ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হানাদারি কী উদ্দেশ্যে

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী হামলা ও রাষ্ট্রপতিকে অপহরণের প্রতিবাদে কলকাতায় মার্কিন তথ্য দপ্তরের সামনে বামদলগুলির বিক্ষোভ মিছিল। ১২ জানুয়ারি

ল্যাটিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে গত ৩ জানুয়ারি আমেরিকার কম্যান্ডো বাহিনি আচমকা হানা দিয়ে অপহরণ করে বন্দি করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁদের বিরুদ্ধে ড্রাগ পাচারের অভিযোগ তুলে জানিয়েছেন আমেরিকায় এর বিচার হবে। ভেনেজুয়েলার শাসনভার নেবে আমেরিকা এবং প্রয়োজনে সেখানে মার্কিন সেনাও পাঠানো হবে।

রাষ্ট্রপুঞ্জের সনদ সহ সমস্ত আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়ম-কানুনকে পদদলিত করে একটি দেশের নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানকে সস্ত্রীক অপহরণের ঘটনা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নির্লজ্জ দস্যুবৃত্তি আরও একবার প্রকট করেছে। খানিকটা আতঙ্কও ছড়িয়েছে। ‘সর্বশক্তিমান’ ট্রাম্প সাহেবের পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু কোন দেশ, তা নিয়ে জল্পনা কল্পনাও শুরু হয়েছে। কিন্তু সামগ্রিক বিশ্ব-পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না, এই গুন্ডাগিরির মধ্য দিয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ যে ভাবে পেশি প্রদর্শনের চেষ্টা করেছে, তার পিছনে আসলে রয়েছে তার নিজের সঙ্কট।

আমেরিকার উঠোন হিসাবে পরিচিত ল্যাটিন আমেরিকার যে দেশগুলি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে এখনও প্রতিবাদী, ভেনেজুয়েলা তাদের অন্যতম। ২০০২ সালে ভেনেজুয়েলায় অভ্যুত্থানের অপচেষ্টা থেকে শুরু করে ২০১৯-এ নির্বাচন ছাড়াই একজন অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্টকে স্বীকৃতি দেওয়া, বার বার আক্রমণ ও মাদুরো-সরকারকে অপসারণের হুমকি, মিথ্যা অজুহাত তুলে দেশটিকে বিপন্ন ও অস্থির করে তোলার অপচেষ্টা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে আসছে। বার বার অবরোধ জারি করে অর্থনীতিকে বেশ খানিকটা বিপর্যস্ত করে দিতে পারলেও এত দিন পর্যন্ত ভেনেজুয়েলাকে বশংবদ বানাতে পারেনি আমেরিকা। শেষ পর্যন্ত সেখানকার রাষ্ট্রপ্রধানকে বন্দি করতে সরাসরি হামলা চালানোর ছক কষেছেন ট্রাম্প।

কেন ভেনেজুয়েলা

ভেনেজুয়েলাকে কেন এ ভাবে মুঠোয় পুরতে চাইছে আমেরিকা? ভেনেজুয়েলার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজ মন্তব্য করেছিলেন যে, খনিজ তেল তথা পেট্রোলিয়াম কেবল একটা পণ্য নয়, এ হল একটি ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ার। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তেলসমৃদ্ধ দেশ ভেনেজুয়েলা। গোটা বিশ্বের মোট তেলভাণ্ডারের ১৭ শতাংশ রয়েছে এই দেশের দখলে। পাশাাপাশি সে দেশে রয়েছে সোনা ও বিরল মৃত্তিকা মৌলের বিপুল সমাহার। এক সময় এক্সনমোবিল, গাল্ফ অয়েল ইত্যাদি মার্কিন তেলসংস্থার বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ ছিল ভেনেজুয়েলায়। কিন্তু হুগো শ্যাভেজের নেতৃত্বে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সরকার কায়েম হওয়ার পর ২০০৭ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজ সে দেশের তেলসম্পদ জাতীয়করণ করেন। ব্যবসা লাটে ওঠে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানিগুলির। এ দিকে দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে ট্রাম্প সাহেব আমেরিকার অর্থনীতিকে শক্তিশালী বানানোর যত প্রতিশ্রুতিই দিন না কেন, বেকারি, মূল্যবৃদ্ধির মতো সমস্যায় আমেরিকার অর্থনীতি যথেষ্ট জেরবার। রেটিংয়ের হিসাবে দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও গত এক বছরে বেশ খানিকটা কমেছে। এ দিকে এ বছর বেশ কয়েকটি স্থানীয় নির্বাচন তো রয়েছেই, আবার ২০২৮-এ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মহাক্ষণও এগিয়ে আসছে। এই অবস্থায় একদিকে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন বহুজাতিক পুঁজির ব্যবসা নতুন করে কায়েম করা, অন্য দিকে পেট্রোলিয়াম সহ বিপুল খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ দেশটিকে বশে এনে নিজের সর্বশক্তিমান ভাবমূর্তি বজায় রাখার উদ্দেশ্য কাজ করেছে ট্রাম্প সাহেবের এই কাপুরুষোচিত হামলার পিছনে।

