
বিশ্ব সর্বহারা শ্রেণির মহান শিক্ষক ও নেতা, বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ও রাষ্ট্রের রূপকার কমরেড ভি আই লেনিনের ১০২তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে গত ২১ জানুয়ারি উত্তর কলকাতার বীরেন্দ্র মঞ্চে একটি সভার আয়োজন করেছিল এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট)-এর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি। সভাপতিত্ব করেন দলের রাজ্য কমিটির সদস্য কমরেড ধ্রুবজ্যোতি মুখোপাধ্যায়। বক্তব্য রাখেন সাধারণ সম্পাদক কমরেড প্রভাস ঘোষ। সে দিনের আলোচনাটি দু’টি ভাগে আমরা প্রকাশ করছি। প্রকাশের আগে কমরেড প্রভাস ঘোষ সেটি সম্পাদনা ও পরিমার্জনা করে দিয়েছেন। অনলাইন সংস্করণে দুটি অংশ একত্রে প্রকাশ হল।
মহান লেনিনের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন এবং তাঁর অমূল্য বৈপ্লবিক শিক্ষাগুলি স্মরণের জন্য আজ আমরা এখানে সমবেত হয়েছি।

মহান লেনিন সম্পর্কে বিশ্ব সাম্যবাদী আন্দোলনের মহান নেতা স্ট্যালিন, মাও সে তুং এবং শিবদাস ঘোষের ছাত্র হিসেবে যতটুকু বুঝেছি, তার ভিত্তিতে আমি কিছু কথা বলব। মহান লেনিনকে বুঝতে হলে তাঁর একটি ঐতিহাসিক উক্তির মর্মার্থ বোঝা দরকার, যা আমি নিজের ভাষায় বলছি। তিনি বলেছিলেন, যুগে যুগে যাঁরা মানবজাতির মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছেন, শোষক শ্রেণি তাঁদের ওপর অত্যাচার নিপীড়ন করেছে, কাউকে খুন করেছে, তাঁদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করেছে, বক্তব্য বিকৃত করেছে। কিন্তু ওই মহান বিপ্লবীদের মৃত্যুর পর যখন জনগণ তাঁদেরই বক্তব্যের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছে, তখন সেই শোষক শ্রেণিই আবার তাঁদের প্রশংসা, স্তব-স্তুতি করেছে, যাতে শোষিত জনগণ বিভ্রান্ত হয়, বিপথগামী হয়। লেনিন বলেছেন, মার্ক্সের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই ঘটেছে। মার্ক্সের জীবদ্দশায় শাসকরা তাঁকে দেশ থেকে দেশে বিতাড়িত করেছে, তাঁর সম্পর্কে অপপ্রচার করেছে। আবার মার্ক্সের মৃত্যুর পর মার্ক্সবাদের প্রভাব যখন উত্তরোত্তর বেড়েছে, তখন বুর্জোয়া চিন্তাবিদরা মার্ক্সের প্রশংসা শুরু করেছেন। একই সাথে তাঁরা মার্ক্সের চিন্তার অপব্যাখ্যা করছেন। মেকি মার্ক্সবাদীরাও মার্ক্সবাদকে বিকৃত করছে, মার্ক্সবাদের বিপ্লবী প্রাণসত্তাকে বিনষ্ট করার চেষ্টা করছে। লেনিন বললেন, মার্ক্সবাদের এই বিপ্লবী প্রাণসত্তাকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। লেনিন শুধু এই মহান ব্রতই সফল করেননি, তিনি মার্ক্সবাদকে যুগোপযোগী ও বেশ কিছু নতুন তত্ত্বগত অবদানের দ্বারা আরও সমৃদ্ধ এবং উন্নত করেছেন। যে জন্য তাঁর সুযোগ্য উত্তরসাধক মহান স্ট্যালিন যথার্থই বলেছেন, ‘সাম্রাজ্যবাদ ও সর্বহারা বিপ্লবের যুগে লেনিনবাদই মার্ক্সবাদ’। তিনি বলেছেন, ‘আরও সুনির্দিষ্ট ভাবে বলতে গেলে, লেনিনবাদ হল সাধারণ ভাবে সর্বহারা বিপ্লবের তত্ত্ব ও রণকৌশল, বিশেষ ভাবে সর্বহারা একনায়কত্বের তত্ত্ব ও রণকৌশল’। এই মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদকে হাতিয়ার করেই রাশিয়া, চিন, পূর্ব ইউরোপে শোষণমুক্ত সমাজ কায়েম হয়েছিল, বিশ্বব্যাপী শক্তিশালী সাম্যবাদী আন্দোলন গড়ে উঠেছিল।
মার্ক্সবাদকে বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করেছেন লেনিন
আজকের আলোচনায় আমি লেনিনের জীবনের ঘটনা বিশেষ উল্লেখ করছি না। তাঁর তত্ত্বগত অবদানের কিছু দিক আমি আলোচনা করব। হেগেলের দ্বন্দ্বমূলক ভাববাদ, কান্টের অজ্ঞেয়বাদ এবং ফুয়েরবাখের মানবতাবাদকে ফাইট করে দর্শনগত ক্ষেত্রে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ কী, তা মার্ক্সই প্রথম মানবজাতির সামনে উপস্থিত করেন। সেন্ট সাইমন ও চার্লস ফুরিয়েরের কাল্পনিক সমাজতন্ত্র যে ভ্রান্ত এবং দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রই যে সঠিক তা তিনি দেখান। অ্যাডাম স্মিথ, ডেভিড রিকার্ডোর ক্ল্যাসিকাল পলিটিক্যাল ইকনমির সীমাবদ্ধতার দিকগুলি দেখিয়ে তিনি প্রমাণ করেন যে, একমাত্র শ্রমিককে তার ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করেই পুঁজিপতিরা মুনাফা অর্জন করে। শ্রমিক তার শ্রম দিয়ে পণ্য উৎপাদন করতে গিয়ে যে বাড়তি মূল্য সৃষ্টি করে, তার সামান্য একটা অংশ সে মজুরি হিসাবে পায়, বাকিটা মুনাফা হিসাবে পুঁজিপতিরা আত্মসাৎ করে। এই ভাবে তিনি ও তাঁর সহযোগী এঙ্গেলস পুঁজিবাদের নির্মম শোষণের চরিত্র উদঘাটিত করেছেন। এর ফলে পুঁজিবাদ যে অনিবার্য ভাবে চরম সঙ্কটের সম্মুখীন হবে, এটাও বলেছেন এবং এই শ্রমিক শ্রেণিই যে পুঁজিবাদকে উচ্ছেদ করে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করবে, এই ভবিষ্যদবাণী করেছেন। তাঁরা মানবসমাজের পরিবর্তনের নিয়ম আবিষ্কার করেছেন। যার ভিত্তিতে মার্ক্সবাদ মানবজাতির ইতিহাসে প্রথম শোষিত জনগণের সামনে শোষণমুক্ত ও শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের হাতিয়ার হিসাবে উপস্থিত হয়।
মার্ক্সের মৃত্যুর পর এঙ্গেলসের উপস্থিতিতে যে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক গড়ে ওঠে, তা ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। কিন্তু একটা সময় লেনিন দেখলেন, এই দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক মার্ক্সবাদকে বিকৃত করছে। সারা জীবন লেনিন যে লড়াই করেছেন, তার অন্যতম প্রধান হল এই বিকৃতির বিরুদ্ধে তীব্র সংগ্রাম পরিচালনা করা, মার্ক্সবাদের সঠিক উপলব্ধি কী, সেটা বিশ্বের সামনে উপস্থিত করা। লেনিন এই অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজটি না করলে রুশ বিপ্লব হত না। সোভিয়েত সমাজতন্ত্র হত না। পুঁজিবাদের বিকল্প হিসাবে আমরা শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা পেতাম না। আর লেনিন এই কাজটি না করলে সম্ভবত তাঁর উত্তরসূরি হিসাবে স্ট্যালিন, মাও সে তুং, শিবদাস ঘোষ– এঁদেরও পাওয়া যেত না। এঁরা সকলেই মার্ক্সের ধারাবাহিকতায় লেনিনের শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়েই মার্ক্সবাদকে বুঝেছেন এবং সেই অনুযায়ী সর্বহারা শ্রেণির বিপ্লবী সংগ্রাম পরিচালনা করেছেন।
সংগঠন গড়ে তোলার উদ্যোগ
আমাদের দেশে ক্ষুদিরাম যেমন এক অত্যাচারী ব্রিটিশ শাসককে হত্যা করতে গিয়ে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন, তেমনই লেনিনের বড় ভাইয়ের লক্ষ্য ছিল অত্যাচারী শাসক জারকে হত্যা করা। তাঁদের নারদনিক নামে একটা গোষ্ঠী ছিল, যেমন আমাদের দেশেও স্বাধীনতা সংগ্রামীদের এই ধরনের বিপ্লবী গোষ্ঠী ছিল। এই গোষ্ঠীর ভাবনা অনুযায়ী লেনিনের বড় ভাই রাশিয়ার সম্রাট দ্বিতীয় জারকে হত্যা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনি ধরা পড়ে যান এবং তাঁর ফাঁসি হয়। লেনিনের তখন অল্প বয়স। এই ঘটনা তাঁর মনে গভীর রেখাপাত করে। তিনি এ কথা বুঝতে পারেন যে, এ পথে হবে না। তা হলে পথ কোথায়? সেই পথ খুঁজতে হবে। সেই পথ খুঁজতে গিয়ে খুব অল্প বয়সেই মার্ক্স-এঙ্গেলসের কিছু বইপত্র তিনি পান। মাত্র ১৭ বছর বয়সে যখন তিনি কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, জার-বিরোধী ছাত্র মিছিলে যোগ দেওয়ার অপরাধে গ্রেপ্তার হন। গ্রেপ্তার করার পর তাঁকে একটি গ্রামে অন্তরীণ করা হয়। সেখানে বেশ কিছু দিন তিনি ছিলেন। ওই অন্তরীণ অবস্থায় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মার্ক্স-এঙ্গেলসের যত বইপত্র তিনি জোগাড় করতে পেরেছিলেন, সেগুলি অত্যন্ত গভীর ভাবে অধ্যয়ন করেন। এই অধ্যায়ের পর লেনিন সামারা বলে আর একটা শহরে আসেন। সেখানে তাঁর উদ্যোগে প্রথম মার্ক্সবাদী পাঠচক্র গড়ে ওঠে। এ সময় রাশিয়ার বিভিন্ন শহরে ছোট ছোট মার্ক্সবাদী পাঠচক্র গড়ে উঠেছিল। লেনিন বুঝতে পারেন, বিচ্ছিন্ন বিচ্ছিন্ন পাঠচক্র দিয়ে কাজ হবে না, সবগুলিকে একত্রিত করতে হবে। তাঁর বয়স যখন ২৫ বছর, রাশিয়ার রাজধানী সেন্ট পিটার্সবুর্গে সেখানকার মার্ক্সবাদী পাঠচক্রগুলিকে একত্রিত করে ‘লিগ অফ স্ট্রাগল ফর দি এমানসিপেশন অফ দি ওয়ার্কিং ক্লাস’ অর্থাৎ শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির জন্য একটা সংগঠন গড়ে তোলেন। পরবর্তী কালে তিনি বলেন, এটা ছিল সর্বহারা দলের ভ্রূণ। বিপ্লবী আন্দোলনে তাঁর হাতেখড়ি এই ভাবেই শুরু হয়। অর্থাৎ এই ভাবেই তিনি প্রথম সংগঠন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। তার পর বিচ্ছিন্ন বিচ্ছিন্ন বিভিন্ন গ্রুপ, যারা মার্ক্সবাদ চর্চা করছে, তাদের মধ্যে প্রচারের জন্য তিনি দেশের বাইরে গিয়ে ‘ইস্ক্রা’ নামে একটা পত্রিকা বের করেন। কারণ দেশের ভিতরে জারের কঠোর শাসনে এটা সম্ভব ছিল না। গোপনে দেশে পাঠিয়ে এই পত্রিকার মাধ্যমে সকলের সঙ্গে যোগাযোগ করা, তাদের কাছে মার্ক্সবাদের বক্তব্য পৌঁছে দেওয়া, এই ছিল সেই সময়ে তাঁর সংগ্রাম। প্রথম জীবনে তাঁর নিজস্ব প্রচেষ্টায় এই সব উদ্যোগ গ্রহণ পরবর্তী কালে তাঁর অগ্রগতির সোপান হিসাবে কাজ করেছিল।
