সংবিধানে ‘সমাজতান্ত্রিক’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দ যোগ — কংগ্রেসের কৌশল, বিজেপির বিড়ম্বনা

 সংবিধানের প্রস্তাবনা থেকে ‘সমাজতান্ত্রিক’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দ দুটি বাদ দেওয়ার পক্ষে কিছুদিন ধরে সওয়াল করছেন আরএসএস এবং বিজেপি নেতারা। আরএসএস-এর সাধারণ সম্পাদকের পর বিজেপি নেতা তথা উপরাষ্ট্রপতিও ভারতের সংবিধান থেকে শব্দ দুটি বাদ দেওয়ার জন্য জোর সওয়াল করেছেন। বোঝা যায় এই শব্দ দুটিতে আরএসএস-বিজেপির ঘোর আপত্তি। কিন্তু কেন?

এ সম্পর্কে আরএসএস-বিজেপির় প্রথম যুক্তি, ১৯৭৬-এ কংগ্রেস নেত্রী ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থা জারি করে বিরোধী নেতাদের জেলে পুরে রেখে জোর করে এই শব্দ দুটি সংবিধানের প্রস্তাবনায় যুক্ত করে দিয়েছেন। দ্বিতীয় যুক্তি– সমাজতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা হল পাশ্চাত্যের কট্টর এবং নেতিবাচক ধারণা, যা ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খায় না।

প্রসঙ্গত, এই শব্দ দুটি সংবিধান থেকে বাদ দেওয়ার আর্জি জানিয়ে আরএসএস-বিজেপির উদ্যোগে দায়ের করা বেশ কয়েকটি মামলা খারিজ করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। তার পরেও তারা ফের এই প্রসঙ্গ তুলছে। যদিও সংবিধানে গণতন্ত্র, জনগণের অধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা ইত্যাদি বিষয়ে লেখা যাই থাক, তাতে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণে, সরকারের সমালোচকদের বিনা বিচারে মিথ্যা মামলায় জেলে পুরতে বিজেপির কি কোনও অসুবিধা হচ্ছে? কংগ্রেসেরও তা হয়নি। সংবিধানে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দটির জন্য কংগ্রেসের যেমন সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করতে কোনও অসুবিধা ছিল না, বিজেপিরও কার্যত কোনও অসুবিধা হচ্ছে না। আবার ‘সমাজতান্ত্রিক’ শব্দটিকে রেখেই কংগ্রেস এবং বিজেপি দুটি দলই ভারতে পুঁজিপতি শ্রেণির মুখ্য সেবাদাস হিসাবে দেশের সাধারণ মানুষের ওপর তাদের বেলাগাম শোষণ চালানোর অবাধ ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। কারণ তারা জানে, ‘সমাজতান্ত্রিক’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দ দুটি সংবিধানের অন্যান্য বহু অধিকারের মতো শুধুই কথার কথা।

