Breaking News

‘শিল্প’ সংজ্ঞায় বদলঃ বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের জীবনে বিপর্যয় নেমে আসবে

ফাইল ফটো

২০ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের নয় সদস্যের বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে রায় দিয়েছেন, ‘শিল্প’ বা ইন্ডাস্ট্রি-র সংজ্ঞা বিজেপি সরকার প্রণীত নতুন শ্রমকোডের সাথে মিলিয়ে করতে হবে। ফলে ১৯৭৮ সালে বিচারপতি ভি আর কৃষ্ণ আয়ারের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের বেঞ্চ ‘শিল্প’-এর সংজ্ঞা নির্ধারণ করে যে রায় দিয়েছিলেন তা আর চলবে না।

সাম্প্রতিক এই রায়ের ফলে বিরাট সংখ্যক শ্রমিক শিল্প বিরোধ সংক্রান্ত রক্ষাকবচের বাইরে চলে গেলেন। বর্তমান বিশ্বায়ন ও উদার অর্থনীতির সময়ে সরকারি উদ্যোগ কার্যত সীমিত। সমস্ত পরিষেবা ক্ষেত্রও চলে আসছে বেসরকারি পুঁজির আওতায়। এই সময়ে শিল্পের সংজ্ঞা বদলে দিলে বেসরকারি পুঁজি পরিচালিত হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসনের কর্মী বা বেসরকারি এজেন্সির নিযুক্ত শ্রমিকরা শিল্প বিরোধ সংক্রান্ত কোডের আওতার বাইরে চলে যাবেন।

১৯৭৮-এ ‘ব্যাঙ্গালোর ওয়াটার সাপ্লাই অ্যান্ড সুয়ারেজ বোর্ড বনাম রাজাপ্পা’ মামলায় বিচারপতি ভি আর কৃষ্ণ আয়ারের নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের সাত বিচারপতির বেঞ্চ ১৯৪৭-এর শিল্প বিরোধ আইনের ২(জে) ধারার ব্যাখ্যাকে বিস্তৃত করে শিল্পের সংজ্ঞা নির্ধারণে ‘ট্রিপল টেস্ট’-এর দিকনির্দেশ দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, কোনও কার্যক্রম যদি ব্যবসা বাণিজের মতো সংগঠিত হয়, নিয়োগকর্তা ও কর্মচারী সম্পর্কের ভিত্তিতে কাজ হয়, মানুষের যে কোনও প্রয়োজন, তুষ্টি বা ইচ্ছা পূরণের উপযুক্ত পণ্য বা পরিষেবা উৎপণ্য করে, তাকেই বলা হবে শিল্প বা ইন্ডাস্ট্রি। এই সংজ্ঞার ফলে কারখানা ছাড়াও স্কুল, হাসপাতাল, চ্যারিটেবল ট্রাস্ট পরিচালিত নানা পরিষেবা, স্থানীয় প্রশাসনের বিরাট সংখ্যক শ্রমিক এমনকি ঝাড়ুদার, অশিক্ষক-কর্মী, স্বাস্থ্য-কর্মীদের মতো বিভিন্ন স্তরের কর্মীরা ‘শিল্প’-এর সংজ্ঞার আওতায় এসেছিলেন। গত পাঁচ দশক ধরে এর ভিত্তিতে অধিকার আদায়ে তাঁরা লড়তে পেরেছেন।

