দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলে অনেকে বিস্মিত হয়েছেন, অনেকে হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, তা হলে আপও হারল! তা-ও বিজেপির কাছে! বিজেপিকে গত দুটি বিধানসভা নির্বাচনে আপ গো-হারান হারিয়েছিল। এ বার সেই আপের এমন দুর্দশা হল কেন?
ভোটার সংখ্যায় অস্বাভাবিক বৃদ্ধি কিংবা ভোটের চার দিন আগে কেন্দ্রীয় বাজেটে কল্পতরু সাজাই নিশ্চয় এর একমাত্র কারণ নয়। তা হলে বিজেপি আপের সমর্থকদের মধ্যে এমন বড় মাপের ধস নামাতে পারল কী করে?
অনেকেরই মনে আছে প্রথম বার বিধানসভা নির্বাচনে আপের দিল্লি মসনদ দখলের পর দেশজুড়ে আপ-রাজনীতির এমন ঢেউ উঠেছিল যে দেশের বড় বড় শহরগুলির মতো কলকাতারও মোড়ে মোড়ে কিছু ব্যক্তি টেবিল নিয়ে বসে গিয়েছিলেন আপের সদস্য করার জন্য। সে দিন আপের প্রতি মানুষের এমন সমর্থনের প্রধান কারণটা কী ছিল?
সময়টা কেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউপিএ-র অন্তিম কাল। এক দিকে পুঁজিপতিদের স্বার্থ দেখতে গিয়ে ক্রমাগত জনবিরোধী নীতি নেওয়া, অন্য দিকে টেলিকম, কয়লা, কমনওয়েলথ গেমস সহ একের পর এক নানা দুর্নীতিতে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে মানুষ ক্ষোভে ফুটছে। এমন সময়ে দিল্লিতে দুর্নীতির মামলাগুলির দ্রুত তদন্ত ও বিচারের জন্য লোকপাল নিয়োগের বিল নিয়ে আসার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন সমাজকর্মী আন্না হাজারে। সেই আন্দোলনেই দুর্নীতি বিরোধী মুখ হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন প্রাক্তন আমলা অরবিন্দ কেজরিওয়াল। কংগ্রেসের জনপ্রিয়তা দ্রুত তলানিতে পৌঁছতে থাকে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আম আদমি পার্টি নামে দল গড়েন কেজরিওয়াল। এই নতুন দলে যোগ দেন আন্নার বেশ কিছু সহযোগী। কংগ্রেস কেন্দ্রেীয় ক্ষমতা হারানোর পরের বছর দিল্লির বিধানসভা ভোটে প্রথম নেমেই কংগ্রেসকে শূন্য করে দেয় আপ। বিজেপি পায় মাত্র ৩টি আসন।
আপের এই বিরাট জনসমর্থনের পিছনে কারণ হিসাবে কাজ করেছিল সাধারণ মানুষ বিশেষত দিল্লির মধ্যবিত্ত অংশের কংগ্রেসের দুর্নীতিতে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠা। এই দুর্নীতি-বিরোধী আন্দোলনের প্রতিনিধি হিসাবেই কেজরিদেরও মানুষ গ্রহণ করেছিল। দল গঠনের পর তাঁদের দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের প্রতিশ্রুতিতে মানুষ বিশ্বাস করেছিল। ক্ষমতায় বসার পর শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নতিতে বেশ কিছু পদক্ষেপ মানুষের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছিল। সরকারি স্কুলগুলির উন্নয়ন ঘটেছিল। মহল্লা ক্লিনিক জনপ্রিয় হয়েছিল। গরিব গৃহস্থের জন্য বিনামূল্যে বিদ্যুৎ এবং মহিলাদের জন্য বিনামূল্যে বাসে যাতায়াত মানুষকে খুশি করেছিল। এর সঙ্গে ছিল পুঁজিবাদী প্রচারমাধ্যমের ব্যাপক প্রচার। কারণ পুঁজিপতি শ্রেণির হাতে তখনও অন্য কোনও বিকল্প ছিল না। দিল্লিতে বিজেপি তখনও অনেকখানি দুর্বল। এই প্রচারে ভেসে গিয়ে মানুষ বিচার করতে ভুলে গেল যে, দুর্নীতির উৎস মুনাফাসর্বস্ব এই পুঁজিবাদী অর্থনীতি। তাকে উপড়ে ফেলার পরিবর্তে মানুষ দল পাল্টে এর হাত থেকে রেহাই পেতে চাইল। ফলে দ্বিতীয়বারও আপ প্রায় একই রকম জনসমর্থন পেয়ে ক্ষমতা দখল করেছিল।
