
‘সমাজতন্ত্র’ শব্দটা ধনকুবেরদের বুকে কেমন কাঁপন ধরায় এবং একই সাথে তা খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ এবং সমাজের প্রান্তিক অংশের কাছে কতখানি আকর্ষণ সৃষ্টি করে, তা আবার দেখা গেল নিউইয়র্ক শহরের মেয়র পদে খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প-সমর্থিত প্রার্থীকে হারিয়ে জোহরান মামদানির জয়ে। একটা শহরের মেয়র পদ বিশ্বের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তো বটেই এমনকি একটি দেশের মূল রাজনৈতিক নীতি নির্ধারণের প্রশ্নে তেমন কিছুই নয়। তবু এই নির্বাচন সারা বিশ্বে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। তার প্রধান কারণ মামদানির নামের সাথে ‘সমাজতন্ত্রী’ কথাটা জড়িয়ে থাকা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে মামদানিকে হারানো এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল যে, তিনি তাঁর নিজের দল রিপাবলিকান পার্টির বদলে ভোটারদের বলেছেন নির্দল হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা বিদায়ী ডেমোক্র্যাট মেয়র অ্যান্ড্রু কুওমোকে ভোট দিতে। এমনকি মামদানিকে আটকাতে কেন্দ্রীয় বাহিনী ন্যাশনাল গার্ড নামিয়ে দেওয়া এবং এর পরেও মামদানি জিতলে নিউইয়র্কের জন্য ফেডারেল সরকারের আর্থিক বরাদ্দ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন তিনি। মামদানি জিতলে নিউইয়র্ক ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন ধনকুবেরদের একাংশ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তো মামদানিকে একেবারে ‘কমিউনিস্ট’ বলেই আখ্যা দিয়েছেন। পুঁজিমালিকদের অভিধানে যেটা একেবারে জঘন্য গালি ও আতঙ্কজনক শব্দ। এ ছাড়াও তাঁকে বলা হয়েছে ‘ইসলামিস্ট’, ‘ইহুদি বিদ্বেষী’ ইত্যাদি। যদিও তিনি নিজে ঘোষিত ‘গণতান্ত্রিক-সমাজতন্ত্রী’ অর্থাৎ মূলত সংস্কারপন্থী। পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে আমূল বদলে ফেলার বৈপ্লবিক লক্ষ্য তাঁর নেই, তিনি এই পুঁজিবাদী রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যেই মানুষের জন্য আরও কিছুটা বাঁচার পরিসর দাবি করেন। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র কিংবা কমিউনিজমের সাথে তাঁর দূরত্ব অনেক হলেও মানুষের ভাল চান বলে কিছু বিষয়ে তাঁর মতের সাথে কমিউনিস্টদের মিল হয়, আবার বহু ক্ষেত্রেই অমিল প্রচুর।
ভারতীয় চিত্রপরিচালক মা এবং অধ্যাপক বাবার সন্তান জোহরান কওমে মামদানি ডেমোক্র্যাট দলের অফিসিয়াল প্রার্থী হিসাবে ভোটে দাঁড়িয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, দরিদ্রদের জন্য সস্তায় আবাসন, বাড়ি ভাড়ার সীমা নিয়ন্ত্রণ, নিখরচায় বাস পরিষেবা, সব আয়ের মানুষের জন্য সুবিধাজনক শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র, নিউইয়র্কে খাদ্য সামগ্রী সহ সমস্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের সরকারি দোকান, ২০৩০-এর মধ্যে নূ্যনতম দৈনিক মজুরি ৩০ ডলার করা, পুলিশ বাহিনীর সংস্কার, ১০ লক্ষ ডলার বা তার বেশি