বিচারপতি প্রমাণ করলেন তিনি শ্রেণি-রাজনীতির বাইরে নন

ফাইল ফটো

এ কি শুধুই ধান ভানতে শিবের গীত, নাকি মনের কথাটাই বেরিয়ে এল সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির কথায়? না হলে গৃহসহায়কদের ন্যূনতম বেতন স্থির করে দেওয়ার আর্জি শুনতে গিয়ে হঠাৎ ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন কত খারাপ তার ফিরিস্তি দিতে শুরু করবেন কেন তিনি? বিচারপতি বলেছেন, দেশে শিল্পের বিকাশ বিঘ্নিত হওয়ার জন্য মূলত দায়ী শ্রমিক সংগঠনগুলিই। তিনি বলেন, শ্রমিক সংগঠনগুলির জন্য দেশের কত শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গিয়েছে জানেন? গোটা দেশে বিভিন্ন শিল্প বন্ধ হয়ে গিয়েছে এই ‘ঝান্ডা সংগঠনগুলোর’ জন্যই।

প্রধান বিচারপতি যে হঠাৎ ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের বিরুদ্ধে বিষোদগার করলেন, তার মানে ধরে নেওয়া যায় দেশে শিল্পের বিকাশ বিঘ্নিত হওয়ার জন্য শ্রমিক সংগঠনগুলিই যে দায়ী এ বিষয়ে তিনি নিশ্চিত। কিন্তু তিনি যে হেতু কথাগুলি প্রধান বিচারপতির আসন থেকে বলছেন, তাই শুধু তিনি নিশ্চিত হলেই তো চলে না, তিনি কীসের ভিত্তিতে এমন গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় সিদ্ধান্তের মতো জানিয়ে দিলেন তা দেশের মানুষেরও জানা দরকার। শ্রমিক সংগঠনগুলির আন্দোলনের জন্য আদৌ কোনও কারখানা বন্ধ হয়েছে কি না, হলে কতগুলি হয়েছে, আর মালিকরা নিজেরা কতগুলি কারখানা বন্ধ করেছে, বড় পুঁজিপতিরা কত সংখ্যায় ছোট পুঁজিপতিদের কারখানা গিলে খেয়েছে, এ বিষয়ে যথেষ্ট পরিমাণ তথ্য তাঁর কাছে আছে কি? থাকলে তাঁর বক্তব্যের ভিত্তি হিসাবে তা তুলে ধরলেন না কেন? না হলে কীসের ভিত্তিতে প্রধান বিচারপতি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা সুপ্রিম কোর্টে দাঁড়িয়ে বলে দিলেন? নাকি প্রধান বিচারপতির কথাগুলি একেবারেই মনগড়া?

অবশ্য প্রধান বিচারপতির কথাগুলি অদ্ভুত ভাবে মিলে যাচ্ছে এ দেশের মালিক শ্রেণির কথার সঙ্গে। মালিক তথা দেশের পুঁজিপতি শ্রেণি দীর্ঘ দিন ধরে ঠিক এই কথাগুলিই দেশবাসীর উদ্দেশে প্রচার করে আসছে। এ কথাগুলির সঙ্গে বাস্তবের বা সত্যের কোনও সম্পর্ক নেই। বাস্তবে শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনার এক কানাকড়িও মালিকরা দেয় না, প্রধান বিচারপতি যেগুলিকে ‘ঝান্ডা সংগঠন’ বলেছেন সেই ট্রেড ইউনিয়নগুলি সংগঠিত ভাবে আন্দোলন না করলে। অর্থাৎ শ্রমিকরা যে আন্দোলন করে, ধর্মঘট করে তা বাধ্য হয়েই। আশ্চর্যের বিষয়, প্রধান বিচারপতি, যিনি বিচার ব্যবস্থার শীর্ষে অধিষ্ঠান করছেন, সংবিধান রক্ষার হক নিয়ে বসে আছেন, তিনিই শ্রমিকদের কাছ থেকে সংবিধান তাদের যে অধিকার দিয়েছে সংগঠন করার সেই অধিকারকেই কার্যত নাকচ করে দিলেন।

