কেন্দ্রীয় কৃষিপণ্য বিপণন নীতিঃ শুধু কৃষক নয়, সমস্ত অংশের মানুষকে নিঃস্ব করবে

উত্তর প্রদেশের মোরাদাবাদে কেকেএমএস এর বিক্ষোভ। ২৫ ফেব্রুয়ারি

কেন্দ্রীয় সরকারের জাতীয় কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রণালয় ২০২৪ সালের ২৫ নভেম্বর যে কৃষিপণ্য বিপণন নীতির খসড়া প্রকাশ করেছে, তাতে কৃষক কল্যাণের ছিটেফোঁটাও নেই। এই নীতিতে কৃষক কল্যাণের মন্ত্র জপতে জপতেই কৃষককে বৃহৎ পুঁজির গ্রাসে ঠেলে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই কৃষক ও খেতমজুর সংগঠন এ আই কে কে এম এস সহ ৫০০টি কৃষক সংগঠনের সংগ্রামী জোট সংযুক্ত কিসান মোর্চা (এস কে এম) এই বিপণন নীতির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। এসইউসিআই(কমিউনিস্ট)-ও এর বিরুদ্ধে পথে নেমেছে। ২১ জানুয়ারি লেনিন স্মরণ দিবসে কলকাতায় এই দলের ডাকা মহামিছিলেও এই কৃষি বিপণন নীতির বিরুদ্ধে গর্জন উঠেছে। ৩ এপ্রিল এই দলের ডাকা আইন অমান্য আন্দোলনেও এটি অন্যতম ইস্যু।

ঠিক কী কারণে এই নীতি বিপজ্জনক? এই নীতিতে বৃহৎ পুঁজির মালিকদের পাইকারি বাজার খোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর ফল কী হবে? এর ফলে সমস্ত কৃষিপণ্য চলে যাবে বৃহৎ পুঁজির মালিকদের নিয়ন্ত্রণে। তারা সর্বোচ্চ মুনাফা করতে দ্বিমুখী নীতি নেবে। একদিকে কৃষকদের কাছ থেকে একেবারে কম দামে ফসল কিনবে। আর জনসাধারণের কাছে তা বিক্রি করবে অত্যন্ত চড়া দামে। কৃষক এর ফলে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়বে। জমিজমা বিক্রি করে মজুরে পরিণত হবে। অন্যান্য অংশের জনগণও মূল্যবৃদ্ধিতে বিপর্যস্ত হবে।

এই বিপণন নীতির দ্বিতীয় আপত্তিকর বিষয় হল চুক্তি চাষ। ফসল কেনাবেচা নিয়ে চুক্তি হবে বহুজাতিক কোম্পানি এবং কৃষকদের মধ্যে। এ কথা মনে করার কোনও কারণ নেই, কৃষিপণ্যের ক্রেতা বৃহৎ পুঁজিপতিরা দয়া করে কৃষকদের ন্যায্য দাম দেবে। সর্বোচ্চ মুনাফা-লোভীদের কাছে এমন মহানুভবতা আশা করা বৃথা। তারা পুঁজিবাদী অর্থনীতির নিয়ম মেনে ব্যবসায় নেমেছেন। ফলে এই নীতি অনুযায়ী সর্বোচ্চ মুনাফা তুলতে চুক্তিকে নানাভাবে তারা প্রভাবিত করবে। নানা বাহানা তুলে, ফসলের গুণমানের অজুহাত তুলে এরা চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করলেও গরিব কৃষকদের পক্ষে কিছু করার উপায় থাকবে না। বর্তমান অবস্থায় ফসল বিক্রির ক্ষেত্রে কৃষক ঠকছেন ফড়েদের কাছে। চুক্তি চাষে তাঁরা ঠকবেন বৃহৎ পুঁজিপতিদের কাছে। ফলে বঞ্চনা কমার অবকাশ নেই। বরং রয়েছে অত্যন্ত ক্ষমতাধর বৃহৎ পুঁজির গ্রাসে পড়ার আশঙ্কা।

