স্বাস্থ্য ব্যবসায়ীদের মুনাফা-লালসা থেকে রেহাই নেই সাধারণ মানুষের

সরকারি চিকিৎসা ক্ষেত্রে পরিষেবা পেতে সমস্যার মুখোমুখি হয়ে কেউ কেউ বলেন, বেসরকারিকরণ হলে বোধহয় সমস্যা হত না। তাঁদের ধারণা, বেসরকারি ক্ষেত্রে সহজেই পরিষেবা পাওয়া যায়। বাস্তবটা কী? সরকারি ক্ষেত্রে সরকার জনসাধারণকে চিকিৎসা পরিষেবা দিতে দায়বদ্ধ। বেসরকারি ক্ষেত্রে বিপুল ব্যয় করেও সাধারণ মানুষ কি প্রয়োজন মতো চিকিৎসা পরিষেবা পাচ্ছে? যদিও সরকারি পরিষেবায় অসন্তুষ্ট হয়েই বেসরকারি ক্ষেত্রে ছুটছে মানুষ। সরকারি ও বেসরকারি দুটি ক্ষেত্রে অতি জরুরি স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বিপরীত। সরকারি ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য হল পরিষেবা, বেসরকারি ক্ষেত্রে তা নিতান্তই মুনাফার পণ্য।

সরকারি হাসপাতালের চিত্র কী? হাজার হাজার রোগী। অনেক লাইন দিয়ে ডাক্তার দেখানোর পর ওষুধের লম্বা লাইন। এ ছাড়াও নানা পরীক্ষার লম্বা তালিকা হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়। বহুক্ষেত্রে সেগুলির সব কটি হাসপাতালে হয় না। বিপুল খরচে বাইরে থেকে করাতে হয়। সংখ্যায় অত্যন্ত কম ডাক্তার-নার্স পরিষেবা চালু রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন। চিকিৎসা সরঞ্জামের অপ্রতুলতায় ও গুণগত মানের অভাবে বহু রোগীরই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করতে পারেন না চিকিৎসকরা। আবার বেসরকারি হাসপাতালগুলিতে কর্তৃপক্ষ রোগী এবং রোগীর পরিবারকে ভয় দেখিয়ে বিপুল খরচে গিনিপিগের মতো নানা পরীক্ষা করিয়েই চিকিৎসা-নৈতিকতার বালাই না রেখে রোগীকে মৃতপ্রায় করে ফেলে। আর্থিক, মানসিক ও শারীরিক ভাবে বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে রোগী ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। এই ধরনের মারাত্মক অভিজ্ঞতা অনেকেরই।

এই অবস্থায় পড়তে বাধ্য হচ্ছে কেন মানুষ? কারণ দেশের জনস্বাস্থ্যের বেহাল দশা। সরকারি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে কার্যত পঙ্গু করে দিয়েছে সরকার। প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্র এমনকি জেলা হাসপাতালগুলিতে পরিকাঠামোর অভাব চূড়ান্ত। কোথাও রয়েছে ওষুধ, চিকিৎসকের ঘাটতি, কোথাও পরীক্ষা করার যন্ত্রপাতি নেই বা খারাপ হয়ে পড়ে রয়েছে। ফলে বেড পেলেও চিকিৎসা হয় না। বহু সময়ে রোগীকে কলকাতায় রেফার করে দেওয়া হয়। বহু জেলা থেকেই রোগীর পরিজনরা আগের দিন রাতে ট্রেনে চেপে পর দিন সকালে সরকারি হাসপাতালে দেখানোর লম্বা লাইনে দাঁড়াতে বাধ্য হন। সেখানেও রয়েছে দালালের খেলা। আগের দিন রাত থেকে পরের দিন সন্ধ্যে পর্যন্ত ডাক্তার দেখাতেই চলে যায় বহু রোগীর। তারপর ওষুধ সংগ্রহ, না পাওয়া গেলে বাইরে থেকে কিনে ঘরে ফেরা। বহু রোগীকে কোনও পরীক্ষা করার দিন নির্ধারিত হয় কয়েক মাস পরে। গুরুতর অসুস্থ রোগীর ক্ষেত্রে বাইরে থেকেই তা করাতে হয়। এত হয়রানিতে ডাক্তার দেখাতে না পেরে অনেকেই বাইরে বেসরকারি হাসপাতাল বা নার্সিংহোমে যেতে বাধ্য হন। এই পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ এবং হাসপাতালে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়োগ বাড়িয়ে পরিকাঠামো উন্নত করে সাধারণ মানুষকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিতে পারত সরকার। তার থেকেও হাত গুটিয়ে নিয়ে কিছু বেসরকারি কোম্পানির হাতে হাসপাতালের ভাল-মন্দের ভার তুলে দিচ্ছে সরকার। ঠিকাকর্মী নিয়োগ থেকে শুরু করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা– সব কিছুই চলে যায় তাদের নিয়ন্ত্রণে। সব কিছুই নির্ধারিত হয় লাভ-ক্ষতির নিরিখে। এতে রোগী নিরাপত্তাও বিপন্ন হয়। সম্প্রতি মেদিনীপুর ও এসএসকেএম হাসপাতালে বেসরকারি কোম্পানির কর্মীদের হাতে মহিলা রোগী নিগৃহীত হয়েছেন।

