
ওয়াকফ (সংশোধনী) বিল ২০২৫ গত এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে লোকসভা ও রাজ্যসভায় পাস হওয়ার পর অতি দ্রুত রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর পেয়ে আইনে পরিণত হয়েছে। অতি তৎপরতার সাথে কেন্দ্রীয় সরকার তা চালুও করে দিয়েছে। এই সংশোধিত আইনে এমন কিছু বিষয় আছে যা মুসলিম ধর্মাবলম্বী মানুষের মেনে নেওয়া অত্যন্ত কষ্টকর। এই আইন-বলে সরকারের দ্বারাই ওয়াকফ সম্পত্তি গ্রাস করার আশঙ্কা রয়েছে। সেটা স্পষ্ট হয় কেন্দ্রীয় ওয়াকফ কাউন্সিলে চারজন, রাজ্য ওয়াকফ কাউন্সিল ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ওয়াকফ কাউন্সিলে অন্তত তিনজন করে অ-মুসলিম সদস্য মনোনীত করার ক্ষমতা দেওয়ায়। এই যে ক্ষমতা এই আইনে দেওয়া হয়েছে তা মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তাই এই আইন পাস হওয়ার পর মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। দেশ জুড়ে মুসলিম ধর্মীয় সংগঠনগুলি এবং সেই সঙ্গে এ দেশের বহু গণতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন সংগঠনও এই সংশোধনী আইন বাতিলের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে।
ঘটনা হল, ওয়াকফ আইনে আগে কী ছিল এবং এখন কী পরিবর্তন হল এ সম্পর্কে হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধরা তো দূরের কথা এমনকি অসংখ্য মুসলিম ধর্মাবলম্বী মানুষেরও স্পষ্ট ধারণা নেই। অন্য দিকে বিজেপি-আরএসএস যে ভাবে হিন্দুত্ববাদী মানসিকতার প্রসার ঘটিয়ে মুসলিম বিদ্বেষের এক বিপজ্জনক পরিবেশ তৈরি করেছে, তার ফলে অনেকে এই আইন সম্পর্কে কোনও কিছুই না বুঝেও ওয়াকফ সংশোধনী আইনের বিরোধিতা দেখে বিরক্তি প্রকাশ করছেন। গণতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন সংগঠনগুলি মুসলিম ধর্মীয় আচরণ পালন করার অধিকার রক্ষার পক্ষে দাঁড়ানোয় হিন্দুত্ববাদীরা তাকে মুসলিম তোষণ বলে দাগিয়ে দিতে দিচ্ছে।
অন্য দিকে, ধর্মরক্ষার নামে মুসলিম মৌলবাদী সংগঠনগুলিও এই সুযোগে প্রবল সক্রিয় হয়ে নিজেরা যেমন জায়গা পাওয়ার চেষ্টা করেছে, তেমনই বিজেপি-আরএসএস-ও পরোক্ষ ভাবে তারই প্রতিক্রিয়ায় সংগঠন বাড়াতে সুবিধা পেয়ে যাচ্ছে। তৃণমূল কংগ্রেসের বহু নেতাও এই মুসলিম মৌলবাদীদের হাতে রাখতে চেয়েছে এবং তাদের নিজের দলে এমন মৌলবাদী চিন্তার লোক অনেক রয়েছে। তার ফলে পশ্চিমবাংলার মুর্শিদাবাদ জেলা সহ সারা দেশের বেশ কিছু জায়গায় ছোটখাটো দাঙ্গা ঘটেছে বা দাঙ্গার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল।
সকলের এ কথা স্মরণে আছে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সেই সময় মুসলিম ধর্মাবলম্বী মানুষকে আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন যে, এ রাজ্যে তিনি ওয়াকফ সংশোধনী আইন চালু হতে দেবেন না। কিন্তু দেখা গেল, চুপিসারে গত নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে রাজ্যের তৃণমূল সরকার এই আইনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারা মেনে নিয়ে ‘উমিদ’ পোর্টালে ওয়াকফ সম্পত্তির কাগজপত্র আপলোড করার নির্দেশ দিয়েছে। আইন অনুযায়ী যে কাজ ছয় মাসে করার কথা, সেই কাজ ১০ দিনে সম্পন্ন করার জায়গায় দাঁড় করিয়েছে।
ভারতে যে কোনও ধর্মের মানুষের তার নিজের ধর্মাচরণের অধিকার স্বীকৃত। এই কারণেই বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনগুলি ধর্মীয় নির্দেশ ও বিশ্বাস অনুযায়ী তাদের সম্পত্তি রক্ষা করার অধিকারী। সব ধর্মেরই ধর্মীয় সম্পত্তি রক্ষার এবং সেই সম্পত্তির উপর ভিত্তি করে নানা সংস্থা পরিচালনার আইন রয়েছে। মুসলিমদের মধ্যে তেমনই একটি আইন ছিল ওয়াকফ আইন।