এর পরই পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে পুঁজিবাদী নিয়মকে মেনে নিয়ে, অর্থাৎ পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থকে রক্ষা করেই কাজ করতে থাকে আপ। যেমন একচেটিয়া বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলির অন্যায় লুঠের বিরোধিতা না করে সরকারি কোষাগার থেকে গৃহস্থের বিদ্যুতের দাম মিটিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় আপ। ফলে একের পর এক দুর্নীতিতে জড়াতে থাকেন আপ নেতারা। রাজস্ব আদায়ের সহজ উপায় হিসাবে মদের ঢালাও লাইসেন্স দিতে গিয়ে আবগারি কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে যান আপ নেতারা। গ্রেফতার হয়ে জেলে যান মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল ও উপমুখ্যমন্ত্রী মনীশ সিসোদিয়া। মহল্লা ক্লিনিকগুলি সম্পর্কে নানা গাফিলতির অভিযোগ উঠতে থাকে। স্কুলগুলিরও একই দশা হয়। দলের নেতাদের সম্পর্কে দাম্ভিক এবং বিলাসবহুল জীবনযাপনের অভিযোগ উঠতে থাকে। মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়ালের আবাসবাড়িটি কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে সাজানোর অভিযোগ তুলে ব্যাপক প্রচার চালায় বিজেপি। অর্থাৎ আপের বিকল্প তথা স্বচ্ছ রাজনীতির ভাবমূর্তিটি ভেঙে পড়তে থাকে।
দিল্লিতে যানজট, বায়ু দূষণ এবং যমুনা জল দূষণ রোধে আপ প্রশাসন ব্যর্থ বলে জনমানসে ধারণা হয়। বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে মোকাবিলার পরিবর্তে আপ নেতৃত্ব নরম হিন্দুত্বের আশ্রয় নেয়। কেজরিওয়াল নিজেকে হনুমানের ভক্ত বলে প্রচার করতে থাকেন। দিল্লি দাঙ্গায় নিরপেক্ষতার ভান করে হিন্দুত্বের পক্ষে থাকেন। স্বাভাবিক ভাবেই নরম হিন্দুত্ব দিয়ে শেষ পর্যন্ত সঙ্ঘ পরিবারের প্রবল হিন্দুত্ববাদী ধুরন্ধর রাজনীতির মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয় আপ।
এই রকম পরিস্থিতিতে হরিয়ানা ও মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচনে সাফল্যের পর দিল্লি জয় করতে নতুন উৎসাহে নামে বিজেপি। ভোটের প্রচারে নামায় আরএসএস বাহিনীকে। অন্য দিকে যে খয়রাতি-রাজনীতির উপর আপ দাঁড়িয়েছিল, বিজেপির প্রতিশ্রুতি প্রতিটি ক্ষেত্রে তাকে ছাপিয়ে যায়। খয়রাতি বা সুবিধা দেওয়ার রাজনীতির অসুবিধা হল, গত বার যে ঘোষণায় ভোটাররা উল্লসিত হয়েছিল, এ বার বিরোধী কোনও দল তার থেকে বেশি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে জনতা তার পক্ষে চলে যেতে পারে। অর্থাৎ জনজীবনের জ্বলন্ত সমস্যাগুলির আসল কারণ যে শোষণমূলক পুঁজিবাদী এই ব্যবস্থা এবং এই ব্যবস্থা যত দিন টিকে থাকবে তত দিন যে সেগুলির