কৃষিতে পুঁজিবাদের চরিত্র চিনিয়েছেন লেনিন
‘নারদনিক’ গোষ্ঠীর বক্তব্য ছিল, রাশিয়ার মতো অনুন্নত দেশে যেখানে শ্রমিকের সংখ্যা কম, সেখানে কৃষকরাই জারের বিরুদ্ধে বিপ্লব করবে। এই সময়ে তাদের বিরুদ্ধে প্রবন্ধ লিখে লেনিন তত্ত্বগত সংগ্রাম করেন। এ ছাড়া ‘ইকোনমিস্ট’ নামে আর এক দল সেই সময় প্রচার করছিল, শ্রমিকরা রাজনৈতিক আন্দোলনে থাকবে না, তারা অর্থনৈতিক দাবিদাওয়া নিয়ে লড়বে, রাজনীতি করবে মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীরা। এদের বিরুদ্ধেও এই সময়ে লেনিনকে তত্ত্বগত লড়াই করতে হয়েছিল। সেন্ট পিটার্সবুর্গে তিনি যখন এ সব কার্যকলাপ চালাচ্ছেন, সেখানকার শ্রমিকদের ধর্মঘটকে রাজনৈতিক ভাবে গাইড করছেন, বুদ্ধি-পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করছেন– সেই সময়ে আবার তিনি গ্রেপ্তার হন। এই সময় দীর্ঘদিন তিনি জেলে ছিলেন। তারপর লেনিনকে সাইবেরিয়ায় নির্বাসনে পাঠানো হয়। তিন বছর তিনি সেখানে ছিলেন। তিনি যখন গ্রামে অন্তরীণ ছিলেন, তখন কৃষকদের জীবনযাত্রা, দারিদ্র প্রত্যক্ষ করেছিলেন, তাদের সাথে ঘনিষ্ঠ ভাবে মিশতেন, রাজনৈতিক আলোচনা করতেন। একই ভাবে সেন্ট পিটার্সবার্গে শ্রমিকদের সাথে মিশতেন, তাদের সমস্যা ও চিন্তাভাবনা বুঝতেন, তাদের মধ্যে বিপ্লবী মতবাদ প্রচার করতেন। সাইবেরিয়ায় থাকাকালীন মার্ক্সবাদে তাঁর একটা মৌলিক অবদান ‘ডেভেলপমেন্ট অব ক্যাপিটালিজম ইন রাশিয়া’, শুধু শিল্পে নয়, রাশিয়ার গ্রামাঞ্চলে কৃষিতেও কী ভাবে পুঁজিবাদ বিকাশ লাভ করছে, এ নিয়ে এই বিখ্যাত বইটি তিনি রচনা করেন। এই রচনা বিশ্ব সাম্যবাদী আন্দোলনের ক্ষেত্রেও একটি অমূল্য সম্পদ। এতে লেনিন দেখান, কৃষিতে যে পুঁজিবাদ প্রবেশ করেছে তা কোন কোন লক্ষণ দেখে বোঝা যাবে? তিনি দেখালেন, দেখতে হবে জমি বাজারের পণ্য হয়ে গেছে কি না। সামন্ততন্ত্রের জমি কেনাবেচা হত না। পুঁজিবাদ এসেছে মানেই জমি বাজারের পণ্যে পরিণত হয়েছে। দ্বিতীয়ত দেখালেন, আগে গ্রামে এক একটা এলাকায় উৎপাদিত সম্পদ মূলত এলাকার প্রয়োজনের জন্যই রাখা হত। এটাই ছিল স্বনির্ভর আঞ্চলিক অর্থনীতি। কিন্তু পরবর্তীকালে গ্রামে যে ফসল উৎপন্ন হচ্ছে, তা গোটা জাতীয় বাজারের পণ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে– অর্থাৎ তা কমোডিটি অব দ্য ন্যাশনাল মার্কেট হয়ে গেছে। এটাও পুঁজিবাদের চরিত্র। এ ছাড়া তিনি দেখালেন, একদল মানুষ মজুরির বিনিময়ে কৃষিতে কাজ করছে। অর্থাৎ তারা কৃষিশ্রমিক, সার্ফ বা ভূমিদাস নয়। এই যে কৃষিজমি বাজারের পণ্য, কৃষিজাত ফসলও জাতীয় বাজারের পণ্য এবং যারা শ্রম দিচ্ছে তাদের শ্রমশক্তিও পণ্য, তারা ভূমিদাস নয়। তারা শ্রম বিক্রি করে মজুরি পায়, অর্থাৎ তারা কৃষি-শ্রমিক– এগুলি হচ্ছে গ্রামে সামন্ততন্ত্র ভেঙে পুঁজিবাদ যে প্রবেশ করছে, তার সুস্পষ্ট লক্ষণ। লেনিনের আগে এ ভাবে কেউ দেখাননি। পরবর্তী কালে লেনিন এটাও দেখিয়েছিলেন যে, উন্নত পুঁজিবাদী দেশ জার্মানি, ফ্রান্স, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও কৃষিতে সামন্ততন্ত্রের অবশেষ রয়ে গেছে।
‘নারদনিক’, ‘ইকোনমিস্ট’-দের বিরুদ্ধে আদর্শগত সংগ্রাম, মার্ক্সবাদ প্রচারের জন্য ‘ইস্ক্রা’ প্রকাশনা এবং রাশিয়ার কৃষিতে পুঁজিবাদের বিকাশ সংক্রান্ত তত্ত্ব– এগুলিই প্রমাণ করে ওই বয়সেই তিনি মার্ক্সবাদী চিন্তাধারা কত গভীর ভাবে আয়ত্ত করেছিলেন।
পার্টি সদস্য হওয়ার মাপকাঠি
প্লেখানভ, যিনি প্রথম মার্ক্সবাদ সংক্রান্ত পুস্তক রুশ ভাষায় অনুবাদ করে রাশিয়াতে প্রচার করেন, যাঁকে লেনিন প্রথম দিকে শিক্ষক বলে গণ্য করতেন, সেই প্লেখানভের উদ্যোগে এই সময় রাশিয়ান সোসাল ডেমোক্রেটিক লেবার পার্টি গড়ে ওঠে এবং তার প্রথম কংগ্রেস হয়। এতে লেনিন যেতে পারেননি, তখন তিনি সাইবেরিয়ায় নির্বাসনে ছিলেন। পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেস হয় লন্ডনে, ১৯০৩ সালে। এই কংগ্রেসেই কারা পার্টির সদস্য হবে তা নিয়ে লেনিনের সাথে অন্যদের তীব্র মতপার্থক্য হয়়। এই বিরোধকে ভিত্তি করে রাশিয়ান সোসালিস্ট ডেমোক্রেটিক লেবার পার্টি (আরএসডিএলপি)-র মধ্যে বলশেভিক আর মেনশেভিক নামে দুটি গ্রুপ হয়ে যায়। লেনিন বললেন, তারাই সদস্য হবে, যারা পার্টির নীতি মানবে, চাঁদা দেবে, শৃঙ্খলা মানবে, পার্টির কোনও একটি সংগঠনে যুক্ত হয়ে দৈনন্দিন কাজ করবে। আর মেনশেভিকরা, যারা তাঁর বিরোধী, তাদের বক্তব্য ছিল, সদস্যরা পার্টির নীতি মানবে, চাঁদা দেবে, কিন্তু পার্টির কোনও একটি সংগঠনে যুক্ত হয়ে শৃঙ্খলা মেনে নিয়মিত কাজ করবে, এই শর্ত থাকার দরকার নেই। লেনিন বললেন, এ ভাবে কোনও শৃঙ্খলাবদ্ধ সর্বহারা শ্রেণির দল গড়ে উঠতে পারে না। এই প্রশ্নেই পার্টির মধ্যে বিভাজন হয়। বলশেভিক মানে সংখ্যাগরিষ্ঠ, মেনশেভিক মানে মাইনরিটি বা সংখ্যালঘু। এখানেই লেনিন প্রথম মার্ক্সবাদী দলের সদস্য হওয়ার মাপকাঠি কী হবে, সেই তত্ত্ব উপস্থিত করেন ও লড়াই চালিয়ে যান। আরএসডিএলপি অনেকটা একটা প্ল্যাটফর্মের মতো ছিল। সেখানে বলশেভিকরাও ছিল, মেনশেভিকরাও ছিল। লেনিনের পক্ষে যারা তাদের বলা হত বলশেভিক। তিনি তাদের মার্ক্সবাদী বিপ্লবী আদর্শে গড়ে তুলেছিলেন। অন্য দিকে মেনশেভিকরা ছিল পেটিবুর্জোয়া, আপসকামী শক্তি।
পুঁজিবাদের সাম্রাজ্যবাদী চরিত্রকে চিহ্নিত করলেন লেনিন
যখন প্রথম মহাযুদ্ধ শুরু হয়, সেই যুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণির দলের কী ভূমিকা হবে তা নিয়ে লেনিনের সাথে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের তীব্র মতভেদ হয়। মহাযুদ্ধের প্রাক্কালেই সাম্রাজ্যবাদ কী, পুঁজিবাদের কোন স্তরে সাম্রাজ্যবাদ এল, কী ভাবে এল– মার্ক্সবাদের ভিত্তিতে এই ব্যাখ্যা লেনিনই প্রথম উপস্থিত করেন মানবজাতির সামনে। তিনি দেখালেন, পুঁজিবাদের দুটি স্তর। সামন্ততন্ত্রকে উচ্ছেদ করে পুঁজিবাদের প্রথম স্তর হচ্ছে অগ্রগতির স্তর, প্রগতিশীল স্তর। এই স্তরে ছিল অসংখ্য ক্ষুদ্র পুঁজি। তাদের মধ্যে অবাধ প্রতিযোগিতা চলত। ক্ষুদ্র পুঁজিপতিদের মধ্যে অবাধ প্রতিযোগিতা চলতে থাকার কারণে ক্ষুদ্র পুঁজিগুলিকে ভিত্তি করে মাল্টিপার্টি ডেমোক্রেসি বা বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু হয়। কিন্তু একটা স্তরে এসে কিছু পুঁজিপতি অন্যদের প্রতিযোগিতায় পরাজিত করে একচেটিয়া পুঁজিপতি হয়ে যায়। একচেটিয়া পুঁজিবাদ হচ্ছে পুঁজিবাদের দ্বিতীয় স্তর। এখানে একচেটিয়া পুঁজি মানে, যেমন ধরুন এ দেশে টাটা– সে ইস্পাত শিল্পেরও মালিক, সে যন্ত্রপাতি তৈরি করারও মালিক, সে কয়লাখনিরও মালিক, সে নানা শিল্পের মালিক হয়ে বসে আছে। এই হল একচেটিয়া পুঁজি। ক্ষুদ্র পুঁজি মার খেতে খেতে অনেকটা প্রান্তিক হয়ে গেছে, কোনও রকমে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। কিছু ধ্বংস হচ্ছে, কিছু নতুন মাথা তুলছে, এ ভাবে মনোপলির আক্রমণে পর্যুদস্ত হচ্ছে।
একচেটিয়া পুঁজির স্তরে আরেকটা জিনিসও ঘটে। আগে ব্যাঙ্ক জনসাধারণের কাছ থেকে টাকা নিয়ে পুঁজিপতিদের দিত, জনসাধারণ সুদ পেত। এই ব্যাঙ্ক-পুঁজি আর শিল্পপতিদের যে পুঁজি বা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্যাপিটাল– এ দুটো আলাদা ছিল। একচেটিয়া পুঁজি একটা স্তরে আসার পর ব্যাঙ্ক পুঁজি আর শিল্প পুঁজি– দুটি মিলিত হয়ে গেল, অর্থাৎ তাদের একত্রীভবন ঘটল। এটা হল সাম্রাজ্যবাদের প্রথম বৈশিষ্ট্য। এর ফলে এদের মধ্য থেকে ধনকুবের গোষ্ঠী বা ফিনান্সিয়াল অলিগার্কি গড়ে উঠল। পুঁজির কেন্দ্রিকরণ ঘটল, লগ্নিপুঁজির জন্ম হল। এই হল তার দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য। তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হল, শুধু শিল্পজাত পণ্য নয়, বিদেশের সস্তা শ্রম ও সস্তা কাঁচামাল লুণ্ঠনের জন্য লগ্নিপুঁজি বিদেশে অর্থাৎ অনুন্নত দেশগুলিতে রপ্তানি করা। চতুর্থ বৈশিষ্ট্য হল, বিভিন্ন দেশের মনোপলি হাউসগুলো ট্রাস্ট অ্যান্ড কার্টেল তৈরি করে বিভিন্ন দেশের বাজার নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। পঞ্চম বৈশিষ্ট্য, বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী দেশ বিশ্বকে নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নেয়।
যুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণির ভূমিকা
সাম্রাজ্যবাদের এই বৈশিষ্ট্যগুলি লেনিন দেখালেন। দেখালেন, এ যুগে যুদ্ধ হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদীদের মধ্যেকার বাজার দখলের লড়াই। যুদ্ধ আসলে লুণ্ঠন ক্ষেত্র দখলের লড়াই। এর আগে সুইজারল্যান্ডের বাসল-এ দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সম্মেলনে সিদ্ধান্ত ছিল যে, সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ বাধলে যুদ্ধরত সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির শ্রমিক শ্রেণি নিজ নিজ দেশের সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। এক দেশের শ্রমিক অন্য দেশের শ্রমিকের বিরুদ্ধে লড়বে না। এ দেশের শ্রমিকরাও সৈনিক, ও দেশের শ্রমিকরাও সৈনিক। দুই দেশের শ্রমিকরা একে অপরকে হত্যা করবে না। এটা বাসল ম্যানিফেস্টো বলে পরিচিত। ডেনমার্কের কোপেনহেগেনের সম্মেলনেও একই সিদ্ধান্ত ছিল। সাম্রাজ্যবাদীরা নিজেদের লুণ্ঠন ক্ষেত্র ভাগ-বাঁটোয়ারার জন্য লড়াই করছে। সেই লড়াইয়ের সুযোগে শ্রমিকরা নিজের দেশের পুঁজিপতি শ্রেণির বিরুদ্ধে, সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে, গৃহযুদ্ধ বাধাবে, বিপ্লব করবে। এই ছিল সিদ্ধান্ত।
কিন্তু যখন যুদ্ধ বাধল, তখন ১৯১৫-তে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের বৈঠক হয় সুইজারল্যান্ডের জিমেরওয়াল্ডে। সেই বৈঠকে বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক নেতা বললেন– না, শ্রমিক শ্রেণি এখন যে যার দেশ রক্ষা করবে, অর্থাৎ যে যার দেশের সরকারের পক্ষে দাঁড়াবে। অর্থাৎ নিজ দেশের সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে দাঁড়াবে। লেনিন এর তীব্র প্রতিবাদ করলেন। তিনি বললেন, তোমরা আগের সিদ্ধান্তকে লঙ্ঘন করছ। এটা হতে পারে না। লেনিন-বিরোধীরা হলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ, লেনিন হলেন সংখ্যালঘিষ্ঠ। লেনিন তখন দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক থেকে বেরিয়ে এলেন। বললেন, এরা বিশ্বাসঘাতক। এরা মার্ক্সবাদ থেকে বিচ্যুত হয়ে সর্বহারা শ্রেণির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করছে, আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করছে।
দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের নেতাদের এই বিচ্যুতি ঘটল কেন? সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি উপনিবেশ, আধা উপনিবেশগুলিকে লুণ্ঠন করে চলেছে। সেই লুণ্ঠনের অংশ থেকে নিজের দেশের শ্রমিকদের মজুরি কিছুটা বাড়িয়ে দিয়ে, অর্থাৎ শ্রমিকদের এবং শ্রমিক নেতাদেরও ঘুষ দিয়ে বিক্ষোভ স্তিমিত করে দিচ্ছে। লেনিন বললেন, দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের নেতারা প্রতিনিধিত্ব করছেন সেই সব শ্রমিক নেতাদের যারা সাম্রাজ্যবাদীদের ঘুষ খেয়েছে এবং কেনা হয়ে গেছে। তারা বিপ্লবের বিরুদ্ধে যাচ্ছে। এ ভাবে একই সময়ে দেশের ভিতরে ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সঠিক মার্ক্সবাদী লাইন রক্ষার জন্য লেনিনকে লড়াই করতে হয়েছে।
গড়ে উঠল সোভিয়েত
ইতিপূর্বে রাশিয়ার ভেতরে ১৯০৫ সালে একটা অভ্যুত্থান ঘটে। সে অভ্যুত্থান হয়েছিল শ্রমিক শ্রেণির বিক্ষোভ দিয়ে। এক খ্রিস্টান যাজক গ্যাপন শ্রমিকদের বোঝান, আমাদের জার মহৎ, চলো আমি তোমাদের তাঁর কাছে নিয়ে যাব। তোমরা প্রার্থনা করো, তিনি সব দাবিদাওয়া মেনে নেবেন। শ্রমিকরা গেল, জারের সৈন্যবাহিনী সেখানে প্রবল গুলিবর্ষণ করল। কয়েক হাজার মানুষ মারা গেল। এই দিনটা ‘ব্লাডি সানডে’ বা ‘রক্তাক্ত রবিবার’ বলে চিহ্নিত হয়ে আছে। এর ফলে রাশিয়াতে প্রচণ্ড বিক্ষোভ হয়। ধর্মঘটের পর ধর্মঘট শুরু হয়। বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিকরা কমিটি গড়ে তোলে, যাকে বলে সোভিয়েত। শ্রমিকদের সংগ্রামী কমিটি সোভিয়েত গোটা দেশে নানা স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। মিলিটারির মধ্যেও কিছু সোভিয়েত গড়ে ওঠে। কিন্তু এগুলিতে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো সংগঠন বলশেভিকদের তখনও গড়ে ওঠেনি। এই বিপ্লব ১৯০৫-০৬ সাল পর্যন্ত চলতে থাকে। বিভিন্ন প্রদেশে তা ছড়িয়ে পড়ে। জার মিলিটারি দিয়ে নৃশংস ভাবে তা দমন করে। লেনিন বললেন, এর থেকে শিক্ষা নিতে হবে। এই ব্যর্থ অভ্যুত্থান হল আগামী বিপ্লবের ড্রেস রিহার্সাল। রাশিয়ার শ্রমিক শ্রেণির, রাশিয়ার জনগণের আগামী দিনের বিপ্লবের ট্রেনিং হল এই লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে। এ দিকে দেশের মধ্যে শাসক শ্রেণির আক্রমণ চলতে থাকে। আরএসডিএলপি-র মধ্যেও অনেকে ভয়-ভীতি-হতাশা থেকে সরে যেতে থাকে। লেনিনের এখানে একটা বিখ্যাত উক্তি আছে। তিনি বলেছেন, বিপ্লবের যখন জোয়ার আসে, সেই জোয়ারে অনেকে ভেসে এসে দলে যুক্ত হয়, নাম করার জন্য, কেরিয়ার গোছানোর জন্য। যখন বিপ্লবী আন্দোলন কঠিন সঙ্কটের সম্মুখীন, তখনই হয় আসল পরীক্ষা– কে খাঁটি, কে মেকি। এই দিক থেকে তিনি একটি মূল্যবান শিক্ষা সকলের সামনে রেখে গেছেন। যখন দলের খুব প্রভাব-প্রতিপত্তি, তখন অনেকে আসে। কিন্তু যখন দলের তীব্র সঙ্কট, দল যখন আক্রমণের সামনে, তখন যাঁরা তার হাল ধরে আছেন, তাঁরাই খাঁটি বিপ্লবী। এটাই হচ্ছে বিপ্লবীদের পরীক্ষা।
কিছু দর্শনগত বিভ্রান্তির জবাবে
রাশিয়ায় যখন হতাশা চলছে, তখন মার্ক্সবাদের বিরুদ্ধে আর এক ধরনের আক্রমণ শুরু হয়। বাজারভ, বগদানভ এবং আরও কয়েক জন এম্পিরিও-ক্রিটিসিজম বা পজিটিভিজম প্রচার শুরু করেন। এঁদের বক্তব্য, মানুষ সেন্স অর্গ্যান বা ইন্দ্রিয় দ্বারা যা কিছু উপলব্ধি করে, সেটাই রিয়েল বা বাস্তব। অর্থাৎ ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভূত না হলে সেটা বাস্তব নয়। এই বক্তব্য অনুযায়ী দাঁড়ায়, ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভূত না হলে কোনও বস্তুরই অস্তিত্ব নেই। এই বক্তব্যকে খণ্ডন করে লেনিন বললেন যে, ‘মেটিরিয়াল ওয়ার্ল্ড একজিস্টস ইন্ডিপেন্ডেন্ট অফ হিউম্যান কনশাসনেস’, অর্থাৎ বস্তুজগৎ মানুষের চেতনা নিরপেক্ষ ভাবেই অবস্থান করে। সেনসেশন জানার উৎস নয়, জানার মাধ্যম। জানার উৎস হচ্ছে বস্তুময় জগৎ। দৃষ্টান্ত হিসাবে তিনি বললেন, আলকাতরা থেকে আলিজারিন পাওয়া গেছে, এটা কিন্তু পাওয়ার আগেই অর্থাৎ ইন্দ্রিয় শক্তি দ্বারা জানার আগেই আলকাতরার মধ্যে ছিল। এই ধরনের আরও কিছু ভ্রান্ত চিন্তাকে তিনি ‘মেটিরিয়ালিজম অ্যান্ড এম্পিরিও ক্রিটিসিজম’ পুস্তিকায় আলোচনা করে মার্ক্সবাদের সঠিকতা দেখান। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও তিনি আর একটি ভ্রান্ত ধারণাকে ফাইট করে সঠিক বিচার দেখান। ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ডে পরীক্ষা করে দেখা গেল, ইলেক্ট্রনের ভেলসিটি (বেগ) যত বাড়ানো হয়, তত ইলেক্ট্রনের মাস (ভর) বাড়তে থাকে। আবার যত ইলেক্ট্রনের ভেলসিটি কমানো হতে থাকে, তত তার মাস কমতে থাকে। এ ভাবে কমতে কমতে এক সময় মনে হয় আর মাস নেই, অর্থাৎ ইলেক্ট্রন আর নেই। ফলে বিভ্রান্ত এক দল বিজ্ঞানী বলতে থাকেন, ‘ম্যাটার ডিসঅ্যাপিয়ার করে গেছে’, অর্থাৎ আর বস্তু নেই। এর উত্তরে লেনিন বললেন, ‘ম্যাটার ডিসঅ্যাপিয়ার করেনি, ম্যাটার সংক্রান্ত ইতিপূর্বের ধারণার সীমা ডিসঅ্যাপিয়ার করছে এবং ম্যাটার সম্পর্কে জ্ঞান আরও গভীরতর হচ্ছে। পূর্বেকার ধারণা অপরিবর্তনীয় ছিল না, আপেক্ষিক ছিল। পরবর্তী সময়ে বিজ্ঞান লেনিনের এই বক্তব্যের সঠিকতা প্রমাণ করেছে।