কৃষি বিপণন নীতির তৃতীয় আপত্তিকর বিষয়টি হল, গ্রামীণ হাটগুলি চলে যাবে বহুজাতিক পুঁজির দখলে। বর্তমান ভারতে এপিএমসি (এগ্রিকালচারাল প্রডিউস মার্কেট কমিটি) আইনের অধীনে ৭০৫৭টি সংগঠিত পাইকারি বাজার আছে, অনিয়ন্ত্রিত বাজার আছে ৫০০টি এবং গ্রামীণ হাট আছে ২৯,৯৩১টি। গ্রামীণ হাটগুলি এখন নিয়ন্ত্রণ করে গ্রামীণ পুঁজিপতিরা। এগুলির নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে বৃহৎ পুঁজির দখলে। এতে ক্ষুদ্র পুঁজি বিপন্ন হবে। এমনিতেই খুচরো ব্যবসা বিপন্ন হচ্ছে বৃহৎ পুঁজির দাপটে। বৃহৎ পুঁজির মালিকরা পুঁজির জোরে সব ক্ষেত্রে একচেটিয়া ব্যবসায় নেমেছে। এদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় দাঁড়াতে পারছে না ক্ষুদ্র পুঁজি। তারা হটে যাচ্ছে। এভাবে বৃহৎ পুঁজির একচেটিয়া ব্যবসা কায়েম হলে তারা অত্যন্ত চড়া হারে দাম বাড়াবে। মানুষের জীবন আরও অসহনীয় হয়ে উঠবে।

কৃষি বিপণন নীতির চতুর্থ আপত্তিকর বিষয়টি হল এমএসপির বিলোপ। বর্তমানে ২৩টি কৃষিপণ্যে যতটুকু এমএসপি দেওয়া হয়, তার মধ্যে রয়েছে ৭ ধরনের দানাশস্য, ৫ ধরনের ডাল, ৭ ধরনের তৈলবীজ এবং ৪ ধরনের বাণিজ্যিক ফসল। কৃষি ব্যবসায়ীরা বাজারে দাম কমিয়ে দিয়ে কৃষককে যেভাবে ঠকিয়ে আসছে তার বিরুদ্ধে এমএসপি একটা রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করত। নতুন কৃষি বিপণন নীতিতে এমএসপি বিষয়ে একটি কথাও নেই। এর ফলে কৃষকদের গরিব হওয়ার প্রক্রিয়া, জমি হারানোর প্রক্রিয়া আরও তীব্রতর হবে ।

নরেন্দ্র মোদি সরকার এই নীতির রূপরেখা তৈরি করলেও এর মূল উদগাতা কংগ্রেসের মনমোহন সিং। ১৯৯১ সালে বিশ্বায়ন-উদারিকরণের নীতি অনুযায়ী কংগ্রেস এই ধারণা নিয়ে আসে। কংগ্রেস সরকার এপিএমসি আইন পাল্টে বৃহৎ পুঁজির হাতে কৃষিপণ্য কেনার আইনি অধিকার দেয়, চুক্তি চাষ আইনসিদ্ধ করে। এইভাবে কৃষিতে একচেটিয়া পুঁজির কর্তৃত্ব কায়েম করার পথ প্রশস্ত করে দেয় কংগ্রেস। বিজেপি সেই পথেই চলছে।

কংগ্রেস বা বিজেপি– দুটি দলই ভারতের বিভিন্ন একচেটে পুঁজিপতি গোষ্ঠীর সামগ্রিক স্বার্থ রক্ষার দল। কৃষিতে এদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কায়েমের উদ্দেশ্যে এই ভয়ঙ্কর নীতি চালু করতে চাইছে মোদি সরকার। এর মধ্য দিয়ে ঘুরপথে, ভিন্ন নামের আড়ালে চূড়ান্ত জনবিরোধী, কৃষকদের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত কেন্দ্রীয় কৃষিনীতি ফিরিয়ে আনার কৌশল নিয়েছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। এআইকেকেএমএস গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ভারতের ১৭টি রাজ্যের রাজধানী শহরে এর বিরুদ্ধে কৃষক সমাবেশ করেছে। একে সম্পূর্ণরূপে বাতিল করার লক্ষ্যে গ্রামে গ্রামে কৃষক কমিটি গঠনের চেষ্টা চলছে। ৩ এপ্রিল জেলায় জেলায় আইন অমান্য আন্দোলনের জন্য যে নিবিড় প্রচার চলেছে, তার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে এই কমিটিগুলির ভিত্তি।

লেখাটি গণদাবী ৭৭ বর্ষ ৩৪ সংখ্যা ৪-১০ এপ্রিল ২০২৫  প্রকাশিত