তেমনই হিন্দুদের রয়েছে ‘দেবোত্তর সম্পত্তি আইন’, যা সেবাইতরা দেখভাল করে। এ রাজ্যে রয়েছে ‘পশ্চিমবঙ্গ দেবোত্তর সম্পত্তি আইন’, তামিলনাড়ুতে রয়েছে ‘হিন্দু রিলিজিয়াস অ্যান্ড চ্যারিটেবল এনডাওমেন্ট অ্যাক্ট’। কর্ণাটকে রয়েছে ‘দ্য হিন্দু রিলিজিয়াস ইনস্টিটিউশনস অ্যান্ড চ্যারিটেবল অ্যাক্ট’। এমনই নানা রাজ্যে নানা নামে দেবোত্তর সম্পত্তি রক্ষার আইন রয়েছে। এটা যেমন হিন্দুধর্মাবলম্বীদের অধিকার, তেমনই অন্য ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রেও সত্য। মূলত তেমন করেই ওয়াকফ আইন তৈরি হয়েছিল এবং সময়ের সাথে সাথে সেই ওয়াকফ আইনের সংশোধনীও হয়েছিল। কিন্তু এত দিন পর্যন্ত সংশোধনীগুলিতে সম্পত্তি রক্ষাই ছিল মূল প্রতিপাদ্য। কিন্তু এ বার তা নয়, এ বার সম্পত্তি কেড়ে নেওয়ার ফাঁক রাখা হয়েছে ওয়াকফ আইনের মধ্যেই।
দেখা যাক, এ বারের ওয়াকফ (সংশোধনী) আইনে কী কী পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগেই বলা হয়েছে, নতুন ওয়াকফ (সংশোধনী) আইনে কেন্দ্রীয় ওয়াকফ কাউন্সিলে চার জন, রাজ্য ওয়াকফ কাউন্সিল ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ওয়াকফ কাউন্সিলগুলিতে অন্তত তিনজন করে অ-মুসলিম রাখা হবে। খুব স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন ওঠে, হিন্দুধর্মীয় সংগঠনগুলি পরিচালনার ক্ষেত্রে তা হলে কেন অ-হিন্দু এবং খ্রিস্টান ধর্মীয় সংগঠনগুলি পরিচালনার ক্ষেত্রে অ-খ্রিস্টান রাখা হবে না? কেন মুসলিম ধর্মীয় সংগঠনের ওয়াকফ কাউন্সিলে শুধুমাত্র অ-মুসলিম রাখা হবে? এসব প্রশ্নের কোনও উত্তর কেন্দ্রীয় সরকার দেয়নি।
এ ছাড়াও পূর্বের ওয়াকফ আইনের প্রথম পরিচ্ছদের ধারা-৩ এর (দ) উপধারায় ওয়াকফ-এর অর্থ বোঝাতে বলা হয়েছিল, ‘কোনও ব্যক্তির দ্বারা তার স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি মুসলিম আইনের দ্বারা স্বীকৃত ধর্মের জন্য বা দানের উদ্দেশ্যে ব্যবহারের জন্য স্থায়ী ভাবে দান করা।’ এ ক্ষেত্রে যিনি দান করবেন তার ধর্মের উল্লেখ ছিল না। কিন্তু নতুন সংশোধিত আইনে বলা হয়েছে, একজন ব্যক্তি মুসলিম ধর্মাবলম্বী হলেই হবে না, তাকে অন্তত পাঁচ বছর মুসলিম ধর্মাচরণ পালন করতে হবে। তবেই তিনি ওয়াকফে দান করতে পারবেন।
(২) এই উপধারাতেই পুরাতন আইনে ছিল ‘ওয়াকফের আয় থেকে শিক্ষা, উন্নয়ন ও কল্যাণমূলক কাজে এবং মুসলিম আইনে স্বীকৃত এই ধরনের অন্যান্য কাজে ব্যয় করা হবে। কিন্তু নতুন সংশোধিত আইনে ‘কল্যাণমূলক’ শব্দটি বাদ দিয়ে বিধবা, বিবাহবিচ্ছিন্না ও অনাথদের জন্য ব্যয় করার কথা বলে, তার সাথেই যুক্ত করা হয়েছে … as may be prescribed by the Central Government’ অর্থাৎ কেন্দ্রীয় সরকার যেমন ভাবে বিহিত করতে বলবেন তেমন ভাবে খরচ হবে।
(৩) নতুন সংশোধিত আইনে বলা হয়েছে, আইন কার্যকরী হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে ওয়াকফে দান করা সমস্ত সম্পত্তির তথ্য পোর্টালে তুলতে হবে এবং ডাটাবেস তৈরি করতে হবে। কবে কে ওয়াকফ তৈরি করেছে বা দান করেছে তার নাম-ধাম জানাতে হবে। সেই ওয়াকফ সম্পত্তি নিয়ে কোনও মামলা আছে কি-না তা-ও জানাতে হবে। এখানেও রয়েছে আপত্তি। এই কথাটা যত সহজে আইনে লেখা হয়েছে পোর্টালে তোলা এবং ডাটাবেস তৈরি করা তত সহজ নয়। ৫০০, ৭০০ বছর আগে কবে কে ওয়াকফ তৈরি করেছে, কবে কে দান করেছে, তার নামধাম ঠিকানা জানা যাবে কী করে? এটা কি আদৌ বাস্তবসম্মত ধারা?
