
বিনয়বাবু এমনিতে নরম মেজাজের মানুষ। তবে স্ত্রী ইদানিং লক্ষ করছেন, বাজার থেকে ফিরলেই মেজাজ তাঁর তিরিক্ষি হয়ে থাকে। সে দিন ফরমায়েস মতো অফিস ফেরতা পেঁয়াজ আর চিনি কিনে বাড়িতে ঢুকেই তুলকালাম। নিউজ চ্যানেলে তখন চলছিল ঘণ্টাখানেকের টক শো। দুম করে বন্ধ করে দেন তিনি। পেঁয়াজের দাম ৬০-৭০ টাকা, চিনির দাম ৭০-৮০ টাকা, গ্যাস হাজার টাকা, সব্জির দাম ৫০ থেকে ১০০, এমনকি ১৫০ টাকা পর্যন্ত হয়ে গেল! ভাবে এরা এ সব নিয়ে? মানুষগুলো বাঁচবে কী করে? মানুষের রোজগার কি বাড়ছে? ও সব সরকার এক। কী হবে এদের কথা শুনে?– গজগজ করতে থাকেন তিনি।
বিনয়বাবুর কথাগুলো কিছু অমূলক নয়। ঘরে ঘরে, হাটে-বাজারে কান পাতলে মানুষের এমন রাগ-বিরক্তি-চিৎকার শোনা যায় হামেশাই। লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে জেরবার সাধারণ মানুষ। সব সরকারই ক্ষমতায় আসার় আগে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের কথা বলে। ভোট মিটলে কমা দূরে থাক, জিনিসপত্রের দাম লাফিয়ে বাড়ে কয়েকগুণ। পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী ২০২৩ সাল থেকে সভায় সভায় প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছেন, ‘আমরা কথা দিচ্ছি বাংলায় বিজেপিকে ক্ষমতায় আনলে ৪৫০ টাকায় গ্যাস দেওয়া হবে, ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিনামূল্যে দেওয়া হবে’। একটা অংশের মানুষ তাঁদের এই প্রতিশ্রুতিতে সাময়িক ভাবে বিভ্রান্ত হয়েছেন, তবে আজ হাড়ে হাড়ে বুঝছেন– সে সবই কেবল কথার কথা। জীবনযন্ত্রণায় জর্জরিত মানুষের রাগ বিরক্তি যত্রতত্র ফেটে পড়ছে।
চিনির দাম বৃদ্ধি নিয়ে এখন মানুষের ক্ষোভ তুঙ্গে। পরিসংখ্যান বলছে ২০১৪ সাল থেকে ভারতে আখের উৎপাদন প্রায় ৪৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারত বিশ্বের অন্যতম প্রধান আখ ও চিনি উৎপাদনকারী দেশ। মাত্র ৬ মাস আগেও ৭ লক্ষ মেট্রিক টন চিনি রফতানি করা হয়েছে। তা হলে এখন সরকারকে চিনি আমদানি করতে হচ্ছে কেন? কেমন করে এই ঘাটতি দেখা দিল? কেন ভারতে চিনির দাম লাফিয়ে বাড়ছে? রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-’২৬-এ প্রায় ৩০ লাখ টন আখ ইথানল উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা হয়েছে। এটি দেশের মোট চিনি উৎপাদনের প্রায় ১০ শতাংশের সমান। বিজেপি-ঘনিষ্ঠ শিল্পপতি আদানি গোষ্ঠী এবং মন্ত্রীদের পারিবারিক ব্যবসায় বাড়বাড়ন্তের উদ্দেশ্যে পেট্রলে ইথানল মেশানোর বিষয়ে সরকার ছাড়পত্র দিচ্ছে। যদিও কেন্দ্রীয় সরকার দাবি করেছে, ইথানল উৎপাদন চিনির সংকট ও দামবৃদ্ধির কারণ নয়। তা হলে চিনির দাম বৃদ্ধির কারণ কী? এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনও যুক্তি সরকারের কাছে নেই। কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের পক্ষ থেকে নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে, যে খাদ্য ও পানীয় প্রক্রিয়াকরণ সংস্থাগুলি মাসে ১০ মেট্রিক টনের বেশি চিনি ব্যবহার করে, তারা ১৫ দিনের বেশি ব্যবহারের উপযোগী চিনি মজুত রাখতে পারবে না। যদিও এই মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলি গুদামে মজুত চিনির পরিমাণ কত তার কোনও হিসেব করা হয়নি। অবৈধ মজুত নিয়ে কোনও পদক্ষেপই নেওয়া হয়নি। যে অসঙ্গতিগুলি সামনে আসছে তা থেকে অন্তত এটা বোঝা যায়, মজুতদারি কিংবা ই-২০ পেট্রল– দুই ক্ষেত্রেই লাভবান হচ্ছে বড় পুঁজিপতিরা। দামের বোঝা বইছে জনগণ।
সরকারের হাতে সত্যিই কি দাম নিয়ন্ত্রণের কোনও ক্ষমতা থাকে? যদি কোনও সরকারের উদ্দেশ্য হয় জনকল্যাণ, তবে অবশ্যই ফাটকাবাজি, মজুতদারি বন্ধ করে দাম নিয়ন্ত্রণ করার আইনি ক্ষমতা তার আছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের নিয়ন্ত্রণ মুনাফাবাজদের হাতে ছেড়ে না দিয়ে পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় বাণিজ্য সরকার চালু করতে পারে। উৎপাদকের কাছ থেকে কিনে সরকার তা সরাসরি জনসাধারণের কাছে বিক্রি করতে পারে। অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইন প্রয়োগ করে কালোবাজারি, মজুতদারি ইত্যাদি যে সব কারণে দাম বাড়ে তা অচিরেই বন্ধ করা সম্ভব। কিন্তু পুঁজিবাদের স্বাভাবিক নিয়মে আজ বাজারের প্রতিটি ক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণ করছে একচেটিয়া পুঁজিপতিরা। সরকারগুলি কাজ করে পুঁজিপতিদের পলিটিক্যাল ম্যানেজার হিসেবে। তাই জনকল্যাণ এদের কাছে বহু দূরের বিষয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় বাণিজ্য চালু করলে বৃহৎ ব্যবসায়ীদের অধিকতর মুনাফার স্বার্থে আঘাত লাগবে। কাজেই আইন থাকলেও আর প্রয়োগ হয় না।
মন্ত্রীরা নাকি বাজারে টহল দিয়ে বেড়াচ্ছেন! কিন্তু এ পর্যন্ত কতজনকে তাঁরা শাস্তি দিয়েছেন? ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস বুরো এবং বিভিন্ন বিচার বিভাগীয় পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী অত্যাবশ্যক পণ্য আইনে সাজার হার প্রায় নেই বললেই চলে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০০৯-২০১৪ সময় কালের মধ্যে দেশ জুড়ে প্রায় লক্ষাধিক মামলায় শাস্তি হয়েছে মাত্র ০.১২ শতাংশ ক্ষেত্রে। সম্প্রতি বিজেপি নেতা ও রাজ্যের মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ চিনির দাম বৃদ্ধিতে ফাটকাবাজি বা সিন্ডিকেট চক্রের হাত থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন। এ পর্যন্ত একজন ফাটকাবাজকেও তাঁরা চিহ্নিত করে গ্রেফতার করেছেন কি? কেন্দ্র এবং রাজ্য দুই সরকারই তো তাঁদের হাতে! তা হলে সরকার কি সত্যিই দাম নিয়ন্ত্রণ করতে চায়?
মানুষ যখন বাজারে পেঁয়াজ কেনেন ৭০ টাকায়, তা আসলে মাঠ থেকে ওঠার সময়ে ৪-৫ টাকা কেজিতে চাষির কাছ থেকে কিনে মজুত করে রাখা পেঁয়াজ। ১ কেজি চিনি তৈরি হতে প্রায় ১০ কেজি আখ ব্যবহৃত হয়। ১০ কেজি আখের জন্য চাষি পায় ৩৫-৩৬ টাকা। অর্থাৎ মুনাফার আগুনে ঝলসে যাচ্ছে চাষি এবং সাধারণ ক্রেতা উভয়পক্ষই। ফুলে ফেঁপে উঠছে অল্পসংখ্যক বড় ব্যবসায়ী ও বৃহৎ পুঁজিপতি। সরকারের কাছে জনগণের যে ন্যূনতম প্রত্যাশা তা পূরণ হওয়ারও কোনও সম্ভাবনা নেই। বিনয়বাবুদের মতো সাধারণ মানুষের রাগ তাই স্বাভাবিক। কিন্তু ঘরে কিংবা চায়ের দোকানের উত্তেজনায় তো পরিস্থিতি পাল্টায় না! তা হলে যন্ত্রণা থেকে মুক্তির উপায় কি নেই? জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে জনগণ যদি একে অপরের হাত শক্ত করে ধরতে পারেন, ব্যক্তিগত পরিমণ্ডল থেকে বেরিয়ে সোচ্চার প্রতিবাদী স্বরকে আন্দোলনের ময়দানে ধ্বনিত করতে পারেন, তা হলেই এক মাত্র সরকারকে বাধ্য করা যায় মানুষের কথা শুনতে। এ সত্যকে আবার দেখিয়েছে দিল্লির বুকে আছড়ে পড়া সাম্প্রতিক শক্তিশালী ছাত্র আন্দোলন। সমাধানের এই একমাত্র রাস্তা।