Breaking News

বাঙালি অস্মিতার নকল লড়াই

ফাইল চিত্র

প্রধানমন্ত্রী এ রাজ্যে এর আগে অনেক সভা করেছেন। কখনও তাঁর মুখে ‘বাঙালি অস্মিতা’র কথা শোনা যায়নি। ১৮ জুলাই দুর্গাপুরের প্রাক-নির্বাচনী সভায় তিনি হঠাৎ বাঙালি অস্মিতার কথা তুললেন কেন? শুধু তাতেই তিনি ক্ষান্ত হননি। বলেছেন, ‘বিজেপির কাছে বাঙালি অস্মিতাই সবার উপরে।’ এবং তা এতখানিই উপরে যে, বাঙালি অস্মিতার বিরুদ্ধে কোনও রকম ষড়যন্ত্রই নাকি বিজেপি সফল হতে দেবে না। এটা নাকি মোদির গ্যারান্টি।

‘বাঙালি অস্মিতা’ এবং তার রক্ষায় ‘মোদির গ্যারান্টি’– প্রধানমন্ত্রীর মুখে এ সব কী শুনছে আজ বাংলার মানুষ! হঠাৎ কী এমন ঘটল যে প্রধানমন্ত্রীকে এ রাজ্যে ছুটে এসে এত সব কথা বলতে হচ্ছে?

বিজেপির অনুপ্রবেশ তত্ত্ব দেশ জুড়ে বাংলার মানুষকে বিপদে ফেলছে

যা ঘটেছে তা হল, বিজেপি দীর্ঘ দিন ধরে যে অনুপ্রবেশ তত্ত্ব আওড়ে আসছে, তার সত্যতা প্রমাণ করতে দেশ জুড়ে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের ব্যাপক ভাবে ধরপাকড় শুরু করেছে পুলিশ ও বিজেপি-আরএসএস গুন্ডাবাহিনী। শ্রমিকদের মোবাইল, টাকা এবং বিভিন্ন ডকুমেন্ট কেড়ে নিয়ে মারধর করা হচ্ছে, জেলে ভরা হচ্ছে, ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানো হচ্ছে, আবার কাউকে সীমান্তে নিয়ে গিয়ে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে। ওড়িশা, দিল্লি, ছত্তিশগড়, রাজস্থান, হরিয়ানা, আসাম, মহারাষ্ট্র প্রভৃতি বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলিতেই এ ঘটনা ঘটছে। প্রমাণ করার চেষ্টা হচ্ছে, বাংলাভাষী মানেই বাংলাদেশি। এই ভাবে বাঙালি শ্রমিকদের গ্রেফতার করে বিজেপি একাংশের মানুষকে উদ্বিগ্ন করতে চায় যে, সারা দেশ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীতে ভরে গেছে এবং এই অনুপ্রবেশই এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা। বিজেপির এই অনুপ্রবেশ তত্ত্ব প্রমাণের দাপটে অন্য রাজ্যে বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকরা যেমন গুরুতর সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন, তেমনই শিক্ষিত বাঙালিদেরও দিল্লি, গুরুগ্রামের মতো জায়গায় কাজ পেতে, ঘরভাড়া পেতে, ফ্ল্যাট কিনতে খুবই অসুবিধা হচ্ছে। আসামে পরিকল্পিত ভাবে বাংলাভাষী বিশেষত সংখ্যালঘুদের উচ্ছেদ করে বিপুল পরিমাণ জমি আদানির মতো ধনকুবেরকে ভেট দেওয়া হচ্ছে। এই বাঙালি বিদ্বেষ আসামে লক্ষ লক্ষ বাংলাভাষী ভারতীয় নাগরিকের জীবন বিপন্ন করে তুলছে।

প্রধানমন্ত্রীর বাঙালি অস্মিতার ধাপ্পা

প্রধানমন্ত্রী বললেন, বিজেপির কাছে বাঙালি অস্মিতাই নাকি সবার উপরে। অথচ তিনি তাঁর দীর্ঘ বক্তৃতায় একবারও রাজ্যে রাজ্যে ভারতীয় নাগরিক বাঙালিদের উপর যে পুলিশি নির্যাতন চলছে তার নিন্দা করলেন না। বললেন না, এ ভাবে কোনও ভারতবাসীকে পুলিশ বিনা প্রমাণে গ্রেফতার কিংবা শারীরিক নির্যাতন করতে পারে না। তা হলে ‘বিজেপির কাছে বাঙালি অস্মিতাই সবার উপরে’ প্রধানমন্ত্রীর এই কথাটি কি বাঙালিদের প্রতি একটা বড় ধাপ্পা নয়?

