
আমাদের মধ্যে কিছু কমরেড আছেন, নিজেদের মতের বিরোধী কোনও মতামত শোনার ধৈর্যটুকুও যাঁদের নেই। কোনও সমালোচনাই তাঁরা সহ্য করতে পারেন না। এ অত্যন্ত অন্যায়। এই কনফারেন্স চলাকালেই একটি প্রদেশের গ্রুপ মিটিং হচ্ছিল। শুরুটা খুব প্রাণবন্ত হল। কিন্তু যেই প্রাদেশিক পার্টি কমিটির সম্পাদক আসন গ্রহণ করতে সভায় ঢুকলেন, ব্যস! চাপা গলায় ‘চুপ চুপ’ বলে আর কেউ মুখ খুলল না। কমরেড প্রাদেশিক সম্পাদক, এই যদি হয়, তবে তখন আপনার সেখানে যাওয়ার দরকার কী? আপনি আপনার ঘরে বসে চিন্তা করলেই পারতেন। অন্যদের মন খুলে কথা বলতে দিতেন! চারপাশে এমন পরিবেশই যেখানে তৈরি হয়েছে, আপনি উপস্থিত থাকলে মানুষ যখন মুখ খুলতে সাহসই পাচ্ছে না, তখন আপনার তো সেখানে না থাকাই উচিত। ভুল যিনিই করুন, আত্মসমালোচনা তাঁকে করতেই হবে। আর দেখুন, যাতে অপরে মন খুলে কথা বলতে পারে। অন্যদেরও সমালোচনা করতে দিন। …
গত বছরের ১২ জুন ছিল পিকিংয়ের ওয়ার্কিং কনফারেন্সের সমাপ্তি দিবস। কনফারেন্স আহTান করেছিল চিনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি। আমি সে দিন আমার নিজের ভুল এবং ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। কমরেডদের আমি বলেছিলাম, আমার কথাগুলি প্রদেশে প্রদেশে অঞ্চলে অঞ্চলে পৌঁছে দিতে। পরে আমি দেখেছি বহু অঞ্চলকে সে সব কথা জানানোই হয়নি। যেন, আমার ভুল হলে তা গোপন রাখা যায় বা গোপন রাখাই উচিত। কমরেডস, আমি মনে করি, তা কখনওই উচিত নয়। কেন্দ্রীয় কমিটির যা ভুলভ্রান্তি, তার মধ্যে যেগুলির সঙ্গে আমি সরাসরি জড়িত, সেগুলির জন্য আমি প্রত্যক্ষভাবে দায়ী। আর, যে ক্ষেত্রে আমি সরাসরি জড়িত নই, সে ক্ষেত্রেও আমার আংশিক দায়িত্ব আছে। কারণ, আমিই কেন্দ্রীয় কমিটির চেয়ারম্যান। অবশ্য আমি এ কথা বলছি না যে, অন্যেরা তাঁদের ভুলের দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারেন। অন্য কমরেডদেরও দায়িত্ব আছে। কিন্তু সর্বপ্রথম দায়িত্ব আমাকেই নিতে হবে। প্রিফেক্ট কাউন্টি পার্টি কমিটি থেকে শুরু করে নিচের দিকে স্তরে স্তরে জেলা, বিভিন্ন সংস্থা এবং কমিউন পার্টি কমিটির সম্পাদক পদে যাঁরা আছেন, ফার্স্ট সেক্রেটারি হিসাবে কাজের সমস্ত ত্রুটি-বিচ্যুতি ও ঘাটতির দায়দায়িত্ব আপনাদের নিতে হবে। দায়দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলা, দায়িত্ব নিতে ভয় পাওয়া এবং জনগণকে মুখ খুলতে না দেওয়া– যেন মুখ খুললেই বাঘের লেজ মুচড়ে দেওয়া হল– এই রকম মনোভাব নিয়ে যদি দশজনও চলেন, আমি বলছি সেই দশজনেরই নিশ্চিত অধঃপতন ঘটবে। আজ হোক আর কাল হোক, মুখ মানুষ খুলবেই। আপনারা কি ভাবছেন, আপনারা সব এমন বাঘ যে মানুষ আপনাদের লেজে হাত দিতে সাহসই পাবে না? সেই দুঃসাহস জনগণই দেখাবে।
দলের অভ্যন্তরে এবং জনজীবনে গণতন্তে্রর পূর্ণ-প্রতিষ্ঠা যদি আমরা না করি, সর্বহারার গণতন্ত্রকে পুরোপুরি রূপায়িত না করি, তা হলে চিনের পক্ষে সর্বহারার কেন্দ্রিকতা অর্জন করা অসম্ভব। উন্নত মানের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে উন্নত মানের কেন্দ্রিকতার জন্ম দেওয়া যায় না। আর, উন্নত মানের কেন্দ্রিকতা ছাড়া সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি সার্থকভাবে প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব। যদি আমরা সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি সার্থকভাবে রূপায়িত করতে না পারি, তবে দেশ ভবিষ্যতে কোন দিকে যাবে? এটা একটা শোধনবাদী রাষ্টে্র পরিণত হবে। অর্থাৎ একটা বুর্জোয়া রাষ্টে্র পরিণত হবে এবং সর্বহারার একনায়কত্বের বদলে আসবে বুর্জোয়া একনায়কতন্ত্র যা একটা প্রতিক্রিয়াশীল ফ্যাসিস্ট একনায়কতন্তে্রর নামান্তর। এ ব্যাপারে আমাদের সর্বদা তীক্ষ্ম নজর রাখতে হবে এবং আমি আশা করি কমরেডরা এ সব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলি গভীরভাবে ভেবে দেখবেন।
১৯৬২ সালের ৩০ জানুয়ারি চিনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ধিত সভায় মাও সে তুং।