কংগ্রেস সরকার ১৯৯০-এ বিশ্বায়ন, উদারিকরণের নীতি এনে শ্রমিক-কর্মচারীদের অধিকার খর্ব করা শুরু করেছিল। সম্প্রতি উদারিকরণের রাস্তাতেই বিজেপি সরকার সমস্ত শ্রম আইন বাতিল করে যে চারটি শ্রম কোড এনেছে তাতে শ্রমিক-কর্মচারীদের দর কষাকষির অধিকার, ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করা ও মালিকপক্ষের সঙ্গে লড়াই করার জন্য প্রয়োজনে ধর্মঘট করার অধিকার কার্যত কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এমনিতেই পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থায় মালিকপক্ষের দিকেই থাকে রাষ্টে্রর পক্ষপাতিত্ব। সরকার, আমলাতন্ত্র, প্রশাসন থেকে শুরু করে বিচারব্যবস্থা পর্যন্ত মূলত মালিকদের স্বার্থেই কাজ করে। প্রধান বিচারপতির বেঞ্চের সংখ্যাগরিষ্ঠের মত হল, ১৯৭৮-এর সংজ্ঞার বোঝা না চাপিয়ে শিল্পের নতুন সংজ্ঞা ২০২০-র শ্রমকোডের চেতনা ও বিষয়বস্তু অনুযায়ী করতে হবে। বিজেপি সরকারের নতুন শ্রমকোডের চেতনা কী তা শ্রমিকরা জানেন। তা হল, শ্রমিককে কার্যত কোনও অধিকার ছাড়াই মুখ বুজে খেটে যেতে হবে। কারণ শাসকের মতে, এটাই হল শিল্পের জন্য আদর্শ শর্ত! এই শ্রমকোড শ্রমিককে এমনিতেই কোণঠাসা অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিচারব্যবস্থার একাংশ থেকেই কথা উঠেছে, বিচারপতি আয়ারের শ্রমিক স্বার্থ রক্ষার রায় নাকচ হয়ে গেলে মালিকের পাল্লাই ভারী হবে। দেখা যাচ্ছে, নয় বিচারপতির বেঞ্চের তিনজন এই রায়ের বিপক্ষে মত দিয়েছেন। বিশেষত বিচারপতি নাগরত্না তাঁর আলাদা রায়ে শ্রমিকস্বার্থ রক্ষার প্রশ্নটিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছেন।

সুপ্রিম কোর্টের এই রায়কে ‘হতাশাজনক’ বলে অভিহিত করে এআইইউটিইউসি-র সাধারণ সম্পাদক শঙ্কর দাশগুপ্ত ২২ আগস্ট এক বিবৃতিতে ১৯৭৮ সালের বিচারপতি আয়ারের রায়কে ‘যুগান্তকারী’ হিসাবে তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, নতুন ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিলেশনস কোড, ২০২০-র ক্ষেত্রে পাঁচ দশক ধরে চলে আসা শিল্পের সংজ্ঞাটি প্রযুক্ত না হলে এবং তা শ্রম কোডের ২(পি) ধারাকে নিয়ন্ত্রণ না করলে গত প্রায় পাঁচ দশক ধরে শ্রমিকদের একটি বিশাল অংশ যে আইনি ও ন্যায্য অধিকার ভোগ করে আসছেন, তা ক্ষুণ্ন হবে। যে কোনও অজুহাতেই হোক না কেন, নাগরিকদের অধিকার খর্ব করে এমন আইন বা আদালতের রায় নিশ্চিতভাবেই অগণতান্ত্রিক। এই রায় বিপুল সংখ্যক শ্রমিককে ‘শিল্প’-এর সংজ্ঞার আওতার বাইরে ঠেলে দিল এবং তাদের একচেটিয়া পুঁজির স্বার্থবাহী ও শ্রমিক-বিরোধী কঠোর ‘আইআর কোড’-এর নতুন ব্যাখ্যার শিকারে পরিণত করল।

এআইইউটিইউসি বলেছে, এই রায় দেশের বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের ওপর বিপর্যয়কর প্রভাব ফেলবে এবং তাদের নির্মম শোষণের মুখে ঠেলে দেবে। শীর্ষ আদালতের এই আপত্তিকর রায়ের বিরোধিতা করা এবং নিজেদের কষ্টার্জিত অধিকার রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ ভাবে লড়াই করা ছাড়া শ্রমজীবী মানুষের সামনে অন্য বিকল্প নেই।