Breaking News

ভিবিজি রামজি বিলঃ গ্রামীণ জনগণের কাজের সুযোগের উপর পরিকল্পিত আক্রমণ

এ দেশের খেতমজুর সহ গ্রামীণ মজুরদের সারা বছর কাজ ও ন্যায্য মজুরি না পাওয়া একটি স্থায়ী সমস্যা। দেশের ৬৫ ভাগ জনগণ কৃষির সাথে যুক্ত, এর মধ্যে ৫৪ শতাংশ মানুষ খেতমজুর বা গ্রামীণ মজুর। অর্থাৎ প্রায় ৫০ কোটি মানুষ গ্রামীণ মজুর যাদের অর্ধাহারে-অনাহারে, বিনা চিকিৎসায় দিন কাটাতে হয়। এরাই মূলত ‘মনরেগা’ বা মহাত্মা গান্ধী ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি অ্যাক্ট (MGNREGA)-এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে ১০০ দিনের কাজ পাওয়ার অধিকারী।

সাধারণ ভাবে খেতমজুররা বছরে দু-তিন মাসের বেশি কাজ পান না। এই যোজনার নানা সীমাবদ্ধতা ও ত্রুটি-দুর্নীতি সত্ত্বেও এত দিন গ্রামীণ মজুরদের পরিবার পিছু ১০০ দিন কাজ পাওয়ার আইনি অধিকার ছিল। যদিও গত ৫ বছরে গড়ে ৫০-৫৫ দিন কাজ হয়েছে। আবার কাজের জন্য আবেদন করার পর কাজ না দিতে পারলে নির্দিষ্ট হারে তাদের ভাতা পাওয়ার আইনি অধিকার ছিল কেবল আইনের খাতায়। তবু অধিকার হিসাবে কাজ চাইবার একটা জোর ছিল।

কিন্তু কেন্দ্রের বিজেপি সরকার ১৬ ডিসেম্বর সংসদে ‘ভিবিজি-রামজি’ বিল-২৫ নামে যে বিল পেশ করেছে তাতে এত দিন মনরেগাতে গ্রামীণ মজুরদের যতটুকু কাজের আইনি অধিকার ছিল তা আর থাকবে না। অর্থাৎ দেশের ৫০ কোটি গ্রামীণ মজুরদের কর্মসংস্থানের কোনও রকম দায়িত্ব কেন্দ্রের বিজেপি সরকার আর নিতে চাইছে না।

এর ফলে তাদের দুরবস্থা কী ভয়ঙ্কর রূপ নেবে তা সহজেই অনুমেয়। অন্যান্য সমস্ত ক্ষেত্রে কোনও জনবিরোধী বিল যখন পেশ করা হয়, সেই বিলে যেমন অনেক ভাল ভাল কথা বলা থাকে এই বিলেও তেমনই বেশ কিছু ভাল কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এই ভাল কথার আড়ালে লুকিয়ে আছে আক্রমণের প্রকৃত নকশা।

প্রথমত, ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি অ্যাক্ট-এ (মনরেগা) কাজ পাওয়ার যে আইনি অধিকার ছিল, এই নতুন বিলে তা বাতিল করে দিয়ে কাজ পাওয়ার ‘নিশ্চয়তা’র কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ ২০০৫ সালে মনরোগা চালু হওয়ার আগে ‘গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা প্রকল্প’ যেমন চালু করা হয়েছিল এবং দেশের বেশিরভাগ জায়গায় বছরে ১০ দিনের বেশি গ্রামীণ মজুররা কাজ পেত না, এই বিল বাস্তবে সেই আদলেই করা হয়েছে এবং চাতুর্যের সাথে ঘুরিয়ে সেই কথাই বলা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, রাজ্য সরকারের ভূমিকা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে এই প্রকল্প সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, প্রতি আর্থিক বছরে কোন রাজ্যকে কী পরিমাণ কাজের বণ্টন করা হবে তা কেন্দ্রীয় সরকার ঠিক করবে। মনরেগাতে যেমন পরিবারভিত্তিক কাজের দাবিতে কাজ বণ্টন করার ব্যবস্থা ছিল, এখানে তার পরিবর্তে কেন্দ্রীয় সরকারের মর্জিমাফিক কাজের বণ্টন ব্যবস্থা থাকবে এবং কোথায় কত পরিমাণ কাজ বণ্টন করা হবে তা ঠিক করবে কেন্দ্রীয় সরকারের আমলারা।

তৃতীয়ত, মনরেগাতে এত দিন সম্পূর্ণ আর্থিক দায়িত্ব ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের। এই বিলে তার পরিবর্তে কেন্দ্রীয় সরকার আর্থিক দায়িত্বের ৬০ শতাংশ গ্রহণ করবে, বাকি ৪০ শতাংশ রাজ্য সরকারের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ রাজ্য সরকারগুলোর আর্থিক ক্ষমতা ও সদিচ্ছা না থাকলে কাজ হবে না। কোনও রাজ্য যদি তাদের নির্ধারিত অর্থ দিতে না পারে, সেই রাজ্যে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে না। রাজ্যের ঘাড়ে আর্থিক দায় চাপিয়ে প্রকল্পকে নিষ্ক্রিয় করার সুযোগ রেখে দিল কেন্দ্রীয় সরকার।