প্রথম দিকে লেনিন প্লেখানভকে শিক্ষক মনে করতেন। বলতেন, ‘প্লেখানভ ইজ দ্য ফাদার অব মার্ক্সইজম ইন রাশিয়া’। কারণ প্লেখানভই রাশিয়াতে মার্ক্সবাদ সংক্রান্ত বইপত্র নিয়ে এসেছিলেন। আবার আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কাউটস্কিকেও তিনি শিক্ষক হিসেবে গণ্য করতেন। তা সত্ত্বেও মার্ক্সবাদ ও সর্বহারা বিপ্লবী আন্দোলনের স্বার্থে যাঁদের এক সময় তিনি শিক্ষক বলে গণ্য করতেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও তিনি দৃঢ়তা ও সাহসের সাথে আদর্শগত সংগ্রাম পরিচালনা করতে পেরেছিলেন এবং মার্ক্সবাদের সঠিক উপলব্ধি বিশ্বের সামনে উপস্থিত করেছিলেন। কত বড় মহান বিপ্লবী হওয়ায় এটা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়েছিল! এই সময়ই লেনিন বলেছিলেন, এঁরা মার্ক্সবাদকে সংশোধন করার নামে বিকৃত করছে, মার্ক্সবাদের অপব্যাখ্যা করছে। তখন থেকেই রিভিশনিজম বা সংশোধনবাদ শব্দটা ব্যবহার হয়ে আসছে।
লেনিন ছিলেন সৃজনশীল মার্ক্সবাদী
লেনিনের সাথে এঁদের পার্থক্য বুঝতে হবে। এঁরা সকলেই মার্ক্স-এঙ্গেলসের বই পড়েছেন, মুখস্থ বলতে পারতেন, উদ্ধ´তি দিতে পারতেন। কিন্তু এঁরা হলেন মার্ক্সবাদী পণ্ডিত, স্কলার। আর লেনিন ছিলেন সৃজনশীল মার্ক্সবাদী। বিজ্ঞানটাকে বুঝে কোন পরিস্থিতিতে মার্ক্সবাদকে কী ভাবে প্রয়োগ করতে হবে, চর্চার মধ্য দিয়ে তা তিনি আয়ত্ত করেছিলেন। এঁরা কথায় কথায় বলতেন, মার্ক্স এই কথা বলেছেন, মার্ক্স ওই কথা বলেছেন। মার্ক্সের বেশ কিছু কথা সাম্রাজ্যবাদ পূর্ববর্তী যুগের, যেগুলি সাম্রাজ্যবাদের যুগে আর প্রযোজ্য নয়। লেনিন বলছেন, উই ডু নট রিগার্ড মার্ক্সেস থিয়োরি অ্যাজ সামথিং কমপ্লিটেড অ্যান্ড ইনভায়োলেবল। এমনটা হতে পারে না যে, মার্ক্সবাদের সব কথা শেষ হয়ে গেছে, মার্ক্সবাদ বিজ্ঞান হিসাবে আর বিকাশ লাভ করবে না। আর মার্ক্সের সময় সেই পরিস্থিতিতে যে সব কথা বলা হয়েছে, তার সবগুলিই এখনও প্রযোজ্য, সেগুলি লঙ্ঘন করা যাবে না, এটাও ঠিক নয়। এটা লেনিনের বিখ্যাত উক্তি। কত বড় সৃজনশীল মার্ক্সবাদী হলে এ কথা বলতে পারেন! বলেছেন, মার্ক্স-এঙ্গেলস ওনলি লেড দি ফাউন্ডেশন স্টোন অফ দি সায়েন্স হুইচ সোসালিস্টস মাস্ট ডেভেলপ ইন অল ডাইরেকশনস ইফ দে উইশ টু কিপ পেস উইথ লাইফ। অর্থাৎ মার্ক্স ও এঙ্গেলস মার্ক্সবাদী বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করে গেছেন। চলমান জীবনের সাথে সামঞ্জস্য রক্ষা করতে হলে আমাদের সব দিক থেকে এই বিজ্ঞানকে বিকশিত করতে হবে। যেটা লেনিন নিজে করেছেন। এখানেই প্লেখানভ, কাউটস্কির সাথে তাঁর পার্থক্য। তাঁরা ছিলেন পণ্ডিত। আর লেনিন ছিলেন সৃজনশীল মার্ক্সবাদী। তিনি মার্ক্সবাদী বিজ্ঞানকে, দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদী বিজ্ঞানকে আয়ত্ত করেছিলেন এবং সেই বিজ্ঞানকে প্রয়োগ করে বিশেষ পরিস্থিতিগুলিকে বিশ্লেষণ করে কোথায় কী ভাবে কী করতে হবে, তা নির্ধারণ করেছিলেন। বলেছেন, বিপ্লবের যে সাধারণ লাইন, ইংল্যান্ডে তার প্রয়োগ যে ভাবে হবে, ফ্রান্সে সে ভাবে হবে না, ফ্রান্সে যে ভাবে হবে, জার্মানিতে সে ভাবে হবে না, জার্মানিতে যে ভাবে হবে রাশিয়াতে সে ভাবে হবে না। প্রত্যেক দেশে কিছু অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক বৈশিষ্ট্য থাকে। ফলে সর্বহারা বিপ্লব বলতে একটা জেনারেল লাইনকে বোঝায়, পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সর্বহারা বিপ্লব। এক একটা দেশে সে দেশের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সামাজিক সাংস্কৃতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী এই বিপ্লবের লাইন ঠিক করতে হবে। এটাকে বলে বিশেষীকৃত রূপ, কংক্রিটাইজেশন অফ মার্ক্সিজম। এই যে কথাটা, এটা লেনিনের উত্থাপিত একটা ঐতিহাসিক বক্তব্য।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে এক দিকে ছিল ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং রাশিয়ার জার। বিপরীত দিকে ছিল জার্মানি, অস্ট্রিয়া এবং হাঙ্গেরি। এই যুদ্ধ চলাকালীন লেনিন রাশিয়ার বুকে প্রচার চালাচ্ছিলেন যাতে জারের সাথে ব্রিটিশ এবং ফরাসি সাম্রাজ্যবাদীদের যে বোঝাপড়া, দেশের শ্রমিক শ্রেণি তার স্বরূপটা ধরতে পারে। তিনি শ্রমিক শ্রেণিকে বোঝান, জার শাসনের বিরুদ্ধে বিপ্লব করতে হবে। লেনিনের শিক্ষায় বলশেভিক পার্টির নেতৃত্বে রাশিয়ার শ্রমিক শ্রেণিকে এই ভাবে প্রস্তুত করা হচ্ছিল। এই সময়ে লেনিনের সাথে কাউটস্কি, প্লেখানভ, মেনশেভিক এবং দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের নেতাদের মতভেদ দেখা দিল। তাঁরা বললেন, সবচেয়ে উন্নত পুঁজিবাদী দেশে প্রথম বিপ্লব হবে এবং তা হবে এক সাথে অনেকগুলি দেশে। এটা ছিল আগেকার দিনের চিন্তা। লেনিন বললেন, সাম্রাজ্যবাদী যুগে এটা সম্ভব হবে না। সাম্রাজ্যবাদী যুগ হচ্ছে পুঁজিবাদের অসম বিকাশের যুগ। তা ছাড়া এই নেতারা বুর্জোয়া পার্লামেন্টারি রাজনীতির মোহে আচ্ছন্ন হয়ে গেছে। তিনি বললেন, অনুন্নত হলেও এখন যে দেশে সঙ্কট সবচেয়ে বেশি তীব্র এবং তার ফলে বিক্ষোভ যেখানে সবচেয়ে বেশি তীব্র, সে দেশেই বিপ্লব করা সম্ভব হবে। এবং একটা দেশেই বিপ্লব করা সম্ভব। তারা বলল, রাশিয়া এখন বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তরে আছে এবং বিপ্লব বুর্জোয়া শ্রেণির নেতৃত্বে হবে। লেনিন বললেন, এই বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবও আজকের দিনে বুর্জোয়াদের নেতৃত্বে সম্পূর্ণ হবে না, শ্রমিক শ্রেণিকে এই বিপ্লবে নেতৃত্বকারী ভূমিকা নিতে হবে।
রাষ্ট্রক্ষমতা কার হাতে তার দ্বারাই নির্ধারিত হয় বিপ্লবের স্তর
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ অধ্যায়ে রাশিয়াতে জনগণের মধ্যে প্রচণ্ড বিক্ষোভ তৈরি হয়। যুদ্ধে রুশ সম্রাট জার হারছিল। দেশের মধ্যে তখন স্লোগান উঠেছে, যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই। তা ছাড়া দেশে প্রচণ্ড দুর্ভিক্ষ চলছে। ফলে দাবি উঠছে, রুটি চাই, ব্যক্তি স্বাধীনতা চাই। গ্রামের গরিব কৃষকদের মধ্যে থেকে দাবি উঠছে, জমি চাই। জনগণের মধ্যে থেকে একের পর এক এই সব দাবি উঠছে। এই সব দাবির ভিত্তিতেই ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাশিয়াতে প্রথম বিপ্লব হয়। এই বিপ্লবেও বহু শ্রমিক সোভিয়েত গড়ে ওঠে। সৈন্যবাহিনীতে সোভিয়েত গড়ে ওঠে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় এমনকি কৃষক সোভিয়েতও গড়ে ওঠে। কিন্তু বলশেভিক পার্টির সদস্যরা তখন জারের সৈন্যের বিরুদ্ধে রাস্তায় লড়াই করছিল। রাস্তার লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকায় সে সময় সোভিয়েতগুলোর মধ্যে তারা সে ভাবে কাজ করতে পারেনি। সেই সুযোগে মেনশেভিকরা, সোসালিস্ট রেভোলিউশনারি বলে আর একটা পার্টি সোভিয়েতগুলোর মধ্যে প্রাধান্য বিস্তার করে। অন্য দিকে কারখানার পুরনো শ্রমিকরা যুদ্ধে চলে গিয়েছিল। নতুন যারা শ্রমিক হয়েছে, তারা কৃষকদের ঘর থেকে এসেছে। আর কৃষকদের মধ্যে পেটিবুর্জোয়া মানসিকতা, আপসমুখিতার প্রভাব থাকে। এই দুটি কারণে সোভিয়েতগুলির মধ্যে প্রথম দিকে বলশেভিকরা ছিল সংখ্যালঘু। মেনশেভিক এবং সোসালিস্ট রেভোলিউশনারিরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। ফেব্রুয়ারি বিপ্লবে বুর্জোয়ারা ক্ষমতায় আসে। বিপ্লবে লড়েছে মূলত শ্রমিকরা এবং সৈনিকরা। কৃষকরাও লড়েছে। লেনিন বললেন, এই পরিস্থিতিকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের দিকে নিয়ে যেতে হবে। এই পরিস্থিতি যে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পক্ষে অনুকূল, এটা লেনিন বলেই বুঝতে পেরেছিলেন। এই সময়েও বিরোধীরা প্রশ্ন তোলে, রাশিয়ায় তো পুঁজিবাদ তেমন শক্তিশালী হয়নি।