অন্য দিকে সরকারি স্বাস্থ্যক্ষেত্রের বেহাল দশার সুযোগ নিয়ে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে কর্পোরেট মালিকদের একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম হয়েছে। তারা মুনাফা সর্বোচ্চ করতে অতিরিক্ত ফি ধার্য করে ও রোগী পরিষেবাকে গৌণ করে। আবার কর্পোরেট ওষুধ কোম্পানিগুলি জীবনদায়ী সহ সমস্ত ওষুধের দাম বাড়িয়ে চলেছে। অথচ ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা কেন্দ্রীয় সরকারের কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। তার উপর রয়েছে রোগ নির্ণয়ের জন্য নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার বহর। ফলে চিকিৎসা করতে গিয়ে মানুষ কার্যত সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ছে। বিনা চিকিৎসায় রোগীমৃত্যু ঘটছে।

‘আর্নেস্ট অ্যান্ড ইয়ং’ এবং ‘ফিকি’ দুটি বেসরকারি সংস্থার ২০২৪-এর রিপোর্ট বলছে, দেশ জুড়ে স্বাস্থ্য পরিষেবা মসৃণ রাখতে ৫০ লক্ষের বেশি প্রশিক্ষিত চিকিৎসক এবং ১ কোটি ৫০ লাখের মতো বেশি নার্স নিয়োগ করা দরকার। হাসপাতালের বেড আরও ৩০ লক্ষের বেশি বাড়ানো প্রয়োজন। স্বাস্থে্যর মতো জরুরি পরিষেবায় সরকারের উচিত ছিল অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে পরিকাঠামো বৃদ্ধি করা, চিকিৎসা করাতে আসা অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো। তা না করে তারা স্বাস্থ্যক্ষেত্রে বেসরকারি মালিকদের একচেটিয়া ভাবে ব্যবসা করার দরজা পুরোপুরি খুলে দিচ্ছে।

কেন্দে্রর বিজেপি সরকার ‘প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা’ প্রকল্প চালু করেছে। রাজ্যে রাজ্যে সরকারগুলি নানা নামে এই ধরনের প্রকল্প চালু করছে। রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের ‘স্বাস্থ্যসাথী’-ও এ ধরনের প্রকল্প। সাধারণ মানুষ আশা করেছিল, চিকিৎসা পেতে হয়ত কিছুটা সুবিধা করে দেবে এই প্রকল্পগুলি। যদিও কোন হাসপাতালে কোন কোন রোগের চিকিৎসায় তা কাজে লাগবে, সেটা নির্দিষ্ট। ফলে বহু ক্ষেত্রে এই প্রকল্পগুলির সুফল মানুষ পাচ্ছেন না। আবার কিছু সময় সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা প্রশাসনিক জটিলতা কাজ করে। কার্যত সরকারের এই প্রচেষ্টা অনেকটা দগদগে ক্ষতের নিরাময় না করে তাতে একটু হাত বুলিয়ে উপশমের চেষ্টা! তারা যদি সর্বসাধারণের চিকিৎসার কথা ভাবত, তা হলে একে এত ব্যয়বহুল করত না।

নীতি আয়োগের মতে (২০২১ সালে), বর্তমানে ভারতীয় অর্থনীতিতে রাজস্ব বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে অন্যতম বৃহৎ অংশীদার স্বাস্থ্যব্যবসায়ীরা। বেসরকারি চিকিৎসার বিপুল ব্যয় দেশের ১৪০ কোটি মানুষের ক’জন বহন করতে পারে? সেটা কর্পোরেট মালিকদের ভাবার কথা নয়, কিন্তু দারিদ্রের কারণে বিশ্বের ক্ষুধা-তালিকায় বিপজ্জনক স্থানে থাকা ভারতের জনপ্রতিনিধিরা তা ভাববেন না কেন?

বৃহৎ ব্যবসায়ীদের পাখির চোখ স্বাস্থ্যক্ষেত্রে ব্যবসা বাড়িয়ে আরও বেশি মুনাফা অর্জন করা। তাদের উদ্দেশ্য স্পষ্ট। কিন্তু দেশে এবং রাজ্যে রাজ্যে জনস্বার্থের কথা বলে গদিতে বসা সরকারগুলি জনস্বাস্থে্যর তোয়াক্কা না করে স্বাস্থ্যব্যবসায়ীদের স্বার্থে সর্বস্ব-পণ করে কাজ করছে কেন? কারণ, কর্পোরেট স্বাস্থ্যব্যবসায়ীদের সাথে সরকারি নেতা-মন্ত্রীদের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। কর্পোরেট স্বাস্থ্যব্যবসায়ী ও ওষুধ কোম্পানিগুলি বিপুল টাকা ঢালে শাসক দলগুলির পিছনে, তাদের ভোটে জেতানোর জন্য। বিনিময়ে স্বাস্থ্যব্যবসায়ীদের মুনাফা নিশ্চিত করে সরকার। তাতে ভেজাল ওষুধে শিশুরা মারা গেল কি না, কত জন গরিব প্রান্তিক মানুষ চড়া দামের জন্য জীবনদায়ী ওষুধ কিনতে পারল না, তা নিয়ে তাদের কোনও মাথাব্যথা নেই। ভেজাল ওষুধের কারবারি জানা সত্তে্বও বহু কর্পোরেট কোম্পানির ওষুধ বাজেয়াপ্ত তো হয়ই না, উল্টে চড়া দামে রমরমিয়ে সেগুলির বিক্রি চলছে বাজারে।

সরকারি পরিষেবা উপযুক্ত নয়, বহুমূল্যের বেসরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থার নিয়মেই স্বাস্থ্যব্যবসায়ীরা চিকিৎসা বিজ্ঞানের নৈতিকতার বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না কর়ে মুনাফার হাতিয়ারে পরিণত করেছে রোগীদের। জনস্বাস্থ্য থেকে সরকারের প্রায় হাত উঠিয়ে নেওয়া এই চক্রকেই শক্তিশালী করছে।