
মোদি সরকার ২১ নভেম্বর ৪টি শ্রম কোড চালু করে দিল। শ্রমিকদের তীব্র প্রতিবাদ অগ্রাহ্য করে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার ১৮ ডিসেম্বর ২০২০ থেকে মজুরি কোড-২০১৯, সামাজিক সুরক্ষা কোড ২০২০-র বিভিন্ন ধারা গেজেট বিজ্ঞপ্তি করে চালু করে দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত এ বছর ২১ নভেম্বর গেজেট বিজ্ঞপ্তি জারি করে শিল্প সম্পর্কিত কোড ও পেশাগত নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য এবং কর্ম পরিবেশ কোড-২০২০-র সম্পূর্ণ অংশ, মজুরি কোড ও সামাজিক সুরক্ষা কোডের বাকি অংশ চালু করে দিয়েছে। ফলে ২১ নভেম্বর থেকে চারটি কোড সম্পূর্ণ রূপে চালু হয়ে গেল। শ্রমিকদের স্বার্থে যে শ্রম আইনগুলি ছিল একে একে সব বাতিল করে দিল মোদি সরকার।
রুলস-এর গেজেট-বিজ্ঞপ্তি না করা নিয়ম বিরোধী
স্বাধীনতার আগে ও পরে এতদিন পর্যন্ত প্রচলিত নিয়ম ছিল কেন্দ্রীয় শ্রম আইনের ক্ষেত্রে প্রথমে লোকসভা ও পরে রাজ্যসভায় আইন পাশ করিয়ে, তার পর ওই আইনের কেন্দ্রীয় রুলসকে গেজেট-বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কার্যকর করতে হবে। রুলস গেজেট-বিজ্ঞপ্তি জারি করতে না পারলে আইনকে কার্যকর করা সম্ভব নয়। বিজেপি সরকার এ বারই প্রথম এই নিয়মের কোনও তোয়াক্কা না করে রুলসের গেজেট-বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করে শ্রমকোড চালু করে দিয়েছে। উল্লেখ্য, শ্রম আইন সংবিধানে কেন্দ্র ও রাজ্য যৌথ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। কেন্দে্রর রুলসের গেজেট-বিজ্ঞপ্তি জারি হওয়ার পর রাজ্যগুলি নিজস্ব রুলস তৈরি করবে– এটাই নিয়ম। রুলস ছাড়া আইন কার্যকর হওয়া সম্ভব নয়। তাই কেন্দ্র ও রাজ্য রুলস তৈরি করে গেজেট-বিজ্ঞপ্তি জারির পর কেন্দ্র ও রাজ্যে আইন কার্যকর হবে। যদিও মোদি সরকার ২০২০ সালে ড্রাফট-রুল তৈরি করে জনসমক্ষে এনেছিল, কিন্তু প্রবল শ্রমিক বিক্ষোভের ফলে তা আজও গেজেট-বিজ্ঞপ্তি হিসাবে প্রকাশ করতে পারেনি। তাই মালিকদের স্বার্থে কেন্দ্রীয় সরকার নিয়ম ভেঙে শ্রমকোড চালু করে দিয়েছে।
মালিকরা খুশি
শ্রম কোড চালু করার সাথে সাথেই বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শিল্প সংস্থার কর্তারা একে শ্রম আইনের নজিরবিহীন সংস্কার বলে স্বাগত জানিয়েছেন। অন্য দিকে, ওই দিন এআইইউটিইউসি সহ দশটি কেন্দ্রীয় শ্রমিক সংগঠন শ্রমিকস্বার্থ বিরোধী কালা শ্রম কোড বাতিলের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে।
সংসদে আলোচনার সুযোগ দেওয়া হয়নি
কেন্দ্রীয় সরকার মালিক শ্রেণির সামগ্রিক স্বার্থে ২০২০ সালে ২০১৯ সালের মজুরি কোড সহ বাকি তিনটি কোড লোকসভা ও রাজ্যসভায়় প্রায় কোনও আলোচনার সুযোগ না দিয়েই সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ও লকডাউনের সুযোগে পাশ করিয়ে নিয়ে গেজেট-বিজ্ঞপ্তি জারি করে দিয়েছিল। কিন্তু ড্রাফট রুলসের গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ সম্ভব হয়নি। তাই কেন্দ্রীয় সরকার ঘুরপথে মজুরি কোডের ৪২(১), ৪২(২), ৪২(৩), ৪২(১০), ৪২(১১), ৬৭(২)এস, ৬৭(২)টি, এবং ৬৯ ধারা ১৮ ডিসেম্বর ২০২০ গেজেট-বিজ্ঞপ্তি দিয়ে চালু করে। ৩ মে ২০২৩, গেজেট বিজ্ঞপ্তি দিয়ে চালু করে সামাজিক নিরাপত্তা কোড ২০২০-র ১৪২ ধারা এবং ১৫(৩), ১৬(১)এ, ১৬(১)বি, ১৬(২), ১৪৩, ১৬৪(১) আইটেম (ও), ১৬৪(২)বি