এই অবস্থায় কী ভাবে পুঁজিবাদ বিরোধী বিপ্লব হবে? আগে পুঁজিবাদ শক্তিশালী হোক, তারপর পুঁজিবাদ বিরোধী বিপ্লব হবে। মেনশেভিকরা এ কথা বলে, প্লেখানভও তাদের সাথে একমত হন। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের নেতারাও একই কথা বলে। এই প্রসঙ্গে লেনিনের বিখ্যাত উক্তি আছে– রাষ্ট্রক্ষমতা কার হাতে আছে তার দ্বারাই নির্ধারিত হবে বিপ্লবের স্তর কী হবে– পুঁজিবাদ কতটা ডেভেলপ করেছে, সামন্ততন্ত্র কতটা আছে, এ সব দিয়ে নয়। তিনি বললেন, ফেব্রুয়ারি বিপ্লবে বুর্জোয়া শ্রেণি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছে। টু দ্যাট এ’টেন্ট বুর্জোয়া ডেমোক্রেটিক রেভোলিউশন ইজ কমপ্লিটেড। অর্থাৎ সেই অর্থে বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পূর্ণ হয়েছে এবং এখন বুর্জোয়া শ্রেণিকে ক্ষমতাচ্যুত করতে হবে। সেই অর্থে বর্তমান বিপ্লবের স্তর হবে সমাজতান্ত্রিক। বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের বাকি যে সব অপূরিত কাজ, অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক– সেগুলি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রই সম্পূর্ণ করবে।
সর্বহারা একনায়কত্ব প্রসঙ্গে
রাশিয়ায় তখন দু’টি শক্তি বা পাওয়ার কাজ করছিল। এক দিকে বুর্জোয়া প্রভিশনাল গভর্নমেন্ট, অন্য দিকে সশস্ত্র সোভিয়েত পাওয়ার, যেখানে বলশেভিকরা সংখ্যালঘু। এই ভাবে ডুয়াল পাওয়ার বা দ্বৈত শক্তি গড়ে উঠেছিল। মেনশেভিকরা চাইছে সোভিয়েতগুলি সমস্ত ক্ষমতা প্রভিশনাল সরকারের হাতে তুলে দিক এবং সোভিয়েতগুলি ভেঙে দিক, আর লেনিন দাবি করলেন সোভিয়েতের হাতে সমস্ত ক্ষমতা দিতে হবে। তিনি প্রথমে নিজের দল বলশেভিক পার্টিতে ব্যাপক আলোচনা করে দলে ঐকমত্য গড়ে তুললেন। তারপর বলশেভিক দলের নেতা-কর্মীরা শ্রমিকদের মধ্যে, সৈন্যবাহিনীর মধ্যে ও সোভিয়েতগুলিতে ব্যাপক আলোচনা, তর্কবিতর্ক করে মেনশেভিক ও সোসালিস্ট রেভোলিউশনারিদের শেষ পর্যন্ত কয়েক মাসের মধ্যে পরাস্ত করে সংখ্যাগরিষ্ঠ হল এবং নভেম্বরে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সফল করল। সেই সময়ে লেনিন যদি এই বৈপ্লবিক পরিস্থিতির তাৎপর্য বুঝে বিপ্লবের উদ্যোগ না নিতেন, তা হলে ইতিহাসে নভেম্বর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব পাওয়া যেত না। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের নেতারা সশস্ত্র বিপ্লবের বিরোধিতা করে বলেন, পার্লামেন্টের ভোটের মাধ্যমেই তো সমাজতন্ত্র কায়েম হতে পারে। লেনিন বলেন, প্রতি পাঁচ বছর ছ’বছর অন্তর কারা পুঁজিবাদের চাকর হিসাবে কাজ করবে পার্লামেন্টারি নির্বাচনের দ্বারা সেটাই ঠিক হয়। বিপ্লবী শ্রমিক শ্রেণির লড়াই হচ্ছে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। আমলাতন্ত্র, সামরিক শক্তি, বিচারব্যবস্থা– এই তিনটি স্তম্ভ নিয়ে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র। ভোটের দ্বারা এগুলির পরিবর্তন হয় না। ভোটের দ্বারা যে রাষ্ট্রের পরিবর্তন হয় না, প্যারি কমিউনের অভিজ্ঞতা থেকে মার্ক্স নিজেই উল্লেখ করে বলেছেন, রেডিমেড অর্থাৎ আগে থেকে তৈরি হয়ে থাকা পুঁজিবাদী রাষ্ট্র উচ্ছেদ করে শ্রমিকদের নিজস্ব রাষ্ট্র কায়েম করতে হবে। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সঙ্গে মতাদর্শগত সংগ্রাম করে লেনিন এই তত্ত্বের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি দেখান, পুঁজিবাদী রাষ্ট্রকে উচ্ছেদ করতে হবে। ওরা বলল, শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিপ্লব হবে। লেনিন বললেন, শান্তিপূর্ণ উপায়ে হতে পারে না। রাষ্ট্র সশস্ত্র, তার বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই করতে হবে। এই সমস্ত তত্ত্বগত প্রশ্নগুলি নিয়ে লেনিন তখন মেনশেভিক ও কাউটস্কিদের ফাইট করেন।
কাউটস্কি, প্লেখানভদের সাথে ডিকটেটরশিপ অফ দি প্রলেটারিয়েট অর্থাৎ সর্বহারা একনায়কত্ব প্রশ্নেও লেনিনের তীব্র মতভেদ হয়। তাঁরা বললেন, এতে গণতন্ত্র থাকবে না। লেনিন দেখালেন, মার্ক্সই বলে গেছেন, পুঁজিবাদ থেকে সাম্যবাদে পৌঁছবার অন্তর্বর্তী স্তরে সর্বহারা একনায়কত্ব থাকবে। লেনিন আরও বললেন, বুর্জোয়া গণতন্ত্রও বাস্তবে বুর্জোয়া একনায়কতন্ত্র। যে হেতু পুঁজিবাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তার শক্তি দশগুণ বেড়ে যায়, প্রতিবিপ্লবী ষড়যন্ত্র চলতে থাকে এবং বাইরের পুঁজিপতিদের সাথে প্রতিবিপ্লবীদের যোগাযোগ থাকে, অসংখ্য ক্ষুদ্র পুঁজি উচ্ছেদ করা যায় না এবং এ সব থেকে প্রতিদিন, প্রতি ঘণ্টায়, প্রতি মিনিটে পুঁজিবাদ জন্ম নেয়। তাই সর্বহারা একনায়কত্ব প্রয়োজন। আবার এটা সর্বহারা শ্রেণির স্বার্থে গণতন্ত্র।
রাশিয়ায় বিপ্লব সফল হওয়ার পর আতঙ্কিত হয়ে ১৬টি সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী রাষ্ট্র একযোগে রাশিয়াকে আক্রমণ করে, দেশের অভ্যন্তরে ক্ষমতাচ্যুত পুঁজিপতিরাও নানা স্থানে বিদ্রোহ করে। এই সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে রাশিয়ার শ্রমিক শ্রেণি, বিপ্লবী সৈন্যবাহিনী ও কৃষকরা বীরত্বপূর্ণ লড়াই চালিয়ে এই সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণ ও প্রতিবিপ্লবী ষড়যন্ত্র পরাস্ত করে। সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির শ্রমিকরাও আন্তর্জাতিকতাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিশ্বের প্রথম শ্রমিক শ্রেণির রাষ্ট্রের পক্ষে দাঁড়ায়। যার ফলে সাম্রাজ্যবাদীদের আক্রমণ প্রতিহত করা সম্ভব হয়। বিপ্লবের প্রস্তুতিতে, বিদেশি আক্রমণ প্রতিহত করার ক্ষেত্রে এবং প্রতিবিপ্লব দমনে লেনিনের নেতৃত্বে স্ট্যালিনের ভূমিকাও উল্লেখযোগ্য ছিল। এর পর প্রথম মহাযুদ্ধ-পরবর্তী দেশের তীব্র আর্থিক সঙ্কট মোকাবিলায় লেনিন প্রথমে ‘ওয়ার কমিউনিজম’ ও পরে ‘নিউ ইকনমিক পলিসি’ চালু করেন। এই পর্যায় শেষ হওয়ার পর পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি গঠনের ঐতিহাসিক কর্মকাণ্ড শুরু হয়।
লেনিন আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্বগত অবদান রেখেছেন। তার অন্যতম হচ্ছে, কী ভাবে আধুনিক জাতি গড়ে ওঠে। তিনি দেখিয়েছেন, জাতীয় বুর্জোয়ার অভ্যুত্থানকে ভিত্তি করে জাতীয় বাজার, জাতীয় ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে আধুনিক জাতিগুলি গড়ে উঠেছে। জার সাম্রাজ্যের অধীনস্থ জাতিগুলির স্বাধীনতার পক্ষেও তিনি বক্তব্য রাখেন। তিনি এ কথাও বলেন যে, বুর্জোয়ারা নেতৃত্বে থাকলেও সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির শ্রমিক শ্রেণি ও শ্রমিক শ্রেণির দলকে উপনিবেশ ও আধা-উপনিবেশগুলির স্বাধীনতা আন্দোলনকে সাহায্য করতে হবে, আবার একই সাথে সেই সব দেশে আলাদা কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে।
শ্রমিক শ্রেণির দল গঠনে পথনির্দেশ
লেনিনের আর একটা ঐতিহাসিক অবদান হল, কী ভাবে শ্রমিক শ্রেণির দল গড়ে উঠবে তার পথনির্দেশ দেওয়া এবং তিনিই প্রথম শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লবী দল গড়ে তোলেন। সর্বহারা শ্রেণির দল কী ভাবে গড়ে উঠবে মার্ক্স-এঙ্গেলস তা দেখিয়ে যাননি। তখন তার প্রয়োজনীয়তাও দেখা দেয়নি। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের অন্তর্ভুক্ত দলগুলি ঢিলেঢালা ধরনের ছিল। এক মানুষের দেহের মতো মনোলিথিক পার্টি, সুশৃঙ্খল পার্টি গড়ে তোলার রাস্তা লেনিনই দেখিয়েছেন। প্রথম দিকে লেনিন যে ‘লিগ অফ স্ট্রাগল ফর দি ইমানসিপেশন অফ দি ওয়ার্কিং ক্লাস’ গড়ে তুলেছিলেন– যাকে বলেছিলেন, এটি দল গঠনের ভ্রূণাবস্থা অর্থাৎ এমব্রায়োনিক স্টেজ, পরবর্তী কালে এটাকে তিনি তত্ত্বগত প্রয়োগের ক্ষেত্রে অনেক উন্নত করলেন।