কেন আশঙ্কিত আমেরিকা

ল্যাটিন আমেরিকার বেশ কয়েকটি দেশকে নিজের ক্ষমতার বৃত্তের ভিতরে আনতে সক্ষম হলেও কিউবার মতো ভেনেজুয়েলা দেশটিও এখনও পর্যন্ত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের বিরুদ্ধে নিজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে পেরেছে। শুধু তাই নয়, বর্তমানে আমেরিকার বিশ্বজোড়া আধিপত্যের সামনে চ্যালেঞ্জ হিসাবে মাথা তুলছে যে চিন ও রাশিয়া, ভেনেজুয়েলা তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ক্রমাগত ঘনিষ্ঠ করেছে। এমনকি আমেরিকার জারি করা অবরোধের তোয়াক্কা না করে মূলত চিন ও রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের জোরে ভেনেজুয়েলা তার খনিজ তেল বিক্রির মাধ্যম হিসাবে ডলারকে হঠিয়ে ইউয়ান, রুবল ও ইউরোকে বেছে নিয়েছে। এতে খানিকটা হলেও ধাক্কা খেয়েছে বিনিময়ের মাধ্যম হিসাবে ডলারের বিশ্বজোড়া আধিপত্য। এখানেই ভয় ট্রাম্পের।

চিন-ভেনেজুয়েলা ঘনিষ্ঠতা

এমনিতেই আমেরিকার খনিজ তেলের নিজস্ব সঞ্চয় কমতে থাকা এবং তেলের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির উপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে ট্রাম্প প্রশাসন চাপের মুখে। এ দিকে ২০২৪-’২৫-এর তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে, জল, বাতাস, সৌরশক্তি ইত্যাদি ব্যবহার করে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির পরিমাণে চিন ছাপিয়ে গেছে আমেরিকাকে। এর পাশাপাশি চিনা পণ্যে ছেয়ে যাচ্ছে গোটা বিশ্বের বাজার, যা আমেরিকাকে দুশ্চিন্তায় ফেলেছে।

১৯৯৯ সালে ভেনেজুয়োলর প্রেসিডেন্ট হয়ে হুগো শ্যাভেজ ধীরে ধীরে চিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে তোলেন। ১৯৯৯-২০১০– এই ১১ বছরে অন্তত ছ’বার চিন সফর করেছেন শ্যাভেজ এবং চিন ক্রমে ভেনেজুয়েলার স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হিসাবে জায়গা করে নিয়েছে। পরবর্তীকালে প্রেসিডেন্ট মাদুরোও চিন এবং রাশিয়ার সঙ্গে ভেনেজুয়েলার ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছেন। খনিজ তেলের বিনিময়ে ভেনেজুয়েলাকে বিপুল পরিমাণ ঋণ দিয়েছে চিন, সে দেশের পরিকাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়নে বিপুল পরিমাণ পুঁজিও বিনিয়োগ করেছে তারা। পাশাপাশি আমেরিকার হুমকি উপেক্ষা করে রাশিয়ার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে ভেনেজুয়েলা। দুই দেশের মধ্যে খনিজ তেল, উৎপাদিত পণ্য ও অস্ত্রশস্ত্রের বিপুল বিনিময় চলেছে।

বেপরোয়া হয়ে উঠেছে আশঙ্কিত আমেরিকা

এমনিতেই বিশ্বে নিজের এক নম্বর অবস্থান হারিয়ে ফেলার আশঙ্কায় ভুগছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। এর উপর তার নাকের ডগায় বসে ঘরের পাশের দেশ ভেনেজুয়েলায় চিন-রাশিয়ার এমন দাপাদাপি এবং খোদ ভেনেজুয়েলার এতখানি স্পর্ধা সহ্য হয়নি ট্রাম্প সাহেবের। গোটা বিশ্বের চোখে নিজের দস্যু-ভাবমূর্তি আরও পাকাপোক্ত হয়ে ওঠার আশঙ্কা উপেক্ষা করে নিতান্ত বেপরোয়া হয়েই রাতের অন্ধকারে গোপনে কাপুরুষের মতো ভেনেজুয়েলায় হামলার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

