Breaking News

বিদ্যুৎ গ্রাহকদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি আদায়

অ্যাবেকার নেতৃত্বে বিদ্যুৎ গ্রাহকদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে স্মার্ট মিটার না লাগানোর ঘোষণা হয়েছিল। কিন্তু জোর জবরদস্তি করে লাগিয়ে দেওয়া স্মার্ট মিটারগুলি কিছুতেই খোলা হচ্ছিল না। এমনিতেই বর্ধিত ফিক্সড চার্জ, মিনিমাম চার্জের কোপে সারা রাজ্যের হাজার হাজার ক্ষুদ্রশিল্প– গমকল, ধানকল, তেলকল, প্লাস্টিক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। টিওডি (টাইম অব ডে) মিটারের কৃষি সেচের বর্ধিত বিলে চাষিদের হাজার হাজার টাকা বকেয়া। এর বিরুদ্ধে অ্যাবেকার নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গের কাস্টমার কেয়ার সেন্টার থেকে শুরু করে ডিভিশন, রিজিয়ন সহ বিদ্যুৎ ভবন, সর্বস্তরের বিদ্যুৎ দপ্তরগুলিতে চলছে লাগাতার বিক্ষোভ অবরোধ।

আন্দোলনের চাপে অ্যাবেকা নেতৃত্বের সাথে বৈঠকের প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়েছিলেন রাজ্যের বিদ্যুৎমন্ত্রী। সেই অনুযায়ী ১৯ ফেব্রুয়ারি সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে পাঁচ জন সদস্যের সঙ্গে বিদ্যুৎমন্ত্রীর বৈঠক হয়। মন্ত্রী জানান, সরকারি দপ্তর ছাড়া স্মার্ট মিটার কোথাও লাগানো হবে না। গ্রাহকের আবেদনের ভিত্তিতে লাগিয়ে দেওয়া স্মার্ট মিটার খুলে নেওয়ার ব্যবস্থা করবে কোম্পানি। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সুব্রত বিশ্বাস বলেন, এটা গ্রাহক আন্দোলনের জয়। তিনি বলেন, অ্যাবেকার দাবি ছিল ক্ষুদ্র শিল্পে মিনিমাম চার্জ কমাতে হবে। ক্ষুদ্র শিল্পের মিনিমাম চার্জ প্রতি কেভিএ মাসে ২০০ টাকা থেকে কমিয়ে ৫০ টাকা করার অ্যাবেকার প্রস্তাব বিদ্যুৎমন্ত্রী ন্যায্য বলে স্বীকার করেছেন। এ বিষয়ে রাজ্যের বিদ্যুৎ বন্টন কোম্পানির ডিস্ট্রিবিউশন ডাইরেক্টরকে লিখিত নোট দিয়েছেন। অ্যাবেকার দাবি মেনে মন্ত্রী জানান, বাঁশের খুঁটিতে বৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ যেখানে যা আছে, তার ছবি সহ দ্রুত পাঠালে সেগুলি পাল্টে বিদ্যুৎ ভবন থেকেই পোলের ব্যবস্থা করা হবে।

কৃষিতে বিনামূল্যে বিদ্যুতের দাবির বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, প্রান্তিক কৃষি বিদ্যুৎ গ্রাহকদের ক্ষেত্রে সরকার বিনামূল্যে বিদ্যুতের বিষয়টি প্রান্তিক কৃষিবিদ্যুৎ গ্রাহকের মাপকাঠি ঠিক হলে শীঘ্রই ঘোষণা করবেন। আলোচনায় উপস্থিত বিদ্যুৎ বন্টন কোম্পানির ডিস্ট্রিবিউশন ডাইরেক্টর স্বীকার করেছেন, সিকিউরিটি ডিপোজিটের পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহারের ভিত্তিতে হবে, লোডের ভিত্তিতে নয়। যেখানে যেখানে লোড বৃদ্ধির অজুহাতে সিকিউরিটি ডিপোজিট বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, সেই অভিযোগগুলোর প্রমাণপত্র সহ ডিস্ট্রিবিউশন ডাইরেক্টরের কাছে জমা দিতে হবে। প্রয়োজনে সেগুলো বিদ্যুৎ মন্ত্রীও দেখবেন। তবে যাদের প্রকৃতই লোড বৃদ্ধি হয়েছে তাদের লোড বাড়িয়ে নেওয়ার আবেদন করতে হবে।  কাস্টমার কেয়ার সেন্টার স্তরে দুর্নীতি প্রসঙ্গে লিখিত অভিযোগগুলি মন্ত্রী গ্রহণ করে তখনই তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। বিদ্যুৎমন্ত্রী জানিয়েছেন জনবিরোধী ‘বিদ্যুৎ আইন সংশোধনী বিল ২০২৫’ কেন্দ্র যদি পাশ করায় তাহলেও পশ্চিমবঙ্গে তা লাগু হবে না।

অ্যাবেকার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ন্যূনতম ১৬.৫ শতাংশ লাভ রেখেই বিদ্যুতের মাশুল নির্ধারণ করা হয়। মুখ্যমন্ত্রীও জানিয়েছিলেন ক্যাপটিভ কয়লা খনি থেকে কয়লা উত্তোলন শুরু হলে বিদ্যুতের দাম অবশ্যই কমবে। ফলে বিদ্যুতের মাশুল ৫০ শতাংশ কমানোর বাস্তব অবস্থা আছে। এ বিষয়ে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ বন্টন কোম্পানি প্রচুর টাকা লোকসানে চলছে, তা সত্তে্বও ২০১৬-’১৭ সাল থেকে বিদ্যুতের মাশুল বাড়ানো হয়নি। অ্যাবেকার প্রতিনিধিরা এর তীব্র বিরোধিতা করে তথ্য দিয়ে দেখান, ঘুরপথে বিলের বোঝা কী পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। অসংখ্য খারাপ ও বন্ধ মিটারের মাসের পর মাস গড়বিল করা চলছে। এ বিষয়ে ডাইরেক্টর ডিস্ট্রিবিউশন বলেন, ডিজিটাল মিটার ইতিমধ্যেই কেনা হচ্ছে। ফলে এই সমস্যা দ্রুত সমাধান করা হবে।

অ্যাবেকার নেতৃত্বে রাজ্যব্যাপী বিদ্যুৎ গ্রাহকদের নানা স্তরে সংগঠিত আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতেই রাজ্যের বিদ্যুৎমন্ত্রী এই প্রতিশ্রুতিগুলি দিতে বাধ্য হয়েছেন। এটা আন্দোলনের জয়। কিন্তু এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কার্যকর করতে হলে বিদ্যুৎ গ্রাহকদের আন্দোলনের চাপ আরও তীব্র করা দরকার। সুব্রত বিশ্বাস বলেন, ২০২১ সালে অ্যাবেকার ডেপুটেশনে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেছিলেন, স্মার্ট মিটার এই রাজ্যে লাগানো হবে না। কিন্তু পরে দেখা গেল স্মার্ট মিটার লাগানো হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে অ্যাবেকার নেতৃত্বে সারা রাজ্যে বিদ্যুৎ গ্রাহকদের প্রবল প্রতিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। এর চাপে ২০২৫ সালের ৯ জুন বিদ্যুৎমন্ত্রীকে বিধানসভায় দাঁড়িয়ে বলতে হয়েছে ‘স্মার্ট মিটার বন্ধ’। মিনিমাম চার্জ বৃদ্ধির ফলে ক্ষুদ্র শিল্প যে বন্ধ হয়ে যাবে এ কথা বারবার রাজ্যের বিদ্যুৎ বন্টন কোম্পানি, রাজ্য বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ কমিশন, বিদ্যুৎমন্ত্রীর দপ্তরে জানানো সত্ত্বেও ২০২৩ সালে বিদ্যুৎমন্ত্রীর কাছে ডেপুটেশনে তাঁরা বলেছিলেন, মিনিমাম চার্জ কমানো যাবে না, প্রত্যাহারও করা যাবে না, কারণ বিশ্বব্যাঙ্কের প্রবল চাপ।

এখন আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে তিনি গ্রাহক সংগঠনের নেতাদের ক্ষুদ্রশিল্প বাঁচানোর যে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, তা বাস্তবায়িত করতে হলে ক্ষুদ্রশিল্প সহ সমস্ত স্তরের বিদ্যুৎ গ্রাহকদের সংগঠিত আন্দোলন তীব্রতর করা প্রয়োজন।

বিদ্যুৎ মন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি
  • সরকারি দপ্তর ছাড়া কোথাও স্মার্ট মিটার লাগানো হবে না
  • গ্রাহকরা আবেদন করলে লাগানো স্মার্ট মিটার খুলে নেওয়া হবে
  • ক্ষুদ্রশিল্পে মিনিমাম চার্জ কমে হবে ৫০ টাকা
  • প্রান্তিক কৃষি বিদ্যুৎগ্রাহকদের মাপকাঠি ঠিক হলে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ দেওয়া হবে
  • সিকিউরিটি ডিপোজিট বিদ্যুৎ ব্যবহারের ভিত্তিতে ঠিক হবে

গণদাবী ৭৮ বর্ষ ৩০ সংখ্যা ৬ মার্চ ২০২৬