
কথা না মানলে ভারতের অর্থনীতিকে একেবারে ‘ধ্বংস’ করে দেবেন বলে হুমকি দিয়েছেন তিনি। না, পাড়ার বখাটে কোনও ছেলের হুমকি এটা নয়, হুমকিদাতা খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাই দুশ্চিন্তার বিষয় তো নিশ্চয়ই।
সম্প্রতি ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরো-তে অনুষ্ঠিত হয়েছে ব্রিকস সম্মেলন। সম্মেলন চলাকালীনই ট্রাম্পের হুমকি-ঘোষণা মার্কিন বিরোধী নীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেই চাপ বাড়বে অতিরিক্ত শুল্কের।
এ বারের সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সহ রাশিয়া, চিন, দক্ষিণ আমেরিকা, মিশর, সংযুক্ত আমিরশাহি সহ শরিক দশটি দেশেরই তাবড় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। ব্রিকস-কে জি-৭ এর প্রতিপক্ষ হিসাবে উপস্থাপনার প্রচেষ্টা ছিল লক্ষ করার মতো। কাল-বিলম্ব না করে সেই প্রচেষ্টায় কার্যত জল ঢেলে দিতে চেয়ে মহা দাপটে উপস্থিত হলেন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের শিরোমণি ট্রাম্প। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ট্রাম্পের পাশাপাশি হেঁটে বা বুকে জড়িয়ে ধরে নিজেকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান নেতা হিসাবে যতই জাহির করার চেষ্টা করুন, অবস্থাটা দাঁড়িয়েছে এমনই যে, এ যাবত তিনি অথবা কেন্দ্রীয় সরকারের কোনও মহল থেকেই ট্রাম্পের হুমকির প্রতিবাদে টুঁ শব্দও উচ্চারিত হয়নি। খোলসা করে ট্রাম্প বলে দিয়েছেন, রাশিয়ার সঙ্গে সব বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন না করলে তিনি ‘ধ্বংস’ করে দেবেন ভারত, চিনের মতো ‘রুশ সহযোগী’ দেশগুলির অর্থনীতি। সোজা কোথায়, সকল দেশকে ‘মার্কিন সহযোগী’ হতে হবে। কার্যত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পদতলে নতজানু হওয়ার ধমকি। কোথায় গেল ৫৬ ইঞ্চি ছাতির বিশ্বগুরুর নেতৃত্বে ভারতীয় জিডিপির চ্যাম্পিয়নশিপ, আর কোথায় গেল বহু ঘোষিত বিশ্বায়নের অবাধ বাণিজ্য পরিস্থিতি?
বাস্তবে সোভিয়েট ইউনিয়ন, চিন সহ পূর্ব ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশের সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাময়িক বিপর্যয় তথা সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব ব্যবস্থার অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে সাম্রাজ্যবাদের শিরোমণি দেশগুলি সীমাহীন লুণ্ঠনের স্বর্গরাজ্য গড়ে তুলেছে। আর সমাজতন্তে্রর পরিবর্তে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে অতি দ্রুত রাশিয়া ও চিন কেবল সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র অর্জন করে ফেলেছে তাই নয়, বিশ্বে অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেছে। বিশ্ব সাম্যবাদী আন্দোলনের মহান নেতা কমরেড লেনিন সাম্রাজ্যবাদের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে দেখিয়েছিলেন, একদিকে বৃহৎ সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি পারস্পরিক দ্বন্দ্বকে সামাল দিয়ে বিশ্বজুড়ে শোষণকে বজায় রাখার জন্য ‘ইন্টারন্যাশনাল ট্রাস্ট অ্যান্ড কার্টেল’-এ সম্মিলিত হচ্ছে, আবার ঠিক একই সাথে আস্তিনের মধ্যে ছুরি শানিয়ে পরস্পরকে কুপোকাত করে বাজার দখলের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর অবশ্যম্ভাবী পরিণতিতেই সৃষ্টি হচ্ছে যুদ্ধ।