স্বাভাবিক ভাবেই রাজ্য জুড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিজেপির ফ্যাসিস্ট সুলভ এই মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। এ ধারণা আরও দৃঢ় হয়েছে যে, বিজেপির রাজনীতি বাংলার মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যের সম্পূর্ণ বিরোধী। এই ক্ষোভের ব্যাপকতা আঁচ করেই ভোটের মুখে তাতে প্রলেপ দিতে দুর্গাপুরের সভায় প্রধানমন্ত্রী বাঙালি অস্মিতার কথা যেমন তুলেছেন, তেমনই ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি বাদ দিয়ে ‘জয় মা দুর্গা’, ‘জয় মা কালী’ বলে সভা শুরু করেছেন।

বিজেপি সংকীর্ণ ভোটস্বার্থে যে ‘অস্মিতা’র রাজনীতি আনতে চাইছে তার মারাত্মক ফল আমরা এর আগে দেখেছি। মহারাষ্টে্র বিহারীদের বিতাড়ন, আসামে বাঙালি বিতাড়ন ইত্যাদি কোনও অস্মিতাতেই সাধারণ মানুষের কোনও উপকার হয়নি। তাই প্রধানমন্ত্রীর ‘অস্মিতা’ রাজনীতির ফাঁদে পা দেওয়াটা একেবারেই আত্মঘাতী হবে।

বাস্তবে এটি কোনও বাঙালি তথা প্রাদেশিক অস্মিতার বিষয় নয়। ভারতের একটি অঙ্গরাজ্য হিসাবে বাংলাভাষী পশ্চিমবাংলার যে মর্যাদা প্রাপ্য বিজেপি আজ সেই মর্যাদায় আঘাত করেছে। পশ্চিমবাংলার প্রায় ১০ কোটি মানুষ বাংলাভাষী। এর বাইরেও আরও কয়েক কোটি বাংলাভাষী মানুষ আসাম, ত্রিপুরা, ঝাড়খণ্ড এবং অন্যান্য রাজ্যে বাস করেন। অথচ বিজেপি তার সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে বাংলাভাষী মাত্রেই বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বলে দাগিয়ে দিতে চায় এবং সারা দেশে সেই প্রচারই তারা চালাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী যদি সত্যিই অনুপ্রবেশ নিয়ে উদ্বিগ্ন হতেন, তবে এ ভাবে বাংলাভাষী মাত্রেই বাংলাদেশি– এই হাস্যকর তত্ত্ব না আওড়ে যে সীমান্ত দিয়ে সাধারণত অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটে সেগুলিতে আরও নিিশ্চদ্র প্রহরার ব্যবস্থা করতেন। কৈফিয়ত চাইতেন সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর কাছে যে, কী ভাবে অনুপ্রবশে ঘটতে পারছে। কিন্তু সে সব তিনি কিছুই করেননি। এ থেকেই প্রমাণ হয় যে, অনুপ্রবেশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর দলের উদ্বেগ পুরোটাই সাজানো। এটিকে তাঁরা শুধুমাত্র ভোটের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু করে তুলতে চান। আর তাঁদের এই সংকীর্ণ ভোট-রাজনীতির শিকার হতে হচ্ছে বাংলাভাষী মানুষদের। মনে রাখতে হবে, কিছু কিছু অনুপ্রবেশ সব সময়েই ঘটে। অপেক্ষাকৃত দুর্বল অর্থনীতির দেশ থেকে প্রতিবেশী দেশে কিছু কিছু অনুপ্রবেশের ঘটনা গোটা বিশ্বেই সাধারণ ঘটনা। এমনকি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নিজের রাজ্য গুজরাট থেকেও খোদ আমেরিকায় কত সংখ্যায় অবৈধ অনুপ্রবেশ ঘটেছে, হাতকড়া পরিয়ে তাঁদের একাংশকে ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধবিমানে ফেরত পাঠানো থেকেই স্পষ্ট। ফলে বিষয়টিকে যুক্তির ভিত্তিতে বিচার করতে হবে।

