
সুন্দরবনকে যারা শুধু মানচিত্রে দেখেন, তাদের কাছে এটি হয়ত একটি পর্যটন কেন্দ্র, নদী, বন, বাঘ আর প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের এক বিস্ময়ভূমি। কিন্তু সুন্দরবনের মানুষের কাছে, সুন্দরবন কোনও পর্যটন-পণ্য নয়। এটি তাদের ভিটেমাটি, রুজি-রোজগার, স্মৃতি, স্বপ্ন এবং বেঁচে থাকার আশ্রয়।
সুন্দরবনের যে মানুষটি গত আমফান ঝড়ে নিজের ঘর হারিয়েছেন, যে কৃষক নোনা জলে জমি হারিয়ে আজও ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, যে জেলে প্রতিদিন নদীতে নামেন মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে, যে মৌয়াল বাঘের ভয় মাথায় নিয়ে জঙ্গলে প্রবেশ করেন, যে যুবক কাজের অভাবে কেরালা, গুজরাট বা দিল্লির নির্মাণক্ষেত্রে শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন সুন্দরবনের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়া উচিত তাদের জীবন থেকে, কোনও বিলাসবহুল পর্যটন প্রকল্পের নকশা থেকে নয়। রাজ্য বাজেটে এদের নিয়ে কিছু বলা আছে কি?
২২ জুন ঘোষিত রাজ্য বাজেটে সুন্দরবনের জন্য যে ‘টুরিজম মাস্টার প্ল্যান’-এর ঘোষণা করা হয়েছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইকো-রিসর্ট, ভাসমান গ্ল্যাম্পিং, বিশেষ পর্যটন জেটি, বৈদ্যুতিক জলযান এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে পর্যটন শিল্পের সম্প্রসারণ। সরকার বলছে, এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান হবে, উন্নয়ন হবে, অর্থনীতি চাঙ্গা হবে। কিন্তু সুন্দরবনের মানুষের মনে প্রশ্ন, এই উন্নয়ন কার জন্য? সুন্দরবনের মানুষের জন্য, নাকি সুন্দরবনের নদী-জঙ্গল-প্রকৃতিকে ঘিরে একচেটিয়া মালিকদের নতুন মুনাফার ক্ষেত্র তৈরির জন্য?
পর্যটকের অভাব সুন্দরবনের মূল সমস্যা নয়। সবচেয়ে বড় সংকট হল ভাঙা বাঁধ, নদীভাঙন, লবণাক্ততার আগ্রাসন, কৃষির সংকট, মৎস্যজীবীদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, মৌয়ালদের নিরাপত্তাহীনতা, কর্মসংস্থানের অভাব এবং ক্রমবর্ধমান পরিযান, এখান থেকে যুবকদের বহির্গমন।
সুন্দরবনের ভারতীয় অংশে প্রায় ৩,৫০০ কিলোমিটার উপকূলীয় বাঁধ রয়েছে। অথচ বাজেটে ঘোষণা হয়েছে প্রায় ১,০০০ কোটি টাকা ব্যয়ে মাত্র ৬০ কিলোমিটার বাঁধ সংস্কারের। অঙ্কের হিসাব বলছে, এই গতিতে সমস্ত বাঁধ সংস্কার করতে সময় লাগবে প্রায় ৫৮ বছর। কিন্তু সমুদ্র কি ৫৮ বছর অপেক্ষা করবে? নদী কি অপেক্ষা করবে? ঘূর্ণিঝড় কি অপেক্ষা করবে? আমফান অপেক্ষা করেনি। ইয়াস অপেক্ষা করেনি।
প্রতিবার বাঁধ ভাঙে, প্রতিবার হাজার হাজার পরিবার নতুন করে নিঃস্ব হয়। নোনা জল ঢুকে পড়ে কৃষিজমিতে। পুকুরের মিঠা জল নষ্ট হয়ে যায়। ভেঙে যায় ঘর, অর্থনৈতিক বিপর্যয় নেমে আসে, ভেঙে যায় ভবিষ্যতের স্বপ্ন। তারপর কিছু ত্রাণ, কিছু প্রতিশ্রুতি, কিছু অস্থায়ী মেরামত এবং তা নিয়ে দুর্নীতি– এ ভাবেই কেটে যায় আর একটি বছর।
এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে, সুন্দরবনের মানুষের সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন কি ভাসমান গ্ল্যাম্পিং, নাকি নিরাপদ বাঁধ? পর্যটন জেটি, নাকি নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পুনর্বাসন? বিলাসবহুল জলযান, নাকি যুবকদের জন্য স্থায়ী কর্মসংস্থান? সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল বাজেটের সেই বহুল উচ্চারিত শব্দবন্ধ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব(পিপিপি মডেল)। অভিজ্ঞতা বলছে, এই মডেলে বহু ক্ষেত্রেই জনগণের সম্পদ ধীরে ধীরে বড় পুঁজির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
সুন্দরবনের মানুষ এখনও ভুলে যাননি ২০০২ সালে সিপিএম সরকারের সেই অধ্যায়, যখন ইকো-ট্যুরিজমের নামে সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ অঞ্চল সাহারা গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। প্রবল গণআন্দোলনের চাপে সেই পরিকল্পনা পিছিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিল সরকার। আজও প্রশ্ন উঠছে, নতুন নামে, নতুন মোড়কে কি আবারও সুন্দরবনকে বড় পুঁজির লুটের ক্ষেত্র তৈরির পথ করা হচ্ছে?
উদ্বেগ শুধু অর্থনীতির নয় সমাজ ও সংস্কৃতিরও
ইতিমধ্যেই সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় পর্যটন শিল্পের প্রসারের ফলে প্লাস্টিক দূষণ, নদী ও খাঁড়িতে বর্জ্য ফেলা, শব্দদূষণ এবং পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা নিয়ে অভিযোগ বাড়ছে। যে অঞ্চল জলবায়ু বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে বিশ্বের অন্যতম প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ, সেই অঞ্চলের পরিবেশকেই আরও বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য খুলে দেওয়া হচ্ছে।
নিয়ন্ত্রণহীন ও মুনাফাকেন্দ্রিক পর্যটন ব্যবস্থার সঙ্গে প্রায়শই প্রবেশ করে এক আক্রমণাত্মক ভোগবাদী সংস্কৃতি। অর্থের ঝলকানি, দ্রুত মুনাফার লোভ, বাজারের আগ্রাসন এবং অসুস্থ বিনোদনের সংস্কৃতি ধীরে ধীরে গ্রামীণ সমাজের ভিতকে দুর্বল করে। বিশ্বের বহু পর্যটন অঞ্চলের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, কর্পোরেট পর্যটনের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে মাদক, অপরাধচক্র, নারীশোষণ, দেহব্যবসা এবং সামাজিক অবক্ষয়ের প্রবণতাও বৃদ্ধি পায়।
সুন্দরবনের মানুষ তাই আশঙ্কা করছেন যে পর্যটন শিল্প ইতিমধ্যেই সীমিত পরিসরে পরিবেশ ও সামাজিক জীবনে কিছু নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, তা যদি বহুগুণ বিস্তৃত হয়, তবে আগামী দিনে তার মূল্য চোকাতে হবে স্থানীয় সমাজকেই। দারিদ্র ও বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে স্থানীয় যুবসমাজকে ভোগবাদী সংস্কৃতির দিকে ঠেলে দেওয়া হতে পারে। বহু গরিব পরিবারের নারী ও কিশোরীরা বিভিন্ন ধরনের শোষণ, প্রলোভন ও বিপজ্জনক কর্মপরিবেশের মুখোমুখি হতে পারেন। অর্থনৈতিক উন্নয়নের নামে যদি সামাজিক মর্যাদা, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য এবং মানবিক মূল্যবোধ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, তবে সেই উন্নয়নকে কি সত্যিই উন্নয়ন বলা যায়?
ইকোট্যুরিজমের অর্থনৈতিক সুফল কি এলাকার মানুষের জীবনে বর্তাবে?
নাকি তারা কোনও রিসর্টের নিরাপত্তারক্ষী, নৌচালক বা নামমাত্র বেতনের অস্থায়ী কর্মচারীতে পরিণত হবেন? সুন্দরবনের কৃষক, জেলে ও মৌয়ালরা কি উন্নয়নের মালিক হবেন, নাকি নিজেদের মাটিতে সব লুট হওয়ার কেবল দর্শকে পরিণত হবেন?
সুন্দরবনের উন্নয়নের ভিত্তি হওয়া উচিত মানুষের অধিকার, মানুষের মালিকানা এবং মানুষের অংশগ্রহণ। পর্যটন যদি গড়ে তুলতেই হয়, তবে তা স্থানীয় সমবায়, গ্রামীণ মানুষের নেতৃত্বে গড়ে উঠতে হবে। বড় কর্পোরেট রিসর্টের পরিবর্তে স্থানীয় হোম-স্টে, স্থানীয় নৌপরিষেবা, স্থানীয় গাইড এবং স্থানীয় উৎপাদনের বাজার গড়ে তুলতে হবে।
একই সঙ্গে নদীবাঁধের স্থায়ী সংস্কার, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন, মৎস্যজীবী ও মৌয়ালদের জীবিকা সুরক্ষা, মধু-মাছ-কাঁকড়া প্রক্রিয়াকরণ শিল্প, কৃষির পুনরুজ্জীবন এবং পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য শ্রমনিবিড় শিল্প স্থাপনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
সুন্দরবনের মানুষ উন্নয়নের বিরোধী নন। তাঁরা শুধু এমন উন্নয়নের বিরোধী, যেখানে নদী তাদের, বন তাদের, শ্রম তাদের, ঝুঁকি তাদের, কিন্তু মুনাফা পুঁজিপতির।
ঝড়ের রাতে যখন বাঁধ ভেঙে যায়, তখন কোনও কর্পোরেট সংস্থা মানুষের পাশে এসে দাঁড়ায় না। দাঁড়ায় প্রতিবেশী। দাঁড়ায় কৃষক, জেলে, খেতমজুর। তারাই কাঁধে বালির বস্তা তুলে বাঁধ বাঁচায়, তারাই ভাঙা ঘর গড়ে, তারাই আবার নতুন করে জীবন শুরু করে।
তাই সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকারও সর্বাগ্রে তাদেরই। উন্নয়নের নামে যদি সুন্দরবনের নদী, বন, জমি, সংস্কৃতি এবং মানুষের জীবিকার উপর কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়, তবে তা উন্নয়ন নয়, তা হবে সুন্দরবনের মানুষের ভবিষ্যৎ বন্ধক রাখার আয়োজন।
সুন্দরবনকে বাঁচাতে হলে শুধু তার বাঘকে নয়, শুধু তার বনকে নয়, শুধু তার পর্যটন শিল্পকেও নয়, সবার আগে বাঁচাতে হবে সুন্দরবনের মানুষকে।
সুন্দরবনের প্রকৃত রক্ষক সেই শ্রমজীবী মানুষ, যাদের ঘাম মিশে আছে এই মাটিতে, যাদের কান্না মিশে আছে এই নদীতে, যাদের স্বপ্ন মিশে আছে এই অরণ্যে। তাদের বাঁচানোই সুন্দরবনকে বাঁচানোর প্রথম এবং প্রধান শর্ত।