মালিকরা সব সময়েই শ্রমিকদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে তাদের শোষণের চরিত্রটাকে আড়াল করতে চায়। আবার শ্রমিকরা যাতে তাদের ন্যায্য দাবিগুলি তুলতে এবং তার জন্য আন্দোলন করতে না পারে এই প্রচারের দ্বারা সেটিও সিদ্ধ হয়। ফলে শ্রমিক শ্রেণির বিরুদ্ধে প্রধান বিচারপতির এই বিষোদগারে দেশের মালিক শ্রেণি যেমন খুশি হবে, তেমনই মালিক শ্রেণির রাজনৈতিক ম্যানেজার তথা সেবক হিসাবে নরেন্দ্র মোদিরাও খুশি হবেন। ফলে মালিক শ্রেণির ‘মন কি বাত’-ই উচ্চারিত হয়েছে বিচারপতির কণ্ঠে।

কারণ মালিক শ্রেণির সর্বোচ্চ মুনাফা নিশ্চিত করার জন্য শ্রমিক শ্রেণির উপর শোষণকে আরও নির্মম করতে বিজেপি সরকার ৪৪টি শ্রম আইনকে ছেঁটে ৪টি শ্রমকোডে পরিণত করেছে। যেখানে কার্যত শ্রমিকদের সংগ্রামলব্ধ সমস্ত অধিকারগুলিই কেড়ে নেওয়া হয়েছে। অন্য দিকে মালিকদের দেওয়া হয়েছে একচ্ছত্র শ্রমিক শোষণের অধিকার। আট ঘণ্টার পরিবর্তে ১২ ঘণ্টা শ্রম সময় আইনসিদ্ধ করে নেওয়া হয়েছে। শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অর্থাৎ ইউনিয়ন করার, ধর্মঘট করার অধিকারও কার্যত কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এর বিরুদ্ধেই দেশ জুড়ে ১২ ফেব্রুয়ারি এআইইউটিইউসি সহ কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলি সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে।

গত শতকে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস বিরোধী যুক্তফ্রন্ট সরকারের কথা অনেকের মনে থাকতে পারে। প্রথম যুক্তফ্রন্টের শ্রমমন্ত্রী ছিলেন এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট) নেতা সুবোধ ব্যানার্জী। তিনি মন্ত্রী হয়ে দলের নীতি অনুযায়ী ঘোষণা করেছিলেন, ন্যায়সঙ্গত গণআন্দোলনে পুলিশ হস্তক্ষেপ করবে না। এর ফলে এত দিন শ্রমজীবী মানুষের ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনগুলি যে পুলিশি দমন-পীড়নের নির্মম শিকার হয়ে এসেছে তা বন্ধ হল। রাজ্য জুড়ে শ্রমিকদের উপর দীর্ঘদিনের বঞ্চনার প্রতিবাদে আন্দোলনের জোয়ার উঠল। মালিকমহলে উঠল গেল গেল রব। তারা তারস্বরে প্রচার চালাতে থাকল যে শ্রমিক আন্দোলনের ফলে একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে রাজ্যের উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। তাদের পরিচালিত সংবাদপত্রগুলিও তাদের কথা ফলাও করে ছাপতে থাকল। মালিকদের এই প্রচারে কোনও কোনও শ্রমিক সংগঠনের নেতারাও বিভ্রান্ত হলেন। একমাত্র শ্রমিক সংগঠন এআইইউটিইউসি-র নেতারা এই স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে দেশের মানুষকে বললেন, এটা মালিকদের পরিকল্পিত মিথ্যা প্রচার। কারখানা বন্ধ করছে মালিকরাই এবং তা হচ্ছে উৎপাদিত পণ্যের বাজার অর্থাৎ দেশের মানুষের কেনার ক্ষমতা না থাকার কারণে। কেন্দ্রীয় সরকারের মাশুল সমীকরণ নীতিও এ রাজ্যের শিল্পকে দুর্বল করার অন্যতম কারণ হিসাবে সে দিন কাজ করেছিল। রাজ্য সরকারের তৎকালীন শ্রমকমিশনার দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় কতগুলি কারখানা মালিকরা বন্ধ করেছে, আর কতগুলি কারখানা শ্রমিক আন্দোলনের জন্য বন্ধ হয়েছে, তার তথ্য দিয়ে দেখান যে, শ্রমিক আন্দোলনের জন্য কারখানা বন্ধ হয় না, বন্ধ হয় বাজার না থাকার কারণে, মালিকদের কাছে উৎপাদন লাভজনক না হওয়ার কারণে।