প্রসঙ্গঃ সমাজতন্ত্র

ইন্দিরা গান্ধী সমাজতান্ত্রিক শব্দটি সংবিধানে ঢুকিয়েছিলেন কেন? ভারতীয় পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থে স্বাধীনতার পর থেকে কংগ্রেস সরকার যে অত্যাচারী শাসন-শোষণ চালিয়ে এসেছে তার বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ তখন তুঙ্গে। এ দিকে বিশ্বে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উন্নত মান, তাদের উন্নত জীবনধারা ভারতের খেটে খাওয়া মানুষকে যে প্রবল আকর্ষণ করে তা পুুঁজিপতিরাও অস্বীকার করতে পারে না। এই সময় ইন্দিরা গান্ধীর প্রধানমন্ত্রিত্বে ভারত সরকার ব্যাঙ্ক, বিমা ইত্যাদি রাষ্ট্রীয়করণ করে। এই পদক্ষেপ ছিল রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে পুঁজিকে কেন্দ্রীভূত করার মাধ্যমে বৃহৎ পুঁজি মালিকদের সাহায্য করার জন্যই। রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া পুঁজি এর ফলে শক্তিশালী হয়। কিন্তু এর আসল চরিত্রকে আড়াল করতে প্রচারমাধ্যম সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির জাতীয়করণের সাথে এর তুলনা করতে থাকে, যাতে সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দেওয়া যায়। সিপিআই-সিপিএমের মতো বামপন্থী দলগুলিও পুঁজিপতি শ্রেণি ও কংগ্রেসের প্রকৃত মতলবকে উন্মোচিত না করে একে ‘সমাজতন্ত্রের দিকে’ পদক্ষেপ বলে অভিহিত করে। এই সময় ১৯৭৫-এ ইন্দিরা গান্ধীর নির্বাচনকে বেআইনি বলে রায় দেয় এলাহাবাদ হাইকোর্ট। এই রায় এড়িয়ে গদি ধরে রাখতে ১৯৭৫-এর ২৫ জুন ইন্দিরা গান্ধী ঘোষণা করেন ‘জরুরি অবস্থা’। ১৯৭৬-এ ৪২তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারবিভাগের ক্ষমতা খর্ব করা ও আমলাতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা বৃদ্ধি করা হয়। পাশাপাশি জনমানসে নিজের স্বৈরাচারী মুখকে আড়াল করতে ইন্দিরা গান্ধী কিছু কিছু প্রগতিশীল স্লোগান দিতে থাকেন। এই সময়েই তিনি সংবিধানের প্রস্তাবনায় ‘সমাজতান্ত্রিক’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দ দুটি যুক্ত করেন। জাতীয় ঐক্যের সাথে ‘সংহতি’ শব্দটিও ঢোকানো হয়। যদিও ইন্দিরা গান্ধী নিজেই পুঁজিপতিদের আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন, সমাজতন্ত্র নিয়ে তাঁরা যেন ভয় না পান। তিনি বলতেন, ‘তোমরা আমায় সমাজতন্ত্রী বলে ডাকতে পারো… আমার দারিদ্র দূর করার কথাকে কারও সমাজতন্ত্র মনে হতে পারে, কিন্তু এই শব্দটার ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক হলে আমি বলতে চাই, আমি এই শব্দটার দিকে তাকাতেও চাই না। আমি এই রকম কোনও শব্দে আদৌ বিশ্বাস করি না’ (ব্লেমা স্টেইনবার্গঃ উইমেন ইন পাওয়ার, দ্য পার্সোনালিটিজ অ্যান্ড লিডারশিপ স্টাইলস অফ ইন্দিরা গান্ধী, গোষ্প্র মেয়ার অ্যান্ড মার্গারেট থ্যাচার)। যতদিন সমাজতান্ত্রিক শিবির ছিল, ততদিন ভারতীয় বুর্জোয়া শাসকরা শ্রমিক-কৃষক-খেটে খাওয়া মানুষের ওপর শোষণের স্টিম রোলার চালাতে চালাতেও কিছু কিছু সামাজিক সুরক্ষা, গণতান্ত্রিক অধিকার, যথেচ্ছ ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে শ্রমিকের রক্ষাকবচ ইত্যাদি চালু রাখতে বাধ্য হত। পুুঁজিপতিরা চাইলেও সরকার একেবারে এ সব বাতিল করে দিতে পারেনি। সমাজে ক্রমবর্ধমান আর্থিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে জনগণের বিক্ষোভকে এর সাহায্যে কিছুটা স্তিমিত করতে চেয়েছে তারা। ফলে ভারতীয় সংবিধানে ‘সমাজতান্ত্রিক’ শব্দ যোগ করাটা ছিল খেটে-খাওয়া মানুষকে ঠকানোর জন্য শাসক বুর্জোয়া শ্রেণির নিছক একটা কৌশল। অন্য দিকে, খেটে-খাওয়া মানুষের কাছে শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক সমাজ এবং উন্নত জীবনই আকাঙক্ষার বস্তু। এই আকাঙক্ষার শক্তিকে আজও বুর্জোয়া রাষ্ট্রের কর্ণধাররা যে একেবারে উপেক্ষা করতে পারে না, সম্প্রতি তার প্রমাণ আবার পাওয়া গেল, যখন সংবিধান থেকে সমাজতন্ত্র বাদ দেওয়া নিয়ে বিজেপি ঘনিষ্ঠদের মামলায় সুপ্রিম কোর্ট এই প্রসঙ্গে বলল–এ দেশে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা কিংবা ব্যক্তিমালিকানা উচ্ছেদের ইচ্ছা থেকে ‘সমাজতান্ত্রিক’ শব্দটি সংবিধানে লেখা হয়নি। শব্দটি থাকা দরকার এই জন্য যাতে মানুষের মনে এই আশাটুকু জাগিয়ে রাখা যায় যে, রাষ্ট্র ধনবৈষম্য দূর করতে না পারুক, তা অন্তত করতে চায়। ভারতীয় পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের রক্ষাকর্তা হিসাবে সুপ্রিম কোর্টের এই পর্যবেক্ষণ দেখিয়ে দিচ্ছে, ‘সমাজতন্ত্রের ভূত’ সেই মার্ক্সের সময় থেকে শুরু করে আজও বুর্জোয়া শাসকদের কী ভাবে তাড়া করে বেড়াচ্ছে! রাষ্ট্রের কর্ণধাররা জানেন, তাঁদের শত বিষোদগার সত্ত্বেও খেটে-খাওয়া মানুষের মন থেকে শোষণমুক্তির আকাঙক্ষা আর সমাজতন্ত্রের স্বপ্নকে মুছে দেওয়া অসম্ভব। তাহলে বিজেপি এই নিয়ে আসর গরম করছে কেন? আসলে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ভোটবাজারের চ্যাম্পিয়ন সাজতে এবং একই সাথে সমাজতন্ত্রের সাথে সুকৌশলে ইন্দিরা জমানার স্বৈরাচারী শাসনকে এক করে দেখানোর হীন উদ্দেশ্যে তারা এই জিগির তুলছে। কিন্তু যদি তারা সংবিধানের পাতা থেকে ‘সমাজতন্ত্র’ কথাটা মুছে দিতে সফলও হয়, কোনও শক্তির সাধ্য নেই খেটে খাওয়া মানুষের মন এবং আগামী দিনের মুক্তি আন্দোলনের পথরেখা থেকে তা মুছে দেয়।