বার্ষিক আয় করা ধনীদের ওপর কর বৃদ্ধি ইত্যাদি। তিনি জনকল্যাণের কাজে অর্থ জোগাড়ের জন্য অতি ধনীদের উপর ১ শতাংশ ট্যাক্স বাড়ানোর কথা বলেছেন। মার্কিন রাজনীতিতে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট এই দুই দলের মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা চললেও দুটি দলই পুঁজিপতিদের রাজনৈতিক ম্যানেজার হিসাবে কাজ করে। তাই তাদের মূলগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং ভূমিকা এক। সে জন্যই রিপাবলিকান ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরোধী প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডেমোক্র্যাট জো বাইডেন এবং তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের থেকে আলাদা কিছু ট্রাম্প করছেন না। প্যালেস্টাইনের গণহত্যার প্রতি নির্লজ্জ সমর্থন, অর্থনীতির সামরিকীকরণ থেকে শুরু করে পরিবেশ বিধি ধ্বংস করার কাজে বহুজাতিক কোম্পানিদের মদত দেওয়া, জনকল্যাণ খাতে অর্থ বরাদ্দ কমানো, ইত্যাদি কোনও বিষয়েই এঁরা কেউ আলাদা নন। মামদানি ডেমোক্র্যাট দলের মধ্যে থেকেও ডেমোক্রেটিক সোস্যালিস্টস অফ আমেরিকা বা ডিএসএ নামে একটি বামপন্থী সংগঠনের সদস্য। এই সংগঠনে বহু মতের মানুষ আছেন, তাঁদের কেউ কেউ বিপ্লবাত্মক সমাজ পরিবর্তন চাইলেও অনেকেই ‘সমাজতন্ত্র’ কথাটা বর্তমান ব্যবস্থারই নিতান্ত নিরীহ সংস্কার সাধনের অর্থে বোঝেন। নিউইয়র্ক মেয়র নির্বাচনে মামদানি ডেমোক্র্যাট দলের প্রাইমারিতে জিতে ভোটের টিকিট পেয়ে জনকল্যাণের কিছু কথা বলা মাত্রই সমাজতন্তে্রর ছায়া দেখে আতঙ্কিত ডেমোক্র্যাট সমর্থক ধনকুবেররা তাঁর বিরোধিতায় একজোট হয়ে যান। তাঁরা বিদায়ী ডেমোক্র্যাট মেয়র তথা যৌন কেলেঙ্কারি এবং দুর্নীতিতে অভিযুক্ত অ্যান্ড্রু কুওমোকে নির্দল প্রার্থী খাড়া করে দেন। তাঁরা যে ভোট কেনার চেষ্টায় শত শত কোটি ডলার ঢেলেছেন তা স্পষ্টভাবেই মার্কিন সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। কিন্তু একেবারে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের কথা তুলে ধরার কৌশলে মামদানি তাঁর পাশে সমর্থন জড়ো করতে থাকেন। আক্ষরিক অর্থেই তাঁর সমর্থনে সাধারণ মানুষের ঢল নামে। নিউইয়র্কের সমস্ত শ্রমিক ও গরিব মহল্লার মানুষ একেবারে ঢেলে ভোট দিয়েছেন মামদানিকে। ইজরায়েল সরকারের সমালোচক বলে তাঁকে ইহুদি বিদ্বেষী হিসাবে দেখানোর চেষ্টা হলেও ৩০ শতাংশের বেশি ইহুদি ভোট তিনিই পেয়েছেন। আমেরিকান পার্টি অফ লেবারের মতে কৃষ্ণাঙ্গ, শ্বেতাঙ্গ, হিস্পানিক, ল্যাটিনো, খ্রিস্টান, মুসলিম নির্বিশেষে দরিদ্র ও নিম্নবিত্তদের ক্ষোভ এই ভোটকে ঘিরে ফেটে পড়তে চেয়েছে। তাঁরাই দাঁড়িয়েছেন মামদানির পাশে।
মামদানি তাঁর প্রতিশ্রুতি রক্ষায় সচেষ্ট যদি হনও শোষণমূলক পুঁজিবাদী ব্যবস্থাটার উচ্ছেদ তাঁর লক্ষ্য নয়। বরং নিশ্চিত ভাবে বলা যায়, জনগণের ক্ষোভের সামনে আপাতত মামদানির বামপন্থাকে মেনে নিতে শাসক বুর্জোয়া শ্রেণি বাধ্য হলেও, সামান্য সংস্কারের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিপ্লবী রাস্তায় তাঁর পা ফেলার চেষ্টা দেখতে পেলেই তাঁকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে তৎপর হয়ে উঠবে তারা।