সমাধান দূরের কথা, বাড়তেই থাকবে, এই কঠোর সত্যিটি সম্পর্কে শোষিত জনগণকে সচেতন করার পরিবর্তে তাকে আড়ালই করে গেছে আপ রাজনীতি। মানুষের মধ্যে শ্রেণিচেতনা এনে দেওয়া, অর্থাৎ কোন শ্রেণি বা শ্রেণি দল সাধরাণ মানুষের স্বার্থ রক্ষা করবে, আর কোন শ্রেণি বা শ্রেণি দল জনতার সেবার মুখোশ পরে পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করবে– একমাত্র এই চেতনা গড়ে উঠলেই মানুষ বিজেপির ধূর্ত সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, পুঁজিবাদী শ্রেণিস্বার্থ রক্ষার রাজনীতি ধরতে পারত এবং তাকে প্রত্যাখান করত। তা হয়নি আপের নিজের পেটি-বুর্জোয়া শ্রেণি রাজনীতির জন্যই।
আপের দুর্নীতি মুক্ত প্রশাসনের প্রতিশ্রুতিতে ভুলে, কোনও রকম বাছবিচার না করেই মানুষ যে দিন তার পিছনে ছুটেছিল সে দিন এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট) এ কথা স্পষ্ট করেই বলেছিল যে, পুঁজিবাদের বর্তমান তীব্র বাজারসঙ্কটের যুগে দুর্নীতি পুঁজিবাদের অপরিহার্য অঙ্গে পরিণত হয়েছে। এই দুর্নীতিগ্রস্ত পুঁজিবাদকে যে দল সেবা করবে, তাকে টিকে থাকতে সাহায্য করবে, সেই দলও দুর্নীতিগ্রস্ত হতে বাধ্য। এবং জনস্বার্থকেও শেষপর্যন্ত তারা পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থের পায়ে বিসর্জন দিতে বাধ্য হবে।
আপের ক্ষেত্রে তাই হয়েছে। ফলে আদর্শ ও রাজনীতি কোনও ক্ষেত্রেই আপ বিজেপি-কংগ্রেসের পুঁজিবাদের স্বার্থরক্ষাকারী রাজনীতির বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি। আজ যাঁরা আপের পরাজয়ে বিস্মিত হচ্ছেন তাঁদেরও এই শ্রেণি রাজনীতিটি বুঝতে হবে। না হলে বিজেপির অপশাসনে আবার একদিন অতিষ্ঠ হয়ে উঠলে পুঁজিপতি শ্রেণি সে দিন তাদেরই বিশ্বস্ত সেবক কোনও একটি দলকে ‘বিকল্প’ হিসাবে জনগণের সামনে উপস্থিত করবে এবং তার পক্ষে ব্যাপক প্রচার দিতে থাকবে। তখন একই রকম ভাবে কোনও রকম বিচার না করে সেই প্রচারে ভুলে মানুষ তাকেই সমর্থন করে বসবে এবং আবার হতাশ হবে।
সর্বভারতীয় স্তরে এনডিএ বা ইন্ডিয়া, রাজ্য স্তরে এই দল বা ওই দল– এই জোট বা ওই জোট– এই যে দ্বিদলীয় ব্যবস্থা বা দ্বিজোট ব্যবস্থা, এর মধ্য দিয়ে যে ভোট রাজনীতি চলছে– তা শোষণমূলক পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার একটি ফ্যাসিবাদী প্রচেষ্টা।
বহু মানুষ যথার্থ শ্রেণি চেতনার অভাবে মনে করে সব দলই সমান। বাস্তবে সত্যি সব দল সমান নয়। যে দলটি যথার্থই শোষিত শ্রেণির স্বার্থে লড়াই করে চলেছে শ্রেণি চেতনা দিয়েই তাকে চিনে নিতে হবে। সেই দলের শক্তি কম থাকলে শোষিত মানুষের দায়িত্ব তাকে শক্তিশালী করা এবং সেই শক্তির উপর দাঁড়িয়ে শোষিত শ্রেণির স্বার্থ রক্ষায় শ্রেণিসংগ্রামকে তীব্র করা। তখন এটা দেখা চলে না যে, সেই দলের এমএলএ-এমপি আছে কি না, বা ভোটে বিপুল সমর্থন পায় কি না।
এ কথা কোনও ভাবেই ভুলে গেলে চলবে না যে, শোষিত মানুষের স্বার্থরক্ষাকারী শ্রেণিদলকে শক্তিশালী করার দায়িত্ব শোষিত শ্রেণিরই, পুঁজিপতিরা তা করে দেবে না।