তৃণমূলের ভূমিকা

অন্য দিকে বিজেপির এই অনুপ্রবেশের রাজনীতিকে ‘বাংলা বিরোধী’ হিসাবে তুলে ধরে বাঙালির ত্রাতা হিসাবে ভোটরাজনীতি স্বার্থ রক্ষায় নেমেছে তৃণমূল কংগ্রেস। না হলে গত কয়েক বছর ধরেই যে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বাংলাভাষীদের এমন হেনস্থা চলছে, তৃণমূল সরকারকে কখনও তার বিরুদ্ধে সে ভাবে সোচ্চার হতে দেখা যায়নি। তারাও চেয়েছে এই হেনস্তা আরও গুরুতর আকার নিক। তখন তারা বাংলাভাষী বিশেষত মুসলিমদের ত্রাতা হিসাবে ময়দানে নামবে। ঠিক আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে এসে সেই ‘ত্রাতা’র ভুমিকাতেই তাদের দেখা যাচ্ছে। না হলে অনেক আগেই তারা ওই সব রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, প্রশাসনিক প্রধান এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে এ নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ ধ্বনিত করতেন, এবং অবিলম্বে এমন অগণতান্ত্রিক, বেআইনি স্বৈরাচার বন্ধের দাবি জানাতেন। বিষয়টিকে জাতীয় রাজনীতির বিষয় করে তুলতেন। তা তাঁরা করেননি।

বাঙালি অস্মিতার কথা বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বাংলার শিল্পের দুর্দশা, শিক্ষায় নৈরাজ্যের কথা বলেছেন। বলেছেন, তৃণমূল নিজের স্বার্থে বাংলার সংস্কৃতিকে বিপদের মুখে ফেলে দিয়েছে। বলেছেন, তৃণমূল বাংলার বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে সঙ্কটে ফেলে দিয়েছে। এই কথাগুলো ভুল নয়। বাংলার শিক্ষাকে সর্বনাশের অতলে ঠেলে দিয়েছে তৃণমূল সরকার। বাংলার গর্ব যে স্কুল শিক্ষাব্যবস্থা, তা আজ ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে তৃণমূল সরকার। শুধু স্কুল নয়, কলেজগুলিরও একই অবস্থা। স্কুলগুলিতে শিক্ষক নেই, ক্লাস হয় না। পরিণতিতে ছাত্রসংখ্যা ক্রমাগত কমে চলেছে। কলেজগুলিতেও পর্যাপ্ত অধ্যাপক নেই। কিন্তু এ সবই যে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদি তথা বিজেপি সরকারের শিক্ষানীতি এ রাজ্যে প্রয়োগেরই ফল, প্রধানমন্ত্রী তা চেপে গেলেন। উচ্চমাধ্যমিকের ফল প্রকাশ দীর্ঘ দিন হয়ে গেলেও এখনও ভর্তি প্রক্রিয়াই শেষ হয়নি। বাস্তবে গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাটিকে বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়ার যে প্রক্রিয়া সিপিএম শাসনে শুরু হয়েছিল, তৃণমূল সেই প্রক্রিয়াটিকে সম্পূর্ণ করে ফেলেছে। স্বাভাবিক ভাবেই সমাজের নিচের তলার দরিদ্র, নিম্নবিত্ত বিরাট অংশের কাছে সরকারি শিক্ষার নামে যা যাচ্ছে তা বাস্তবে দুধের বদলে পিটুলি গোলা জল ছাড়া আর কিছু নয়। তৃণমূল সরকার শিক্ষার বেসরকারিকরণের রাস্তাটিকে হাট করে খুলে দিয়েছে এবং রাজ্যের মানুষকে বাধ্য করছে শিক্ষা নামক পণ্যটিকে বিপুল দামে কিনতে। এটাই তো জাতীয় শিক্ষানীতিতে মোদি সরকার চেয়েছে।