ধারা। শুধু তাই নয়, ওই দিনই ‘এমপ্লয়িজ প্রফিডেন্ট ফান্ডস অ্যান্ড মিসলেনিয়াস প্রভিশন অ্যাক্ট-১৯৫২’, বাতিল করে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। ফলে কেন্দ্রীয় সরকার ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকেই চুপিসারে ধূর্ততার সাথে শ্রম কোড চালু করার কাজ করে চলেছে। শুধু সময় ও সুযোগ খুঁজছিল, কখন সম্পূর্ণ কোড চালু করবে। শেষ পর্যন্ত ২১ নভেম্বর, ২০২৫ তারা শ্রম কোড চালুর বিজ্ঞপ্তি জারি করল। ফলে শ্রমিকদের শোষণ, বঞ্চনা ও মালিকি অত্যাচার আরও তীব্র হবে।
আগে কোডের বিভিন্ন অংশ চালু করার সময় কেন্দ্রীয় সরকার কোনও ধরনের প্রচার করেনি। এ বার কিন্তু বিরাট ঢাক-ঢোল পিটিয়ে কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রী সহ সরকার ব্যাপক প্রচারে নেমেছে এটা বোঝাতে যে এই শ্রম কোড শ্রমিকদের কত ধরনের সুযোগ-সুবিধা, নিরাপত্তা ও অধিকার দেবে! বিজ্ঞাপনী এই প্রচারেই সাধারণ জনগণের করের কোটি কোটি টাকা খরচ করছে কেন্দ্রীয় শ্রম দপ্তর।
৮-১২ ঘণ্টা শ্রমদিবস
তারা যে ভাবে প্রচার করছেন, তা চালাকি ও শঠতায় ভরা। শুধু তাই নয়, কোডে যা ছিল না, তাও বিজ্ঞপ্তিতে দেওয়া হয়েছে। যেমন, কাজের সময় বলা হয়েছিল শ্রমিকদের ৮ ঘণ্টা করে সপ্তাহে ছয় দিন, মোট ৪৮ ঘণ্টা কাজ করতে হবে। কিন্তু ২১ নভেম্বর কেন্দ্রীয় শ্রম দপ্তর থেকে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে (বিড়ি শ্রমিকদের প্রসঙ্গ আলোচনায়) শ্রম দিবস হবে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা, কিন্তু সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টা। এর ফলে মালিকরা আইনের অজুহাতেই শ্রমিকদের এক কর্মদিবসে ১২ ঘণ্টা কাজ করাতে পারবে। এ ভাবে ঐতিহাসিক মে দিবসে লড়াইয়ে অর্জিত ৮ ঘণ্টার কাজের অধিকার কেড়ে নেওয়া হল। অন্য দিকে মালিকদের অবাধ অধিকার দেওয়া হল যাতে তারা ৮ ঘণ্টার বেশি শ্রমিকদের কাজ করিয়ে নিতে পারে।
ব্রিটিশ সরকার শ্রমিকদের যতটুকু অধিকার দিয়েছিল সেটাও হরণ করল মোদি সরকার
কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রী মনসুখ মাণ্ডব্য তাঁর একটি লেখায় বলেছেন, ‘ভারতের শ্রম আইনগুলি ১৯২০ থেকে ১৯৫০-র মধ্যে তৈরি করা হয়েছিল এবং ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে তৈরি হয়েছিল।’ তিনি আরও বলেছেন, বিভিন্ন রাজ্য, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল, কর্মী সংগঠন ও শিল্প মহল প্রগতিশীল নিয়ম-নীতিকে স্বাগত জানিয়েছে’। শ্রমমন্ত্রী উপনিবেশিক মানসিকতার প্রসঙ্গ তুলে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু দেশের সচেতন মানুষ জানেন, বিজেপির চিন্তাগত অভিভাবক আরএসএস ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতা করেছিল এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে কাজ করেছিল। এখন ঔপনিবেশিক মানসিকতার প্রসঙ্গ তোলা ভণ্ডামি ছাড়া কিছু নয়।
ভারতের শ্রমিকরা উনিশ শতকের আগে থেকেই মালিকদের শোষণ-জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছেন। তাঁরা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে শ্রমিক স্বার্থে শ্রম আইন তৈরির জন্যও লড়াই করেছেন। এই সময় মহান লেলিন ও স্ট্যালিনের নেতৃত্বে বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাশিয়াতে শ্রমিক শ্রেণির রাষ্ট্র গঠিত হয়। এই ঘটনা বিশ্বের অন্যান্য বহু দেশে শ্রমিকদের অনুপ্রাণিত করে ও তাঁদের লড়াই-সংগ্রামকে জোরদার করে। দেশে দেশে মালিকরা বিপ্লবের ভয়ে শ্রমিকদের সামান্য হলেও কিছু অধিকার দিতে বাধ্য হয় শ্রম আইনগুলোতে। এই সময় ব্রিটিশ সরকার ভারতে দি ওয়ার্কমেন্স কম্পেনসেশন অ্যাক্ট, ১৯২৩ এবং দি ট্রেড ইউনিয়নস অ্যাক্ট, ১৯২৬ চালু করতে বাধ্য হয়। এ বারের কোডে মালিকদের স্বার্থে দি ট্রেড ইউনিয়নস অ্যাক্ট, ১৯২৬-এর কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত শ্রমিক শ্রেণির রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের অসাধারণ বীরত্বপূর্ণ ভূমিকায় বহু দেশে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে। ১৯৪৯ সালে চিনে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ফলে সমাজতান্ত্রিক শিবির বিশাল শক্তি নিয়ে আবির্ভূত হয়। এর প্রভাবে বিশ্বের দেশে দেশে শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলন তীব্র হয়। বিশ্বের পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি শ্রমিক বিপ্লবের ভয়ে সমাজকল্যাণকামী রাষ্টে্রর কথা বলতে থাকে। এই সময়ে স্বাধীন ভারতে দি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিসপিউটস অ্যাক্ট ১৯৪৭, ন্যূনতম মজুরি আইন ১৯৪৮, দি এমপ্লয়িজ স্টেট ইনসিওরেন্স অ্যাক্ট ১৯৪৮, প্রফিডেন্ট ফান্ড অ্যাক্ট ১৯৫২, দি মাইনস অ্যাক্ট ১৯৫২ সহ বহু শ্রম আইন হয়। এই আইনগুলিতে সামান্য হলেও শ্রমিকদের অধিকার স্বীকৃতি পেয়েছিল। বিজেপি সরকার সে সবই হরণ করল।
শ্রম আইন নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের মিথ্যাচার
কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রী বলেছেন, কর্মী সংগঠনগুলি এই শ্রম কোডকে স্বাগত জানিয়েছে। বাস্তবে বিজেপির শ্রমিক সংগঠন বিএমএস ছাড়া দশটি কেন্দ্রীয় শ্রমিক সংগঠন সহ দলমত নির্বিশেষে প্রায় সকল শ্রমিক সংগঠনই কোডের বিরোধিতায় রাস্তায় নেমে আন্দোলন করেছে। কোড বাতিলের দাবিতে কয়েক বার ডাকা সর্বভারতীয় সাধারণ ধর্মঘট সফল হয়েছে। তাই কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর বক্তব্য সত্যের অপলাপ মাত্র শুধু নয়, শ্রমজীবী সহ সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার হীন কৌশলও।
কেন্দ্রীয় শ্রম দপ্তর ঢালাও প্রচার করছে, ‘সমস্ত ধরনের শ্রমিকদের জন্য এই প্রথম ন্যূনতম মজুরির ব্যবস্থা করা হয়েছে।’ আমাদের দেশে স্বাধীনতার পরের বছর ন্যূনতম মজুরি আইন ১৯৪৮ পাশ হয়। শ্রমিকরা তখন থেকে ন্যূনতম মজুরি পাওয়ার অধিকারী হন। বিভিন্ন রাজ্যের সরকার সেই রাজ্যের শ্রমিকদের অবস্থান অনুযায়ী শ্রমিক সিডিউল ঠিক করে এবং আইন অনুযায়ী ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করে। এই প্রক্রিয়ায় সমস্ত রাজ্যের প্রায় সমস্ত শ্রমিক ওই সিডিউলভুক্ত হয় এবং ন্যূনতম মজুরি পাওয়ার অধিকারী হয়। ফলে এই প্রথম ন্যূনতম মজুরির ব্যবস্থা হল– এটা ডাহা মিথ্যাচার।
কেন্দ্রীয় সরকার এ বার কোডে ন্যূনতম মজুরির থেকে কম ফ্লোর ওয়েজের ব্যবস্থা করেছে। এর সুযোগ নিয়ে মালিকরা শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির অনেক কম মজুরি নিতে বাধ্য করবে। বর্তমানে জাতীয় স্তরে ফ্লোর ওয়েজ দিনে মাত্র ১৭৮ টাকা। ফলে সকল শ্রমিককে ন্যূনতম মজুরির আওতায় আনা হল– এ কথা মিথ্যাচার ছাড়া আর কী?