একই সাথে এই নির্বাচন আবার সামনে এনে দিল পুঁজিবাদী দুনিয়ার অর্থনৈতিক ইঞ্জিন আমেরিকার ভয়ানক সংকটময় পরিস্থিতিকে। এই সংকট থেকে ত্রাণের আশায় মার্কিন শাসকরা এনেছিল ‘নয়া উদার অর্থনীতি’ ও ‘বিশ্বায়ন’। কিন্তু অনেক আগে থেকেই, এমনকি ট্রাম্পের প্রথম দফার গদি লাভের আগেই তারা এর থেকে পালানোর পথ খোঁজা শুরু করেছে। মার্কিন অর্থনীতির আভ্যন্তরীণ সংকট এতটাই তীব্র যে, যে কোনও মুহূর্তে গণবিক্ষোভ ফেটে পড়ার আশঙ্কা শাসকদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। তাই কখনও ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ স্লোগান, কখনও অভিবাসীদের ঘাড়ে সব সংকটের দায় চাপিয়ে দেশের মানুষের স্বদেশ প্রীতিতে উস্কানি দিয়ে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা ইত্যাদি কাজ তারা করে যাচ্ছে। ট্রাম্প সাহেব বিদেশি পণ্যে বাড়তি শুল্ক চাপানোর মাধ্যমে দেশীয় শিল্পে কর্মসংস্থান ও সরাসরি সাধারণ মানুষকে আর্থিক অনুদানের খোয়াব দেখাচ্ছেন। এই রকম পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের অভিবাসী বিরোধী ও শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বের প্রবল জিগিরের মধ্যেই আফ্রিকার উগান্ডায় জন্ম নেওয়া ভারতীয় বংশোদ্ভূত একজন, যিনি মাত্র ২০১৮-তে মার্কিন নাগরিকত্ব অর্জন করেছেন, তাঁর এই বিপুল জয় অনেককে অবাক করেছে। আবার পুঁজিপতিদের আতঙ্কিতও করেছে। কারণ ট্রাম্প সাহেবদের জাতি ও বর্ণবিদ্বেষমূলক স্লোগানকে নস্যাৎ করে মানুষ ধনববৈষম্যের বিরুদ্ধে মাথা তুলছে, ধনকুবেরদের বিরুদ্ধে এক হতে চাইছে। তারা ‘ট্যাক্স দ্য রিচ’ স্লোগানে সোচ্চার, ‘সমাজতন্ত্র’ কথাটা শুনে উদ্বেল হয়ে উঠছে– পুঁজিপতি শ্রেণির চোখে এ বড় সুখের সময় নয়।
মামদানি যদি ‘সমাজতন্ত্র’ এবং জনকল্যাণের কথাকে নিছক ভোট কৌশল হিসাবে ভেবেও থাকেন, দেওয়ালে পিঠ ঠেকা খেটে খাওয়া মানুষের কাছে সেটাই আজ আঁকড়ে ধরার মতো সম্বল। তাই সাধারণ নিউইয়র্কবাসী নিঃশেষে বিশ্বাস করেছেন মামদানিকে। এর আগেও ডেমেক্র্যাট দলের নেতা বার্নি স্যান্ডার্স দুবার প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হওয়ার জন্য নিজের দলের মধ্যে লড়েছেন সমাজতান্ত্রিক স্লোগান দিয়ে। তিনি ব্যর্থ হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সমাজতন্ত্র শব্দটা যে মানুষের কাছে কতটা আশা জাগায় তা তখনই বোঝা গেছে। এই নির্বাচনে আরও একটা জিনিস পরিষ্কার হল– কমিউনিজম এবং সমাজতন্তে্রর বিরুদ্ধে যতই ঘৃণা জাগানোর চেষ্টা ট্রাম্প বা পুঁজিবাদী দুনিয়া করুক না কেন, খেটে খাওয়া মানুষের কাছে এর আকর্ষণ ক্রমাগত বাড়ছে। একই সাথে আবারও বেআব্রু হয়ে গেল মার্কিন গণতন্তে্রর প্রকৃত স্বরূপটি। ‘পবিত্র’ সংসদীয় গণতন্ত্রের জরাজীর্ণ আলখাল্লার ফুটো দিয়ে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ফ্যাসিবাদী মুখটা আবারও প্রকট হয়ে বেরিয়ে এল ট্রাম্প সাহেবের আচরণে।