রাজ্যে শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতি কী ভয়াবহ আকার নিয়েছে তা আজ কারও অজানা নয়। শিক্ষক নিয়োগে ব্যাপক দুর্নীতি এখন আদালতে বিচারাধীন। ঘুষকাণ্ড এবং নিয়োগ মামলায় ইডি এবং সিবিআই গ্রেফতার করেছিল শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জীকে। কিন্তু সিবিআইয়ের সেই মামলার পরিণতি কী? সে দিন বিজেপি নেতারা বলেছিলেন, দুর্নীতি মামলায় কেউ রেহাই পাবে না। সিবিআই সবাইকে গ্রেফতার করবে। প্রধানমন্ত্রী কিন্তু তাঁর বক্তৃতায় একবারও বললেন না, কেন সিবিআইয়ের এই মামলা গতি হারাল, কেন দুর্নীতিতে জড়িত বাকি নেতারা গ্রেফতার হলেন না? তা ছাড়া বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিও যে চরম দুর্নীতিতে ডুবছে সে কথা কি বক্তৃতার সময়ে প্রধানমন্ত্রী ভুলে গিয়েছিলেন? ভুলে গিয়েছিলেন দেশের এ যাবত সবচেয়ে বড় দুর্নীতি মধ্যপ্রদেশে বিজেপি সরকারের ব্যপম কেলেঙ্কারির কথা? তা হলে দুর্নীতি নিয়ে তাঁর এই বক্তব্য একপেশে। তাঁর উদ্বেগ একেবারেই মেকি। এই ছদ্মউদ্বেগের কী মূল্য রয়েছে বাংলার মানুষের কাছে?

বাস্তবে প্রধানমন্ত্রী এসেছিলেন নির্বাচনী বক্তৃতা দিতে, যা এর আগেও তিনি বহুবার দিয়ে গেছেন। তৃণমূলের দুর্নীতি এবং অপশাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ মানুষের সমর্থন নিজের দলের দিকে টানতেই তাঁর এই বাঙালি-ভক্তির বাহানা। তাই যে প্রধানমন্ত্রী পশ্চিমবঙ্গের হাসপাতালেও মহিলারা সুরক্ষিত নন বলে গভীর উদ্বেগ দেখিয়ে বলেন, আপনারা দেখেছেন, মহিলা চিকিৎসকের উপরে অত্যাচারের পরে তৃণমূল কী ভাবে অপরাধীদের আড়াল করেছিল। হ্যাঁ, এ কথা আজ আর কারও অজানা নয় যে, আরজি কর হাসপাতালে চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় দোষীদের মুখ্যমন্ত্রী এবং তৃণমূল প্রশাসন নির্লজ্জ ভাবে আড়াল করে চলেছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সিবিআই কেন তৃণমূল সরকারের মতো একই ভাবে দোষীদের আড়াল করে চলেছে, সততা থাকলে প্রধানমন্ত্রী তো সে উত্তরটাও প্রকাশ্য সভায় দিতেন। কিন্তু তিনি তা দেননি। কাকে আড়াল করতে চাইলেন প্রধানমন্ত্রী? তৃণমূল সরকারকে, নাকি সিবিআইকে? তা হলে ফারাকটা কোথায় থাকল তৃণমূল কংগ্রেস আর বিজেপিতে?