বিজেপি সরকার আরও বলছে, ‘এই কোডের ফলে শ্রমিকদের সঠিক সময়ে প্রাপ্য বেতন পাওয়া নিশ্চিত করা হয়েছে, যা আগে ছিল না।’ এটাও সত্যের অপলাপ। ১৯৩৬ সালের আইন ‘দি পেমেন্ট অফ ওয়েজ অ্যাক্ট, ১৯৩৬’-এ পরিষ্কার বলা আছে– দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক বেতন মালিকরা সঠিক সময় দিতে বাধ্য, না হলে তাদের জরিমানা হবে। পুরুষ ও মহিলা সহ সকল শ্রমিকের সম কাজে সমান মজুরির কথা বেশ বড় করে বলা হয়েছে, যা ‘দি ইকুয়াল রেমুনারেশন অ্যাক্ট, ১৯৭৬’-এ উল্লেখ রয়েছে। নতুন বিধিতে ওভারটাইমের ক্ষেত্রে দ্বিগুণ মজুরির কথা বলা হয়েছে, যা আমাদের দেশের মিনিমান ওয়েজেস অ্যাক্ট, ১৯৪৮ অনুযায়ী বহু বছর ধরে শ্রমিকদের পাওয়ার অধিকার রয়েছে। ফলে বিজেপি সরকার সঠিক সময়ে বেতন পাওয়ার ব্যবস্থা করে দিল–এ কথা আদৌ সত্য নয়। খুব গুরুত্বপূর্ণ আর একটি বিষয় হল ২০২০ সালে প্রকাশিত ড্রাফট রুলস শ্রমিক সংগঠনগুলির নেতাদের মতানুযায়ী ফাইনাল হয়ে এখনও গেজেট-বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়নি। তা হলে রুলস বাদ দিয়ে কী ভাবে কোড কার্যকর হবে?
আইএলও কনভেনশন লঙ্ঘন করা হয়েছে
১৯৭৬ সালে আন্তর্জাতিক সংস্থার (আইএলও) ১৪৪তম কনভেনশনে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, শ্রম আইনের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন মালিক, শ্রমিক ও সরকার– ত্রিপাক্ষিক আলোচনা ছাড়া করা যাবে না। কনভেনশনে ভারত সরকারের প্রতিনিধিও উপস্থিত ছিলেন। তাই ভারত সরকারের এই সিদ্ধান্ত মানা আবশ্যিক। কিন্তু মোদি সরকার তা মানছে না। শুধু তাই নয়, ভারতের শ্রম সংক্রান্ত ত্রিপাক্ষিক আলোচনার জন্য ১৯৪০ সাল থেকে ইন্ডিয়ান লেবার কনফারেন্স (আইএলসি) শুরু হয়েছিল। কিন্তু বিজেপি সরকারের আমলে ২০১৫ সালে মাত্র এক বার আইএলসি-র ৪৬তম অধিবেশন হয়েছিল। তার পর মোদি সরকার আর কোনও আইএলসি ডাকেনি, যা প্রতি বছর হওয়ার কথা। মোদি সরকারের এই স্বেচ্ছাচারী আচরণ কার স্বার্থ রক্ষা করতে?
৭০ শতাংশ শ্রমিক শ্রম আইনের আওতার বাইরে চলে যাবে
বিজেপি শাসিত কেন্দ্রীয় সরকার যা বলছে না, তা হল– এই শ্রম কোডের ফলে ৭০ শতাংশ শ্রমিক মূল শ্রম আইনের আওতার বাইরে চলে যাবেন এবং এর প্রয়োগে মালিকরা অবাধে শ্রমিক ছাঁটাই, লে-অফ, লক-আউট করবে।
ওয়েজ কোড ২০১৯-এর ৯ নং ধারায় ফ্লোর ওয়েজের কথা বলা হয়েছে। বর্তমান শ্রম আইনে ফ্লোর ওয়েজের কোনও সংস্থান ছিল না। আগে মজুরির ধারণা ছিল তিন প্রকারের। (ক) মিনিমাম ওয়েজ বা ন্যূনতম মজুরি, যার কম মজুরি দিলে কোনও শ্রমিক পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবেন না। (খ) ফেয়ার ওয়েজ বা কোনও মতে বাঁচার মতো মজুরি এবং (গ) লিভিং ওয়েজ বা বাঁচার মতো মজুরি। ১৯৪৮ সালে গঠিত ফেয়ার ওয়েজ কমিটি সুপারিশ করেছিল শ্রমিক-কর্মচারীদের মজুরি, ন্যূনতম মজুরি থেকে লিভিং ওয়েজে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু কোডে আমরা বিপরীত প্রক্রিয়াই দেখতে পেলাম।
ন্যূনতম মজুরি আইন-১৯৪৮ অনুযায়ী সকল মালিককে শ্রমিকদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি দিতে হবে। ১৯৫৭ সাল থেকে আইনত ন্যূনতম মজুরি শ্রমিকদের দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যে মালিক ন্যূনতম মজুরির কম মজুরি দেবেন তিনি আইনভঙ্গকারী হিসাবে চিহ্নিত হবেন এবং আইন অনুযায়ী শাস্তি পাবেন। সকলেই জানেন, বহু মালিক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি দেয় না। এই মজুরি ফাঁকি দেওয়ার জন্য সবাই শাস্তি না পেলেও সামান্য কিছু ক্ষেত্রে আইনভঙ্গকারী মালিকদের শাস্তি হয়েছে। এর হাত থেকে মালিকদের বাঁচানোর জন্য এবং আইন অনুযায়ী প্রাপ্য থেকে আরও কম মজুরিতে শ্রমিকদের কাজ করানোর জন্যই মালিকদের স্বার্থে নতুন ফ্লোর ওয়েজের বিষয়টি কোডে এসেছে। বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকার দৈনিক মজুরি নির্ধারণ করেছে ১৭৮ টাকা যা ফ্লোর ওয়েজের নামান্তর। এই মজুরি ন্যূনতম মজুরি থেকে অনেক কম। এখানে উল্লেখ্য ২০১৭ সালে কেন্দ্রীয় সরকার প্রয়োজনভিত্তিক ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের জন্য অনুপ শতপথীর নেতৃত্বে ৭ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছিল। এই কমিটি দৈনিক মজুরি ৩৭৫ টাকা এবং মাসে ১৪৩০ টাকা ঘর ভাড়ার দেওয়ার জন্য সুপারিশ করেছিল। তাও মোদি সরকার মানেনি। এর থেকেই পরিষ্কার কেন্দ্রীয় সরকার মালিকদের স্বার্থে শ্রমকোডে ‘ফ্লোর ওয়েজ’ নামে নতুন ধাপ এনেছে কেন।
‘ফিক্সড টার্ম এমপ্লয়মেন্ট দি ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিলেশন কোড ২০২০’-এর (ও) ধারায় এবং অন সোসাল সিকিউরিটি ২০২০-র ২(৩৪) ধারায় ফি’ড টার্ম এমপ্লয়মেন্টের কথা বলা হয়েছে। এটি আগের কোনও শ্রম আইনে ছিল না। ফিক্সড টার্ম এমপ্লয়মেন্ট অনুযায়ী বর্তমান আইনের পরিকাঠামোর বাইরে গিয়ে শ্রমিকরা মালিকের সাথে একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কাজের শর্তে চুক্তিবদ্ধ হবেন। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য চুক্তিভিত্তিক এ জাতীয় নিয়োগ শ্রম কোড জারি হওয়ার আগে ২০১৮ সালে সংসদে পাশ করিয়ে গেজেট করা হয়েছিল। এই চুক্তিবদ্ধ কর্মীদের থাকবে না কাজের কোনও স্থায়িত্ব। মেয়াদ পূরণের আগে চাকরি হারানোর ভয়, কাজ চলে যাওয়ার পর পরবর্তী কাজ পাওয়ার অনিশ্চয়তা থেকে ইউনিয়ন না করার মানসিকতা ও প্রবণতা শ্রমিকদের মধ্যে গড়ে উঠবে। এ হল কারখানা বা প্রতিষ্ঠানকে ইউনিয়ন-মুক্ত করার এক সুপরিকল্পিত মালিকি চক্রান্ত। ইউনিয়ন না থাকলে শ্রমিকের শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে কোনও প্রতিবাদও হবে না। ফলে মালিকদের শোষণ জুলুম অত্যাচারের মাত্রা বাধাহীন ভাবে বাড়বে।
ধর্মঘট করার অধিকার হরণ
আইআর কোডের ৬২নং ধারায় বলা হয়েছে, কোনও শিল্প বা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট করতে হলে ১৪ দিন আগে শ্রমিকদের নোটিস দিতে হবে। বলা হচ্ছে ধর্মঘট করা বেআইনি। পূর্বের শ্রম আইন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিসপিউট অ্যাক্ট ১৯৪৭-এর ২২নং ধারায় অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা ক্ষেত্র বাদ দিয়ে আর কোথাও ধর্মঘট করার জন্য নোটিস দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল না। তাই এত দিন পর্যন্ত অত্যাবশ্যকীয় ক্ষেত্র ছাড়া যে কোনও কারখানা বা প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকরা প্রয়োজন অনুযায়ী ধর্মঘট করতে পারতেন। শ্রম আইন