স্বাস্থ্য সাথী প্রকল্প রাজ্যের মানুষের স্বাস্থ্য বঞ্চনার কতটা সুরাহা করতে পারছে

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার ২০১৬ সালে প্রধানত দারিদ্রসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের চিকিৎসার কথা বলে স্বাস্থ্য সাথী নামক একটি বিমা প্রকল্প চালু করে। এটি একটি সরকারি বিমা প্রকল্প। পরবর্তীকালে অস্থায়ী কর্মী, আধা সরকারি সংস্থার কর্মী সহ মধ্যবিত্ত মানুষের জন্যেও এর সুযোগ সম্প্রসারিত করা হয়। রাজ্য সরকারের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে ২ কোটি ৪৫ লক্ষ পরিবার অর্থাৎ ৮ কোটি ৭২ লক্ষ মানুষ এই স্বাস্থ্য বিমার আওতায় রয়েছেন। অর্থাৎ রাজ্যের সিংহভাগ মানুষই স্বাস্থ্য সাথী কার্ডের সুযোগ পাচ্ছেন। এই কার্ডের মাধ্যমে একটি পরিবারের বছরে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসার সুযোগ পাওয়ার কথা। প্রাথমিক ভাবে এই কার্ডের মাধ্যমে বিভিন্ন বেসরকারি নার্সিংহোম এবং বেসরকারি হাসপাতাল থেকে মানুষ এই কার্ডের মাধ্যমে চিকিৎসা পেতেন। বর্তমানে সরকারি হাসপাতালগুলিতেও স্বাস্থ্য সাথী কার্ডকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অর্থাৎ আজ স্বাস্থ্য সাথী কার্ড ছাড়া কোথাও চিকিৎসার সুযোগ খোলা নেই। কেবলমাত্র বেসরকারি হাসপাতালে যেখানে চিকিৎসা পেতে মোটা অঙ্কের টাকা গুনতে হয় সেখানেই একমাত্র কার্ড ছাড়া চিকিৎসা পাওয়া যেতে পারে, যার সুযোগ রাজ্যের মুষ্টিমেয় মানুষই গ্রহণ করতে সক্ষম।

পাশাপাশি আমরা লক্ষ করছি, ২০১৮ সাল থেকে কেন্দ্রীয় সরকার আয়ুষ্মান ভারত নামক একই রকম একটি বিমা প্রকল্প চালু করেছে। সারা ভারতের স্বাস্থ্য পরিষেবাকে অত্যাধুনিক অর্থাৎ ডিজিটালাইজড করার নাম করে চালু করা হয়েছে আয়ুষ্মান ভারত ডিজিটাল হেলথ মিশন। আয়ুষ্মান ভারত কার্ডটি এই মিশন পরিচালনার অন্যতম হাতিয়ার। এই কার্ড চালু করাকে কেন্দ্র করে নানা সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থ এবং বিরোধ থাকার ফলে কেন্দ্রীয় সরকারের এই কার্ডটি পশ্চিমবঙ্গ সহ বেশ কিছু রাজ্যে চালু হয়নি। সুযোগ বুঝে উভয় সরকারই মাঝেমধ্যে দুটি কার্ডের ব্যর্থতার খতিয়ানগুলি তুলে ধরতে যতটা তৎপর, এই কার্ডে মানুষের চিকিৎসার সুরাহা কতটা হল তা দেখার ক্ষেত্রে তারা ততটা তৎপর নয়।

বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই ন্যাশনাল হেলথ স্কিম অর্থাৎ এই ধরনেরই বিমা প্রকল্পের মাধ্যমে স্বাস্থ্য পরিষেবা সরকারগুলি দিচ্ছে। সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নে বিশ্বে প্রথম চালু হয় সকল মানুষের জন্য স্বাস্থ্যনীতি, যার মাধ্যমে সরকার দেশের সমস্ত মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত স্বাস্থ্যের সমস্ত দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল এবং তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পালন করত। সমাজতান্ত্রিক শিবির যতদিন ছিল বিশ্বের পুঁজিবাদী দেশগুলি কিছুটা হলেও সর্বজনীন স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিতে বাধ্য হয়েছে। সমাজতান্ত্রিক শিবিরের অনুপস্থিতিতে বর্তমানে সমস্ত মানুষের জন্য ফ্রি চিকিৎসার ব্যবস্থা আজ আর বিশ্বে কোথাও নেই। আমাদের দেশেও এই ফ্রি চিকিৎসার ব্যবস্থা যতটুকু চালু হয়েছিল আজ বহুলাংশেই তা ধ্বংস করা হয়েছে। একদা জনগণের ট্যাক্সের টাকায় গড়ে ওঠা স্বাস্থ্য পরিকাঠামোগুলি সরকার আজ ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দিচ্ছে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ নীতির মাধ্যমে। এর ফলে স্বাস্থ্যব্যবস্থার বেশিরভাগ অংশই আজ বেসরকারি মালিকের হাতে হস্তান্তরিত হয়েছে। যতটুকু অংশ বেঁচে আছে তার সবটুকুই নানা ধরনের স্বাস্থ্য বিমা কোম্পানির অবাধ লুন্ঠনের ক্ষেত্র হিসেবে উন্মুক্ত করা হচ্ছে। আমাদের দেশে বহু সরকারি-বেসরকারি বিমা কোম্পানি রয়েছে যারা কর্পোরেট হাসপাতালগুলিতে থাবা বসিয়ে রেখেছে। হেলথ ইন্সিওরেন্স ছাড়া বড় বড় বেসরকারি হাসপাতালে নগদ টাকায় চিকিৎসা করানোর ক্ষমতা আজ দেশের প্রায় কোনও মানুষেরই নেই। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তারা মোটা অঙ্কের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। একটা বিরাট অংশের মানুষের হাতে টাকা না থাকার ফলে তারা মাঝারি ও নিম্নমানের বেসরকারি হাসপাতাল ও নার্সিংহোমগুলিতেও চিকিৎসা করাতে অপারগ হয়ে উঠেছে। স্বাস্থ্য সাথী কার্ডের মাধ্যমে সরকার ওইসব নার্সিংহোমের বিল মেটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে স্বাস্থ্য সাথী বা আয়ুষ্মান ভারতের মতো সরকারি উদ্যোগে বিমা নির্ভর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা চালু করে।

স্বাস্থ্যব্যবস্থার বেসরকারিকরণের নীতির মাধ্যমে ইতিমধ্যেই সরকারি হাসপাতালের একটা বিরাট অংশের পরিষেবা বেসরকারি মালিকের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। ফলে সরকারি হাসপাতালেও চিকিৎসা পরিষেবা আজ অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। উপরন্তু সরকারি হাসপাতালের পরিকাঠামোর যে দৈন্যদশা তৈরি করা হয়েছে কয়েকটি উদাহরণ দিলেই তা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হবে। ইতিমধ্যে ভোটের চটকদার রাজনীতির স্বার্থে পশ্চিমবঙ্গ সরকার রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় বেশ কিছু ঝাঁ চকচকে হাসপাতাল বিল্ডিং তৈরি করে সেখানে সুপারস্পেশালিটি হাসপাতালের সাইনবোর্ড টাঙিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ওইসব হাসপাতালগুলি থেকে একটি গ্রামীণ হাসপাতালের নূ্যনতম পরিষেবাও মিলছে না। কারণ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের প্রায় ৯০ ভাগ পদই শূন্য রাখা হয়েছে। মেডিকেল কলেজের সংখ্যা প্রতি বছরই বাড়ানো হচ্ছে, তার কোথাও প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোর পঞ্চাশ শতাংশও নেই। সম্প্রতি জানা গেছে, প্রায় ৫ হাজারেরও বেশি সিনিয়র চিকিৎসকের পদ শূন্য পড়ে রয়েছে। সবচেয়ে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে গ্রুপ ডি এবং সুইপারের পদ, যার প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই ফাঁকা। ফলে কিছু হাসপাতালে ডাক্তার নার্স থাকা সত্ত্বেও অপারেশন থেকে শুরু করে বিভিন্ন জরুরি পরিষেবা দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা বহুলাংশে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দেওয়ার ফলে তা হয়ে উঠেছে অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এইভাবে সরকারি হাসপাতালগুলি ইতিমধ্যেই চিকিৎসার অনুপযোগী করে তোলা হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, রাজ্য সরকার তো ক্ষমতায় আসার পরেই ২০১১ সালে ঘোষণা করেছিল সমস্ত মানুষের জন্য হাসপাতাল থেকে ফ্রি চিকিৎসা দেওয়া হবে। চিকিৎসা যদি ফ্রি হবে তাহলে আর স্বাস্থ্য সাথী কার্ড কিসের জন্য? যেখানে বর্তমানে মানুষ উপলব্ধি করতে পারছেন স্বাস্থ্য সাথী কার্ড বাধ্যতামূলক করার আগে সরকারি হাসপাতালে যতটুকু চিকিৎসা পরিষেবা ফ্রিতে পাওয়া যেত আজ সেটুকু পেতে গেলে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হচ্ছে। অনেক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। তারপরেও কি সমস্ত চিকিৎসা পাওয়া যাচ্ছে? সম্প্রতি কলকাতার প্রিমিয়ার হাসপাতাল এসএসকেএম-এ উডবার্ন-এর দ্বিতীয় ক্যাম্পাস চালু করা হয়েছে যেখানে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে চিকিৎসা পেতে হয়। এই ওয়ার্ডে চিকিৎসার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য সাথী কার্ডের প্রয়োগ কিন্তু খুবই সীমিত। ফলে মানুষের মনে প্রশ্ন উঠছে স্বাস্থ্য সাথী কার্ড কি তাহলে মানুষের সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা-বঞ্চনার সুরাহা করতে পারছে, নাকি আরও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে, মানুষের স্বাস্থ্যের অধিকার আরও কেড়ে নিচ্ছে?

অন্যদিকে জনসংখ্যা বাড়লেও সরকারি হাসপাতালে বেডের সংখ্যা বাড়ানো হয়নি। বর্তমানে জনসংখ্যার নিরিখে রাজ্যে তিন লক্ষের উপরে হাসপাতাল বেড প্রয়োজন। যেখানে রয়েছে মাত্র ৯০ হাজার, তার মধ্যেও একটা বড় অংশের বেড অকার্যকরী অবস্থায় পড়ে থাকে। যতটুকু বেড বা পরিষেবা রয়েছে অবাধ দালাল রাজ এবং দুর্নীতি ও অরাজকতা চলার ফলে সেই পরিষেবাটুকুও আমজনতা সুষ্ঠুভাবে পাচ্ছেন না। সহজেই অনুমান করা যায় বেডের এই সঙ্কট, পরিকাঠামোর চূড়ান্ত অপ্রতুলতা থাকার দরুন স্বাস্থ্য সাথী কার্ড থাকা সত্তে্বও বহু মানুষ প্রতিদিনই সরকারি হাসপাতালেও ভর্তি হতে পারছেন না বা চিকিৎসা পাচ্ছেন না। বিনা চিকিৎসাতেই তাদের মৃত্যুর মুখে পড়তে হতে হচ্ছে।