সংগ্রামী ঐতিহ্যই বাংলার অস্মিতা

প্রধানমন্ত্রী মুখে যতই বাঙালি অস্মিতার পক্ষে কথা বলুন, বাস্তবে বাঙালি অস্মিতা বলে বাংলার মানুষের কাছে আলাদা কিছু কোনও দিনই ছিল না, আজও নেই। অস্মিতার বাহনে বাংলায় প্রাদেশিকতার চর্চা জায়গা করতে পারেনি। এবং তা হয়নি নবজাগরণ, স্বাধীনতা আন্দোলন এবং পরবতী সময়ে বামপন্থী আন্দোলনের ঐতিহ্যের কারণেই। বাঙালি অস্মিতা যদি কিছু থাকে তবে তা এটাই। বাংলার এই আপসহীন সংগ্রামের চেতনায় সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে আজ বিজেপি এবং তৃণমূল উভয়েই তাদের হীন রাজনৈতিক স্বার্থে ধ্বংস করছে। এই নবজাগরণের সঙ্গে বিজেপি বা তার পূর্বসূরী হিন্দু মহাসভা, জনসংঘের কোনও সম্পর্ক ছিল না। বরং এই সংগঠনগুলি ছিল ভারতীয় নবজাগরণের চিন্তার সম্পূর্ণ বিরোধী। রামমোহনের ধারাবাহিকতায় বিদ্যাসাগরের চিন্তা বিকশিত হয়েছিল ধর্মের সঙ্গে ছেদ ঘটিয়ে সেকুলার তথা পার্থিব মানবতার পথে। সেই একই চিন্তার নানা রূপ নানা মাত্রায় আমরা দেখতে পাই একদিকে রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, নজরুলের মধ্যে, অন্য দিকে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, সত্যেন বোসদের মধ্যে। বাস্তবে বাঙালি অস্মিতা যদি কিছু থেকে থাকে তবে তা এই নবজাগরণের বিকশিত চিন্তা এবং স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়েই। বিজেপির পূর্বসূরী সংগঠনগুলি তো স্বাধীনতা আন্দোলনকেই স্বীকার করেনি। তাই তারা স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেনি শুধু নয়, তার বিরোধিতা করে ব্রিটিশের সঙ্গে সহযোগিতা করে গেছে। তাই কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপির স্বরাষ্টমন্ত্রীর মিছিল থেকে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙতেও যেমন তাদের বাধে না, তেমনই বিদ্যাসাগর এবং পরবর্তীকালের শিক্ষাবিদরা যে ধর্মনিরপেক্ষ, সেকুলার শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছিলেন, জাতীয় শিক্ষানীতির নামে সেই শিক্ষানীতিকে ধ্বংস করে অবৈজ্ঞানিক, অনৈতিহাসিক শিক্ষা চালু করতেও বাধে না। তাই প্রধানমন্ত্রী কিংবা বিজেপি নেতাদের মুখে কখনও রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, নজরুল কিংবা ক্ষুদিরাম, মাস্টারদা, নেতাজির কথা শোনা যায় না, শোনা যায় দেশভাগের অন্যতম প্রবক্তা, চরম সাম্প্রদায়িক শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর কথা। এ রাজ্যে এমন কোনও বিজেপি সমর্থক পাওয়া যাবে না যিনি নেতাজির প্রতি অনুরক্ত নন। অথচ নেতাজি নিজে হিন্দু মহাসভার নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর সাম্প্রদায়িক চিন্তাকে বাংলার রাজনীতি থেকে বিসর্জন দিতে দেশের মানুষের কাছে আহ্বান জানিয়ে ছিলেন। বিজেপির রাজনীতিকে সমর্থন করলে বাংলার এই ঐতিহ্যকে সম্মান দেওয়া যায় না।

পুঁজিপতিদের বেঁধে দেওয়া ছকের বাইরে মানুষকে ভাবতে হবে

আজ রাজ্যের মানুষকে বুঝতে হবে যে, তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গে বিজেপি রাজনীতির মূলগত ফারাক বিশেষ কিছু নেই। তৃণমূল কংগ্রেস একটি আঞ্চলিক দল, বিজেপি জাতীয় দল। একটি দল আঞ্চলিক পুঁজির স্বার্থরক্ষাকারী, অন্যটি জাতীয় একচেটিয়া পুঁজির স্বার্থরক্ষাকারী। উভয়ের নীতিই পুঁজিপতিদের স্বার্থবাহী, তাই জনবিরোধী। মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, জনগণের জন্য শিক্ষা-চিকিৎসার সুযোগ, কিংবা নারীর মর্যাদা রক্ষা সমস্ত প্রশ্নেই উভয়ে একই নীতি নিয়ে চলে। তাদের মধ্যে যে বিরোধ, তা হল পুঁজিপতি শ্রেণির অবাধ শোষণ-লুণ্ঠনের সহায়তা করার মধ্য দিয়ে তাদের আর্শীবাদধন্য হয়ে কে ক্ষমতার গদিতে বসবে, তা নিয়ে। তাই বর্তমানের সংকট-জর্জরিত পুঁজিবাদী সমাজ প্রতিদিন যে নতুন নতুন সংকটের জন্ম দিচ্ছে সেগুলি সমাধান দূরের কথা, উভয় সরকারের নীতিতেই তা আরও তীব্র হচ্ছে। এই অবস্থায় পুঁজিপতি শ্রেণি এবং তাদের পারিচালিত সংবাদ মাধ্যমের বেঁধে দেওয়া ছকের বাইরে বেরিয়ে এসে জীবনের সমস্যাগুলি সমাধানের রাস্তা মানুষকে খুঁজতে হবে। বাঙালি অস্মিতার আবেগে ভুলে যাওয়া চলে না যে, দেশের অন্যান্য রাজ্যের মতোই বাংলার মানুষও তীব্র অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সঙ্কটে নিমজ্জিত। এ-ও ভুললে চলবে না যে, সরকার পরিবর্তনে এই সঙ্কটের সমাধান হবে না।