প্রসঙ্গঃ ধর্মনিরপেক্ষতা

একই ভাবে, সেকুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতা কথাটা নিয়েও নানা বিভ্রান্তি ছড়ানো চলছে। মনে রাখা দরকার, এ ধারণা কমিউনিস্টরা গড়ে তোলেনি। সমাজ বিকাশের ধারাতেই ধর্মভিত্তিক সামন্তী রাষ্ট্রকে পিছনে ফেলে আরও উন্নত এই গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা এসেছে। ধর্মের ভিত্তিতে এই রাষ্ট্র বিকশিত হয় না। হলে ইউরোপের ক্রিশ্চান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলি সকলেই ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে উঠত না। সামন্তী যুগে রাজা বা সামন্তপ্রভুরা ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসাবে নিজেদের তুলে ধরে শাসন করত। সমাজে সম্পত্তির মালিকানা ছিল রাজার। তাদের শক্তি ছিল ধর্মান্ধতা, ধর্মপ্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের অন্ধ আনুগত্য। এর বিরোধিতা করে নতুন উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের স্বার্থে প্রয়োজন ছিল সম্পত্তির ওপর ব্যক্তির অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। এর থেকেই এসেছে নবজাগরণ বা রেনেসাঁস, এসেছে গণতন্ত্রের ধারণা। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল চার্চ বা অন্য ধর্মপ্রতিষ্ঠানের আধিপত্য থেকে তাকে মুক্ত রাখা। তাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ধারণা বলে– রাষ্ট্র কোনও ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করবে না, কোনও ধর্মকে উৎসাহ দেবে না, কোনও ধর্মকে বাধাও দেবে না। ধর্ম কেবলমাত্র ব্যক্তিগত বিশ্বাসের জায়গায় থাকবে। কেউ চাইলে তা মানতে পারে, আবার কোনও ধর্ম, এমনকি ঈশ্বরের অস্তিত্বকে না মেনেও কেউ চলতে পারে। এ ভাবেই গণতান্ত্রিক রাষ্টে্রর ধারণার সাথে যুক্ত হয়েই ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণার উদ্ভব হয়েছিল। ইউরোপে এর জন্ম হলেও একে কোনও মতেই বিদেশি মতবাদ বলা চলে না। দ্বিতীয়ত, ভারতের মতো একটি বহু ধর্ম অধ্যুষিত দেশে রাষ্ট্র ধর্মনিরপেক্ষ না হলে অবধারিতভাবে তার পক্ষে গণতান্ত্রিক হওয়াও অসম্ভব। রাষ্ট্রনায়করা যদি কোনও একটি বিশেষ ধর্মের প্রতি বেশি অনুরক্ত হন, তাহলে তাঁদের অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষের প্রতি নিরপেক্ষ সমদৃষ্টি রাখা সম্ভব নয়। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের যে মূল লক্ষ্য, সকলের জন্য সমান সুযোগ, তা থেকে ভিন্ন ধর্মের মানুষরা বঞ্চিত হবেনই। এই পথেই জায়গা করবে সাম্প্রদায়িক বৈষম্যের দৃষ্টিভঙ্গি। তা ছাড়া ভারতে শাসকদলগুলি যেভাবে ভোটের স্বার্থে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ঘটাতে বিদ্বেষ ছড়ায়, সেখানে ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার বিকাশ ক্রমাগত না বাড়াতে পারলে সমাজকে ধর্মীয় বিভেদ থেকে মুক্ত করে ঐক্য সংহতি রক্ষা করাই হবে দুরূহ। বিজেপি নেতারা বলে থাকেন ভারতে যেহেতু হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ তাই এ দেশটাকে হিন্দুরাষ্ট্রে পরিণত করতে বাধা নেই। ইতিহাসের শিক্ষা মানলে এ কথা তাঁরা বলতে পারতেন না। তাঁরা ভুলিয়ে দিতে চাইছেন যে, এই ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে এক যোগে লড়াই করেছে। এই সংগ্রামের মূল সুরটি ছিল ধর্মনিরপেক্ষ। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, ভগৎ সিং, চন্দ্রশেখর আজাদ, আসফাকউল্লা খানের মতো আপসহীন ধারার সংগ্রামীরা, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, নজরুলের মতো শিল্পী-সাহিত্যিকরা এই আদর্শটিকেই তুলে ধরেছেন। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু সুস্পষ্ট ভাষায় হিন্দুরাজের ধ্বনির তীব্র বিরোধিতা করেছেন।

কিন্তু জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণির পৃষ্ঠপোষকতায় ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্ততান্ত্রিক চিন্তার সাথে আপসকামী ধারাই প্রাধান্য বিস্তার করেছিল। বিপ্লবভীত জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণি এটাকেই মূলত সাহায্য করেছে। ফলে ভারতীয় জাতীয়তা বোধের সাথে ধর্মীয় বিভেদ, প্রাদেশিকতা, জাতপাতের বিভেদ খাদ হয়ে মিশে থেকেছে। যদিও স্বাধীনতার পর বুর্জোয়া শাসকরা যতই ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার সাথে আপস করুন, স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপ্লবী আপসহীন ধারার রেশ মানুষের মধ্যে কাজ করায় দেশের মানুষের সামনে নেতাদের ধর্মনিরপেক্ষ থাকার কথা বলতে হয়েছে। যদিও তাঁরা এর প্রকৃত অর্থ থেকে সরে গিয়ে সব ধর্মকে সমান উৎসাহদানের মতো পর্যায়ে বিষয়টিকে ঠেলে দিয়েছেন। তাঁরা প্রচার করতে থাকেন, এটাই নাকি ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষতা! ভাবখানা এমন যে প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতা বিষয়টা বিদেশি, ভারতে তা চলে না। যেন কোনও বিশ্বজনীন আদর্শ, বিজ্ঞানের আবিষ্কার ইত্যাদির মর্মার্থ সারা বিশ্বের থেকে ভারতে এসেই অলাদা হয়ে যায়! যদিও এই সব নেতারা গাড়ি চড়েন বিদেশি, এমনকি ঘড়ি চশমা পর্যন্ত তাঁদের বিদেশি। যে সংসদীয় গণতন্ত্রের সুফল ভোগ করে তাঁরা বিলাসবহুল জীবন কাটান, সেই গণতন্ত্রের উৎসও ইউরোপে। এতে তাঁদের কোনও অসুবিধা নেই, অসুবিধা শুধু ধর্মনিরপেক্ষতাকে গ্রহণ করতে!

ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে বিজেপির এই ভণ্ডামিতে বিজেপির সুবিধা করে দিয়েছে কংগ্রেসই। তারা স্বাধীনতার পর থেকে ভোটব্যাঙ্ক রাজনীতির স্বার্থে কখনও হিন্দুত্ববাদে ইন্ধন দিয়েছে, কখনও সংখ্যালঘু ভোট পাওয়ার জন্য তাদের ত্রাতা সাজতে চেয়েছে। যে ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থার সময় ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি সংবিধানের প্রস্তাবনায় ঢুকিয়েছেন বলে আরএসএস-বিজেপির এত আপত্তি, সেই ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থার আগে থেকেই বলতে শুরু করেছিলেন, আমরা এতদিন সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়িয়েছি, তারা আমাদের ভোট দেয়নি। এখন থেকে আমি সংখ্যাগুরু হিন্দুকে দেখব। ১৯৮০-র লোকসভা নির্বাচনে এই ইন্দিরা গান্ধীকেই পুরোপুরি সমর্থন জানিয়েছিল আরএসএস। এই কংগ্রেসই বাবরি মসজিদ বিতর্ক খুঁচিয়ে তুলতে তার তালা খুলেছিল। ইন্দিরা গান্ধীর যেমন সমাজতন্ত্র নিয়ে কোনও মাথাব্যথা ছিল না, ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়েও ছিল না। তিনি নিজের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের চেষ্টায় প্রগতিশীল সাজতে শব্দ দুটি নিয়ে খেলা করেছেন। এ দিকে নিজে ভোটের স্বার্থে কখনও আরএসএস, কখনও নানা হিন্দু ধর্মগুরুর পা মাথায় ঠেকিয়েছেন, কখনও মুসলিম মৌলবাদীদের তোষণ করেছেন। সবটাই ছিল তাঁর ভোট কৌশল।

বিজেপি এখন এ নিয়ে এত হইচই তুলছে কেন? একই কারণ– ভোট কৌশল। তারা মানুষের কাছে ভোট চাইতে দাঁড়াবে কী নিয়ে? এমন কোনও কাজের কথা বলতে তারা অক্ষম যেটা জনস্বার্থ রক্ষায় বিজেপি করেছে। একটি অ্যাজেন্ডাই তাদের বেঁচে আছে– হিন্দুত্বের ত্রাতা সাজা। যদিও হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে মোদি সরকারের জনবিরোধী ভূমিকায় মানুষের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। ফলে ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে জিগির তুলে আরএসএস-এর হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে ফেরি করে তারা পরবর্তী ভোট উতরোতে চাইছে। চেষ্টা– যদি এতে হিন্দু কূলতিলক সাজা নরেন্দ্র মোদির গায়ে লেপ্টে থাকা স্বৈরাচার এবং অপশাসনের কাদা মুছে ফেলা যায়। অবশ্য এই ক্ষেত্রে বিজেপির একটা বিড়ম্বনা আছে। একদিকে এই বিশাল দেশে অসংখ্য ভাষা, ধর্ম, সম্প্রদায়, উপজাতির সব মানুষকে এক ছাঁচে ঢালার চেষ্টা যে ব্যর্থ হবেই এ সত্য তারাও অস্বীকার করতে পারে না।

সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষ নিজেদের জীবনধারার স্বাভাবিক ছন্দেই ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে মিলেমিশে আছেন বহুকাল। নেতারা চাইলেই তাঁরা সব একে অপরকে শত্রু জ্ঞানে পরস্পরের গলায় ছুরি বসাতে শুরু করবেন, এটা দিবাস্বপ্ন! এ ছাড়া দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের মনীষীদের চিন্তার ছোঁয়া আজও ভারতের মাটিতে লেগে আছে। বিজেপির রাজনীতি যেখানে বারবার বাধা পায়। ফলে মাঝে মাঝে প্রধানমন্ত্রীকেও ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’ ইত্যাদি বলতে হয়। তাই চাইলেও বিজেপি জনমানস থেকে ধর্মনিরপেক্ষতাকে মুছে দিতে পারছে না। তাই ইন্দিরা গান্ধীর স্বৈরাচারী জরুরি অবস্থার সাথে ‘সমাজতন্ত্র’ আর ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দ দুটিকে সমার্থক করে দেখিয়ে এর বিরুদ্ধে প্রচারে নেমেছেন তাঁরা।

বিজেপি নেতাদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া যাক হিন্দু ধর্মের অন্যতম প্রবক্তা, স্বামী বিবেকানন্দের একটা কথা– ‘এখন ভারতে আধুনিক যুগ। কী ভাবে জনগণের মধ্যে সেকুলার জ্ঞানের বিস্তার হয়, সেটাই গুরুতর প্রশ্ন’ (জনগণের অধিকার, পৃষ্ঠা ৬২)। বিজেপি নেতারা বিবেকানন্দের বইটা অন্তত একবার পাতা উল্টে দেখবেন নাকি!