গরিব ও সাধারণ মানুষের কাছে প্রাথমিকভাবে এই কার্ডটি অত্যন্ত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল এবং মানুষের ভরসা অর্জন করেছিল। প্রথম দিকে বেশ কিছু চিকিৎসা আপাত অর্থে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন বেসরকারি হাসপাতালে এই কার্ডের বিনিময়ে পাওয়ার সুযোগ পেয়ে মানুষ যারপরনাই আনন্দিত হয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে স্বাস্থ্য সাথী কার্ডের এই সুযোগ বহুলাংশে সংকুচিত করা হচ্ছে। সম্প্রতি অর্থোপেডিক্স-এর প্রায় সমস্ত অপারেশনই স্বাস্থ্য সাথী প্রকল্পের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। হাইড্রোসিল, হার্নিয়া, পাইলস, ফিস্টুলার মতো অত্যন্ত সাধারণ অপারেশন যা গ্রাম বাংলার মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন, সে সব অপারেশনও এর আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। এ রকমই প্রকাশ্যে বহু চিকিৎসা পরিষেবাকে ইতিমধ্যেই এই বিমার বাইরে নিয়ে আসা হয়েছে। অর্থাৎ এইসব ক্ষেত্রে মানুষ বর্তমানে নার্সিংহোমগুলোতে স্বাস্থ্যসাথীর সুবিধা পাচ্ছেন না। উপরন্তু স্বাস্থ্য সাথী কার্ডকে সরকারি হাসপাতালে বাধ্যতামূলক করার ফলে সরকারি হাসপাতাল থেকেও এইসব চিকিৎসা পেতে মানুষকে ঝামেলা পোয়াতে হচ্ছে। এ ছাড়াও যেসব পরিষেবা মানুষের পাওয়ার কথা সে সব পরিষেবাও কি মানুষ সব সময় পাচ্ছেন? অনেক ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য সাথী কার্ড-এর মাধ্যমে ভর্তির ক্ষেত্রে নার্সিংহোমগুলো রোগী ভর্তি নিতে অস্বীকার করে। তার পেছনেও যে কারণ রয়েছে স্বাস্থ্য সাথী বিমার বিপুল অংকের টাকা একদিকে যেমন সরকারি বদান্যতায় এই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলির মাধ্যমে নয়ছয় হয়, তেমনই রাজ্য সরকার এইসব প্রতিষ্ঠানের বিপুল অঙ্কের বকেয়া বিল না মেটানোর ফলে প্রতিষ্ঠানগুলি আর নতুন করে স্বাস্থ্য সাথীর রোগী ভর্তি করতে চায় না। ফলে সুপারিশ না থাকলে বা দাদা-দিদির আশীর্বাদ না থাকলে স্বাস্থ্য সাথী কার্ড-এর মাধ্যমে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পাওয়াও আজ দুরূহ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে সরকারি হাসপাতালে বেডের অপ্রতুলতা, পরিকাঠামোর অপ্রতুলতা থাকায় সেখানেও মানুষ ভর্তি হতে পারছেন না। ফলে বহু মানুষ প্রতিদিনই কার্যত বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে স্বাস্থ্য সাথী খাতে প্রতি বছরই দু’হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি বাজেট বরাদ্দ করা হয়। রাজ্য সরকার দাবি করছে এ যাবৎ স্বাস্থ্যসাথীতে চিকিৎসার ক্ষেত্রে সরকার ১৩ হাজার কোটি টাকার বিল মিটিয়েছে। যার দ্বারা এক কোটিরও বেশি মানুষ চিকিৎসা পেয়েছেন। বাস্তবিক ক্ষেত্রে মানুষ দেখতে পায় স্বাস্থ্য সাথী বেডে ভর্তি হতে যেমন প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, তেমনি অত্যন্ত নিম্নমানের ওষুধ ও সরঞ্জাম দিয়ে চিকিৎসার ভুরি ভুরি উদাহরণও রয়েছে। নানা অছিলায় যেসব চিকিৎসা দু-তিনদিনে সম্ভব তার মেয়াদকাল বাড়িয়ে এক সপ্তাহ-দু সপ্তাহ পর্যন্ত করে দেওয়া হচ্ছে। বহু রোগীর ক্ষেত্রে ক্রিটিক্যাল কেয়ার প্রয়োজন না থাকলেও তাদেরকে ক্রিটিকাল কেয়ারে ভর্তি করা হচ্ছে। আবার রোগী সুস্থ হওয়ার আগেই তাকে ছুটি নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন না থাকলেও তা করানো হচ্ছে। অপ্রয়োজনে বহু ক্ষেত্রে চিকিৎসার বিল তৈরি করা হচ্ছে। এসবই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় এই খরচ হওয়া রাজ্য কোষাগারের ১৩ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ঠিক কতটা অংশ মানুষের সুষ্ঠু পরিষেবার জন্য কাজে লেগেছে আর কতটা অংশ অসাধু ব্যবসায়ীদের এবং রাজনৈতিক ও অসাধু প্রশাসনের পকেটস্থ হয়েছে। অন্যদিকে আমরা দেখতে পাচ্ছি স্বাস্থ্যের জন্য সামগ্রিক বাজেট বরাদ্দ কখনওই কুড়ি হাজার কোটি টাকার ওপরে যাচ্ছে না। যা সামগ্রিক বাজেটের ৬ শতাংশেরও কম, অথচ একটা জনকল্যাণমূলক রাষ্টে্র রাজ্যের স্বাস্থ্য বাজেটে মোট বরাদ্দের কুড়ি শতাংশ হওয়ার কথা। তার উপরে স্বাস্থ্য সাথী খাতে ব্যয় করার জন্য মূল স্বাস্থ্য বাজেট প্রতি বছর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যে টাকা দিয়ে সকলের জন্য ফ্রি চিকিৎসার যে বুনিয়াদি পরিষেবা চালু ছিল তাকে ঢেলে সাজানো যেত। সরকার সে পথে না হেঁটে কেন্দ্রীয় সরকারের কায়দায় বিমানির্ভর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর জোর দিল, যা আদতে মানুষের স্বাস্থ্যের অধিকার কেড়ে নেওয়া থেকে শুরু করে সার্বিকভাবে মানুষের স্বাস্থ্য বঞ্চনারই শামিল।

বিমা নির্ভর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, তা বেসরকারি কিংবা সরকারি বিমাই হোক না কেন তা কখনও মানুষের স্বাস্থ্যের সুরক্ষা দিতে পারে না। তা কখনও সকলের জন্য স্বাস্থ্যের বিকল্প রাস্তা হতে পারে না। কারণ বিমা মানেই মানুষের সাথে প্রতারণা। এখানে বিমা কোম্পানি অথবা এর সাথে সংযুক্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলি কিংবা ব্যবসায়ীদের মুনাফাকেই সুনিশ্চিত করা হয়, সেখানে মানুষের ফ্রি চিকিৎসার বিষয়টা গৌণ হয়ে দাঁড়ায়। সেই কারণেই কি কেন্দ্রীয় সরকার, কি রাজ্য সরকার, কেউই প্রত্যক্ষভাবে স্বাস্থ্য পরিষেবার জন্য বরাদ্দ বাড়াচ্ছে না, বরং তা প্রতি বছর কমিয়ে বিমা নির্ভর এইসব প্রকল্প– তা কেন্দ্রীয় সরকারের আয়ুষ্মান ভারত হোক বা রাজ্য সরকারের স্বাস্থ্য সাথী– এই সব প্রকল্পভিত্তিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় জোর দিচ্ছে, যেখানে সাধারণ মানুষের কোনও স্বার্থ নেই।