
পশ্চিমবঙ্গে বর্তমানে বিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষক নিয়োগের জটিলতায় মারাত্মক সংকটে শিক্ষাব্যবস্থা। এ রাজ্যের বর্তমান শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের ব্যাপক দুর্নীতির কারণে ২০১৬-র স্কুল সার্ভিস কমিশনের প্রথম এসএলএসটি পরীক্ষার প্যানেলে নিযুক্তদের চাকরি বাতিল হয়ে যায়। এই প্যানেল বাতিল হওয়ার কারণে যোগ্য ও মেধার ভিত্তিতে নিযুক্ত শিক্ষকরা চূড়ান্ত দুর্দশার সম্মুখীন। কোর্টের রায়ে নতুন করে ২০২৫ সালে স্কুল সার্ভিস কমিশন রাজ্যের স্কুলগুলোর শূন্যপদে নিয়োগের জন্য একটি প্রক্রিয়া শুরু করলেও নানা জটিলতায় আজ তা চূড়ান্ত ধোঁয়াশাময়। এই প্যানেলে আদৌ কোনও নিয়োগ হবে কি না, নাকি পরীক্ষা সম্পূর্ণ বাতিল হবে, এই নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের যে টানাপোড়েন তা গোটা সমাজকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করেছে। কারণ, এর পরিণামে স্কুলে পড়াশোনা গভীর সঙ্কটে।
২০১৬ সালে এসএসসি-র মাধ্যমে রাজ্যের বিদ্যালয়গুলির প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীর নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং ২০১৮-১৯ সাল থেকে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে। এই নিয়োগকে কেন্দ্র করে পাহাড়-প্রমাণ দুর্নীতি প্রকাশ পায়। অসহ্য বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে অন্যায় পথে শাসকদলের নেতা, মন্ত্রী এবং আমলারা লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে শিক্ষকতা ও শিক্ষাকর্মীর চাকরির সুযোগ করে দেয়। কিন্তু সময় অনেকটা গড়িয়ে যাওয়ার পর সাজা পাওয়ার পরিবর্তে ধীরে ধীরে জেল থেকে বেরিয়ে আসছেন দুর্নীতির পাণ্ডারা। অন্য দিকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বহাল থাকা যোগ্য শিক্ষকদের চাকরির মেয়াদ ফুরাতে চলেছে। অর্থাৎ যোগ্যরাই শাস্তি পেল, অথচ যারা চুরি-দুর্নীতিতে যুক্ত, তাদের উপযুক্ত শাস্তি হল না। যে বিচার ব্যবস্থার উপর ন্যায়বিচার পাবে বলে মানুষ আস্থা রাখে, নানা টানাপোড়েন এবং শেষ পর্যন্ত ন্যায় ছাড়াই হতাশাজনক রায়দান, মানুষ মেনে নিতে পারেনি। চাল থেকে কাঁকর না বেছে সমস্ত চালটাকেই যে ভাবে নষ্ট করা হল তাতে কয়েক হাজার শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীর সাথে লক্ষ লক্ষ মানুষের পেটে লাথি মারা হল। ফলে বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়েও আজ প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এখন প্রশ্ন, নিয়োগ আদৌ হবে কি? কারণ সম্প্রতি নতুন পরীক্ষার ক্ষেত্রেও বেশ কিছু জটিলতা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের মামলা আবার হাইকোর্টে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। কলকাতা হাইকোর্টে এই মামলার শুনানি চলছে। সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুযায়ী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে নবম-দশম ও একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। কিন্তু যে গতিতে ফলপ্রকাশ, ভেরিফিকেশন এবং ইন্টারভিউ চলছে তাতে যেমন দীর্ঘ সময়ের টালবাহানা রয়েছে, অন্য দিকে কোর্টে বিচারকদের একই বিষয়ে নানা সময়ে নানা বাক্যালাপ ও রায়দান প্রবল ধোঁয়াশা তৈরি করেছে। ফলে যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের হতাশা চূড়ান্ত রূপ নিচ্ছে।