অনুযায়ী ধর্মঘট করার অধিকার তাঁদের ছিল। কিন্তু শ্রম কোড চালু হলে শোষণ অত্যাচারের প্রতিবাদে শ্রমিকদের ধর্মঘট করার যে মৌলিক অধিকার ছিল, তা কেড়ে নেওয়া হবে। ধর্মঘট করলে তা বেআইনি ঘোষণা করা হবে এবং শ্রমিকদের শাস্তি দেওয়া হবে। এ-ও বলা হয়েছে বিরোধ বিষয়ে সরকারের শ্রম দপ্তরের পক্ষ থেকে আলোচনা শুরু হলে যত দিন আলোচনা চলবে তত দিন ধর্মঘট করার কোনও অধিকার শ্রমিকদের থাকবে না। তাই মালিকপক্ষ ও তার তল্পিবাহক সরকার চাইবে যে কোনও অজুহাতে আলোচনা দীর্ঘায়িত করতে। ফলে আইনের নাগপাশে আটকে দিয়ে শ্রমিকদের আইনসম্মত ভাবে ধর্মঘটে যাওয়ার পথ বন্ধ করা হবে। আরও বলা হয়েছে, অর্ধেকের বেশি শ্রমিক একযোগে ছুটি নিলে তা ধর্মঘট হিসেবে বিবেচিত হবে এবং মালিক এর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারবে।
ছাঁটাইয়ের জন্য সরকারকে জানাতেও হবে না
ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিলেশন (আই আর) কোডের দশম অনুচ্ছেদের ৭৭নং ধারায় বলা হয়েছে ৩০০-র কম শ্রমিক থাকা কারখানায় লে-অফ, ছাঁটাই এবং ক্লোজার করার জন্য মালিকদের সংশ্লিষ্ট সরকারের থেকে অনুমতি নেওয়ার কোনও প্রয়োজন হবে না। শ্রম আইনে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিসপিউট অ্যাক্ট ১৯৪৭-এর ২৫ নং ধারায় আছে, ১০০ বা তার বেশি শ্রমিক যুক্ত কারখানায় লে-অফ, ছাঁটাই এবং ক্লোজার করার জন্য অবশ্যই সরকারের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে। নতুন কোডে মালিকদের হাতে অবাধ শ্রমিক ছাঁটাইয়ের আরও অধিকার তুলে দেওয়া হল।
আই আর কোডের চতুর্থ অনুচ্ছেদের ২৮(১) ধারায় বলা হয়েছে ৩০০ বা তার বেশি শ্রমিক যুক্ত শিল্প সংস্থায় কেবলমাত্র ‘স্ট্যান্ডিং অর্ডার’ কার্যকরী হবে এবং এর কম শ্রমিক যুক্ত শিল্পে বা প্রতিষ্ঠানে তা হবে না। এত দিন পর্যন্ত মডেল স্ট্যান্ডিং অর্ডারের পরিকাঠামোর মধ্যেই শ্রমিকদের বেতন সহ সার্ভিস কন্ডিশন নিরূপণের জন্য সকল শিল্পে স্ট্যান্ডিং অর্ডার শ্রমিকদের মতামতের ভিত্তিতে নির্ধারণ করে কার্যকরী হত। শ্রম কোডে শ্রমিক সংখ্যা বাড়ানোর ফলে প্রায় ৭০ শতাংশ শ্রমিক বেতন ও সার্ভিস কন্ডিশন নির্ধারণের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।
বর্তমানে প্রায় সকল শিল্পেই আধুনিক যন্ত্র ব্যবহারে উৎপাদন বেড়েছে ব্যাপক হারে এবং শ্রমিকের সংখ্যাও বিপুল কমেছে। তাই দেশের প্রায় ৭৪ শতাংশ কারখানা ১০০-র কম শ্রমিক নিয়ে কাজ করে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর যন্তে্রর ব্যবহারে শিল্প ক্ষেত্রে আগামী দিনে শ্রমিক সংখ্যা আরও কমবে। বিজেপি সরকার যদি শ্রমিকদের স্বার্থ সামান্য হলেও ভাবত, তা হলে এই বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দিয়ে কোডে আইনের আওতায় থাকার জন্য শ্রমিক সংখ্যা আরও কমানোর ব্যবস্থা করত। মোদি সরকার তা না করে মালিকদের স্বার্থে শ্রমিক সংখ্যা তিনগুণ বাড়িয়ে বেশির ভাগ শ্রমিককে আইনের আওতার বাইরে এনে ফেলল।
