
প্রতি বছর বর্ষাকাল এলেই সবং, পিংলা, নারায়ণগড়, ভগবানপুর, পটাশপুর সহ দুই মেদিনীপুরের সাতটি ব্লকের লক্ষ লক্ষ মানুষ কমবেশি বন্যা বিধ্বস্ত হয়। কেলেঘাই হয়ে ওঠে দুঃখের নদী। এ বছরও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। সম্প্রতি মাত্র দিন কয়েকের ভারী বৃষ্টি, আর তাতেই কেলেঘাই ও তার শাখা নদী কপালেশ্বরী-বাগুই ভয়ঙ্কর ভাবে ফুলে-ফেঁপে উঠল। এদের শাখা খালগুলির পাড় উপচে পড়া জলে সমস্ত ব্লকের বহু মৌজা জলমগ্ন হল। অতিবৃষ্টিতে শুধু সবং ব্লকেই প্রায় ৩০ হাজার মানুষ বন্যাকবলিত ও ৩১ হাজার একরের বেশি জমির আমন চাষ নষ্ট হয়েছে। বাকি অন্যান্য ব্লকগুলোতেও ক্ষতির পরিমাণ কম নয়। বন্যার জল ঢুকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বহু ঘরবাড়ি। প্রতি বছরের মতো এ বছরের বন্যাতেও ভাগচাষি-দিনমজুর-খেতমজুর সহ কর্মহীন হাজার হাজার মানুষের পরিবারে নেমে এসেছে চূড়ান্ত আর্থিক সংকট। বহু পরিবারকে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাতে হচ্ছে।
কিন্তু বর্তমান আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নের যুগে এই বন্যা প্রতিরোধ করা কি সত্যিই অসম্ভব?
স্বাধীনতার ৭৯ বছর কেটে গেল। অথচ কেন্দ্র-রাজ্য কোনও সরকারই খরা-বন্যা নিয়ন্ত্রণে আজ পর্যন্ত উপযুক্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করেনি। বরং, যে দল যখনই ক্ষমতায় বসেছে, রাজনৈতিক প্রয়োজনে তারা বন্যাকে ব্যবহার করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় মানুষকে নিয়ে ত্রাণের নামে তারা ভোটের রাজনীতি করেছে। ত্রাণ নিয়ে চলেছে দলবাজিও। সরকারগুলির এ হেন উদাসীনতার বিরুদ্ধে কেলেঘাই-কপালেশ্বরী-বাগুই নদীর স্থায়ী বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও এদের শাখা খালগুলির জলনিকাশির দাবিতে বানভাসি মানুষদের নিয়ে ১৯৮৬ সালে গড়ে উঠেছিল গণসংগ্রাম কমিটি। দাবি ছিল, মাটির ঢাল অনুসারে কেলেঘাই নদীর প্রবাহকে দক্ষিণমুখী করা। কারণ অনেকবারই বন্যার সময় অতিরিক্ত জলের চাপে আমগেছিয়ায় বাঁধ ভেঙে জলের স্রোতের প্রবণতা দক্ষিণমুখী হতে দেখা গিয়েছে। ভূ-বিজ্ঞানী ও নদী বিশেষজ্ঞদের দিয়ে সমীক্ষা করে তৈরি করা ম্যাপ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও আধিকারিকদের হাতে একাধিকবার তুলে দেওয়া হয়েছে।
টানা ২২ বছর ধরে লাগাতার আন্দোলনের চাপে গত ২০১১-১২ আর্থিক বছরে নদী সংস্কারের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার ৬৫০ কোটি ৩৮ লক্ষ টাকা ব্যয় বরাদ্দ করতে বাধ্য হয়েছিল। সরকারি ভাবে ঘোষণা করা হয়েছিল পর্যায়ক্রমে ৩টি ধাপে ২০১৪ সালের মধ্যে নদী সংস্কারের পূর্ণাঙ্গ কাজ শেষ করা হবে। কিন্তু দেখা গেল, ২০১২ সালে নদী খননের কাজ প্রাথমিক পর্যায়ে খানিকটা হলেও প্রকল্পটির পূর্ণাঙ্গ কাজ ১৪ বছর পর আজও শেষ হয়নি। মোট ১৪১ কিলোমিটারের মধ্যে সংস্কার হয়েছিল মাত্র ৫২ কিলোমিটার। তাও ছিল দুর্নীতিতে ভরা দায়সারা কাজ। কিন্তু এই সামান্য সংস্কারেই নিকাশি ব্যবস্থার কিছুটা উন্নতি হওয়ায় গত ২০২০ সাল পর্যন্ত অতিবৃষ্টিতে তেমন ভয়াবহ বন্যা হয়নি। এমনিতেই সমতল ভূমির উপর দিয়ে নদী খুবই আঁকা বাঁকা পথে প্রবাহিত। তার উপর অস্বাভাবিকভাবে উত্তরমুখী হওয়ায় নদীর গতি খুবই ধীর। বছরের পর বছর ধরে মোহনায় পলি জমার ফলে নদীর নাব্যতা খুবই কমে গেছে। এর সাথে নানা সময়ে শাসক দলের মদতে নদীখাত দখল করে বা বাঁধ কেটে ভেড়ি, ইটভাটা চলছে। বর্তমান শাসক দলেরও এই সব বেআইনি কাজ বন্ধের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। আর এ কারণেই ২০২১ সাল থেকে আবার আগের ভয়ঙ্কর রূপ নিয়ে ফিরে এসেছে বন্যা।
বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য গণসংগ্রাম কমিটির পক্ষ থেকে বার বার সরকারকে জানানো হয়েছে নদীর গতিপথ দক্ষিণমুখী করতে হবে যেমন আগে ছিল এবং শাখা খালগুলিকে নিয়মিত সংস্কার করতে হবে। কমিটি গত ৪ আগস্ট একগুচ্ছ দাবি জানিয়ে সেচদপ্তরে ডেপুটেশন দিয়েছে।
কেন্দ্র-রাজ্যের ক্ষমতায় সরকার পরিবর্তন বারে বারে ঘটেছে। কিন্তু বানভাসি মানুষদের জীবনে কোনও পরিবর্তন আসেনি। অসহায় অবস্থায় সামান্য দান খয়রাতির মাধ্যমে এদের নিয়ে চলছে ভোটসর্বস্ব নোংরা রাজনীতি। বর্তমানে কেন্দ্র ও রাজ্যে একই সরকার। কিন্তু বন্যা নিয়ন্ত্রণে দ্রুত উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করার ক্ষেত্রে দুই সরকারের যৌথ তৎপরতা কোথায়?