চতুর্থত, মনরেগাতে ছিল মজুররা কাজ করার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কর্তৃপক্ষ মজুরি পরিশোধ করতে না পারলে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এই বিলে তা বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয় মজুরির গড় হার ছিল ২৬০ টাকা, এই বিলে তার এক পয়সাও বাড়ানো হয়নি। ভয়ঙ্কর এই মূল্যবৃদ্ধির সময় এই সামান্য মজুরি প্রহসন ছাড়া আর কী হতে পারে? যদিও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, দৈনিক মজুরি কমপক্ষে ৯০০ টাকা হওয়ার কথা। কিন্তু সরকার তা মানে না। পশ্চিমবঙ্গে তিন বছর ধরে বন্ধ থাকা ১০০ দিনের কাজ গত ১ আগস্ট থেকে এই রাজ্যে চালু করার জন্য কলকাতা হাইকোর্ট কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছিল এবং সুপ্রিম কোর্ট সেই নির্দেশ বহাল রাখলেও কোনও সরকারই তা মানছে না।

এই বিলে বলা হয়েছে, বছরে ১২৫ দিনের কাজের নিশ্চয়তা থাকবে। কিন্তু এই নিশ্চয়তা কেমন তা আমরা দেখেছি মনরেগার আগে ১০০ দিনের কাজের ‘নিশ্চয়তা প্রকল্পে’ মজুররা বছরে গড়ে ১০ দিনও কাজ পায়নি। সুতরাং বিজেপি সরকারের এই ১২৫ দিনের কাজ দেওয়ার নিশ্চয়তা একটা বড় ধাপ্পা ছাড়া কিছুই না। এই বিলে বলা হয়েছে, রাজ্যের যে সব গ্রামীণ এলাকায় যে সময়ে বেশি কাজ দেওয়ার প্রয়োজন তা নির্দিষ্ট করে দেবে কেন্দ্রীয় সরকার। অর্থাৎ এটা পরিষ্কার করে বলে দেওয়া হল, কেন্দ্রীয় সরকার যে সব এলাকা কাজের জন্য নির্দিষ্ট করে দেবে একমাত্র সেই সব এলাকায় মজুরদের কাজ দেওয়া হবে। অন্য জায়গার মজুররা বঞ্চিত হবেন।

গ্রামীণ মজুরদের কর্মসংস্থান হরণকারী এই সর্বনাশা জনবিরোধী বিলের প্রতিবাদে অল ইন্ডিয়া কিসান খেতমজদুর সংগঠন (এআইকেকেএমএস) দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে তোলার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। গ্রামীণ মজুরদের সারা বছরের কাজের দাবিতে এই সংগঠন তার জন্মলগ্ন থেকেই লড়াই করে আসছে। এই ধারাবাহিক লড়াইয়ের ফলে ২০০৫ সালে সরকার মনরেগা চালু করতে বাধ্য হয়। এআইকেকেএমএস সে দিন থেকেই দাবি উত্থাপন করেছে মনরেগাতে দৈনিক ৬০০ টাকা মজুরিতে বছরে কমপক্ষে ২০০ দিনের কাজ দিতে হবে, এর মধ্যে ১০০ দিন এলাকার উন্নয়নের কাজ এবং ১০০ দিন নিম্ন-মধ্য কৃষকের জমিতে কাজ করাতে হবে। সংসদে সংগঠন এই মর্মে দাবিপত্রও জমা দিয়েছে।

কেন্দ্রের সরকার গরিব এই মজুরদের কথা ভাবে না। তাদের ভাবনা দেশি-বিদেশি কর্পোরেট পুঁজির মালিককে কী ভাবে আরও বেশি সেবা করা যায়। তাই বিগত ১০ বছরে কেন্দ্রীয় সরকার এই কর্পোরেট পুঁজিপতিদের প্রায় কুড়ি লক্ষ কোটি টাকা ব্যাঙ্ক ঋণ মকুব করেছে। বাস্তবে রাজকোষ থেকে টাকা নিয়ে এই ঋণ মকুব হয়েছে। অথচ এই টাকা দিয়ে গ্রামীণ মজুরদের ২০০ দিনের কাজ ও ৬০০ টাকা মজুরি অনায়াসেই দেওয়া যেত। তাই গ্রামীণ মজুরদের বেঁচে থাকার জন্য তীব্র লড়াই গড়ে তোলা ছাড়া বিকল্প কোনও রাস্তা নেই। এই লক্ষ্যেই এআইকেকেএমএস দেশের কৃষক-মজুরদের সংগঠিত করছে।