৩-এর (ক) ধারায় বলা হয়েছে, অতীতে যদি ভুল করে কোনও সম্পত্তিকে ‘ওয়াকফ সম্পত্তি’ বলে ঘোষণা করা হয়ে থাকে, তা হলে প্রমাণ দিতে হবে যে সেই সম্পত্তি সরকারি সম্পত্তি নয়। যদি সেই প্রমাণ না দিতে পারা যায় তবে সেটি সরকারি সম্পত্তি হিসেবেই বিবেচিত হবে। আইনে আরও বলা হয়েছে, এ ধরনের সম্পত্তি সরকারি সম্পত্তি কি-না তা তদন্ত করে দেখবেন রাজ্য সরকার দ্বারা নোটিফিকেশন করে নিয়োজিত কালেক্টর র্যাঙ্কের একজন ডেজিগনেটেড অফিসার। তিনি তদন্ত করে সরকারের কাছে রিপোর্ট জমা দেবেন। যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি রিপোর্ট জমা না দিচ্ছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত ওই সম্পত্তি আর ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে উল্লেখ করা যাবে না এবং এর নিষ্পত্তির জন্য কোনও সময়সীমা রাখা হয়নি। তাহলে কী দাঁড়াল? ওয়াকফের আওতাধীন কোনও সম্পত্তিকে সরকারি দাবি করে তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি করার অবকাশ সৃষ্টি হল।
যদিও এই সংশোধনী আইন চালুর সময় সুপ্রিম কোর্টে যে মামলা হয়েছিল, তাতে ওয়াকফে সম্পত্তি দান করতে পাঁচ বছর ইসলাম ধর্ম পালন, কোনও সম্পত্তি ওয়াকফ সম্পত্তি কি-না তা নির্ধারণে জেলাশাসককে সিদ্ধান্ত নিতে ক্ষমতা দান, কেন্দ্রীয় ও রাজ্য ওয়াকফ কাউন্সিলে অ-মুসলিম সদস্য রাখার বিষয়ে ধারাগুলির উপর সুপ্রিম কোর্ট স্থগিতাদেশ দেয়। কিন্তু পোর্টালে ওয়াকফ সম্পত্তির নথি আপলোড করা, ডাটাবেস তৈরি করার কাজটি চলতে থাকে। তৃণমূল কংগ্রেস সরকার তখন ‘এ রাজ্যে ওয়াকফ সংশোধনী আইন চালু হবে না’ বললেও আজ হঠাৎ করে কেন্দ্রীয় সরকারের অনুগত হয়ে নথিপত্র আপলোড করার নির্দেশ দিয়েছে। এর ফলে অল্প সময়ে বহু ওয়াকফ সম্পত্তি আপলোড করতে খুবই সমস্যার সম্মুখীন হবে বলে আশঙ্কা।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করা প্রয়োজন যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী ‘এ রাজ্যে সিএএ চালু করতে দেব না’, ‘এ রাজ্যে এসআইআর হতে দেব না’, কথাগুলি যে সুরে বলেছিলেন, ‘ওয়াকফ সংশোধনী আইন চালু করতে দেব না’ কথাটিও সেই একই সুরে বলেছিলেন। এবং তার কোনওটিই তিনি রক্ষা করতে পারেননি। এগুলি আসলে সমস্যার সমাধান নয়, ভোটব্যাঙ্ক রক্ষা করার অপকৌশল মাত্র। ফলে বিজেপি সরকারের তৈরি নতুন ওয়াকফ আইন এবং রাজ্যের তৃণমূল সরকার কর্তৃক তার প্রয়োগ মুসলিম জনগণকে ওয়াকফ সম্পত্তি নিয়ে সঙ্কটের সামনে দাঁড় করিয়েছে।