সাম্রাজ্যবাদের দানবিক মুখ

বাস্তবে সাম্রাজ্যবাদ আজ এমন বেপরোয়া দানবিক চেহারাই নিয়েছে। ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়ার মতো দেশগুলিতে মিথ্যা অজুহাতে বছরের পর বছর ধরে নৃশংস আগ্রাসন চালিয়ে, গাজায় শিশু সহ কয়েক লক্ষ মানুষকে হত্যা করে আমেরিকা আজ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, সাম্রাজ্যবাদী মুনাফার স্বার্থে আজ কোনও অপরাধেই সে পিছপা নয়। বলা বাহুল্য, সমাজতান্ত্রিক শিবিরের অনুপস্থিতির কারণেই সাম্রাজ্যবাদের আজ এই বাড়বাড়ন্ত। সোভিয়েত ইউনিয়ন সহ পূর্ব ইউরোপের দেশগুলিতে প্রতিবিপ্লবের মাধ্যমে পুঁজিবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ায় যাঁরা ভেবেছিলেন, এত দিনে বিশ্ব জুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হল, সাম্রাজ্যবাদের এই দানবিক মুখ এখন তাঁদের বিদ্রুপ করছে!

চিন-রাশিয়ার লজ্জাজনক ভূমিকা

যে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে চিন ও রাশিয়া ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে যুক্ত, সেখানে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এই ঘৃণ্য হামলার বিরুদ্ধে তারা সরব হবে– স্বাভাবিক ভাবে মানুষ এমনই ভেবেছিল। কিন্তু এই দুটি দেশই স্রেফ মার্কিন হামলার নিন্দা করে বিবৃতি দিয়েই দায়িত্ব সেরেছে। বাস্তবে চিন এবং রাশিয়া সমাজতন্ত্র ত্যাগ করে আজ নিজেরাই পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী দেশে পরিণত হয়েছে। তাই নিজেদের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে ভেনেজুয়েলার পক্ষে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে তারা রাজি নয়।

ভারতেও জনগণের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী দীর্ঘ ঐতিহ্য সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলার নিন্দা করার সাহসটুকু পর্যন্ত দেখাতে পারল না কেন্দ্রের বিজেপি সরকার, শুধু উদ্বেগ প্রকাশ করেই দায় সারল। স্পষ্ট হল, প্রধানমন্ত্রীর ‘৫৬ ইঞ্চি ছাতি’ শুধু দেশের নাগরিকদের একটার পর একটা গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের অস্ত্র আর ভোটের সময়ে দলীয় প্রচারের হাতিয়ার। দেশের একচেটিয়া পুঁজির সেবাদাস কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকার আদানি-আম্বানিদের মুনাফার স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার ভয়ে আমেরিকার সঙ্গে সখ্যতা বজায় রাখাকেই শ্রেয় মনে করেছে।

প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে জনসাধারণকেই

আশার কথা, বিশ্বের দেশে দেশে সাধারণ মানুষ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ভেনেজুয়েলায় নির্লজ্জ হানাদারির বিরুদ্ধে প্রবল ভাবে সোচ্চার হয়েছে। অবিলম্বে প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে দেশে ফেরানোর দাবিতে ভেনেজুয়েলায় প্রতিদিন বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন সেখানকার নাগরিকরা। যুদ্ধজোট ন্যাটোভুক্ত ইউরোপের দেশে দেশেও হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন এই অন্যায় হামলার বিরুদ্ধে পথে নামছেন। খোদ আমেরিকায় শহরে শহরে প্রেসিডেন্ট মাদুরোর অন্যায় অপহরণের বিরুদ্ধে পথে নামছেন মার্কিন নাগরিকরা। ভারতেও এসইউসিআই(কমিউনিস্ট) ঘটনার সংবাদ পাওয়া মাত্র গোটা দেশ জুড়ে রাজ্যে রাজ্যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখিয়েছে, ট্রাম্পের কুশপুতুল পুড়িয়েছে। অন্যান্য বামপন্থী দলগুলির সঙ্গে যৌথ ভাবেই দেশ জুড়ে প্রতিবাদে শামিল হয়েছে এসইউসিআই(সি)।

সাম্রাজ্যবাদের এই বেপরোয়া ও দানবিক আক্রমণ রুখতে এ ভাবেই আজ পথে নামতে হবে জনসাধারণকে। বিশ্বজোড়া সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামী আন্দোলন গড়ে তুলে তাকে শক্তিশালী করতে হবে। সেই আন্দোলনের আঘাতেই প্রতিহত হবে ঘৃণ্য সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন।