
গণতন্ত্রে ভোটাধিকার নাগরিকের সংবিধান প্রদত্ত অধিকার। সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত করে এত লক্ষ নাগরিকদের বাইরে রেখে ভোট করলে তাকে কি গণতান্ত্রিক নির্বাচন বলে? অথচ তাই ঘটানো হল। ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়া যথাসময়ে শেষ না করার দায় কি ভোটবঞ্চিত নাগরিকদের? প্রায় ৩৫ লক্ষ বিচারাধীন ভোটারকে বাইরে রেখে বিধানসভা নির্বাচন সেরে ফেলাই ছিল নির্বাচন কমিশনের কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকার প্রদত্ত কর্তব্য। দেশের সর্বোচ্চ আদালতও সেই ইচ্ছাপূরণে সিলমোহর দিয়েছে। দেশের মধ্যে বিজেপি ও তাদের জোট শরিকরা ছাড়া বাকি সমস্ত বিরোধী রাজনৈতিক দল ও চেতনাসম্পন্ন মানুষ বলেছিলেন, এত অল্প সময়ে এস আই আর শেষ করা যায় না এবং তার জন্য নির্দিষ্ট ও প্রয়োজনীয় সময় দিয়ে তারপর নির্বাচনে যাওয়া হোক, তা মানা হয়নি। তাই ভোটের ফলাফলে তার ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। আর প্রায় ৩৫ লক্ষ নাগরিক তথা বৈধ ভোটার চূড়ান্ত অনিশ্চয়তা, দুর্ভাবনা, আশঙ্কা, হয়রানি ও নাগরিক সুযোগ সুবিধার বঞ্চনা নিয়ে দিনযাপন করছেন।
পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়ায় এনুমারেশন ফর্ম পূরণের পর প্রথম প্রকাশিত তালিকা থেকে মৃত স্থানান্তরিত এবং ডুপ্লিকেট ভোটারদের বাদ দেবার পরেও এ রাজ্যে বহুকাল বসবাসকারী প্রায় ৫ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়। এরপর অ্যাডজুডিকেশন তকমা দিয়ে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির নামে প্রায় ৬০ লক্ষাধিক মানুষের তালিকা প্রকাশিত হয় সেই সময় আবার ৫ লক্ষ ৪৬ হাজার বৈধ ভোটারের নাম ডিলিট করে দেওয়া হয়। তৃতীয় দফায় যে তালিকা প্রকাশিত হয়, দেখা যায় ২৭ লক্ষ ১৬ হাজার ভোটারের নাম বাতিল করা হয়েছে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির কথা বলে। এই লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির কথা অন্য কোনও প্রদেশের এসআইআর কর্মসূচিতে ছিল না এবং নির্বাচন কমিশনের কোনও ধারাতে এর উল্লেখ নেই। ফলে প্রথম দু’দফার তালিকায় বাদ যাওয়া প্রায় ১০ লক্ষাধিক ভোটারের এবং লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির নামে আরও ২৭ লক্ষ ১৬ হাজার ভোটার ট্রাইবুনালের অধীনে বিচারের আশায় দিন গুনছেন। সংবাদে প্রকাশ, প্রায় ৩৫ লক্ষ বিচারাধীন ভোটারের মধ্যে আরও কিছু আবেদনকারীর নাম বাতিল করার জন্য আপিলও যুক্ত আছে। সুপ্রিম কোর্ট নির্ধারিত এই ট্রাইবুনাল অনেক টালবাহানার পর কাজ শুরু করে বিগত ৩ মাসে মাত্র ১৭৭৭ জনের আবেদন নিষ্পত্তি করতে পেরেছে– যার মধ্যে ১৭২৭ জন বৈধ ভোটার বলে গণ্য হয়েছেন। বোঝাই যাচ্ছে, অ্যাডজুডিকেশনে ঝুলিয়ে রাখা এক বিরাট সংখ্যক ভোটার গভীর ষড়যন্তে্রর শিকার। এই সংবাদ প্রকাশিত হবার পরবর্তী সময়ে বড় জোর আরও দু-তিনশো মানুষের বিচার হয়ত সম্পন্ন হয়ে থাকতে পারে। এমনই ধীরগতির বিচারধারা।
প্রথমে কলকাতা হাইকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি টি এস শিবজ্ঞানম এই ট্রাইবুনাল থেকে পদত্যাগ করেছেন। তিনি পরিষ্কার বলেছেন, শুধুমাত্র কলকাতা জেলার ১ লক্ষের মতো আবেদনের নিষ্পত্তি করতেই প্রায় ৪ বছর লেগে যাবে। সম্প্রতি প্রাক্তন বিচারপতি রঞ্জিত কুমার বাগও এই কারণেই পদত্যাগ করেছেন। এই গতিতে ট্রাইবুনালের কাজ চললে আবেদনকারী বৈধ ভোটাররা তাঁদের জীবদ্দশায় ভোটাধিকার ফিরে পাবেন কি না সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। ন্যায় বিচারের নীতি বলে, বিলম্বিত বিচার মানে বিচারকে অস্বীকার করা। তাই যে কোনও শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ চাইবেন– অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ট্রাইবুনালের প্রক্রিয়া শেষ করে বৈধ ভোটারদের নাম তালিকাভুক্ত করা হোক, তাঁদের উদ্বেগ ও হয়রানির অবসান ঘটানো হোক। কিন্তু এ বিষয়ে কোনও সরকারি বা বিচারবিভাগের তৎপরতা লক্ষ করা যাচ্ছে না।
সুপ্রিম কোর্ট শেষ শুনানিতে বলেছে পশ্চিমবঙ্গে আগামী যে কোনও নির্বাচন শুরুর আগে এই আপিল ট্রাইবুনাল বিচার প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে এবং সংশোধিত ভোটার তালিকা প্রকাশ করতে হবে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন, কলকাতা হাইকোর্ট বা বর্তমান রাজ্য সরকারের কোনও হেলদোল দেখা যাচ্ছে না। তাদের মনোভাব, এই ৩৫ লক্ষ নাগরিক, ভোটার না হলে কার কী যায় আসে। আর ধীরে ধীরে তো নাগরিক অধিকার সঙ্কুচিত করা শুরু হয়েছে। সুতরাং শেষ পর্যন্ত বিনা বিচারে তাদের হোল্ডিং সেন্টারে আটক ও সুযোগ বুঝে বেআইনি অমানবিক পুশব্যাক করে বাংলাদেশ পাঠানোর পথ পরিষ্কার করা হবে। বঙ্গের বহু পুরসভার নির্বাচন তো আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে হবার কথা। তা হলে ট্রাইবুুনাল যদি দ্রুত গতিতে বিচারক ও জেলাভিত্তিক বেঞ্চ বাড়িয়ে তা ত্বরান্বিত না করে তাহলে ৩৫ লক্ষ নাগরিকের বিচার তো চার পাঁচ মাসে কোনও মতেই শেষ করা যাবে না।
নানা অসুবিধার সম্মুখীন ডিলিটেড নাগরিকরা
জেলায় জেলায় ডিলিটেড ভোটারদের নানা ধরনের হয়রানি করা হচ্ছে। কোথাও এদের রেশন কার্ড বাতিল করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বাড়ি বাড়ি পুলিশ পাঠিয়ে নানা ধরনের কাগজপত্র চাওয়া হচ্ছে। কোথাও সিভিকদের কাজে লাগিয়ে থানায় ডেকে পাঠানো হচ্ছে ও নথিপত্র চেয়ে পাঠানো হচ্ছে। সব মিলিয়ে একটা মারাত্মক ভয়ের পরিবেশের মধ্যে এদের ফেলা হয়েছে। মারাত্মক অনিশ্চয়তার মধ্যে তাদের দিন কাটছে। ইতিমধ্যে বহু আত্মহত্যা ও আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। আরও কত অবসাদ, মানসিক রোগ ও অপমৃত্যু অপেক্ষা করে আছে কে বলবে। রাজ্যের প্রায় সব জেলাতেই চলছে বিজেপি সরকারের এই অসহনীয় অত্যাচার। তাদের মন্ত্রী ও নেতারা বুক ফুলিয়ে বলে বেড়াচ্ছেন ভোটার তালিকায় নাম উঠলে তবে অন্নপূর্ণা, আবাস যোজনা, আয়ুষ্মান ভারত, সরকারি অন্যান্য সুযোগ সুবিধা মিলবে। অথচ সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট নির্দেশ আছে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ গেলেই কারও নাগরিক অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা কাড়া চলবে না। ইতিমধ্যে জমিজমা কেনাবেচা, সরকারি চাকরির পুলিশ ভেরিফিকেশনে, ভোটার লিস্টে নাম আছে কি না জানতে চাওয়া হচ্ছে। কিছু কলেজ ভর্তির সময় পরিবারের এসআইআর তথ্য জনাতে চাইছে বলে অভিযোগ। কোনও কারণ না দেখিয়ে সরকারি আধিকারিকরা এই সমস্ত মানুষের কাজ ফেলে রাখছেন। কোনও সরকারি নির্দেশিকাও দেখাচ্ছেন না। এই সব হয়রানির বিরুদ্ধে ব্লকে ব্লকে এস ডি ও অফিসে এবং জেলা শাসক কার্যালয়ে মানুষের বিক্ষোভ প্রতিফলিত হচ্ছে।
পুশব্যাক আন্তর্জাতিক আইন বিরোধী
এর সাথে যুক্ত হয়েছে রাজ্যের বেশ কয়েকটি জেলায় ‘হোল্ডিং সেন্টার’ নির্মাণ। এই হোল্ডিং সেন্টারে সরকার বেশ কিছু মানুষকে বন্দি করে রেখেছে। যার সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। তারপর সমস্ত আন্তর্জাতিক রীতি নীতি ও নিয়ম কানুন লঙ্ঘন করে রাতের অন্ধকারে বাংলাদেশে পুশব্যাক করছে বিবেচনাধীন বহু মানুষকে। বিদেশি কোনও নাগরিক অবৈধভাবে প্রবেশ করলে তাকে সনাক্ত করে আন্তর্জাতিক রীতিনীতি মেনে, আইনি প্রক্রিয়ায় যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করাটাই প্রথা। বিদেশি শনাক্তকরণের অধিকার শুধুমাত্র পুলিশ প্রশাসনের উপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। এই প্রক্রিয়া সমস্ত গণতান্ত্রিক রীতিনীতির পরিপন্থী। এ আত্মপক্ষ সমর্থনের মৌলিক অধিকার হরণের নামান্তর। কোনও বিবেকবান, গণতান্ত্রিক মানুষই একে সমর্থন করতে পারেন না। পুশব্যাক অন্য দেশের নাগরিকদের প্রত্যাবর্তনের কোনও বৈধ প্রক্রিয়া ও আইন হতে পারে না। বিভিন্ন সময়ে ভোটের বাজারে আসর গরম করার জন্য এবং বিভাজনের রাজনীতিকে কাজে লাগিয়ে ভোটে লাভবান হবার জন্য বিজেপি নেতারা কখনও বলছেন ১ কোটি কখনওবা ২ কোটি অবৈধ বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা এ দেশে আছে বলে আসর গরম করছেন। কিন্তু পার্লামেন্টে বিজেপি মন্ত্রী বলেছিলেন, তাদের কাছে নির্দিষ্ট নথি নেই যে কত বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা এ দেশে আছে। বর্তমান পুশব্যাক ও ডিটেনশন সেন্টারে আটক সংখ্যার প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী যা বলেছেন তা মেরে কেটে ১০ হাজার। যদিও সেটাও নিশ্চিত কিছু নয়। অর্থাৎ সামগ্রিক অর্থে জনবিন্যাস পাল্টাতে পারার ধারে কাছে বিষয়টা নেই।
রাজ্যের বিজেপি-আর এস এস পরিচালিত সরকার আপীল ট্রাইবুনাল নিয়ে উচ্চবাচ্য করছে না– যেন এটা কোনও সমস্যাই নয়। তাদের কাজ শুধুমাত্র ‘ডিটেক্ট ডিলিট ডিপোর্ট’ করা। আইনের পথে যাঁরা কোনও বিশেষ কারণে ভোটাধিকার ফিরে পাবার জন্য আদালতে যাচ্ছেন সেখানে দেখা যাচ্ছে বিচারকরা ট্রাইবুনাল যাতে আবেদনকারীদের দ্রুত নিষ্পত্তি করে এমন নির্দেশ দিচ্ছেন। ভোটে যারা দাঁড়িয়ে ছিলেন এ রকম কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে তাদের সুরাহা হলেও এখনও লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার তথা নাগরিক অধিকারের সুরক্ষা নির্ভর করছে এই ট্রাইবুনালের উপর। ফলে আপিল ট্রাইবুনালের সংখ্যা বাড়িয়ে, প্রতি জেলায় একাধিক ট্রাইবুনাল নিয়োগ করে আগামী ৩ মাসের মধ্যে এই বিচারের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। দাবি উঠছে যতক্ষণ পর্যন্ত না একজন নাগরিককে আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ দিয়ে নিঃসংশয়ে প্রমাণ করা যাচ্ছে তিনি ভারতীয় নাগরিক নন, তাকে তার আগে পর্যন্ত সমস্ত নাগরিক অধিকার ও পরিষেবা নিশ্চিত করতে হবে। বিচারে বিদেশি প্রমাণিত হলে আন্তর্জাতিক আইন মোতাবেক তাকে বিদেশে পাঠাতে হবে। এই দাবি আদায় করতে হলে সম্মিলিত লড়াই সংগ্রাম ব্যতীত দ্বিতীয় কোনও রাস্তা নেই। এই উদ্দেশ্যে রাজ্যব্যাপী ‘ভোটাধিকার সুরক্ষা সমন্বয় সমিতি’ গড়ে উঠেছে। তারা জেলায় জেলায় নানা স্তরে এই আন্দোলন সংগঠিত করছে। শুধুমাত্র আইনি লড়াই নয়, এই পথেই নাগরিক অধিকার তথা ভোটের মৌলিক অধিকার ছিনিয়ে আনা সম্ভব।
রাজ্যের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে পশ্চিমবঙ্গের ভোটাধিকার বঞ্চিত নাগরিকদের দাবি, ‘তাদের প্রতি ন্যায়বিচার করা হোক, তাদেরভোটাধিকার ও নাগরিক অধিকার অবিলম্বে ফিরিয়ে দেওয়া হোক। এই ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামে সমস্ত শুভবুদ্ধি সম্পন্ন গণতান্ত্রিক মানুষ এগিয়ে আসবেন– এটাই প্রত্যাশা।