লেনিন বলেছেন, বিপ্লবী তত্ত্ব ছাড়া বিপ্লবী দল গড়ে উঠতে পারে না। কমরেড শিবদাস ঘোষ যেটাকে বিস্তারিত করে বললেন, এই বিপ্লবী তত্ত্ব শুধু একটা দেশের বিপ্লবের স্তর (স্টেজ অফ রেভোলিউশন) নির্ধারণ নয়। জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে– অথনৈতিক ক্ষেত্রে হোক, রাজনৈতিক, সামাজিক, পারিবারিক ক্ষেত্রে হোক, স্নেহ মায়া মমতা সহ সমস্ত সম্পর্কের ক্ষেত্রেই মার্ক্সবাদী দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে, সবটা নিয়ে হবে বিপ্লবী তত্ত্ব। কমরেড শিবদাস ঘোষ বলেছেন, লেনিনের শিক্ষাকে এই ভাবে আমাদের বুঝতে হবে। লেনিন বলেছেন, আলাদা আলাদা কিছু বিচ্ছিন্ন গ্রুপ হঠাৎ মিটিং করে বা একটা প্রস্তাব পাশ করে একটা শ্রমিক শ্রেণির পার্টি গড়ে তুলতে পারে না। দল গঠনে যাঁরা এগিয়ে এসেছেন তাঁদের সকলের চিন্তার ঐক্য চাই। চিন্তার ঐক্য গড়ে তুলতে হলে কার কী চিন্তা খোলাখুলি রাখতে হবে এবং তার ভিত্তিতে কারটা ঠিক, কারটা ভুল, তা নিয়ে মতবাদিক সংগ্রাম করতে হবে। এই ভাবে একটা পার্টি গড়ে তুলতে হবে। লেনিন বলেছেন, বিপ্লবী দলে প্রফেশনাল রেভোলিউশনারি চাই। প্রফেশনাল রেভোলিউশনারি মানে এমন ধরনের বিপ্লবী কর্মী, বিপ্লবী সংগঠনের কাজই যাদের একমাত্র কাজ। পরবর্বীকালে এই ধারণাকে কমরেড শিবদাস ঘোষ আরও বিকশিত করে বললেন, প্রফেশনাল রেভোলিউশনারি মানে বিপ্লবের স্বার্থে যারা শুধু ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিসর্জন দিয়েছে তাই নয়, ব্যক্তিসম্পত্তিজাত মানসিকতা, যাকে প্রাইভেট প্রপার্টি মেন্টাল কমপ্লে’ বলে, তা থেকে মুক্ত হয়ে– বিপ্লবের স্বার্থই আমার স্বার্থ, শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থই আমার স্বার্থ, বিপ্লবী দলের স্বার্থই আমার স্বার্থ– এ ভাবে একাত্ম হতে পেরেছে। কমরেড শিবদাস ঘোষ আজকের যুগের পরিপ্রেক্ষিতে লেনিনের এই চিন্তার আরও বিকাশ ঘটিয়েছেন।
কমিউনিস্ট পার্টি শ্রমিক শ্রেণির অগ্রগামী বাহিনী
লেনিন বলেছেন, পার্টি হবে অগ্রগামী বাহিনী বা ভ্যানগার্ড। ট্রেড ইউনিয়ন আর পার্টি এক নয়। বললেন, ট্রেড ইউনিয়নের কাজ হচ্ছে মালিকের কাছে মজুরি বাড়ানোর দাবি তোলা, অতিরিক্ত কাজের সময় কমানো ও শ্রমিকের স্বার্থে নানা আইন-কানুনের জন্য লড়াই গড়ে তোলা। লেনিনের বক্তব্য, ট্রেড ইউনিয়নিজম উইদাউট রেভোলিউশনারি পলিটি’ ইজ এ বুর্জোয়া পলিটিক্স। অর্থাৎ বিপ্লবী রাজনীতি বাদ দিয়ে ট্রেড ইউনিয়ন হচ্ছে বুর্জোয়া রাজনীতি। ফলে ট্রেড ইউনিয়ন থেকে বিপ্লবী চেতনা আসবে না। লেনিন বললেন, ট্রেড ইউনিয়ন থাকবে। কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টি হল শ্রমিক শ্রেণির ভ্যানগার্ড ডিটাচমেন্ট। মানে শ্রমিক শ্রেণির অগ্রগামী বাহিনী। এই বাহিনীর কাজ শ্রমিক শ্রেণিকে বিপ্লবে নেতৃত্ব দেওয়া। শ্রমিক শ্রেণি শুধু ট্রেড ইউনিয়ন করে বিপ্লবী রাজনীতি বুঝবে না। শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে বিপ্লবী রাজনীতি নিয়ে যাবে বিপ্লবী শিক্ষায় শিক্ষিত বুদ্ধিজীবীরা। কারণ মার্ক্সবাদ ও বিপ্লবের তত্ত্বটাই এসেছে দর্শন, ইতিহাস, অর্থনীতি, রাজনীতির নানা তত্ত্বকে ভিত্তি করে। ফলে বিপ্লবের তত্ত্ব ডাজ নট কাম ফ্রম উইদিন, শ্রমিকের দৈনন্দিন দাবিদাওয়া নিয়ে সংগ্রামের ভিতর থেকে বিপ্লবী তত্ত্ব আসবে না। ইট কামস ফ্রম উইদাউট। অর্থাৎ বাইরে থেকে এটা শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে নিয়ে যেতে হবে। কারা নিয়ে যাবে? যারা পেটিবুর্জোয়া জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শ্রমিক-বিপ্লবের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেছে, এই রকম বুদ্ধিজীবীরাই নিয়ে যাবে। আর শ্রমিকদের বিভিন্ন সংগঠনের ভ্যানগার্ড ডিটাচমেন্ট হবে পার্টি।
কমিউনিস্ট পার্টিতে কাজ করে যৌথ নেতৃত্ব
লেনিন বলেছেন, সর্বহারা বিপ্লবী দল গড়ে উঠবে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকরণ বা ডেমোক্রেটিক সেন্ট্রালিজমের ভিত্তিতে এবং এটা গড়ে উঠবে প্রোলেটারিয়ান ডেমোক্রেসি ও সেন্ট্রালাইজেশনের সংমিশ্রণে, অর্থাৎ সর্বহারা গণতন্ত্র ও কেন্দ্রিকরণের সংমিশ্রণের ভিত্তিতে। বলেছেন, এই সংমিশ্রণ হবে সমগ্র দলের কনস্ট্যান্ট কমন অ্যাক্টিভিটি, কনস্ট্যান্ট কমন স্ট্রাগলের ভিত্তিতে। এটা ফর্মাল বা যান্ত্রিক হবে না, যা আমলাতন্ত্রের জন্ম দিয়ে কর্মীদের উপর কর্তৃত্ব করে। গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা থাকলে দলে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও নেতৃত্ব দখলের মানসিকতা থাকবে না। আমলাতান্ত্রিক নেতৃত্ব গড়ে উঠলে পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসাবে দলে শৃঙখলাবিরোধী মানসিকতা ও অ্যানার্কিজম বা নৈরাজ্য গড়ে উঠবে। লেনিনের এই শিক্ষাগুলিকে ভিত্তি করে দল গড়ে তুলতে গিয়ে কমরেড শিবদাস ঘোষ এগুলিকে আরও বিকশিত, সমৃদ্ধ ও উন্নত কর়েছেন। তিনি বলেছেন, মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদকে ভিত্তি করে অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইত্যাদি এবং ব্যক্তিজীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে মার্ক্সবাদী দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে, তা নিয়ে একটা সর্বব্যাপক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে একটি চিন্তার ঐক্য অর্থাৎ আদর্শগত কেন্দ্রিকরণ বা ইডিওলজিক্যাল সেন্ট্রালিজম গড়ে তুলতে হবে। যারা মার্ক্সবাদী দল গড়ে তুলতে উদ্যোগী তাদের এই লড়াইটা করতে হবে। এই লড়াই করতে করতে যখন তাদের মধ্যে জীবনের সমস্ত দিক ব্যাপ্ত করে চিন্তার একটা ঐক্য গড়ে উঠবে এবং এই চিন্তা সর্বশ্রেষ্ঠ রূপে যখন একজন ব্যক্তির চিন্তার মধ্যে দিয়ে প্রতিফলিত হবে, তিনি হবেন আদর্শগত ঐক্যের মূর্ত প্রতীক। যেমন মার্ক্স-এঙ্গেলস-এর পরবর্তীকালে লেনিন, স্ট্যালিন, মাও সে-তুংয়ের অভ্যুত্থান ঘটেছে। কমরেড শিবদাস ঘোষ দেখিয়েছেন ফর্মাল ডেমোক্রেসি বা বুর্জোয়া গণতন্ত্র যে হেতু ব্যক্তি মালিকানার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে, সেখানে গণতন্ত্রের নামে এক বা একাধিক ব্যক্তির নেতৃত্ব কাজ করে। আর সর্বহারা গণতন্ত্র হচ্ছে যৌথ মালিকানা প্রতিষ্ঠার লড়াই, তাই এই নেতৃত্ব যৌথ নেতৃত্ব বা কালেকটিভ লিডারশিপ। এই চিন্তার ঐক্যের মূর্ত রূপ কোনও একজন ব্যক্তির মধ্য দিয়ে যখন ব্যক্ত হচ্ছে, তা হচ্ছে কালেক্টিভ লিডারশিপের কংক্রিট রূপ। এই আদর্শগত কেন্দ্রীকরণ গড়ে উঠছে মানে ওয়ান প্রসেস অফ থিঙ্কিং (সম চিন্তাপদ্ধতি), ইউনিফর্মিটি অফ থিঙ্কিং (সমচিন্তা), ওয়াননেস ইন অ্যাপ্রোচ (সম উদ্দেশ্যমুখিনতা) এবং সিঙ্গলনেস অফ পারপাস (সম উদ্দেশ্য) গড়ে উঠেছে। আদর্শগত কেন্দ্রিকরণ গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় সর্বহারা গণতন্ত্রও গড়ে উঠবে। আদর্শগত কেন্দ্রিকরণকে ভিত্তি করে নিম্নস্তর থেকে উচ্চস্তর পর্যন্ত পার্টি সংগঠন গড়ে উঠবে– এটাই হল সাংগঠনিক কেন্দ্রিকরণ। আদর্শগত কেন্দ্রিকরণ আর সাংগঠনিক কেন্দ্রিকরণ– কমরেড শিবদাস ঘোষ এই ভাবে ভাগ করে দেখালেন। লেনিনের শিক্ষাকে ভিত্তি করে এই যুগের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি আদর্শগত কেন্দ্রিকরণকে আরও উন্নত রূপে উপস্থিত করলেন, যার ভিত্তিতে এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট) গড়ে উঠেছে।
বুর্জোয়ারা কী ভাবে জনগণকে বিভ্রান্ত করে একজন মার্ক্সবাদী বিপ্লবীকে তা ধরতে হবে
লেনিনের আরও কয়েকটি শিক্ষা রয়েছে যেগুলি আমাদের ক্ষেত্রে আজও প্রযোজ্য। লেনিন বলেছেন, বিপ্লবী যে হবে সে যখনই কোনও অন্যায় দেখবে, অত্যাচার দেখবে, তার প্রতিবাদ করবে। লেনিন বলেছেন, একজন মার্ক্সবাদী বিপ্লবী দেশের মধ্যে যা কিছু ঘটনা ঘটছে– যে কোনও ধরনের রাজনৈতিক ঘটনা– সেই ঘটনায় কোন শ্রেণি কী ভূমিকা নিচ্ছে, সেই শ্রেণির রাজনৈতিক, নৈতিক ভূমিকা কী, এটাও মার্ক্সবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করবে। একজন বিপ্লবীকে একটা বিশেষ সময়ে বুর্জোয়া শ্রেণির সামাজিক-রাজনৈতিক ভূমিকা কী তা বুঝতে হবে। একজন বিপ্লবীকে বুর্জোয়া শ্রেণির শক্তি কোথায়, দুর্বলতা কোথায় তা-ও বুঝতে হবে। বুঝতে হবে কী ধরনের চাতুর্যের দ্বারা, লোকঠকানো বুলির দ্বারা তারা মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। বুঝতে হবে কী কী ঘটনা ঘটছে, কী কী আইন হচ্ছে, কোন শ্রেণির স্বার্থে হচ্ছে। বুঝতে হবে জনগণ কী চিন্তা করছে, কী কী কথাবার্তা তাদের মধ্যে হচ্ছে। তারা কোথাও জোরে বলছে, কখনও ফিসফিস করে বলছে– এ সব কিছুর খোঁজখবর একজন বিপ্লবীকে রাখতে হবে। বলেছেন, এগুলি কোনও বই পড়ে পাওয়া যাবে না, বাস্তব জীবনের ঘটনার মধ্যে পাওয়া যাবে। বাস্তব জীবনের ঘটনাগুলিকে বিচার করতে হবে এবং তা থেকে শিখতে হবে।