অন্য দিকে পরীক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের অপরিণামদর্শিতার কারণে নতুন চাকরিপ্রার্থীরাও বঞ্চিত হয়েছেন। যে কথা শুরু থেকেই এসেছিল যে, ২০১৬ প্যানেলের যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের পুনর্বহালের ক্ষেত্রে রাজ্য সরকার পৃথক পরীক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে তাদের নিয়োগের ব্যবস্থা করুক। ফ্রেশারদের জন্য আলাদা পরীক্ষা নেওয়া হোক। এটা হলে আজকের এই জটিলতা অনেক ক্ষেত্রেই এড়ানো যেত।
এই নিয়োগ নিয়ে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তার মূল ক্ষতি শিক্ষাব্যবস্থার ওপর বর্তাচ্ছে। রাজ্যের সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এমনিতেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় মিলে প্রায় আড়াই লক্ষাধিক শূন্যপদ রয়েছে। তার উপর চাকরি চলে যাওয়া এবং সে সংক্রান্ত দোলাচলে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে জনসাধারণের মনে ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে। অন্য দিকে বিদ্যালয়ে বিষয়-শিক্ষক না থাকার কারণে ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনায় বিরূপ প্রভাব পড়ছে। যদিও এই ক্ষতিপূরণে মন্ত্রী-আমলা বা নেতাদের এতটুকুও ভাবনা আছে বলে মনে হয় না।
এই জটিলতায় প্রধানত রাজ্য সরকার যেমন দায়ী, তেমনই বিরোধী পক্ষ বলতে যাদের বোঝায় অর্থাৎ বর্তমানে রাজ্যের বিরোধী দল এবং বিগত শাসক দলের ঘনিষ্ঠদের ভূমিকা নিয়েও জনমানসে প্রশ্ন উঠছে। তৎকালীন বিচারপতি বর্তমানে বিজেপি সাংসদের ঢাকি সমেত বিসর্জনের স্লোগান যেমন ভুলছে না জনসাধারণ, তেমনই বর্তমানে সিপিএমের রাজ্যসভার সাংসদ তথা আইনজীবী বিকাশ ভট্টাচার্য ২০১৬ প্যানেলে নিযুক্তদের ‘অল আর ফ্রড’ বলে বার বার যোগ্যদেরও যে ভাবে দাগিয়ে দিচ্ছেন এবং সামাজিক সম্মানহানি করছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এঁদের আচরণে এ কথা মনে করা স্বাভাবিক যে, শিক্ষাব্যবস্থার বেহাল দশা নিয়ে এঁরা আদৌ ভাবিত নন। কেবল ভোট রাজনীতির লক্ষ্যেই এঁদের লম্ফঝম্ফ। কারণ বর্তমানের শাসক, বিরোধী দল, বিগত শাসক– বারবারই দেখা গেছে যে, এরা সকলেই সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা বেসরকারি মালিকের হাতে তুলে দিতেই আগ্রহী।
অপর দিকে এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট) দল প্রথম থেকেই যোগ্য ও স্বচ্ছতার সঙ্গে নিযুক্তদের পাশে দাঁড়িয়েছে। যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের নিজস্ব আন্দোলনের পাশে থাকা, দলের শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের এই আন্দোলনে অংশ নেওয়া, এমনকি এই শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের আন্দোলনে পুলিশি অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর মধ্য দিয়ে দল এঁদের পাশে দাঁড়িয়েছে, রাজ্য জুড়ে প্রতিবাদ দিবস পালন করেছে।
আজ শিক্ষার এক চরম সংকটের সময় দাঁড়িয়ে দাবি উঠছে– সকল শূন্যপদে নিয়োগ চাই। অন্য দিকে যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীরা সকলে যাতে পুনর্বহাল হতে পারেন, সেই বিষয়ে সরকারকে সম্পূর্ণ দায়ভার গ্রহণ করার দাবিও উঠেছে। শিক্ষার বেসরকারিকরণের যে নকশা কায়েমি স্বার্থবাহী রাজনৈতিক দলগুলি সাজিয়েছে, তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার সাথে সাথে রাজ্যের বিদ্যালয়গুলির সকল শূন্যপদে অবিলম্বে নিয়োগ করে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা যতটুকু বেঁচে আছে, তাকে সচল করার জন্য গণআন্দোলন গড়ে তোলাই এই ভয়ানক সঙ্কট কাটানোর একমাত্র পথ।