ফ্যাক্টরি, ঠিকা শ্রমিক ও পরিযায়ী শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা দেখা যাচ্ছে। শ্রম আইনে ফ্যাক্টরি অ্যাক্ট ১৯৪৮-এর ২এম ধারায় বলা হয়েছে বিদ্যুৎ শক্তিনির্ভর কারখানায় ১০ জন ও বিদ্যুৎ-নির্ভর নয় এমন কারখানায় ২০ জন শ্রমিক থাকলে তাকে ফ্যাক্টরি বলে চিহ্নিত করা হবে এবং শ্রমিকরা ফ্যাক্টরি আইনের সকল সুযোগ পাবে। বর্তমান আইআর কোড ধারা (২)-এ তা উভয় ক্ষেত্রেই দ্বিগুণ করা হয়েছে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ-নির্ভর কারখানায় ২০ জন ও বিদ্যুৎ-নির্ভর নয় এমন কারখানায় ৪০ জন শ্রমিক থাকলে তা কারখানা বলে পরিগণিত হবে। ফলে বহু মালিক এর সুযোগ নিয়ে ১৯ জন বা ৩৯ জন শ্রমিক দিয়ে একাধিক কারখানা চালিয়ে শ্রমিকদের সমস্ত আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত করবে। ঠিকা শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ধারা (৪৫)-তে সংখ্যা ২০ থেকে বাড়িয়ে ৫০ জন করা হয়েছে এবং পরিযায়ী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ধারা (৪৯)-তে ৫ জন থেকে বাড়িয়ে ১০ জন করা হয়েছে। এর ফলে শ্রমিকরা হারাবে আইনের অধিকার ও মালিকরা পাবে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ও শোষণ বঞ্চনার অবাধ স্বাধীনতা।
স্থায়ী চাকরি অবলুপ্ত হবে
কনট্র্যাক্ট লেবার (রেগুলেশন অ্যান্ড অ্যাবলিশন) অ্যাক্ট ১৯৭০ অনুযায়ী কোনও স্থায়ী কাজে অস্থায়ী শ্রমিক বা ঠিকা শ্রমিক নিয়োগ করা যায় না। কিন্তু শ্রম কোড ব্যাপক ভাবে ঠিকা শ্রমিক নিয়োগ করার সিংহ দরজা খুলে দিয়েছে। পেশাগত সুরক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কাজের পরিবেশ সংক্রান্ত কোডে স্থায়ী কাজের ধারণাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। কোডের ৫৭ ধারায় একটি শিল্পের মূল নিয়োগকর্তাকে ঠিকা শ্রমিক নিয়োগ করার অধিকার বা ক্ষমতা দিয়েছে। কোনও কারণে কাজের পরিধি যদি বেড়ে যায় বা সাময়িক কাজের বৃদ্ধি ঘটে, তখন কোর অ্যাক্টিভিটিতেও ঠিকা শ্রমিক নিয়োগ করার অধিকার মালিকদের দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ঠিকা শ্রমিক নিয়োগের ব্যাপকতা বৃদ্ধি করা হয়েছে উৎপাদন, পর্যবেক্ষণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের যে কোনও কাজে। যা শ্রম আইনের পরিপন্থী। পরিষেবা ক্ষেত্রেও যেমন ব্যাঙ্ক, ইনসিওরেন্স ইত্যাদি ক্ষেত্রে ঠিকা শ্রমিক নিয়োগের ঢালাও অধিকার দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ঠিকা শ্রমিকদের কাজের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা বিপন্ন হয়ে পড়বে এবং মজুরিও কমে যাবে। চাকরি-প্রার্থী বেকারদের স্থায়ী চাকরির পথ বন্ধ হবে।
পিএফ থেকে বঞ্চিত করার মালিকি সুযোগ বাড়বে
সামাজিক সুরক্ষা কোডের ১(৫) ধারায় বলা হয়েছে প্রভিডেন্ট ফান্ডের সুরক্ষা শ্রমিকরা পাবেন, কিন্তু তা ঐচ্ছিক হতে পারে। বলা হয়েছে, যদি কোনও কারখানার মালিক প্রভিডেন্ট ফান্ড স্কিমে না থাকতে চায় এবং মালিকপক্ষ ও সেই কারখানার সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমিকরা যদি চুক্তিতে আবদ্ধ হয় যে তাদের ক্ষেত্রে পিএফ থাকবে না তা হলে কেন্দ্রীয় প্রফিডেন্ট ফান্ড কমিশনার তা অনুমোদন করতে পারে। পিএফ এবং তার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত পেনশন ভবিষ্যৎ সামাজিক সুরক্ষার একটি নির্ভরযোগ্য প্রকল্প। একে এ ভাবে ঐচ্ছিক করে দিলে সামাজিক সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্বহীন হয়ে পড়বে। ভয় দেখিয়ে বা ধমকে অধিকাংশ শ্রমিকের সমর্থনের ভিত্তিতে মালিকরা সব শ্রমিকদের পিএফ থেকে বঞ্চিত করার সুযোগ পাবে। সামাজিক সুরক্ষার আইন কখনও এ ভাবে ঐচ্ছিক হতে পারে না। এটা হওয়া উচিত আবশ্যিক এবং সর্বজনীন।