তিনি বলেছিলেন সাম্রাজ্যবাদ যতদিন থাকবে মনুষ্যত্ব ও সভ্যতা ধ্বংসকারী যুদ্ধ তত দিনই চলতে থাকবে। বিশ্ব আজ দেখতে পাচ্ছে তাঁর উক্ত বিশ্লেষণ কতখানি সত্য। সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সাম্রাজ্যবাদী দুনিয়া চিল চিৎকার করে আসছিল দুটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্যই যুদ্ধ অনিবার্য। আজ তা অন্তঃসারশূন্য বাগাড়ম্বরে পরিণত হয়েছে। কমরেড লেনিন মার্ক্সীয় বিজ্ঞানের ভিত্তিতে দেখিয়েছিলেন, যুদ্ধ হল সাম্রাজ্যবাদীদের বাজার দখলের দ্বন্দ্বের জন্য। প্রমাণ করেছিলেন কমিউনিস্টরা যুদ্ধ চায় না এবং তার বাস্তব প্রতিফলন হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়ন সমস্ত ধরনের যুদ্ধবিরোধী ও বিশ্বশান্তির পক্ষে। সেই নীতি প্রয়োগ করে পরবর্তী অধ্যায়ে তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরী কমরেড স্ট্যালিন এ কথা বিশ্ব জুড়ে প্রমাণ করেছিলেন। বিশ্বমানবতা ধন্য ধন্য করেছিল সমাজতন্তে্রর সর্বব্যাপী মহত্ত্বকে। সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব ব্যবস্থার অনুপস্থিতির পর সোচ্চারে ধ্বনিত হয়েছিল– এখন এক-মেরু বিশ্ব। এ বার একই নীতি এবং পদ্ধতিতে চলবে বিশ্ব। চলছেও তো পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী নীতিতে। কিন্তু কেন তবে এত যুদ্ধ? প্রতি মুহূর্তে এত প্রাণহানি ঘটাচ্ছে কারা? এত মানুষকে বিভিন্ন দেশ থেকে বিতাড়িত করে পথে পথে মনুষ্যেতর জীবনে ঠেলে দিচ্ছে কারা? সে কি কেবল দুর্বল রাষ্ট্রের উপর সবল রাষ্ট্রের অত্যাচার? ট্রাম্পের অতি সাম্প্রতিক ঘোষণা এ কথাই প্রমাণ করে দিল, সাম্রাজ্যবাদ কেবল দুর্বল রাষ্ট্রগুলির আর্থিক সম্পদ দলে পিষে নিংড়ে নিতে চায়, তা নয়। তথাকথিত সবল প্রতিদ্বন্দ্বীকেও কোনও প্রকারে এক ইঞ্চি জায়গা ছাড়তে সে রাজি নয়।
বাস্তবে এ ছাড়া আজ তার উপায়ও নেই। বিপুল পুঁজির ভাণ্ডার নিয়ে লগ্নির জায়গা বিশ্ব জুড়ে খুঁজে পাচ্ছে না সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলি। এক মেরুর বিশ্ব আজ সাম্রাজ্যবাদী বহু মেরুতে পৌঁছেছে এবং হিংস্র রূপ ধারণ করে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেছে। সংঘাত সেখানেই। সাম্রাজ্যবাদের শিরোমণি মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্রেরও অর্থনীতি গভীর সঙ্কটে। তার নিজের বাঁচবার উপায় নেই। অর্থনীতির চরম সংকটের বহিঃপ্রকাশ হিসাবে ওয়াল স্ট্রিটের গণবিস্ফোরণের ঘটনা আজও জ্বলজ্বল করছে। এই সংকট থেকে পরিত্রাণের গ্যারান্টি দিয়েই জনগণের দ্বারা অত্যন্ত নিন্দিত হলেও ধনকুবেরদের মদতে দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় বসেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু মার্কিন ধনকুবের হাঙরদের প্রতিটি প্রত্যাশা পূরণে কি তিনি সফল হচ্ছেন? তা যে তিনি পারছেন না, তার প্রকাশ ইতিমধ্যেই ঘটেছে। দ্বিতীয়বার ট্রাম্পকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য প্রধান সহযোগী এবং অতি নিকট বন্ধু হিসাবে কাজ করেছিলেন যিনি, সেই ইলন মাস্ক সে দেশে ইতিমধ্যেই পাল্টা রাজনৈতিক দল গঠন করে ফেলেছেন এবং এই পার্টি গঠনের সাথে সাথেই ট্রাম্পের সঙ্গে মাস্কের প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব সামনে এসে পড়েছে।
মাস্ক তো হেলাফেলা কেউ নন, তিনি বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বেশি সম্পদ কুক্ষিগত করে ৩২৮.৫ বিলিয়ন ডলারের মালিক। মাস্ক সরাসরি ঘোষণা করেছেন, রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট দুটি দলের বিরুদ্ধেই লড়াই করবে তাঁর দল। ফলে বিশ্বের একচ্ছত্র অধিকর্তা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আজ দেশের অভ্যন্তরেই ক্ষতবিক্ষত অবস্থায়। এখন অবস্থা হল, এই মরণোন্মুখ পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদকে কে কত বেশি কোরামিন জুগিয়ে কতটুকু সময় বাঁচিয়ে রাখতে পারবে তার প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হতে তাই ট্রাম্পকে আগ বাড়িয়ে বিপুল পরিমাণ শুল্ক চাপানোর ঘোষণা করতে হচ্ছে। অন্যরাও পাল্টা হুমকি দিচ্ছে শুল্ক চাপানোর। বিশ্ব তা হলে প্রবেশ করল শুল্ক-যুদ্ধের পরিমণ্ডলে। মানবতার কোনও বালাই নেই, এই যুদ্ধের স্পর্ধিত ঘোষণা হল, অপর দেশের অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেব।