
‘‘ভারতবর্ষে দিন যত এগোচ্ছে, ভারতীয় বুর্জোয়া সমাজের স্থায়িত্ব যত বাড়ছে, বুর্জোয়া সমাজের প্রতিক্রিয়ার দিক যত প্রকট হচ্ছে, ততই বুর্জোয়া ব্যক্তিবাদের প্রভাব সমাজের মধ্যে সুবিধাবাদের আকারে দেখা দিচ্ছে বেশি। রাশিয়ার বিপ্লব বা চিনের বিপ্লব ঠিক আজকের মতো করে এই সমস্যার সম্মুখীন হয়নি, ফলে তারা তা অনুভব করেনি।…আর, এখানে ভারতবর্ষে বুর্জোয়া শাসন দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। এ যদি না হত, আমরা যদি ১৯৩০ সালের মধ্যে, ‘৪৭ সালের মধ্যে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পর্ব শেষ করে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সফল করে ফেলতে পারতাম, তা হলে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি বুর্জোয়া সমাজ পরিবেশের মধ্যে প্রকট বুর্জোয়া ব্যক্তিবাদের ব্যাপারটাকে পার্টি গঠন করার সময় এত গুরুত্ব দিয়ে লক্ষ রাখবার প্রয়োজন হত না। কিন্তু আমাদের এই বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে লক্ষ রাখার প্রয়োজন হয়েছে। কারণ, ভারতবর্ষে বুর্জোয়া শাসনব্যবস্থা স্বল্পকালের জন্য হয়নি, স্বল্পমেয়াদি হয়নি। এই অবস্থায় আমরা ভুলতে পারি না যে, এই বুর্জোয়া ব্যক্তিবাদের ব্যাপারটা লক্ষ রেখে না এগোলে, আমাদের সমস্ত প্রচেষ্টাই শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হবে। যত কষ্টকর হোক, এ জিনিস লক্ষ রেখে আমাদের এগোতে হবে, একে ঠিক জায়গায় ধরিয়ে দিতে হবে। পার্টির মধ্যে তর্কবিতর্ক, সমালোচনা-আত্মসমালোচনা, আভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র সমস্ত কিছুকে বুর্জোয়া ব্যক্তিবাদের প্রভাব থেকে রক্ষা করতে হবে। এ সব ক্ষেত্রে ব্যক্তিবাদ কী ভাবে কোথায় কী রূপে মাথা তোলে, কী ভাবে তার দ্বারা ব্যক্তি কলুষিত হয়, দলের সর্বহারা গণতন্ত্রের পরিবেশ নষ্ট হয়, তা ধরিয়ে দিতে হবে। দেখিয়ে দিতে হবে যে, ব্যক্তিবাদ সর্বহারা গণতন্ত্রকে সুবিধায় পর্যবসিত করে।
সর্বহারা গণতন্ত্র আলাদা করে কোনও ব্যক্তির সুবিধা পাওয়ার জন্য বা কোনও ব্যক্তিকে সুবিধা দেওয়ার জন্য নয়– তা সমস্ত ব্যক্তিকে নিঃস্বার্থভাবে সমাজের সামগ্রিক স্বার্থে কাজ করতে শেখাবার জন্য। সমস্ত শ্রমিক শ্রেণির সামগ্রিক আন্দোলনের স্বার্থে ব্যক্তিসত্তার প্রভাব ও আক্রমণ থেকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে মুক্ত ও রক্ষা করার জন্যই সর্বহারা গণতন্ত্র। এ ভাবে না বুঝলে আজকের দিনের বিপ্লবী আন্দোলনের চলবে না।’’
(বৈজ্ঞানিক দ্বন্দ্বমূলক বিচারপদ্ধতিই মার্ক্সবাদী বিজ্ঞান)