পিএফ ও পেনশনের টাকা কমবে
সামাজিক সুরক্ষা কোডের ১৬(১) ধারা অনুযায়ী কর্মচারী এবং নিয়োগকর্তার উভয়ের প্রদেয় মজুরি মূল বেতনের ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। এতে কর্মচারীর পিএফ অ্যাকাউন্টে প্রতিমাসে ৪ শতাংশ অর্থাৎ (মালিক পক্ষ ২ শতাংশ+ শ্রমিক পক্ষ ২ শতাংশ) করে কম জমা পড়বে। এর ফলে অবসরের সময় শ্রমিক কর্মচারীদের প্রফিডেন্ট ফান্ডের প্রাপ্য টাকা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে যাবে। কমে যাবে পেনশনের টাকাও।
ইন্সপেক্টরদের ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে
মজুরি কোডের ৫১ ধারায় ইন্সপেক্টর কাম ফ্যাসিলিটেটর নিযুক্তি এবং তাদের ক্ষমতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। অন্য দুটি কোডেও এ নিয়ে আলোচনা রয়েছে। যখন মালিকদের পক্ষ থেকে ইন্সপেক্টর রাজ খতম করার দাবি উঠেছে তখন এ জাতীয় পরিবর্তন খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকার চাইলেই কেবলমাত্র সরেজমিনে ইন্সপেকশন করতে পারবে। এত দিন পর্যন্ত যারা ছিলেন ইন্সপেক্টর, এই কোড অনুযায়ী তারা হয়ে যাবেন ইন্সপেক্টর কাম ফ্যাসিলিটেটর। এখানে উপধারা ২-এ পরিদর্শন এবং যে কোনও জ্ঞাতব্য ইলেকট্রনিক মাধ্যমে দেওয়া-নেওয়ার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অথচ ডিজিটাল পদ্ধতিতে পর্যবেক্ষণ কখনওই বাস্তব পরিদর্শন অর্থাৎ ঘটনাস্থলে সশরীরে উপস্থিত থেকে পরিদর্শনের বিকল্প হতে পারে না। বাস্তব পরিস্থিতি বা ঘটনাকে বুঝতেসশরীরে পরিদর্শন একান্ত প্রয়োজন। তা ছাড়া এখানে ইন্সপেক্টর কাম ফ্যাসিলিটেটরের ভূমিকাকে মূলত উভয়পক্ষের পরামর্শদাতা ও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে রাখা হয়েছে। এত দিন শ্রম আইনভঙ্গকারী মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার যতটুকু অধিকার ইন্সপেক্টরদের ছিল তা-ও খর্ব করা হল শ্রম কোডের মাধ্যমে। বর্তমানে যখন মালিকদের শ্রম আইন ভাঙার প্রবণতা বাড়ছে এবং শ্রমিকরা অসহায় অবস্থায় কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন তখন এই কোড শ্রমিকদের উপর মালিকদের অত্যাচার আরও বেশি বাড়ানোর সুযোগ দেবে। শ্রমিকদের ঠেলে দেবে অবর্ণনীয় দুর্দশার মধ্যে।
শ্রমিক স্বার্থবিরোধী কালা শ্রমকোড বাতিলের দাবিতে দেশ জুড়ে দলমত নির্বিশেষে শ্রমজীবী মানুষ সহ সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলন গড়ে তুলতে এগিয়ে আসতে হবে। আমরা স্থির নিশ্চিত, সরকারের সঙ্গে যোগসাজশে মালিক শ্রেণির এই মারাত্মক আক্রমণ নীরবে মেনে নেবে না দেশের শ্রমিক শ্রেণি। সর্বত্র তারা প্রতিবাদে সোচ্চার হবে।
অসংগঠিত ভাবে শুধুমাত্র ক্ষোভ প্রকাশ করে এই আক্রমণকে ঠেকানো যাবে না। ঠেকাতে হলে প্রয়োজন কল-কারখানা সহ সংগঠিত-অসংগঠিত সমস্ত ক্ষেত্রে সংগ্রামী শ্রমিক কমিটি গড়ে তুলে সংগঠিত প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে তোলা। সংগ্রামী শ্রমিক সংগঠন এআইইউটিইউসি ভারতের শ্রমিক শ্রেণির কাছে এই আহ্বানই রাখছে।