

উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা দলিত, আদিবাসী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর হয় কথায়-নয় কথায় আক্রমণ ও মারধর করছে। পানীয় জল নিয়ে স্কুলের ছাত্ররা পর্যন্ত জাত-পাত বিভেদের রাজনীতির বলি হচ্ছে। এইসব ঘটনার প্রকাশ্য ভিডিও ফুটেজ দেখে শান্তিপ্রিয় গণতন্তে্র বিশ্বাসী দেশবাসী আতঙ্কিত। সেই উত্তরপ্রদেশে সীতাপুরে কয়েকদিন আগে এক জনপ্রিয় হিন্দি দৈনিকের সাংবাদিক দুর্নীতির মৌচাকে শুধু একটা ঢিল ছুঁড়েছিলেন! খবর করেছিলেন গোটা রাজ্য জুড়ে ধান কেনা ও জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রে স্ট্যাম্প ডিউটি নিয়ে সরকারি স্তরে লাগামছাড়া দুর্নীতির বিষয়ে। মাসখানেক ধরে জনৈক সাংবাদিকের দুর্নীতি বিষয়ক ধারাবাহিক খবর বিব্রত করেছিল উত্তরপ্রদেশের বিজেপি সরকারকে।

প্রশ্ন উঠছে সে জন্যই কি সীতাপুরের এই তরুণ সাংবাদিককে ভরদুপুরে প্রকাশ্য রাস্তায় গুলি করে হত্যা করা হল? দুষ্কৃতীরা ঘুরে বেড়াচ্ছে অথচ এখনও পর্যন্ত কারও নাকি নাগাল পায়নি পুলিশ!

গণবিক্ষোভকে ধামাচাপা দিতে চারজন অধস্তন পুলিশকর্মীকে বরখাস্ত করেই দায় সেরেছে উত্তরপ্রদেশ সরকার। ওই রাজ্যের সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, হাথরসে দলিত তরুণীকে ধর্ষণ ও হত্যার বিষয়ে খবর করতে যাওয়ার অপরাধে কেরালার সাংবাদিক সিদ্দিক কাপ্পানকে বিনা বিচারে দু’বছর ধরে জেলে থাকতে হয়েছে। ব্যাপক শিশুমৃত্যু ঠেকাতে নিজস্ব উদ্যোগে অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনে শিশুদের প্রাণ বাঁচানোর অপরাধে সরকারি হাসপাতালের শিশু চিকিৎসক কাফিল খানকে ৭ মাস জেল খাটতে হয়েছে বিজেপির রাজত্বে।

দু’দশক আগে উত্তরপ্রদেশ ও বিহার সীমান্তে এনএইচএআই প্রকল্পের চূড়ান্ত আর্থিক দুর্নীতি ও চুক্তিগত অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীকে চিঠি লেখার অপরাধে ওই প্রকল্পের ইঞ্জিনিয়ার সত্যেন্দ্রনাথ দুবে খুন হয়েছিলেন গোয়ার কাছে একটি হোটেলের রাস্তায়।

দুর্ভাগ্যের বিষয়, দুবের পরিবার আজও বিচার পায়নি। একইভাবেপশ্চিমবাংলাতেও তৃণমূলের রাজত্বে খুন-ধর্ষণ-দুর্নীতি-রাহাজানি বেড়েই চলেছে, যা নিয়ে সংবাদপত্রে ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে বিজেপি নেতারা আস্ফালন করছেন। প্রতিনিয়ত দেখে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। ডবল ইঞ্জিন সরকার হলেই নাকি দুর্নীতির শিকড় সমূলে উৎপাটিত করে সোনার বাংলা গড়ে তুলে সব সমস্যার সমাধান করবেন তাঁরা! তা হলে উগ্র হিন্দুত্বের ধ্বজাধারী, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানো তথাকথিত হিন্দু ভোটে জিতে আসা পশ্চিমবাংলার বিজেপি জনপ্রতিনিধিরা সাংবাদিক রাঘবেন্দ্র বাজপেয়ীর মৃত্যু নিয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছেন কেন? ধর্ম-পরিচয়ে তিনি তো হিন্দু! এ থেকে কি এটাই প্রমাণিত হয় যে, ক্ষমতায় থাকলে যথেচ্ছ খুন-ধর্ষণ করা যাবে, আর বিরোধী দলে অবস্থান করলে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের নামে নাটক চলতে থাকবে! আসলে বিজেপির হিন্দু-প্রেম স্রেফ ক্ষমতা দখলের জন্য। আশার কথা বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে ভোটলোভী এইসব দলের প্রতারণা, দেরিতে হলেও মানুষ ধরতে পারছে।

স্বপন জানা, মেচেদা

লেখাটি গণদাবী ৭৭ বর্ষ ৩৪ সংখ্যা ৪-১০ এপ্রিল ২০২৫  প্রকাশিত