এক দিকে সরকারের শ্রমিকস্বার্থ বিরোধী চরিত্র, অন্য দিকে বেশির ভাগ শ্রমিক সংগঠনের আপসকামী চরিত্রের কারণে শ্রমিকদের উপর ভয়ঙ্কর মালিকী শোষণ-নিপীড়ন সত্ত্বেও দেশে তেমন উল্লেখযোগ্য শ্রমিক আন্দোলনই গড়ে উঠছে না। ছোট এবং মাঝারি শিল্প-কলকারখানায় শ্রমিকদের ইউনিয়ন নেই বললেই চলে। বড় কারখানাগুলিতেও খুব অল্প সংখ্যক শ্রমিকই ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত। এই অবস্থায় বিচারপতি শ্রমিক আন্দোলনের কারণে কারখানা বন্ধ হওয়ার যে কথা বলেছেন, তা সম্পূর্ণ অসত্য এবং গত বহু দশক ধরে মালিকদের প্রচারিত একটি অসত্যের চর্বিতচর্বণ।

বিশ্বজোড়া মালিকদের চরিত্র একই– শোষণের চরিত্র। তাই শুধু ভারতে নয়, গোটা বিশ্ব জুড়েই শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য পাওনার দাবিতে আন্দোলন করছে। বনেদি পুঁজিবাদী দেশ বলে পরিচিত যে ইউরোপের দেশগুলি সেখানে শ্রমিক আন্দোলনের ঝড় বইছে। বিচারপতির এ সব কথা না জানার কোনও কারণ নেই। তবুও তিনি এ সব কথা বললেন কেন?

জেনে কিংবা না জেনে, তা বড় কথা নয়, প্রধান বিচারপতি বাস্তবে মালিক শ্রেণির ভাষাতেই কথা বলেছেন। তাঁর কথাতে মালিক শ্রেণির দৃষ্টিভঙ্গিই প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি তাঁর কথার দ্বারা আবার প্রমাণ করলেন, একজন বিচারপতিও শ্রেণি-রাজনীতির ঊর্ধ্বে নন– সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হলেও। শ্রেণিবিভক্ত সমাজে শ্রেণি-নিরপেক্ষতার কোনও জায়গা নেই। রাষ্ট্রের অন্যতম স্তম্ভ হিসাবে পুলিশ-প্রশাসন, আমলতন্ত্রে এবং মিলিটারির সঙ্গে যে বিচারব্যবস্থার কথাও উল্লেখ করা হয়, তা কতখানি সত্য তা তাঁর কথা থেকেই বেরিয়ে এল। যারা ভাবেন, রাষ্ট্র মানে সবার রাষ্ট্র, তাঁরা নিশ্চয় প্রধান বিচারপতির কথা থেকে শিক্ষা নেবেন। তা যদি সত্য হত, যদি এই রাষ্ট্র মালিক এবং শ্রমিক, শোষক এবং শোষিত সবার হত, তবে বিচার ব্যবস্থার শীর্ষে থাকা ব্যক্তি মালিক শ্রেণির পক্ষ নিয়ে শ্রমিকদের বাঁচার লড়াইকে এ ভাবে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতেন না।

বহু আগেই সর্বহারা শ্রেণির মুক্তিপথের দিশারি মহান মার্ক্স দেখিয়ে গেছেন, রাষ্ট্র মানেই শ্রেণি রাষ্ট্র। দেখিয়েছেন, রাষ্ট্র হল এক শ্রেণির হাতে অপর শ্রেণিকে দমনের যন্ত্র। পুঁজিবাদী রাষ্ট্র হল পুঁজিপতি শ্রেণির হাতে শ্রমিক শ্রেণি তথা মেহনতি মানুষের উপর দমন চালানোর যন্ত্র। স্বাভাবিক ভাবেই পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের পার্লামেন্ট, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা সব কিছুকেই মালিক শ্রেণির শাসন এবং শোষণের হাতিয়ার হিসাবেই গড়ে তোলা হয়। কিন্তু তারা মুখে এ কথা স্বীকার করে না। তারা একে গণতান্ত্রিক তথা সবার রাষ্ট্র হিসাবে দেখাতে চায়। বাস্তবে এই রাষ্ট্রে গণতন্ত্র যা কিছু আছে তা মালিক শ্রেণির জন্য অবাধ শ্রমিক শোষণের গণতন্ত্র। শোষিত মানুষের জন্য গণতন্ত্রের ছিটেফোঁটাও থাকে না। শ্রমিক শ্রেণি, শোষিত শ্রেণি তথা ৯৯ ভাগ মানুষ গণতন্ত্রের সুযোগ পায় একমাত্র সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের, যা আসলে শ্রমিক শ্রেণির রাষ্ট্র। উল্লেখ্য, প্রধান বিচারপতি গৃহসহায়কদের ন্যূনতম বেতনের অধিকারকে তাঁর রায়ে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করেছেন।