লেনিন বলছেন, যেখানেই জনগণ আছে– যে কোনও ইনস্টিটিউশনে, যে কোনও সোসাইটিতে, যে কোনও ক্লাবে– জনগণ যেখানেই আছে, সেই সংগঠন যদি প্রতিক্রিয়াশীলও হয়, তা সত্ত্বেও বিপ্লবীদের সেখানে কাজ করতে হবে। সে কাজ যত কঠিনই হোক না কেন, প্রতিক্রিয়াশীলরা যতই বাধা দিক, যতই তারা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করুক, বিপ্লবীদের জনগণের মধ্যে যেতে হবে এবং তাদের মধ্যে কাজ করতে হবে। বলেছেন, কোনও ট্রেড ইউনিয়নের নেতৃত্ব প্রতিক্রিয়াশীল বলে সেখানে যাব না, তার মানে হচ্ছে প্রতিক্রিয়াশীল নেতৃত্বের অধীনে শ্রমিক শ্রেণিকে ছেড়ে দেওয়া। সেই সব প্রতিক্রিয়াশীল ট্রেড ইউনিয়নের ভিতরেও বিপ্লবীদের কাজ করতে হবে। শ্রমিক শ্রেণিকে জয় করতে হবে। প্রতিক্রিয়াশীল নেতৃত্বকে শ্রমিকদের থেকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে।
পার্লামেন্টারি ইলেকশন সম্পর্কে
আবার যারা উগ্র বামপন্থী, তারা ভোট বয়কটের কথা বলেছে। তারা বলেছে, পার্লামেন্ট অকার্যকরী হয়ে গেছে, বাতিল হয়ে গেছে। লেনিন বললেন, তোমাদের কমিউনিস্টদের কাছে পার্লামেন্ট বাতিল হয়ে গেছে। কিন্তু জনগণের কাছে তা বাতিল হয়েছে কি? জনগণ তো এখনও পার্লামেন্ট বাতিল বলে বোঝেনি। ফলে জনগণ যতক্ষণ না বুঝছে, এমনকি বিপুল সংখ্যক মাইনরিটি যতক্ষণ না বুঝছে, ততক্ষণ পার্লামেন্ট ইলেকশনে তোমাদের যেতে হবে। পার্লামেন্টের দ্বারা জনগণের সমস্যার সমাধান হচ্ছে না, এটা দেখাতে হবে, প্রমাণ করতে হবে। লেনিন বলেছেন, এমনকি বিপ্লবের পরেও, ১৯১৮ সাল পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নে কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলি আমরা টিকিয়ে রেখেছিলাম। কারণ তখনও কিছু লোকের মধ্যে, মাইনরিটি হলেও বিভ্রান্তি ছিল। বলেছেন, মেজরিটি বুঝলেই হবে না, মাইনরিটি হলেও একটা বড় সংখ্যক মানুষের মধ্যে যদি বিভ্রান্তি থাকে তা হলেও পার্লামেন্ট ইলেকশনে যেতে হবে।
লেনিন এই শিক্ষাও দিয়ে গেছেন যে, শত্রু শিবিরের যে কোনও দ্বন্দ্ব, এমনকি খুব ক্ষুদ্র হলেও অত্যন্ত ধৈর্য, দক্ষতা ও সতর্কতার সঙ্গে তার সুযোগ নিতে হবে। আবার স্বল্প সময়ের জন্য হলেও জনগণের কোনও শক্তি যদি সহযোগী হিসাবে পাওয়া যায়, এমনকি সেই শক্তি অ-নির্ভরযোগ্য, দোদুল্যমান, অস্থায়ী হলেও তাকে কাজে লাগাতে হবে।
ভুল সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি
লেনিন বলেছেন, একটা বিপ্লবী দলের বিপ্লবের স্ট্র্যাটেজি কী, ট্যাকটি’ কী, সেটা সঠিক হলেই চলবে না, জনগণ যাতে তার অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারে– এই বিপ্লবের রণনীতি, রণকৌশল ঠিক– সেটা দেখতে হবে। তিনি বলেছেন, বিপ্লবী দলের কর্মীদের সর্বহারা শ্রেণি, আধা সর্বহারা শ্রেণি, শোষিত জনগণ, তাদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে হবে, তাদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে, এমনকি তাদের সাথে মিশে যেতে হবে। তাদের শিক্ষিত করতে হবে, সংগঠিত করতে হবে। আর বিপ্লবী দলের কর্মীদের স্যাক্রিফাইস করতে হবে, সাহসী হতে হবে, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতে হবে। তিনি বলেছেন, একটা বিপ্লবী দল খাঁটি কি না, এটা বোঝা যায়, সে ভুল করলে সেই ভুল সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি কী, তা দিয়ে। যথার্থ বিপ্লবী দল ভুল করলে সর্বসমক্ষে স্বীকার করে। কী কারণে ভুল হয়েছে সেটাও বলে। কী অবস্থার মধ্যে এই ভুলটা হতে পারল, তা বলে এবং কী ভাবে সংশোধন করা হবে, তাও প্রকাশ্যে আলোচনা করে। এতেই বোঝা যায়, দলটি যথার্থ খাঁটি কি না, যথার্থই সে শ্রমিক শ্রেণির প্রতি, জনগণের প্রতি তার দায়িত্ব পালন করে কি না।
লেনিন আর একটা কথাও বলেছেন। মানবজাতির ইতিহাসে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন যুগে যে জ্ঞানের সৃষ্টি হয়েছে, স্তরে স্তরে যে জ্ঞানের ভাণ্ডার সঞ্চিত হয়েছে, সেই জ্ঞানের ভাণ্ডারকে ভিত্তি করে, তাকে অতিক্রম করে, মানে তা থেকে শিক্ষা নিয়েই এসেছে মার্ক্সবাদ। তাই বিপ্লবীদের মানব-ইতিহাসের বিভিন্ন যুগের জ্ঞানের সাথে পরিচিত হতে হবে। আর একটা কথাও লেনিন বলেছেন। বলেছেন, একজন বিপ্লবী যদি মনে করে আমি কম জানি, তা হলে তার জানার আগ্রহ বাড়বে। আর যদি সে মনে করে আমি অনেক জানি, তা হলে আর যাই হোক, সে কমিউনিস্ট হতে পারবে না। আমি লেনিনের বিশাল শিক্ষার ভাণ্ডার থেকে কিছু অংশ এই আলোচনাতে উপস্থিত করেছি যাতে আমরা সকলে এর থেকে শিক্ষা নিয়ে বিপ্লবী আন্দোলনে যথাযোগ্য ভূমিকা নিতে পারি।
সাম্রাজ্যবাদের দানবিক চেহারা প্রথম চিনিয়েছেন লেনিন
এখন বিশ্বে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ একের পর এক ভয়াবহ ধ্বংসকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। কয়েক বছর আগে তারা ইরাক ধ্বংস করল। বলল, সাদ্দাম হোসেন ইরাকে গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্র তৈরি করছে। অথচ আন্তর্জাতিক কমিশন পরীক্ষা করে বলল, ইরাকে কোনও গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্র নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্ণপাত করল না। ইরাককে ধ্বংস করে ছাই করে দেওয়ার পর বিশ্ব দেখল, এই অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। এটা ছিল ইরাক আক্রমণের জন্য মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অজুহাত মাত্র। তার সহযোগী ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ। এর পর একই ভাবে লিবিয়াকে আক্রমণ করে ধ্বংস করল। ইজরায়েল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ সাহায্যে গাজায় কী নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে! হাজার হাজার মানুষ, শত শত শিশু প্রাণ হারাচ্ছে। সমস্ত এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ঘরবাড়ি বলে কিছু নেই। হাসপাতাল, স্কুল, কলেজ– সব ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। মাত্র কয়েক দিন আগে একটা স্বাধীন দেশ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে মিলিটারি পাঠিয়ে আচমকা গ্রেফতার করে নিয়ে গেল আমেরিকা। ওখানে সৈনিক যারা পাহারা দিচ্ছিল, তাদেরও আক্রমণ করে খুন করল। এখন কিউবা, কলম্বিয়া, মেক্সিকো– আরও কয়েকটা রাষ্ট্র– ল্যাটিন আমেরিকা বলতে যা বোঝায় তাদের বলছে, হয় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হুকুম মেনে আত্মসমর্পণ করো, না হলে তোমাদেরও পরিণতি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টের মতো হবে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে কেন নিয়ে গেল? খোলাখুলি বলছে, ওই দেশের তেলখনিগুলি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের চাই। ওই তেলখনিগুলিতে আগে মার্কিন পুঁজিপতিদের মালিকানা ছিল। ভেনেজুয়েলার সরকার মার্কিনী মালিকানা উচ্ছেদ করে সেগুলির জাতীয়করণ করেছিল। আবার সেগুলিতে নিজেদের মালিকানা কায়েম করল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। যে সাম্রাজ্যবাদের দানবিক চরিত্র আজ দেখা যাচ্ছে– তাকে প্রথম চিনিয়েছেন মহান লেনিন। আজ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় সব দেশেই নিজের আধিপত্য কায়েম করেছে। ল্যাটিন আমেরিকাকেও পদানত করছে, যারা মাথা নোয়ায়নি তাদের থ্রেট করছে। ইরান যাতে আত্মসমর্পণ করে, সে জন্য বিশাল সশস্ত্র রণতরী পাঠিয়েছে।
সমাজতন্ত্রের অনুপস্থিতির কারণে সাম্রাজ্যবাদ বেপরোয়া
আজ সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা নেই। ১৯৫৬ সালে সদ্য স্বাধীন মিশর সুয়েজ ক্যানেল জাতীয়করণ করার পর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মদতে ব্রিটিশ-ফরাসি সাম্রাজ্যবাদ যখন মিশর আক্রমণ করল, তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ বন্ধ করার জন্য ১২ ঘণ্টার সময়সীমা দিয়েছিল। ৬ ঘণ্টার মধ্যেই সাম্রাজ্যবাদীরা আক্রমণ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল। আজ সেই সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক শিবির নেই। আজ সাম্রাজ্যবাদ ইউএনও-র তৈরি বিধান, কোনও আন্তর্জাতিক রীতি-নীতির তোয়াক্কা করছে না, সাম্রাজ্যবাদী লালসা পূরণের জন্য যেখানে সেখানে বেপরোয়া হামলা চালাচ্ছে, হুমকি দিচ্ছে, অন্য দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব পদদলিত করছে। অন্য দিকে চিনও প্রতিবিপ্লবের মধ্য দিয়ে সমাজতন্ত্র ধ্বংস করে শক্তিশালী সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র হয়ে এখন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মান সাম্রাজ্যবাদীরা এদের তুলনায় দুর্বল। অপেক্ষাকৃত ছোট হলেও ভারতীয় পুঁজিবাদও সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র অর্জন করে বিভিন্ন দেশে পুঁজি রপ্তানি করছে, অন্য দেশের কারখানায়, খনিতে পুঁজি বিনিয়োগ করছে। ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদ আমেরিকা, চিন, ইউরোপ ও রাশিয়ার সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে বোঝাপড়া করে চলছে। আজ বিশ্বের নানা জায়গায় সামরিক উত্তেজনা, আঞ্চলিক যুদ্ধ চলছে। এর সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী দেশ শামিল হচ্ছে। এ ছাড়া বাণিজ্য যুদ্ধ, শুল্কযুদ্ধ প্রবল ভাবে চলছে। এই যুদ্ধও এক ধরনের যুদ্ধ, অন্যের বাজার দখলের লড়াই। এক দিকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, অন্য দিকে চিন সাম্রাজ্যবাদ বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী দেশই সামরিক উৎপাদনের উপর জোর দিচ্ছে। ফলে বিশ্ব জুড়ে এক বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্ব জুড়ে পুঁজিবাদবিরোধী বিক্ষোভ
এ দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ গোটা সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী দুনিয়া চূড়ান্ত সংকটগ্রস্ত। বাজার ক্রমসংকুচিত, লকআউট, ক্লোজার, ছাঁটাই, বেকারি, মূল্যবৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি ইত্যাদি সংকটে এই দেশগুলি জর্জরিত। সমাধানের কোনও রাস্তা নেই। আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান– সব দেশেই প্রচণ্ড শ্রমিক বিক্ষোভ চলছে। এই কয়েক বছর আগে আমেরিকায় হয়ে গেল ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ আন্দোলন। ওয়াল স্ট্রিট হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদীদের ব্যবসার কেন্দ্রস্থল। সেই আন্দোলন কয়েক মাস ধরে চলল– হাজার হাজার ছাত্র-যুবক সেই জায়গা ঘেরাও করে রাখল। আবার সম্প্রতি কয়েক দিন আগে হল ‘নো কিংস’ আন্দোলন। মানে ট্রাম্প হল কিং– তাকে চাই না। ট্রাম্প হল সাম্রাজ্যবাদের প্রতিভূ, তারই বিরুদ্ধে বিক্ষোভ। দেশে দেশে প্রচণ্ড বিক্ষোভ হচ্ছে। আজ উন্নত সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলিতেও বিপ্লবের অবজেকটিভ কনডিশন তৈরি, কিন্তু সাবজেকটিভ কনডিশন প্রস্তুত নয়, অর্থাৎ বিপ্লবী আদর্শ, বিপ্লবী দল হয় নেই, না হয় দুর্বল।
সমাজতন্ত্রই মানবসভ্যতার রক্ষক
লেনিন রাশিয়ায় যে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেটা বিশ্বের প্রথম সমাজতন্ত্র। যাকে লেনিনের উপযুক্ত ছাত্র মহান স্ট্যালিন শক্তিশালী করে গড়ে তুলেছিলেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়, ফ্যাসিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে ত্রাতা হিসাবে প্রবল ভরসা নিয়ে সোভিয়েট ইউনিয়নের দিকে তাকিয়েছিলেন মনীষী রমাঁ রলাঁ, বার্নার্ড শ, আইনস্টাইন, রবীন্দ্রনাথরা। তাঁদের আশা ছিল, জার্মানি-ইটালির ফ্যাসিস্ট শক্তিকে পরাস্ত করে মানবসভ্যতাকে একমাত্র সোভিয়েট ইউনিয়নই বাঁচাতে পারে। সেই সোভিয়েট ইউনিয়ন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জার্মানি, ইটালি, জাপানকে পরাস্ত করেছিল, পূর্ব ইউরোপকে মুক্ত করেছিল। পূর্ব ইউরোপে কমিউনিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এ দিকে চিনে মহান মাও সে তুংয়ের নেতৃত্বে জনগণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। সমাজতন্ত্রের পথে এগোচ্ছিল তারা। ফলে একটা সমাজতান্ত্রিক দুনিয়া গড়ে উঠেছিল। সাম্রাজ্যবাদ তখন ভয়ে কাঁপছে। আমাদের কৈশোরে, যৌবনে আমরা এই পরিবেশ পেয়েছিলাম। একদিকে একটা সমাজতান্ত্রিক শিবির– রাশিয়া, পূর্ব ইউরোপ, চিন, উত্তর কোরিয়া– এই সব দেশ নিয়ে। আবার আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকায় সমাজতান্ত্রিক শিবিরের মদতে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা আন্দোলন, মুক্তি সংগ্রাম চলছে। ফলে একটা অন্য পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু রাশিয়ার অভ্যন্তরে পরাজিত যে পুঁজিবাদ, যে পুঁজিবাদ সম্পর্কে লেনিন হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, সেই পুঁজিবাদ প্রতিবিপ্লবের দ্বারা সমাজতন্ত্রকে ধ্বংস করল। একই ভাবে চিনে ও পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্র ধ্বংস হল। কী ভাবে এই প্রতিবিপ্লব সংগঠিত হল এবং আগামী দিনে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এর থেকে কী শিক্ষা নেবে, এ সম্পর্কে আমি মার্ক্সের শিক্ষা, লেনিন, স্ট্যালিন, মাও সে তুংয়ের শিক্ষা, বিশেষ করে কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষা নিয়ে একটা আলোচনা কিছু দিন আগে করেছি। সেই বিষয়ে আজ বিশেষ ভাবে ব্যাখ্যা করতে চাইছি না, অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে। একটা বুকলেট বেরিয়েছে। কিন্তু এই বিষয়টি সকলের জানা দরকার, ভাল করে বোঝার জন্যে।
এস ইউ সি আই (সি) হচ্ছে বিপ্লবী বামপন্থী দল
বিভিন্ন দেশে মানুষ লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত। লড়ছেও। কয়েক বছর আগে দিল্লির কৃষক আন্দোলনে ৭০০ লোক প্রাণ দিল। আমাদের যত দূর শক্তি আছে, এই আন্দোলনে নিযুক্ত করেছিলাম। আপনারা জানেন, সিপিএম, সিপিআই এখন কোনও আন্দোলনে তেমন ভাবে নেই। তারা শুধু ভোটে কার সাথে গেলে কোথায় কটা সিট পাবে এই মতলবেই চলছে– এই হচ্ছে এখন তাদের একমাত্র রাজনীতি। পাঁচের দশকে, ছয়ের দশকে ওরা লড়াইয়ে আসত। ওদের সংস্কারবাদী রিফর্মিস্ট লাইন, আর আমাদের রেভোলিউশনারি লাইনে দ্বন্দ্ব হত। সরকারে আসার পর থেকে সেই সংগ্রামী চরিত্র যতটুকু ছিল, তারা আজ তা সম্পূর্ণ হারিয়েছে। আজ তারা সংগ্রামবিমুখ, ভোটসর্বস্ব পার্টি। বামপন্থার মধ্যেও পার্থক্য আছে। তারা সংশোধনবাদী বামপন্থী। আর আমরা বিপ্লবী বামপন্থী। আমরা আমাদের সাধ্যমতো রাজ্যে রাজ্যে নানা আন্দোলন গড়ে তুলছি।
লেনিনের শিক্ষার তাৎপর্য উপলব্ধি করে পার্টিকে শক্তিশালী করুন
তাই আমাদের শক্তি বাড়াতে হবে। ভারতবর্ষে আমাদের পার্টি বাড়ছে এ কথা ঠিক। রাজ্যে রাজ্যে আমাদের সংগঠন গড়ে উঠছে। কিন্তু সংখ্যায় বাড়লেই হবে না। কমরেড শিবদাস ঘোষ এমন ধরনের চরিত্র চেয়েছিলেন, যারা ঘরবাড়ি-সম্পত্তি-আরাম-আয়েশ সব কিছু পরিত্যাগ করে– শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থই একমাত্র স্বার্থ, বিপ্লবই একমাত্র স্বার্থ, পার্টির স্বার্থই একমাত্র স্বার্থ– এ ভাবে দলের স্তরে স্তরে নেতা-কর্মী হিসাবে গড়ে উঠবে, পার্টির তত্ত্ব আয়ত্ত করবে। যারা পাড়ায় পাড়ায় মিশবে, জনগণের নেতা হবে।
উন্নত চরিত্র গুণে, যুক্তির শক্তিতে গ্রামে, শহরে, কলকারখানায়, অফিসে, শ্রমিকদের মধ্যে, গরিব কৃষক-খেতমজুরদের মধ্যে, ছাত্র-যুবক-মহিলাদের মধ্যে বিপ্লবী রাজনীতি নিয়ে যাবে, নানা দাবিতে শ্রেণি সংগ্রাম ও গণআন্দোলন গড়ে তুলবে, সংগ্রামের হাতিয়ার গণকমিটি ও ভলান্টিয়ার বাহিনী গড়ে তুলবে। এই ভাবেই আগামী দিনে ভারতবর্ষে পুঁজিবাদবিরোধী সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রস্তুতি গড়ে তুলবে।
মনে রাখবেন, মহান মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ-শিবদাস ঘোষের চিন্তাধারায় আমাদের দলের শক্তিবৃদ্ধি প্রয়োজন শুধু এ দেশের বিপ্লবের প্রয়োজনেই নয়, বিশ্বের বিপ্লবী আন্দোলনকে শক্তিশালী করার জন্যও তা প্রয়োজন। এটা আমাদের আন্তর্জাতিক দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনের মধ্যেই রয়েছে মহান লেনিনের প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন।
লেনিনের শিক্ষার তাৎপর্য বুঝে, কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষাকে স্মরণ করে আপনারা পার্টিকে শক্তিশালী করুন, শ্রেণিসংগ্রাম গড়ে তুলুন, বিপ্লবী আন্দোলন গড়ে তুলুন। এ কথা বলেই আমি শেষ করছি।
গণদাবী ৭৮ বর্ষ ৩০ সংখ্যা ৬ মার্চ ২০২৬ ও ৭৮ বর্ষ ৩১ সংখ্যা ১৩ মার্চ ২০২৬ ডিজিটাল